গদ্যানুশীলনে মিঠুন মুখার্জী

জগন্নাথ দর্শন 

পুরীর জগন্নাথের মন্দির। সকাল সাতটা বাজে। হাজার হাজার দর্শনার্থীর ভিড়। আমি মা ও প্রিয়াঙ্কাকে নিয়ে জগন্নাথ দর্শনে এসেছি। টানা দুই মাস বন্ধ থাকার পর দুসপ্তাহ হল দর্শনার্থীদের জন্য মন্দির খুলে দেওয়া হয়েছে। তাই কাতারে কাতারে দর্শনার্থীর ভিড়। যাদের করোনা ভ্যাকসিনের দুটি ডোজ দেওয়া আছে শুধুমাত্র সার্টিফিকেট দেখিয়ে তাদেরকেই ঢুকতে দিচ্ছে। আমি জুতো রাখতে গিয়ে মা-দের বলে গিয়েছিলাম— “তোমরা ভিতরে ঢুকে দাঁড়াও। আমি জুতোগুলো রেখে আসছি। তারপর একসঙ্গে দর্শন করব।” জুতো রাখার জায়গায় লম্বা লাইনের কারণে আমার আসতে অনেক দেরি হয়ে যায়। সার্টিফিকেট দেখিয়ে ভিতরে ঢুকে সারা জায়গা খুঁজেও মা ও প্রিয়াংকাকে কোথাও পাই না। গরু খোঁজার মতো তাদের দুজনকে মন্দিরের মধ্যে ও বাইরে খুঁজতে লাগি, কিন্তু পাইনা। আমার প্রচন্ড দুশ্চিন্তা হয় যে, ওদের এই জায়গার কিছুই চেনা পরিচিত নয়। মনে মনে চিন্তা হয়– কি করবে ওরা! জুতো রাখার জায়গা আমি পুনরায় আসি। সেখানে তাদেরকে খুঁজে পাই না। আমার টেনশন উত্তরাত্তর বেড়ে যায়। পুরীর মন্দিরে পাণ্ডাদের খুব উপদ্রব। তাদের পাল্লায় পড়ল কিনা — সেটাও চিন্তার জগৎকে নাড়া দিতে লাগে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর একজন অপরিচিতের ফোন দিয়ে হোটেলে বাবার কাছে ফোন করে জানতে পারি— সবেমাত্র তারা অটো করে হোটেলে ফিরে গিয়েছে। তারাও আমাকে না পেয়ে অনেক খোঁজা খুঁজি করেছে। শেষে একশো টাকা দিয়ে অটো নিয়ে হোটেলে ফিরেছে। আমার টেনশন যেমন মুহূর্তে কমে যায়, তেমনি আমার কথা না শোনার জন্য তাদের দুজনের উপর প্রচন্ড রাগও হয়।
আমি আসলে মা ও প্রিয়াঙ্কাকে জগন্নাথ ভালো করে দর্শন করানোর জন্য এসেছিলাম। ওরা খুব ভালোভাবেই দর্শন করে হোটেলে ফিরেছে। পূর্বেই জানানো প্রয়োজন, গত দুদিন আগে প্রথমবার জগন্নাথ দর্শনে এসেছিলাম আমরা। সেদিনও ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিলাম। মা ও প্রিয়াংকার সঙ্গে আমার মেয়ে আরাধ্যা ছিল। ভিড়ের মধ্যে তাকে দেখতে গিয়ে জগন্নাথ দর্শন ভালোভাবে করতে পারেনি তারা। সেই অতৃপ্ত হৃদয় আজ তৃপ্ত হয়েছে তাদের। আজ আর মেয়েকে নিয়ে যাইনি। আমি গত দিন খুব ভালোভাবে জগন্নাথ দর্শন করলেও আজ সে সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হয়েছি। আজ যখন দর্শনের জন্য মন্দিরে ঢুকি, তখন এক ঘন্টার জন্য মন্দিরের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। পুলিশে দাঁড়াতে দিচ্ছিল না। তাছাড়া মা-বউকে হারিয়ে মনের মধ্যে একটা টেনশন কাজ করছিলো। তাই অপেক্ষা করে দর্শন না করে প্রসাদ কিনে নিজে নিজে ভগবানের উদ্দেশ্যে অর্পণ করে মন্দিরের বাইরে চলে আসি এবং ওদের খুঁজতে লাগি।
গতদিন জগন্নাথ দর্শন করতে এসে কতগুলো সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলাম আমরা। আবার কিছু ভালোও ঘটেছিল। কথায় বলে ‘কষ্ট না করলে কেষ্ট মেলে না’। কথাটা শত পারসেন্ট হক। বাবা, মা, মেয়ে ও প্রিয়াঙ্কাকে নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু ভ্যাকসিনের কাগজ আনিনি। এদিকে বাবার পটি পাওয়ায় আমরা দুজনে হোটেলে ফিরে যাই। সার্টিফিকেটগুলি নিয়ে আধা ঘন্টার মধ্যে আমি মন্দিরে ফিরে আসি। বাবা বলেন– “তুই যা, আমি আর যাব না।” বাবার জগন্নাথ দর্শন হলো না বলে আমার খুব খারাপ লেগেছিল। আসতে-যেতে ষাট টাকার টোটো ভাড়া দেড়শ টাকা নেয়। বাইরে জুতো রেখে আমরা সার্টিফিকেট দেখিয়ে জগন্নাথের মন্দিরে প্রবেশ করি। মা আমাকে পুজো দেওয়ার জন্য ডালি কিনে আনতে বলেন। মা-রা মন্দিরে ঢুকে যায় দর্শনার্থীদের ভিড়ের চাপে। তখনও আমি পৌঁছায়নি। ফলে প্রথম হারানোর সূত্রপাত এখান থেকেই হয়।
পুজোর ডালি কিনতে গিয়ে পাণ্ডাদের খপ্পরে পড়ি। চীনে জোঁকের মতো পিছনে লেগে থাকে তারা। তাদের একটা বড় ইউনিয়ন আছে মন্দিরে। আমি তাদের ডাকিনি, আমার দরকার নেই তাদের, তবুও ছায়ার মতো পিছু লেগে থাকে তারা। কথায় কথায় ধাইকিরিকিরি কথাটা ব্যবহার করে। এই কথাটির অর্থ তাড়াতাড়ি। মন্দিরের মধ্যে অনেক জায়গায় পুজোর ডালি বিক্রি হয়। তার মধ্যে তিনটি জায়গা পান্ডাদের সংগঠনের প্রতিষ্ঠান। সেখান থেকে কেনার জন্য তারা নানান কথায় মগজ ধোলাই করে। আপনি চাইবেন না, তবুও ওরা এক প্রকার বাধ্য করে। একটা বড় টাকা কমিশন থাকে ওদের। কম দামে যেখানে পুজোর ডালি পাওয়া যায় সেখানে আমি ডালি কেনার জন্য যেতে গেলে একজন পান্ডা বলে– “পুজো দেওয়া ডালি জগন্নাথকে দেবেন!” আমি দাম জিজ্ঞাসা করতে গিয়েও করিনা। অবশেষে ওদের খপ্পরে পড়ে যাই। ওদের প্রতিষ্ঠান থেকে ২৫১ টাকার দুটো ডালি কিনি। ওটাই ওদের কাছে সবচেয়ে কম দামের ডালি। এছাড়া ৫০১, ১০০১, ২০০১, ৪০০১, ৫০০১ টাকা পর্যন্ত ডালি আছে। কিভাবে যে মানুষের সঙ্গে এরা প্রতারণা করছে না দেখলে ঠিক বোঝা যাবেনা। এরপর ডালি নিয়ে আমি লাইনে দাঁড়াই। পরে শুনি এই ডালির আসল মূল্য একশো টাকা। বড় বোকা বনে গেলাম। শুধু আমি নই, হাজার হাজার নানান শ্রেণীর মানুষকে মন্দিরের ভিতরে ও বাইরে মুরগি বানাচ্ছে এরা‌। তাছাড়া একটু ধনী গোছের বুঝতে পারলে একপ্রকার কথার প্যাচে ফেলে পুজো করিয়ে পাঁচশ থেকে দু-হাজার টাকা পর্যন্ত পকটস্হ করছে।
আরো একটা বিষয় দেখলাম আমি। ঠাকুরের ভোগ বিক্রি করার বাজার। মন্দিরের ভিতরেই একটা ভোগ ও মহাপ্রসাদের বাজার আছে। সেখানে অনেক দোকান আছে। এক এক জায়গায় এক এক রকম দাম। তবে সবই ঠাকুরের অরিজিনাল ভোগ বলে আমার মনে হলো না। পান্ডাদের মধ্যে মানুষ ঠকানোর একটা বিরাট প্রবণতা লক্ষ করলাম। ভোগের ঘরটাও দেখলাম। ঠাকুরের অসীম কৃপা না থাকলে এভাবে রান্না করা যায় না। হাড়ির উপর হাড়ি সাজানো ও নীচ থেকে জ্বাল দেওয়া হচ্ছে। সব হাড়িতে ভোগ তৈরি হয়ে যাচ্ছে। ভোগের ঘরে বাইরের কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয় না। যারা মন্দির দেখাশোনা করেন ও ভোগের দায়িত্বে আছেন, তারাই প্রবেশের অধিকার পান। অন্নভোগ ও খাজা হলো জগন্নাথের ভোগ ও প্রসাদ।ভোগ নেওয়ার জন্য আগে থেকে টিকিট কাটলে পান্ডারা হোটেলেও পৌঁছে দেন।
প্রতি পাঁচ বছর অন্তর বিশেষ দিনে সমুদ্রে নিমকাঠ ভেসে আসে। সেই কাঠ দিয়ে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার মূর্তি তৈরি করা হয়। আগের মূর্তিগুলি বিশেষ জায়গায় মাটির নিচে পুঁতে দেওয়া হয়। একজন প্রবীণ পান্ডা স্বপ্নাদেশ পান, সেই অনুযায়ী পূজা-অর্চনা, ঠাকুর নির্মাণ সবকিছুই করা হয়। মন্দিরের চূড়ায় পতাকা লাগানোর জন্য প্রতিদিন লোক ওঠে। আবার প্রতিদিন সন্ধ্যার আগে সেই পতাকা নামিয়ে আনা হয়। চূড়ায় ওঠার কি অসাধারণ দক্ষতা। সর্বত্র দেখলাম মানুষ ঠকানো ব্যবসায় সকলে ব্যস্ত। কোনো জায়গায় ন্যায্য দাম নেই। দেখে মনে হয়েছে যেন আকালের দিন, যে যেমন পারে মানুষকে ঠকিয়ে যাচ্ছে।
মোট তিন দিন আমরা পুরীতে ছিলাম। প্রথম ও শেষ দিন জগন্নাথ দর্শন করে সমুদ্রস্নানে ও সমুদ্রের সৌন্দর্যে মেতেছিলাম। বিকেল বেলায় সমুদ্রের পাড়ে বসা বাজার থেকে জগন্নাথের মূর্তি কিনি বাড়ির মন্দিরের জন্য। দ্বিতীয় দিন খুব ভোরে উঠে হোটেলে স্নান সেরে বাসের টিকিট কেটে আমরা সকলে কোনারকের সূর্য মন্দির, উদয়গিরি-খণ্ডগিরি, নন্দনকানন চিড়িয়াখানা, ভুবনেশ্বরের লিঙ্গেশ্বরের মন্দির আরো কয়েকটা জায়গা ঘুরতে গিয়েছিলাম। দীর্ঘ বারো ঘন্টার সাইটসিন ছিল। সকলেরই একটু শারীরিক কষ্ট হয়েছিল‌। তবে হোটেলে ফিরে সেইদিন তাড়াতাড়ি সকলে ঘুমিয়ে পড়ি। তিন দিন থাকার পর চতুর্থ দিন সকালে যখন অটো রিজার্ভ করে ট্রেন ধরার জন্য সমুদ্রের পাশ থেকে স্টেশনে যাচ্ছিলাম, তখন মন চাইছিল না বাড়ি ফিরে যেতে। মনে হচ্ছিল আরও কিছু দিনের জন্য পুরীতে থেকে যাই। জগন্নাথ দর্শন ও সমুদ্রের অসাধারণ সৌন্দর্যে এমনই অভিভূত হয়েছিলাম সকলে যে, বাড়ি ফিরেও সেই রেশ যেতে সপ্তাহ খানেক সময় লেগেছিলো। তবে মন থেকে একটা কথা বারবার ধ্বনিত হয়েছিল — “জয় জগন্নাথ। জয় জগন্নাথ।”

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!