গদ্যের পোডিয়ামে মালা মিত্র

সাঁঝবাতি

সব দিনই তো সূর্য্য ওঠার আগে ঊষাকাল,পরে সকাল,ধীরে ধীরে মধ্যাহ্ন,অপরাহ্ন,সায়াহ্ন,সাঁঝবেলা বা গোধূলি,সন্ধ্যা জীবৎকালে আমরা নিত্যই দেখি।
কিন্তু কোন কোন সময় ওই ক্ষণগুলি এক জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে আমৃত্যু। বুকের ঘরে সোনা মণিমানিক্য খচিত হয়ে সারাজীবন বিরাজমান থাকে।
কত ঊষাই তো তার শান্তশ্রী নিয়ে প্রত্যহ আসে।আমরা নানান কারণে ওই সময় উঠি নিত্যকার কাজকর্ম করি,কিন্তু সে সময়টা বা ক্ষণটা মনে অবিনশ্বর ভাবে গেঁথে রাখি এমনটা কিন্তু নয়।
এই যেন এল গেল,আবার বিশেষ মানুষের কাছে এই সময়টা বিশেষ কিছু ছাপ রেখে যায়।কবির ভাষায়,’সকাল বেলার আলোয় বাজে,বিদায় ব্যাথার ভৈরবী’।
সকাল আসে নিয়ম মত।প্রথামাফিক কাজকর্মে জড়িয়ে পড়ি,আলাদা ভাবে সে সময়টা মগজঘরে স্থায়ী ছাপ ফেলে না।
সকাল গড়িয়ে দুপুর আসে,চলেও যায় নিয়মমত।কিন্তু কোনো মধুর দুপুর কারো কারো জীবনে স্ট্যাম্প পেপারে চিরকালীন ছাপ রাখে।
মধ্যাহ্ন স্বভাবতই উষ্ণ গনগনে,কিন্তু কারো জীবনে কাঙ্খীত বৃষ্টি,সুরের প্লাবন হয়ে ওঠে,যা নাকি সে কখনো ভোলে না।বিশেষ কারণে বিশেষ হয়ে ওঠে,সেই পূণ্য ক্ষণ জন্ম জন্মান্তর।
বিকেল ও আসে একই পদ্ধতিতে।এমনিতে বিকেল আসে নিত্য।অবশ্যই একেক ঋতুতে একেক রকম।
তবু হয়ত কোনো এক বিকেল হটাৎ ই কারো কাছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে ভাস্বর হয়ে থাকে।যা সে ভুলতে চাইলেও ভুলতে পারে না কোনদিন।
আবার ‘আসা যাওয়ার পথের ধারে’সাঁঝবেলা বা সায়াহ্ন তার বিচ্ছুরিত আলো নিয়ে আসে,সকলেই প্রত্যক্ষ করেন,কিন্তু কে জানে এই কনে দেখা মেঘে,গোধূলিকাশে,কার যাপন সায়াহ্নে প্রথম প্রেমের তীব্র আকর্ষণের চেতনা জাগায়।
যা তার জীবনের অংশ নয়,পুরো জীবন হয়ে ওঠে।
গোধূলির স্নিগ্ধ মায়াবী আলো ঢেলে পৃথিবীর সাথে আকাশের মেলবন্ধন ঘটায়,নক্ষত্র নেমে আসে মাটিতে,চোখপুড়ে যায় সে আলোকবর্তিকায়,পূণ্য সেই গেরুয়া আলোয়,সে সময় যদি কোনো শ্যামকান্তি দেবপূরুষ গেরুয়া পাঞ্জাবিতে, স্বভাবসিদ্ধ ভাবগাম্ভীর্য্যে আজানুলম্বিত দুহাত,কাঁধে উদাসীন কবিঝোলা স্নেহময় স্নিগ্ধ মৃদুহাসি নিয়ে সদন চত্বরে আবির্ভূত হন,সেই মাহেন্দ্রক্ষণ কি ভোলার?যা অমৃতযোগে ক্ষণটিকে শ্রেষ্ঠ থেকে শ্রেষ্ঠতমতে রুপান্তরিত করে।
যে ভাললাগা ভালবাসার পরশ খুব সুক্ষ্ণতার সঙ্গে দয়িতা তার দয়িতের মিলন পূর্বরাগের সূচনা নিয়ে আসে,সে আবেগপূর্ণ চিরকালীন শাশ্বত প্রেম ভালবাসা বুকে পূষে দয়িতা তার সারাজীবনের চড়াই উৎড়াই,আঁকাবাঁকা পথ হাসি মুখে পার হয়ে যায় জন্ম জন্ম।
‘শুনে সাঁঝবেলার সেই গান,মন বায় একা উজান ‘।
মনে হয়,’সেদিন ছিল কি গোধূলি লগন শুভ দৃষ্টির ক্ষণ,চেয়েছিল মোর নয়নের পানে যেদিন তব নয়ন’
তাই উজ্জ্বল সে সময়,গোধূলির রাঙা আলোয় পাখীদের কুলায় ফেরার মত,উদভ্রান্ত মন এক পরমাশ্রয় খুঁজে পায়।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।