T3 || ১লা বৈশাখ || বিশেষ সংখ্যায় মিঠুন মুখার্জী

প্রত্যয়
স্বপ্না ও অরিজিতের বৈবাহিক সম্পর্ক সামান্য একটি ভুল বুঝাবুঝির কারণে শেষ হয়ে যায়। দশ বছর প্রেম করে তাদের সম্পর্ক বাস্তবে রূপ পেয়েছিল। অরিজিৎ স্কুল টিচারের চাকরি পাওয়ার পর স্বপ্নার বাড়ির কেউ আর আপত্তি করেননি। স্বপ্নাও চাকরি পেয়েছিলেন টাটা কোম্পানিতে। বিয়ের একবছর পরে অরিজিৎ তাকে বলেছিলেন— “একটা সন্তান প্রত্যেকের জীবনে ভীষণ প্রয়োজন। নতুবা দম্পতির জীবনে পূর্ণতা আসে না। তাই আর দেরি না করে এবার প্ল্যান করে আমাদের সন্তান নিতে হবে। তুমি চাকরিটা ছেড়ে দাও। আমি যা মাইনা পাই তাতে আমাদের ভালো মতো চলে যাবে।” অরিজিতের কথা শুনে স্বপ্নার মুখটা অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। তিনি অরিজিৎকে বলেছিলেন— “আমি ঠিক চালিয়ে নেব। তুমি একেবারে চিন্তা করো না। লোক রেখে দেব। তাছাড়া সাত মাস মেটার্নিটি লিভ পাব। এর জন্য চাকরি ছাড়তে হবে না।” স্বপ্না মনে মনে ভেবেছিলেন, ‘সে এগিয়ে যাক অরিজিৎ তা চান না।’ কোনো কিছুর বিনিময় তিনি চাকরি না ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। অরিজিতের কথার কোনো আমল না দেওয়ায়, সেও মনে মনে খুব অসন্তুষ্ট হন।
দেখতে দেখতে দুবছর পেরিয়ে যায়। স্বপ্নার একটা ফুটফুটে মেয়ে হয়। অরিজিতের প্রাণ ভোমরা হয়ে ওঠে মেয়ে আরাধ্যা। আরাধ্যার যখন তিন মাস, তখন মা স্বপ্না পুনরায় টাটা কোম্পানির কাজে যোগ দেন। আরাধ্যা ও অরিজিৎকে দেখাশোনার জন্য একজন চব্বিশ-পঁচিশ বছর বয়সী মহিলা রাখেন তিনি। সকাল নটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত তার কাজের সময় ছিল। অরিজিৎ স্কুল থেকে বিকেল চারটেতে ফিরলেও স্বপ্না ফিরতেন সন্ধ্যা সাতটায়। নিজের স্ত্রীর থেকে অরিজিৎ কাজের মেয়েটির উপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। সকালে স্নানের জল তুলে দেওয়া থেকে শুরু করে, খাবার বেড়ে দেওয়া, কখনো কখনো কফিও তৈরি করে দিত সেই মহিলাটি। এর ফলে স্বপ্নার সঙ্গে ধীরে ধীরে দূরত্ব তৈরি হয় তার।
দুই-তিন মাস পর একদিন একটা সামান্য বিষয় নিয়ে স্বপ্না ও অরিজিতের মধ্যে মনোমালিন্য হয়। স্বপ্না তার স্বামীর উপর কাজের মহিলাটিকে নিয়ে সন্দেহ করতে শুরু করেন। মুখ থেকে বলেই ফেলেন—“অল্প বয়সী মেয়ে ছেড়ে আমাকে কি আর ভালো লাগে। ডুবে ডুবে জল খাচ্ছ, ভাবছো আমি বুঝতে পারছি না।” এই কথাটা শুনে অরিজিৎ বুঝতে পারেন, স্বপ্না কি বলতে চাইছেন। মনে খুব আঘাত লাগে তার। বাস্তবে তাদের দুজনের মধ্যে কিছুই ছিল না। কিন্তু সন্দেহ বড় খারাপ বিষয়। এরপর তিনি স্বপ্নাকে বলেন—“তোমার মনে যখন এত সন্দেহ, তখন কাজটা ছেড়ে মেয়েকে তুমি সামলাচ্ছ না কেন? এভাবে কারো চরিত্রে কালি ছিটানোর আগে দশবার ভাববে। নতুবা দীর্ঘদিনের সম্পর্ক সন্দেহের কারণে ভেঙে যাবে।” স্বপ্না অরিজিতের কথা শুনে বলেন— “আমাকে সম্পর্ক ভেঙে দেওয়ার ভয় দেখাচ্ছো? আমি অন্যায়কে সমর্থন করি না। আমি আরাধ্যাকে নিয়ে কালকেই বাপের বাড়ি চলে যাব। তোমার মতো আত্মকেন্দ্রিক মানুষের সাথে আমি থাকবো না।” স্বপ্নার কথা শুনে অরিজিৎ পুনরায় বলেন— “তুমি ভুল বুঝছো আমাকে। আজ যদি তুমি চলে যাও, তবে কাল অবশ্যই অনুতপ্ত হবে। আমার মেয়েকে বিনা দোষে আমার থেকে আলাদা করে তুমি মহাপাপ করবে। ভালো করে ভেবে তবেই সিদ্ধান্ত নিও। পরে পোস্তিও না।” অরিজিতের কোনো কথাই শোনেননি স্বপ্না। পরদিন আরাধ্যাকে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে যান তিনি। মায়ের কাছে মেয়েকে রেখে চাকরিতে যাওয়া শুরু করেন। জীবনে তাগিদ অনুভব করেন। কিছু করতেই হবে।
স্বপ্না আরাধ্যাকে নিয়ে চলে যাওয়ায় অরিজিত মনেপ্রাণে খুবই দুঃখ পেয়েছিলেন। মনে মনে সংকল্প করেছিলেন— ” তিনি স্বেচ্ছায় স্বপ্নাকে মানাতে যাবেন না। নিজের ভুল যতদিন না বুঝতে পারছেন স্বপ্না, ততদিন অরিজিৎ তার জন্য অপেক্ষা করবেন। তাতে যদি একযুগ অতিবাহিত হয়ে যায়, তো যাক।” শুধুমাত্র মেয়ের কথা চিন্তা করে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠে তার।
দেখতে দেখতে পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হয়ে যায়। এই পাঁচ বছরে তাদের দুজনের জীবনের অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়ে যায়। কিন্তু কেউ কারো প্রতি একটুও নরম হন নি। আরাধ্যা বাবার কাছে আসতে চাইলেও স্বপ্না জেদ করে তাকে অরিজিতের কাছে আসতে দেন নি। স্বপ্নার অপরাধের মাত্রাটা একটু একটু করে ক্রমশ বেড়ে যায়। হঠাৎ একদিন স্বপ্নার চাকরিটা চলে যায়। কোম্পানি তাদের অনেক কর্মচারীকে ছেড়ে দেন। ইউনিয়ন অনেক চেষ্টা করেও কোনভাবে মালিকপক্ষের সঙ্গে পেরে ওঠেনি। স্বপ্নার অর্থ উপার্জনের অহংকার কয়েক দিনের মধ্যে ভ্যানিশ হয়ে যায়। এরপর সংসার চালানো খুব কঠিন হয়ে পড়ে। একটা কাজের খোঁজে অনেক জায়গায় যান তিনি। কিন্তু কেউই কাজ দেননি। বাস্তবটা যে কত কঠিন তা তিনি বুঝতে পারেন। এরপর তার মা তাকে বলেন—” এখন কি করবি? অরিজিৎকে ছেড়ে আসা তোর উচিত হয়নি। আরাধ্যার মুখের দিকে তাকিয়ে তোর থাকা উচিত ছিল। তাছাড়া সন্দেহের বসে সংসার ছেড়ে চলে আসা বোকামি। তোর কাছে তো এমন কোনো প্রমাণ ছিল না, যা থেকে প্রমাণিত হয় সত্যি সত্যি অরিজিৎ অপরাধী।” মার কথা শুনে স্বপ্না মাথা নত করে থাকেন। মনে মনে নিজের ভুল বুঝতে পারেন। আরাধ্যার মুখের দিকে তাকিয়ে অরিজিতের কাছে ক্ষমা চাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
এদিকে অরিজিতের জীবনেও ঘটে যায় বিশাল পরিবর্তন। স্বপ্না আরাধ্যাকে নিয়ে চলে আসলে, তিনিও বাড়ি ভাড়া দিয়ে কলকাতায় চলে যান। জীবনে একাকীত্ব অনুভব করতে করতে মানসিক ও শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এক মাস যাবত স্কুল যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। অরিজিতের একমাত্র সম্বল তার মাও মাস তিনেক আগে হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। মায়ের শোকে ও দুঃখে অরিজিত আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েন। অরিজিতের মা মরে যাবার খবর স্বপ্না পান নি। তিন কুলে অরিজিতের আর কেউ না থাকায়, কলকাতায় একাকীত্বের জীবন অতিবাহিত করতে থাকেন সে।
মার এভাবে বোঝানোয় তিনি উপলব্ধি করেন— “একটা সংসার নারী ও পুরুষের বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে থাকে। কোনো একটা ছোটখাটো বিষয় নিয়ে সন্দেহ করে সম্পর্ক নষ্ট করা সহজ, কিন্তু সমস্ত ঝড়-ঝঞ্ঝা সহ্য করে সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া খুবই কঠিন বিষয়। তাছাড়া সে প্রত্যক্ষ এমন কিছুই পাননি,যাতে অরিজিতের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করা যায়। অরিজিৎ অনেক বললেও সে তার একটা কথাও শোনেননি। এটা তার উচিত হয়নি।” অনেক খোঁজাখুঁজি করার পর স্বপ্না অরিজিতের খোঁজ পান। মেয়ে আরাধ্যা ও মাকে নিয়ে কলকাতায় অরিজিতের কাছে আসেন। অরিজিতের রুগ্ন শরীর দেখে স্বপ্না কান্না করে দেন। দৌড়ে গিয়ে অরিজিতের পা দুটো জড়িয়ে ধরে বলেন—“আমি অনেক অপরাধ করেছি। তোমার এই অবস্থার জন্য আমিই দায়ী। আমার ভুলেই আজ তোমার এমন অবস্থা। তুমি আমাকে ক্ষমা কর। আর কোনদিন তোমাকে এমন দুঃখ আমি দেবো না। তোমার মেয়েকে তোমার কাছ থেকে দূরে নিয়ে যাব না।” স্বপ্নার চোখে জল দেখে অরিজিতের দু-চোখেও জল নেমে আসে। কিন্তু তখনও তার অভিমান ভাঙে না। মাথা নত করে বসে থাকেন। একটা ঝড় এসে তাদের সুখের জীবনকে তছনছ করে দিয়েছিল। যার জন্য দায়ী স্বপ্না নিজে। তিনি তার প্রাণপ্রিয় স্বামীর উপর আস্থা হারিয়েছিলেন। স্বপ্নার মা হাত জোর করে অরিজিৎকে বলেন—“বাবা, পুরনো দিনের ঘটনাকে ভুলে গিয়ে নতুনভাবে জীবন শুরু করো। আমি হাত জোর করে তোমার কাছে অনুরোধ করছি। স্বপ্না নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে। আর কখনো এরকম ভুল ও করবে না।” স্বপ্নার মার কথা শুনেও অরিজিৎ অভিমানে চুপ করে বসে থাকেন। বুক ফেটে দু-চোখে জলের ধারা নেমে আসে। একটা কথাও বলেননি। এমন সময় স্বপ্নার মেয়ে আরাধ্যা দিদুনের কোল থেকে নেমে বাবাকে জড়িয়ে ধরে। কেঁদে কেঁদে বলে—“বাবা, তুমি মাকে মেনে নেবে না? আমি আবার তোমার থেকে আলাদা হয়ে যাব?” মেয়ের এই কথা শুনে এবার অরিজিৎ আত্মসংবরণ করতে পারলেন না। মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ কান্না করেন। তারপর বলেন—“আমি এই দিনটার জন্যই অপেক্ষায় ছিলাম। আমি জানতাম, তুমি তোমার ভুল বুঝতে পেরে অবশ্যই একদিন ফিরে আসবে। কষ্ট হয়েছে, দুচোখ থেকে অশ্রু নির্গত হয়েছে, তবুও আমার বিশ্বাস ছিল এই দুর্দিন একদিন ঠিক কেটে যাবে। ঈশ্বর আমায় প্রতিটি মুহূর্তে পরীক্ষা নিয়েছেন। পায়ে পায়ে বিপদ গেছে। তবুও আমি হেরে যায়নি। ঈশ্বরের প্রতি আমার বিশ্বাস ছিল। তার কৃপায় আবার তোমাদের ফিরে পেলাম।” এরপর উপরের দিকে তাকিয়ে বলেন— “আপনার ন্যায় ধীরে হলেও হতাশ করেনা। উচিত বিচার একদিন না একদিন আপনি করেন। তাই আপনার প্রতি আমি চিরকাল কৃতজ্ঞ থাকব।” এরপর আরাধ্যা ও স্বপ্না অরিজিৎকে জড়িয়ে ধরেন। এই দৃশ্য দেখে স্বপ্নার মা আনন্দাশ্রু ফেলেন। দুহাত তুলে তাদের আশীর্বাদ করেন। তিনি বলেন— “তোমরা চিরকাল সুখে থাকো বাবা। বাইরের কোনো অশুভ শক্তি যেন তোমাদের সম্পর্কে আর ভাঙন ধরাতে না পারে— ঈশ্বরের কাছে আমি এই প্রার্থনাই করি।”