গদ্যানুশীলনে মিঠুন মুখার্জী পর্ব – ১

কন্যাসুখ

মুষলধারায় বৃষ্টি পড়ছে। ঘনঘন বাজ পড়ছে, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ডাক্তার দীনবন্ধুকে জানান— তার মেয়ে হয়েছে, বউও ভালো আছেন। প্রথম সন্তান ছেলে হওয়ার আশা থাকলেও মেয়ে হয়েছে বলে দীনবন্ধুর দুঃখ নেই। সে মনে করে দুটোরই প্রয়োজন আছে। মানুষ করতে পারলে কেউই খারাপ না। তবে এখনো এ সমাজে মেয়ে সন্তান অনেকেই চান না। তার কারণ অনেক। তবে ছেলের জায়গা যেমন মেয়ে পূরণ করতে পারে না, তেমনি মেয়ের জায়গা ছেলে।
সরস্বতী মনমরা হয়ে নার্সিংহোমের বিছানায় শুয়ে থাকেন। তারও ছেলের স্বপ্ন ছিল। তবে এ বিষয়ে কারো কোনো হাত নেই। দুঃখ করে কি হবে! আজকাল ছেলের তুলনায় মেয়েরা অনেক ভালো। দীনবন্ধু সরস্বতীর পাশে দাঁড়িয়ে মাথায় হাত দিয়ে বলেন— ‘কি ভাবছো? এরকম মনমরা কেন? আমি খুবই খুশি। ছেলে হয়নি তাই কি হয়েছে। এবার দেয়নি, পরে হয়তো দেবে। তুমি মন খারাপ করো না।’ মেয়ের মুখ প্রথম দেখে দীনবন্ধুর মানসপটে মায়ের মুখের ছবি ভেসে ওঠে। তিনি বলেন— ‘কি গো এত আমার মা! একদম মায়ের মতো মুখ! দেখো দেখো। আজ দশ বছর হল মা নেই। আমার ঘরে আমার মা এসেছেন।’ দীনবন্ধুর কথা শুনে সরস্বতী এবার না হেসে পারেন না। কথায় বলে বর্ষা মাথায় নিয়ে জন্ম হলে সেই মেয়ে খুব ভালো হয়। তাছাড়া প্রথম সন্তান মেয়ে হলে বাবার আয়ু বাড়ে ও ভাগ্যের পরিবর্তন হয় বলে সবাই মনে করেন। দীনবন্ধুর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। এই মেয়ে যে লক্ষী সেটা বুঝতে পেরেছিলেন দীনবন্ধু ও সরস্বতী। দশ বছর ব্যাংকে ক্যাজুয়াল স্টাফ ছিলেন দীনবন্ধু। মেয়ে হওয়ার এক সপ্তাহের মাথায় তার চাকরি স্থায়ী হয়ে যায় এবং বছর ঘুরতে না ঘুরতেই প্রমোশন হয়েছিল তার। প্রচন্ড বর্ষায় জন্ম হয়েছিল বলে এই মেয়ের নাম রেখেছিলেন তারা বর্ষা। মেয়ের মুখ ও মুখের হাসি দেখলে দীনবন্ধুর সমস্ত যন্ত্রণা দূর হয়ে যেত। এমন মেধাবী সন্তান তাদের ঘরে জন্ম নেবে তারা ভাবতেও পারেন নি।
দেখতে দেখতে দশ বছর পার হয়ে যায়। এখন পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ে বৃষ্টি। পড়াশোনা খেলাধুলা গান-নাচ সবকিছুতেই অসাধারণ সে। এরকম বুঝদার ও সিরিয়াস মেয়ে এই বয়সে খুবই কম দেখা যায়। নাচের ম্যাম, গানের স্যার, স্কুলের ম্যাডাম ও ছাত্রীদের মুখে মুখে বৃষ্টির প্রশংসার কথা শুনে গর্বে বুকটা বড় হয়ে যায় তার। মেয়ে অন্ত প্রাণ তারা। পিপি থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত কখনো দ্বিতীয় হয়নি সে। সবেতেই প্রথম। বাবা-মার গাইডেন্সটা ভালো থাকলেও সন্তানের বোধের খুব প্রয়োজন। সেই বোধ বৃষ্টির মধ্যে ছোট থেকেই লক্ষ করা গেছে।
বৃষ্টির যখন পাঁচ বছর বয়স তখন দীনবন্ধু ও সরস্বতীর কোল আলো করে একটি ছেলে সন্তান আসে। মেয়ের পরে ছেলে হওয়ায় তারা খুবই আনন্দ পান। বৈশাখ মাসের উত্তপ্ত এক দুপুরে এর জন্ম হয়েছিল। নাম রেখেছিলেন রুদ্র। রুদ্র ও বৃষ্টি বাবা মায়ের ভালোবাসায় মানুষ হয়। দীনবন্ধুর উন্নতি আরও তরতর করে বেড়ে চলে। তারা মনে করেন, উভয় তাদের ভাগ্য নিয়ে এসেছে। ছেলেটা মেয়ে বৃষ্টির মতো অতটা সিরিয়াস ও প্রতিভাবান না হলেও চেষ্টা করে। কোনো সমস্যা হলে দিদি ওকে সহযোগিতা করে। ভাই বোনের সম্পর্ক খুবই ভালো।
মাধ্যমিক পাশ করার পর সাইন্স নিয়ে বৃষ্টি পড়াশোনা করে জেলার মধ্যে প্রথম হয় ও ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পায়। দীনবন্ধু প্রচুর টাকা খরচ করে মেয়ের পিছনে। অবশেষে এমবিবিএস ও পরে এমডি ডিগ্রি অর্জন করে সে। এদিকে রুদ্র কোনো মতে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে। বাবা মেয়েকে নিয়ে যতটা নিশ্চিন্ত ছেলেকে নিয়ে ততটা নয়। তার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তায় পড়ে যান তিনি।
তিন বছর পর এক ডাক্তার ছেলের সঙ্গে আদরের বর্ষা বিয়ে হয়ে যায়। বর্ষা বিয়ে করতে চাইনি। কিন্তু সুপাত্র পাওয়ায় তার বাবা আর দেরি করেননি। তাছাড়া বর্ষা নিজেও এখন স্বাবলম্বী বলে তাকে নিয়ে ছেলের মতো তার দুশ্চিন্তাও নেই। মহাড়ম্ভরের সঙ্গে বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়। চোখের জলে বাবা-মা মেয়েকে বিদায় জানান। ভালোবাসার মানুষ সঙ্গ ছাড়া হলে খুব কষ্ট পেতে হয়। এমনই কষ্ট পেয়েছিল তারা সকলে।
মেয়ে শ্বশুর বাড়ি চলে যাওয়ার পর দীনবন্ধু ছটফট করে কান্না করেছিলেন। জল থেকে মাছ তুলে নিলে মাছের যেমন অবস্থা হয়, বর্ষার বিয়ে হয়ে যাওয়ায় তার তেমনি অবস্থা হয়েছিল। বৌভাতে কাছের সকলকে নিয়ে মেয়ের বাড়ি গিয়েছিলেন তারা। তার মনে হয়েছিল এক যুগ পর সে মেয়েকে দেখবে। আগেকার দিনে বৌভাতে মেয়ের মায়েরা যেতেন না। কিন্তু বর্তমানে এই নিয়ম কেউ মানেন না। মেয়েকে দেখে তাদের দুজনের চোখ থেকে জল বেরিয়ে ছিল। আনন্দও পেয়েছিল এই ভেবে যে তাদের মেয়ে কত বড় হয়ে গেছে। আজ ডাক্তার হয়ে কত মুমূর্ষু মানুষের কাছে ভগবান হয়ে উঠেছে। নতুন জীবনে পদার্পণ করেছে তাদের সেই ছোট্ট মেয়ে বর্ষা। সময় কারো জন্য থেমে থাকে না। তারা দুজনে মন থেকে আশীর্বাদ করেন, ‘সে যেন সুস্থ থাকে। সবাইকে সুখী রাখতে পারে। তার নতুন জীবন যেন মধুর মতো মিষ্টিতে পরিপূর্ণ হয়।’ বৌভাতের দিন বর্ষা একটা রানী কালারের বেনারসি শাড়ি পড়েছিল। অসাধারণ সুন্দরী লাগছিল ওকে। সারাদিন ধরে ভেবেছে কখন বাবা-মা ভাই আসবে। বুকের ভেতরটা প্রিয়জনের জন্য বেদনায় যেমন দীর্ণ হয়ে উঠেছিল, তেমনি সন্ধ্যায় দেখতে পাবে বলে আনন্দও লাগছিল। ভিডিও কলিংয়ে বাবা-মার সঙ্গে কথা হলেও সামনাসামনি দেখতে পাওয়া একদম আলাদা ব্যাপার। যেখানে বর্ষাকে বসানো হয়েছিল সেই জায়গাটা খুব ভালো করে সাজিয়েছিল। আলো পড়ে অসাধারণ লাগছিল। বিউটি পার্লার থেকে পাঁচজন বিউটিশিয়ান এসেছিল বর্ষাকে সাজাতে। বর্ষা যখন কনের সাজে এসে বসেছিল, তখন মনে হচ্ছিল স্বর্গ থেকে কোনো দেবী এসে বসেছে। সারা গায়ে সোনা ও হীরের অলংকার শোভা পাচ্ছিল। ডাক্তার স্বামীর যোগ্য ডাক্তারনি। সন্ধ্যেবেলা থেকে লোকজন আসছিলেন। প্রেজেন্টেশন আনা বারণ ছিল। তাই সকলে ফুলের তোড়া ও বুকে নিয়ে আসছিলেন। বর্ষা ফুল খুব ভালোবাসতো। বিশেষ করে গোলাপ ও সূর্যমুখী। রজনীগন্ধার গন্ধও ওর খুব ভালোলাগতো।
রাত আটটা নাগাদ পঞ্চাশ জন কণ্যাযাত্রী এসেছিলেন। সঙ্গে ছিলেন বর্ষার ভাই মা-বাবা। তাদের দেখে বর্ষার চোখে জল দেখা যায়। বর্ষা বাবা-মাকে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ কান্না করে। বর্ষার শাশুড়ি বর্ষাকে বলেন— ‘এত কাঁদছিস কেন তুই? অসুস্থ হয়ে পড়বি এখনি। তোর বাবা মা কি তোকে জলে ফেলে দিয়েছেন? আমিও তো তোর মা। আমার মেয়ের অভাব তুই পূরণ করে দিলি। আমিও তোকে কম ভালোবাসা দেব নারে মা। তুই কাঁদিস না। আমি বুঝতে পারছি এত দিনের বাধন ছিন্ন করতে তোর কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু তোর যখন মনে হবে তুই বাবা-মার কাছ থেকে ঘুরে আসবি। এখান থেকে তো বেশি দূরে নয়।’
ছেলে হল বংশের প্রদীপ। বংশের মুখ উজ্জ্বল করে। আর মেয়েরা দুই বংশের মুখ উজ্জ্বল করে। তাই তারা হল দুই বংশের প্রদীপ। যাদের ছেলে নেই, শুধুই মেয়ে, সেই সকল মেয়েরা একাধারে ছেলে ও মেয়ে হয়ে দুই বংশের মুখ উজ্জ্বল করছে। তাই মেয়েদের ছোট করা কোন রকম উচিত নয়। ভাইকে ও ভাইয়ের বন্ধুদের বর্ষা বলে— ‘নিজের মনে করে সব চেয়ে নিস। লজ্জা পাস না তোরা। ভাই ওদেরকে ঠিকমতো খাইয়ে নিস।’ রুদ্র দিদিকে বলে— ‘তোর অতো ভাবতে হবে না দি। আমি আছি তো। তুই বেশি কাঁদিস না। তোর মেকাপ নষ্ট হয়ে যাবে।’এই কথা শুনে সকলে হেসে দেয়।
খুব আনন্দের মধ্যে দিয়ে বৌভাতের রাতটা কাটে সকলের। নাচ-গান খাওয়া-দাওয়া সব কিছুর এলাহী ব্যবস্থা ছিল। ডাক্তার, নার্স, পুলিশ অফিসার, কনস্টেবল অভিনেতা-অভিনেত্রী আরো অনেক পেশার মানুষ নিমন্ত্রিত ছিলেন এই দিন। বর্ষা ও রক্তিমের এই কয় বছরে বেশ পরিচিতি হয়েছিল কলকাতা শহরে। যে কারণে সকল পেশার মানুষরা বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন ।
রাত একটার পর সবাই চলে গেলে ও খাওয়া-দাওয়ার পর্ব শেষ হয়ে গেলে বর্ষার ঘরে এসেছিলো ডাক্তার স্বামি রক্তিম। এই রাতটি তাদের জীবনের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি রাত। যে রাতটি সারা জীবন স্মৃতি হয়ে থাকবে। বর্ষার ঘোমটা সরিয়ে রক্তিম তার মুখ দেখেছিল একটা হীরের আংটি দিয়ে। সলজ্জভাবে বর্ষা রক্তিমকে সেদিন অনেক কথা বলেছিল। দুজনে সকল পরিস্থিতিকে মোকাবিলা করে নিজেদের প্রতি বিশ্বাস রেখে জীবনটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা দিয়েছিল। বর্ষা রক্তিমকে বলেছিল— ‘আমার ভুল হলে ঠিকটা বুঝিয়ে দেবে। কিন্তু ভুল বুঝে দূরে চলে যাবে না। আমার দায়িত্ব যেমন তোমার সংসারকে সুখী করার, তেমনি আমার জন্মদাত্রী মাতা-পিতার দায়িত্ব নেওয়া থেকে আমাকে বিরত করবে না।’ সে রাত্রে বর্ষার সমস্ত কথায় সম্মতি দিয়েছিল রক্তিম। কিন্তু মানুষ কথা দিলেও কথা রাখে না। সময় তার জবাব দেয় ।
পরদিন ভোরবেলা বর্ষা ঘুম থেকে উঠে স্নান সেরে নিজের হাতে কফি তৈরি করে শ্বশুর-শাশুড়ি ও স্বামীকে দেয়। তার এই স্বেচ্ছায় সেবা ডাক্তার রক্তিমের বাড়ির সকলের মন কেড়ে নেয়। ডাক্তার হয়েও শ্বশুরবাড়ির সকলের প্রতি তার ব্যবহার ও অবসর সময়ে তার সাংসারিক কাজকর্ম প্রত্যেকের মনকে জয় করে নেয়। এক সপ্তাহে বর্ষা শশুর বাড়িতে সকলে নয়নের মনি হয়ে ওঠে। একসপ্তাহ পর বর্ষা ও রক্তিম দশবর্ধনে বাপের বাড়িতে যায়। বাড়ি ফিরে বর্ষার মনে হয় কতকাল সে বাড়ি ছেড়ে শ্বশুরবাড়িতে চলে গেছে। বাবা-মা চাতক পাখির মতো অপেক্ষায় বসে ছিলেন। বর্ষারা পৌঁছলে দীনবন্ধুদের যে সকল নিয়ম ছিল সেগুলি পালন করে তাদেরকে ঘরে তোলা হয়। বাপের বাড়িতে এই আড়াই দিন বর্ষা খুব আনন্দে কাটিয়েছিল। হেসে-খেলে খেয়ে- শুয়ে, সকলের সাথে গল্প করে, ভাই ও কাকাতো বোনদের নিয়ে মার্কেটিং করে। মা দুর্গার যেমন কয়েকদিনের জন্য বাপের বাড়িতে আগমন ঘটে, ঠিক তেমনি আড়াই দিনের জন্য বাপের বাড়িতে এসে খুব একটা ভালো লাগে নি বর্ষার। কিন্তু নিয়ম তো মানতেই হবে।যেদিন তারা চলে যায় সেদিন সকলের মন ভারাক্রান্ত ছিল। নবমী নিশি পার করে মা দুর্গা যেমন মনের মধ্যে ভীষণ কষ্ট নিয়ে পিতা হিমালয় ও মাতা মেনকাকে ত্যাগ করে স্বামীগৃহে যায়, তেমনি বর্ষাও রক্তিমকে নিয়ে দীনবন্ধু ও সরস্বতীকে কাঁদিয়ে শ্বশুর বাড়িতে ফিরে গিয়েছিল। পিতা-মাতার সঙ্গে সঙ্গে তার দুচোখ বেয়ে ঝরে ছিল বারিধারা। ভাই দিদিকে জড়িয়ে ধরে খুব কেঁদেছিল। বোনরাও দিদি চলে যাওয়ায় খুব কষ্ট পেয়েছিল।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।