সাপ্তাহিক রম্য সাহিত্যে মন্দিরা হাজরা (বসু) (পর্ব – ১২)

শান্তি পর্ব
“কর্ণ রে তুহূ মম শ্যাম সমান “
লিমকা রেকর্ড ভাঙ্গা যাবে কিনা জানিনা , তবে এই পাঁচ মাসে আমি আট বার হাসপাতালে ভর্তি হই । এই ঘন ঘন যাতায়াতের ফলস্বরূপ ওয়ার্ডের সমস্ত স্টাফ আমাকে প্রায় দিনগত পাপক্ষয়ের মত করে সেবাযত্ন করতেন । দাগী আসামীরা যেমন জেলের আনাচ কানাচ জেনে যায়, সেই রকমই ওয়ার্ডের সমস্ত ঘরগুলির খাট বিছানা, চেয়ার টেবিল ইত্যাদি যাবতীয় আসবাব পত্র আমার আপনজনের মতো হয়ে গিয়েছিল । ভর্তি হবার পরপরই যান্ত্রিক দক্ষতায় আমি সবকিছু গুছিয়ে ফেলতে পারতাম । নার্সরা আমার গৃহিনীপনায় যারপারনাই চমত্কৃত হয়ে যেতেন । দূঃর্ভাগ্য বশতঃ আমার অসুখটাই এতো খাপছাড়া গোছের ছিল যে ক্রমশঃ ডাক্তার বাবুরা তাঁদের ওয়ার্ড রাউন্ডে এসে ” ধরা সে যে দেয় নাই দেয় নাই ” গোছের অন্তরার পর ” রবেনা দুখের এ দিন রবেনা” টাইপ স্বান্তনামূলক সঞ্চারী গেয়ে শেষ করতে লাগলেন । নার্সদের কর্মপদ্ধতি ছিল আরও চমকপ্রদ । নার্সেরা ডাকবার পর আসার সময়কাল মিনিট পনেরো করে( বেল বাজিয়ে সাহায্য চাওয়ার পরে ) এগিয়ে – পিছিয়ে নিতে লাগলেন যাতে একটা ঘন্টা ছয়েকের শিফ্টে বার দুয়েকের বেশী আমার মুখোমুখি না হতে হয় । সত্যি সত্যিই ” সে বড় সুখের সময় ” ছিলনা ।
এই আজব অসুখের পিছনে ধাওয়া করতে গিয়ে আমাকে আপাদ মস্তক উল্টে পাল্টে ( একবার বাস্তবিকই হেঁটমুন্ডু উর্দ্ধপাদ করে শোয়ানো হয়েছিল )নানান পরীক্ষা শুরু হয়ে গেল । ছিমছাম খোকা গোছের এক্স রে থেকে বৃদ্ধ প্রপিতামহ সাইজের গ্যালিয়াম স্ক্যান পর্যন্ত সবই ধাপে ধাপে সম্পন্ন হোলো । কাকস্য পরিবেদনা ! রোগ আর ধরা পড়ে না । শেষ পর্যন্ত যে ভয়ে কম্পিত ছিল আমার হৃদয় ; সেই পেইন ক্লিনিকে আমাকে যেতেই হয়েছিল ।
এই পেইন ক্লিনিকের অভিজ্ঞতা বিশেষ উপস্থাপনার দাবী রাখে । একজন ভোলামহাদেব গোছের নীমিলীত নয়ন ডাক্তার বাবু ঘন্টা খানেক ধরে আমার রোদনভরা বেদনা বৃত্যান্ত শুনলেন এবং ভরসার কথা এই যে তিনি বোধহয় সেসব বিশ্বাসও করলেন । এখানে বলে রাখা ভাল যে পেইন ক্লিনিকে প্রতিটি রোগীকে নিরালা খুবই আরামদায়ক ঘরে কনসাল্ট করা হয় । এখানে নার্সরা সহমর্মী, ডাক্তাররা শ্রবণশীল , ঘন ঘন চোখ মোছার টিসু পেপারের অঢেল যোগান এবং চা-কফির সুবন্দ্যোবস্ত আছে । মোদ্দা কথা হল পেইন না থাকলে পেইন ক্লিনিকে সময় কাটানো খুবই আরামদায়ক ব্যাপার ।