কখন কার ভাগ্যে শিকে ছেঁড়ে কে বলতে পারে! একেবারে আঙুল ফুলে কলাগাছ!কেউ কি স্বপ্নেও ভেবেছিল গণশার এমনটি হবে? ছিলো গণশা, হলো গণপতিবাবু। চায়ের দোকানদার গণশা এখন সারের ব্যবসাদার গণপতিবাবু। ছেঁড়া-ফাটা ময়লা লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরে যে গণশা চায়ের কাপ ধুতো, সেই গণশা এখন ধোপ-দুরস্ত কুর্তা-পাঞ্জাবি পরে গদিতে বসে সারের হিসাব
কষে। চোখঢোকা গালভাঙা হাড় জিরজিরে চেহারার গণশাকে আগে কুর্তা-পাঞ্জাবিতে না মানালেও এখন গণপতিবাবুকে বেশ মানায়। টাকার মানুষ গণপতিবাবু। টাকা থাকলে সব কিছুই মানিয়ে যায়। শূন্য নিমেষে হয় পূর্ণ। আহা, টাকার কি অপার মহিমা!
গণপতিবাবু উঠতি বড়লোক বললে ভুল হবে। বলা যায় হঠাত্ বড়লোক। তাই বনেদি বড়লোকের মত গণপতি ঘাপটি মেরে থাকে না। ডাঙায় ওঠা চিংড়ি মাছের মত তিড়িং বিড়িং করে একটু লাফায়। লাফাবেই তো! মা লক্ষ্মীর কৃপা পেলে এমনিভাবে সবাই লাফায়। গণ-পতিকে বলা যায়, মা লক্ষ্মীর সাক্ষাত্ বরপুত্র। তা না হলে লটারীর একেবারে ফার্ষ্ট প্রাইজটা তার কপালে
বেধে যায়! একধাক্কায় গণপতি হলো হাফ কোটিপতি। প্রায় পঞ্চান্ন লাখ টাকার মালিক।
এরপর থেকে গণপতিকে পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ধনে-জনে-স্নেহ-ভালবাসায়, মান-সম্মানে একেবারে কানায় কানায় ভরে গেছে তার জীবন-পাত্রটা।
বছর দুয়েক কাটতে না কাটতেই হাফ কোটিপতি গণ-পতির কপালে বাধলো আবার একটা প্রাইজ। এবার শুধু কাঞ্চন নয়, কামিনী কাঞ্চন দুটোই। বর্ধমানের বিখ্যাত লোহা ব্যবসায়ী দীনেশ মোড়লের একমাত্র কন্যা লক্ষ্মীর সাথে তার ঘটে গেল বিবাহবন্ধন। একই সাথে লাভ হলো রাজকন্যা আর রাজত্ব। তিন পতির বিশেষণে বিশেষিত হয়ে এবার গণশা সত্যি সত্যিই
হয়ে উঠলো কোটিপতি, গণপতি এবং লক্ষ্মীপতি।
কিন্তু বিয়ের পর থেকেই গণপতির জীবন-আকাশের ঠিক ঈশাণকোণে সন্দেহের একটা কালো মেঘ জমতে জমতে উঠলো ভীষণ এক অশান্তির ঝড়। রাতে ঘুমোতে পারে না। ব্যবসাতে মন বসাতে পারে না। বাড়ী ছেড়ে একদণ্ডও কোথাও কাটাতে পারে না। সর্বদাই মনে হয়, এই বুঝি তার সব শেষ হয়ে গেল। গণপতির একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান ঐ সুন্দরী বউ লক্ষ্মী। শুধুই কি
সুন্দরী। রীতিমতো সুন্দরী। লোকে বলে, মেয়ে তো নয়, পটে আঁকা ছবি! বন্ধু-বান্ধব গণপতিকে দেখে হিংসেয় মরে। বলে বাঁদরের গলায় মুক্তোর মালা!
কথাটা যে মিথ্যে নয়, গণপতি সেটা বেশ ভাল করেই জানে। আর জানে বলেই বউটার প্রতি হাজার সন্দেহ, অবিশ্বাস আর ভয় তার মনটাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়। এক একবার ভাবে লক্ষ্মী প্রতিমার মত মেয়েটাকে বউ হিসাবে না পেলেই ভাল হতো; অশান্তির বোঝাটা কমতো। দেহ-মন-প্রাণ সর্বস্ব খোয়া গেছে তার ঐ পরমাসুন্দরী বউটার কাছে। সুন্দরী বউয়ের রূপের
প্রশংসা বাইরের লোকের কাছে শুনলেই গণপতির মেজাজটা যায় বিগড়ে। বুকটা আনচানিয়ে ওঠে। ভাবে–এই বুঝি বউটা তার চুরি হয়ে গেল। মাঝে মাঝে মনে হয়, বউটাকে এমন এক জায়গায় লুকিয়ে রাখে, যেখানে মাথা খুঁড়লেও খুঁজে পাবে না কেউ — একমাত্র সে ছাড়া।
রতন মাস্টারের কথাটা মনে পড়ে যায় গণপতির। একদিন তার চায়ের দোকানে রতন মাস্টার গল্প করতে করতে বলেছিল, “বাড়ীর বৌ দামী, সৌখিন আর বড্ড বেশী ঠুনকো! পরের লোক তো দূরের কথা, নিজের বন্ধু-বান্ধবের জিম্মায় মূহুর্তের জন্যেও রেখো না। রেখেছো তো মরেছো! মওকা বুঝে কখন যে দেবে নষ্ট করে, নয়তো নিয়ে পালাবে চুরি করে–টেরই পাবে না। কথায় আছে–বই আর বউ একবার বাড়ীর চৌকাঠ পেরুলে তাকে যথাযথ অবস্থায় ফেরে পাওয়া বড্ড কঠিন।”
ইদানিং বাড়ীর ভেতর গণপতি বিশেষ কাউকে ঢুকতে দেয় না। বাড়িতে এসে ঝামেলা পাকায় এই ভয়ে বন্ধু-বান্ধবের সাথে মেলামেশাও একরকম ছেড়ে দিয়েছে। ঘটনাচক্রে কোনো অতিথি যদি হঠাত্ বাড়ীতে এসে পড়ে, তাহলে গণপতি চা জলখাবার স্বয়ং পরিবেশন করে অতিথিকে আপ্যায়ণ করে আবার বিদায়ও জানায়। বলা যায় না–চোখে চোখ ফেলে সুন্দরী বউয়ের মনটাকে কখন দেয় বিগড়ে! সবসময় রূপসী সুন্দরী বউ লক্ষ্মীকে তাই রাখে চোখে চোখে। বিয়ের পর থেকে গণপতি দোকান যাওয়াই ছেড়ে দিয়েছে। কর্মচারীরা দোকান সামলায়। গণপতি ঘরে বসে বউকে সামলায়। বউটার ওপর তার তীক্ষ্ণ নজর। ঘরের বাইরে বেরুনোর যো নাই এক পা-ও। মাথার ঘোমটা একটু ছোটো হলেই হয়েছে! গণপতির রাগ সপ্তমে চড়ে যায়।বলে,”আচ্ছা বেহায়া মেয়েমানুষ তো তুমি! আগুনের মত ওই রূপটাকে না দেখালেই কি নয়!” স্বামীর কাণ্ডকারখানা দেখে মাঝে মাঝে লক্ষ্মী হি-হি করে হেসে ওঠে। বলে, যতই চোখে চোখে রেখে আটকাও, পারবে না। ঠিক ভেগে যাবো।”
গণপতি বোঝে লক্ষ্মী তার সাথে মস্করা করছে। তবুও বুকটা ধড়াস করে ওঠে। গণপতির চোপসানো কালো মুখটা আরও চুপসে যায়। আমতা আমতা করে বলে, “কে–কে-নো, পালাবে কেনো, আমি কি তোমায় কোনো অযত্নে রেখেছি?” লক্ষ্মী মুখ টিপে হাসতে হাসিতে বলে, অমন চোখঢোকা, গাল তোবড়ানো বরের ঘর করতে আমার বয়েই গেছে। বর তো নয়, যেন তালপাতার সেপাই!” গণপতির মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে যায়। সত্যিই সে ভীষণ রোগা লিকলিকে প্যাঁকাঠির মতো চেহারা!
স্বাস্থ্যটাকে ভাল করার জন্য কতবার সে ডাক্তারের পরামর্শমতো ওষুধ খেয়েছে তার ইয়ত্তা নাই। তার দৃঢ় বিশ্বাস, স্বাস্থ্যটা ভাল হলে ঢোকা চোখ দুটো গর্ত থেকে উঠে আসবে, তোবড়ানো গাল দুটো টোবা টোবা হয়ে ফুলে উঠবে। কিন্তু না, কিছুতেই
কিছু হলো না।
এইভাবে মনমরা হয়ে থাকতে থাকতে হঠাত্ একদিন গণপতির ভীষণ জ্বর হলো। জ্বর আর কিছুতেই ছাড়ে না। লক্ষ্মী তখন কালীপূজোয় বাপের বাড়ী। গণপতি জ্বরের ঘোরে কেবলই ভুল বকে। বলে, আমার লক্ষ্মীকে এনে দাও। আমি লক্ষ্মী ছাড়া বাঁচবো না। ডাক্তারবাবু বুঝলেন, গণপতিবাবুকে লক্ষ্মীতে পেয়েছে। ওষুধে কাজ হবে না। তিনি ওষুধের ব্যবস্থা না করে বাপের বাড়ী থেকে তাড়াতাড়ি লক্ষ্মীকে আনার ব্যবস্থা করলেন। লক্ষ্মী বাড়ীতে পা দিতে না দিতেই ম্যাজিকের মত গণপতির জ্বর গেল ছেড়ে।
লক্ষ্মী লজ্জায় মরে যায়। স্বামীকে অভিমানের সুরে একটা ধমক দেয়। বলে, “তুমি ভীষণ পাগলামি শুরু করেছো। লোকে কি বলবে? বলবে–বউপাগলা। সবসময় আমার চিন্তা। আমি রসগোল্লা, না পানতুয়া, যে লোকে আমায় গপ করে গিলে ফেলবে! তোমার মাথায় মস্ত বড় একটা ভূত বাসা বেঁধেছে। ওকে তাড়াতে না পারলে –তুমি আমি দুজনেই মরবো – এই তোমায় বলে রাখলাম!”
লক্ষ্মীর অপরূপ রূপের সৌন্দর্য, ভাদরের তটিনীর ন্যায় যৌবন গণপতিকে পাগল মাতোয়ারা করে দেয়। রূপ আর সৌন্দর্য্যের মাদকতা তার দেহ মনকে করেছে আচ্ছন্ন। পদে পদে তাই লক্ষ্মীকে নিয়ে তার ভয়। লক্ষ্মী নামক নারী বস্তুটির মধ্যে সে দেখতে পায় হাজার মণি-মানিক্যের সন্ধান। তাকে সে কিছুতেই কাছছাড়া করতে পারবে না। তাকে ছাড়া একদণ্ড বাঁচবে না – একদণ্ড বাঁচা সম্ভবও নয়। তার মধ্যেই রয়েছে তার অস্তিত্ব আর মহামূল্য প্রাণটা। হায়রে মোহাবিষ্ট অসহায় মানব মন!
আজ যাকে হৃত্পিণ্ডের মত বুকের মধ্যে আঁকড়ে ধরো, কাল তুমিই তাকে দুষ্টু টিউমারের মতো কেটে বাদ দেওয়ার জন্য ছটফট করো।
কয়েকমাস পরের কথা। রান্নাঘরে গ্যাসের আগুনে বড় একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেছে লক্ষ্মীর। জীবন সংকটাপন্ন।পাগলপ্রায় গণপতি যে কোনো মূল্যে লক্ষ্মীকে বাঁচাবেই। প্রচুর অর্থব্যয়ে শেষপর্যন্ত লক্ষ্মী বেঁচে গেছে। কিন্তু গণপতির জীবনে এসেছে একটা আমূল পরিবর্তন। এখন বাড়ীতে তার একদণ্ড থাকতে ইচ্ছা করে না। ঘোমটা দেওয়ার জন্য আর লক্ষ্মীকে বকাবকি করে না। বাড়ীতে আসার জন্য কাউকে আর বাধা দেয় না। সারাদিন ব্যবসা নিয়েই গণপতি ব্যস্ত থাকে। মাঝে মাঝে রাতে বাড়ীতে শুতে আসার সময় পায় না। দোকানের গদিতে শুয়েই রাত কাটিয়ে দেয়। পালঙ্কের ওপর শুয়ে বালিশে মুখ গুঁজে একা একা লক্ষ্মী কাঁদে আর ঘন ঘন দীর্ঘশ্বাস ফেলে। লক্ষ্মীর জন্য গণপতির বুকে যে ভালবাসার পাহাড়টা ছিল, তা সরে গিয়ে
জমা হয়েছে একরাশ সহানুভূতি। লক্ষ্মীর মুখের দিকে সে তাকাতে পারে না, আতঙ্কে শিয়রে ওঠে। পরমাসুন্দরী লক্ষ্মীর মুখটা এখন বীভত্স–কদাকার!