সাপ্তাহিক ধারাবাহিক প্রবন্ধে মানস চক্রবর্তী – ১২

|| ১২ ||

জ্যোতির আলোয় জ্যোতির্ময়

” লক্ষণরেখায় কেউ বেঁধে রাখতে
পারেনি তোমায় কোনদিন –
না বেলুড় , না দ্বারহাট্টা ,
না সন্ন্যাসীর জটাজুট ,
না সংসারীর লক্ষ্মীভাণ্ড |
ধরা দিয়েও রয়ে গেলে সর্বতো অধরা | “

প্রাক্তন ছাত্রের শিক্ষকের প্রতি অপূর্ব গুরুতর্পণ | কথাটি সর্বতোভাবে ব্রহ্মচারী জ্যোতির্ময় চৈতন্য মহারাজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য | তিনি তথাকথিত গেরুয়াধারী কোনো সন্ন্যাসী নন , আবার স্ত্রী- পুত্র নিয়ে ঘরোয়া সংসারী কোনো মানুষও নন | তিনি হলেন নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচর্য পালনকারী এক স্থিতপ্রজ্ঞ পুরুষ | তিনি যে স্থিতধী পুরুষ তা তাঁর জীবন বৈচিত্র্যে স্বততঃ উৎভাসিত | ” ন জ্যাঠামণির – Pancreas এ ক্যানসার হয়েছিল | কিন্তু অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করেও তিনি হাসিমুখে কাজ করে গেছেন | তখন তিনি তারকেশ্বর কলেজ গড়ছেন | যথারীতি ভিক্ষাপাত্র হাতে দরজায় দরজায় ঘুরছেন সাহায্যের জন্য | শেষ পর্যন্ত অত্যন্ত বাড়াবাড়ি হওয়ায় তাঁকে রামকৃষ্ণ মিশন সেবা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করা হল | মনে পড়ে সে সময় একবার তাঁকে দেখতে গেছি | আমার সামনেই রক্তবমি করলেন প্রায় আধ বালতি | তারপরে স্বাভাবিক হাসিমুখে কথা বলতে লাগলেন – যেন যা ঘটে গেল তা কিছু নয় | ” তাঁর এই অদ্ভুত সহ্যশক্তিতে ডাক্তাররাও বিস্মৃত না হয়ে পারেননি – ক্যানসারের যন্ত্রণাতেও মুখে হাসি | ভাইপো দেশপ্রিয় বসুর স্মৃতিচারণটি পড়লে স্বাভাবিকভাবেই মনে আসে গীতার শ্লোক –
” জ্ঞেয় স নিত্যসন্ন্যাসী যো ন দ্বেষ্টি ন কাঙ্ক্ষতি |
নির্দ্বন্দ্বো হি মহাবাহো সুখং বন্ধাৎ প্রমুচ্যতে || “
সামাজিক বিচারে ব্রহ্মচারী মহারাজের প্রধান পরিচয় তিনি একজন শিক্ষক | শিক্ষক হিসাবে তাঁর শিক্ষক সত্ত্বাটি কতখানি শিক্ষারসে সম্পৃক্ত তাঁরই সমর্থনে এবার প্রবন্ধের পথ হাঁটা | শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের পুরস্কার স্বরূপ ব্রহ্মচারী মহারাজ ১৯৬১ সালে রাষ্ট্রপতি পুরস্কার পান | আশ্চর্যের বিষয় কোনো বাহ্যিক উষ্মা প্রকাশ পেল না | পারিবারিক পত্রিকা ‘ বসুধারায় ‘ লিখলেন :
” আমারে বুঝেছ ভুল , হে রহস্যময় ,
তোমার চাতুরী হেথা পড়িয়াছে ধরা |
আমি জানি , এ গৌরব মোর প্রাপ্য নয় |
যশ মরীচিকা জাগে গূঢ় ছল ভরা ,
তার মাঝে রবো আমি নিস্পৃহ নির্ভয় |
জানি তব ইন্দ্রজাল, গৌরব পসরা তোমারি চরণে
লভে সার্থক বিলয় | “
তিনি যতই দাবী করুক ‘ এ গৌরব মোর প্রাপ্য নয় ‘ – আমরা একথা মানতে রাজী নই | তার জন্য আমরা আত্মপক্ষ সমর্থনে রাজী আছি |
সময়ানুবর্ত্তিতা ও কর্মের প্রতি নিষ্ঠা তাঁর জীবনের একটা দিকের সিংহভাগ জুড়ে আছে | স্কুলের যে কোনো অনুষ্ঠানে তিনি সবার আগে উপস্থিত | শত কাজ থাকলেও তিনি বিদ্যালয়ের কাজে কখনো কোনো আলস্য করেননি | এমনকি ছুটির দিনেও তাঁকে কাজ করতে দেখা গেছে | অসুস্থ শরীরে জ্বর নিয়েও বিদ্যালয়ে এসেছেন |
তাঁর সময়ানুবর্তিতা কীরকম ছিল তার সাক্ষ্য বহন করে তাঁর প্রাত্যহিক জীবনযাপন তালিকাটিই | অতি প্রত্যূষে ঘুম থেকে উঠতেন | সকলের সাথে প্রাতঃস্মরণ | তারপর প্রাতঃভ্রমণ সেরে আধঘণ্টা পূজা ও গীতাপাঠ | সকাল সাড়ে সাতটার মধ্যে স্কুলের অফিসে এসে বিভিন্ন কাজকর্ম করতেন | সাড়ে ন’টা পর্যন্ত থেকে বাড়ি চলে যেতেন | আবার বেলা সাড়ে দশটায় স্কুলে আসতেন | স্কুল শেষ করে বিকেলে সংঘের শাখায় যোগদান | দ্বারহাট্টা রাজেশ্বরীর এক শিক্ষক মহাশয় লিখছেন , ” বিকেলে পায়ে হেঁটে প্রায়ই যেতেন কোন না কোন গ্রামে | সেখানে শাখার স্বয়ংসেবকদের শাখার মাঠে গিয়ে উপদেশ দিতেন | মহাপুরুষের গল্প শোনাতেন | দেশপ্রেমের শিক্ষা দিতেন এবং সন্ধ্যায় ছাত্রদের নিয়ে তাদের বাড়িতে গিয়ে তাদের মা বাবাদের সাথে গল্প করতেন , ওদের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খোঁজখবর নিতেন | আমি অবাক হয়ে যেতাম কি করে এই বয়সে ( তাঁর তখন ৬৩, ৬৪ বছর বয়স ) একটি মানুষ এত পরিশ্রম করতে পারেন | “
রাত্রে তিনি নিয়মিত ডাইরি লিখতেন | ওনার ডাইরি লিখন ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ একটি ব্যাপার | সে কথা প্রবন্ধের অন্যস্থানে যথাসময়ে বলবো | ভোজনের পর হরগৌরী স্ত্রোত্র পাঠ শেষ করে রাত্রি দশটার সময় শুতে যেতেন |
তিনি নিজে যেমন সময়ানুবর্ত্তি ছিলেন , অন্যে যাতে সময়নিষ্ঠ হতে পারে সে বিষয়ে তিনি সচেষ্ট ছিলেন | কোনো শিক্ষকমহাশয় কোনোদিন হয়তো বিদ্যালয়ে আসতে দেরি করে ফেলেছেন | ব্রহ্মচারী মহারাজ পায়চারি করছেন বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে | এগিয়ে এসে শিক্ষক মহাশয়কে জিজ্ঞাসা করলেন , ” দেখোতো, আমার ঘড়িটায় আজ দম দেওয়া হয়নি , বন্ধ হয়ে গেছে | তোমার ঘড়িতে ক’টা বাজে বলতো, ঠিক করে নিই | ” ঘড়ির দিকে দৃষ্টি যেতেই লজ্জিত হয়ে জিভ কেটে ক্ষমা চেয়ে নিতেন | ব্যাপারটা এখানে শেষ হলে দৃষ্টান্ত হতে পারত না | মাস্টারমশাই হয়তো বললেন , ” মাস্টারমশাই আজ বাড়ীতে রান্নার বড্ড দেরী হয়ে গেছে | তাড়াতাড়ি করে চারটি মুড়ি খেয়ে চলে এসেছি | ” দ্বিতীয় ঘণ্টায় ‘ মহারাজ’ ডেকে মাস্টারমশাইকে বললেন , ” তোমার জন্য খাবার ব্যবস্থা করা হয়েছে , এসো আমার সঙ্গে | তোমার ক্লাসটাতে এখন আমি যাচ্ছি | ” মহারাজ ঐ মাস্টারমশাইকে পাশেই নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে খেতে বসিয়ে দিলেন | এ সোহাগভরা শাসনে প্রতিবাদ থাকে না , থাকে নতমস্তকে নতি স্বীকার |
তিনি নিয়মিত পড়াশোনা করে ক্লাসে যেতেন | ইংরাজি টেস্টবুক প্রত্যহ চোখ বুলিয়ে নিতেন | বিভূতিসেন মহাশয়ের লেখায় আছে , ” Lesson note তৈরি করা থেকে শুরু করে Model lesson দেওয়া , প্রশ্নপত্র Scrutinee করে ভুল শুধরে দেওয়া অসংখ্য কাজের মধ্যেও তিনি এই কাজ সুচারুরূপে করতেন | “

( চলবে )

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।