সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে কথা সাগরে মানস চক্রবর্ত্তী – ২৬

মর্তকায়ার অন্তরালে
|| ২৬ ||
জীবনানন্দ – এক জীবন সংগ্রাম
জীবনানন্দ সম্পর্কে অনেক লেখা পড়তে গিয়ে আমার মনে হয়েছে ওখানে জীবনানন্দ কতটুকু আছে | জীবিতকালে স্বয়ং কবিই বিরুদ্ধ মত পোষণ করেছেন | বুদ্ধদেব বসু লিখছেন : “আমাদের আধুনিক কবিদের মধ্যে জীবনানন্দ দাশ সবচেয়ে নির্জন, সবচেয়ে স্বতন্ত্র | ….. তিনি যে আমাদের ‘নির্জনতম’ কবি অত্যধিক পুনরুক্তিবশত এই কথাটার ধার ক্ষয়ে গেলেও যথার্থ আমি এখনও সন্দেহ করি না |”১
স্বয়ং জীবনানন্দের দৃষ্টিগোচর হয়েছিল লেখাটা | তাই তিনি বড়িয়া কলেজের সহকর্মী অধ্যাপক নিরঞ্জন চৌধুরিকে বলেছিলেন : “নির্জন কবি, নির্জন কবি বলে বলে বুদ্ধদেব বসু আমার সম্বন্ধে একটা লিজেণ্ড খাড়া করেছেন, যেটা আমার সম্বন্ধে সম্পূর্ণ ঠিক নয় |”২
অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত কল্লোল গোষ্ঠীর একটি পরিচিত নাম | ‘কল্লোলযুগ’ গ্রন্থে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত লিখেছেন : “সে যেন এই সংগ্রাম সংকুল সংসারের জন্য নয়, সে সংসার পলাতক |” এর সঙ্গে তিনি আরো যোগ করেছেন – “যেখানে অনাহূত ধ্বনি ও অলিখিত রং জীবনানন্দের আড্ডা সেইখানে |”৩
আমার মনে হয়েছে জীবনানন্দের সম্পর্কে একটি ভ্রান্ত মূল্যায়ণ | না তিনি কবিতায়, না জীবনে কোথাও তিনি জীবন থেকে পালাননি | প্রবন্ধের পরম্পরায় তা আমরা দেখব |
হাওড়া গার্লস কলেজের এক ছাত্রী সবিতা পাল ঐ কলেজেরই পত্রিকা ‘জীবনানন্দ সংখ্যা’তে যে ঘটনাটির কথা উল্লেখ করেছেন তা জীবনানন্দের মধ্যে আর এক জীবনানন্দের খোঁজ এনে দেয় | লেখাটি আমি পাই জীবনানন্দ জীবনীকার গোপালচন্দ্র রায়ের ‘জীবনানন্দ’ পুস্তকে | প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি জীবনানন্দের সম্পর্কে পড়া বইগুলির মধ্যে এই বইটি আমার পছন্দের একটি অন্যতম বই | সবিতা পাল লিখছেন :
“একদিন বন্যার্তদের সাহায্যের জন্য পিপলস রিলিফ কমিটির পক্ষ থেকে কুপন সেল করছিলাম | ওঁর কাছে যখন গেলাম, অন্যমনস্কভাবে জিজ্ঞাসা করলেন, থিয়েটার হবে নাকি ? কোথায় ? কত দাম টিকিটের ইত্যাদি | সমস্ত যখন শুনলেন, নিজের ভুলের জন্য হেসে উঠলেন, আর বললেন : কুপনের দাম মাত্র দু-আনা ! তবে গোটা চারেক দাও আমায়, বুঝলাম উনি দেশের লোকের প্রতি কম দরদী নন |”৪
তাকে গভীর বলে, পরিহাসহীনতা বলে লোকের মনে খামকা যে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে তা কিন্তু সত্য নয় | তিনি পরিহাস মজা করতে খুব ভালোবাসতেন |
এক্ষেত্রে যে ঘটনাটির কথা উল্লেখ করব তাঁর হাওড়া গালর্স কলেজে অধ্যাপনা কালে | তিনি একদিন কলেজ থেকে কয়েকজন সহকর্মী সহ এক অধ্যাপক বন্ধুর বাড়িতে গেছেন | সঙ্গে আছেন অধ্যাপক দুর্গাদাস চট্টোপাধ্যায় | অধ্যাপক চট্টোপাধ্যায় একটু স্পষ্টভাষী ছিলেন | এবং তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কঠোরভাষ্য হয়ে যেত |`
সেদিন চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে জীবনানন্দ বললেন : “দেখুন চা-টা যদি আপনার কথার মতো অন্তত কড়া হ’ত তাহলে বেশ উপভোগ হ’ত |” জীবনানন্দের কথায় সকলেই সেদিন হেসেছিল |
জীবনানন্দের ছোটো ভাই অশোকানন্দ লিখিত আর একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করব | “১৯৫৩ সালে পুজোর সময় আমার দিল্লীর গৃহে অনেক আত্মীয় ও বন্ধুর সমাগম হয়েছিল | সকালবেলা আমাদের ঘরের পাশের বাথরুম হয়তো আটকা, দাদাকে জিজ্ঞাসা করেছি আমার ঘর থেকেই – তোমার বাথরুম খালি আছে কি ? – দাদা তক্ষুণি জবাব দিয়েছেন – দিল্লীর মসনদ কি কখনও খালি থাকে ?”৫
এখন পাঠকের কৌতুহল হতে পারে জীবনানন্দ এই পরিহাস প্রিয়তা কোথা থেকে লাভ করলেন ? তাঁর বোন সুচরিতা দাশ এ সম্পর্কে এক জায়গায় লিখেছেন : “…..পরিহাস ও কৌতুক প্রিয়তা আমার মাতুল বংশের থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে বোধহয় লাভ করেছিলেন তিনি | আমার দাদামশায় চঁন্দ্রনাথ দাশ খাঁটি পূর্ববঙ্গের ভাষাষ বহু হাসির গান ও ছড়া রচনা করেছিলেন |”৬
যাঁর মধ্যে এত পরিহাসপ্রিয়তা, এত দেশ প্রীতি, তিনি কী করে পলাতক কবি হতে পারেন ! তিনি সাংসারিক দায়িত্বকে কখনো অবহেলা করেননি ¦ দায়িত্ব ছেড়ে পালিয়েও যাননি |
১৯৪৩সাল | তিনি তখন বরিশাল বি.এম কলেজে অধ্যাপনা করছেন | গ্রীষ্মের ছুটিতে কলকাতায় এলেন ছোটো ভাই অশোকানন্দের বাড়িতে | ছুটির শেষে ফিরেও গেলেন, তবে একটা ইচ্ছে নিয়ে | ভাইয়ের স্ত্রী নলিনী দেবীকে লেখা এক পত্রে তার উল্লেখ আছে | “…..কলকাতায় গিয়ে এবার নানারকম অভিজ্ঞতা লাভ হ’ল; সাহিত্যিক, ব্যবসায়িক, ইত্যাদি নানারূপ নতুন সম্ভাবনার ইশারা পাওয়া গেল | বরাবরই আমার আত্মবৃত্তি জাবিকা নিয়ে কলকাতায় থাকবার ইচ্ছা | এবার সে ইচ্ছা আরও জোর পেয়েছে |৭
কিন্তু তখনই সে ইচ্ছাকে পূর্ণ করার কোনো উপায় কবির কাছে ছিল না | পিতা চলে গেলেও স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, মা নিয়ে তখন তাঁর ভরা সংসার | সুতরাং কলকাতায় নিশ্চিত কাজের সন্ধান না পেলে তাঁর বরিশালের কাজ ছেড়ে দেওয়া সম্ভব ছিল না |
ক্রমশ …..