শিবনাথ শাস্ত্রী মহাশয় লিখছেন , ” যদি কোনো মানুষের সম্বন্ধে এ কথা সত্য হয় – ‘ তিনি শিক্ষক হইয়াই জন্মিয়াছিলেন ‘ – তাহা লাহিড়ী মহাশয়ের সম্বন্ধে | ” ১ অর্থাৎ তিনি জাত শিক্ষক ছিলেন | আমরা এখন এই ভাবনার যথার্থতা নির্ণয়ে সচেষ্ট হব সাধ্যমত |
১৮৪৬ সালের ১ জানুয়ারি কৃষ্ণনগর কলেজ প্রতিষ্ঠা হল | ডি.এল.রিচার্ডসন সাহেব এই কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ | আর লাহিড়ী মহাশয় মানে রামতনু লাহিড়ী একশ টাকা বেতনে দ্বিতীয় শিক্ষক নিযুক্ত হলেন | পড়ানোর গুণে তাঁর অনুরাগী ছাত্রের সংখ্যা বেশ বর্ধিত হল | তাঁর পড়ানোর অর্থাৎ শেখানোর পদ্ধতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের | তিনি যখন পড়াতেন তখন মনে হতো পৃথিবীতে পড়ানো ছাড়া তাঁর আর অন্য কোনো কাজ নেই | এমন তন্ময় হয়ে পড়াচ্ছেন , হয়তো অধ্যক্ষ রিচার্ডসন তাঁকে কিছু বলবার জন্য এসেছেন সেদিকে লাহিড়ী মহাশয়ের কোনো খেয়ালই নেই | অধ্যক্ষ মহাশয় হয়তো দরজায় দাঁড়িয়ে সেই তরুণ শিক্ষক তাপসের পড়ানো শুনছেন |
তাঁর পড়ানোর রীতি সম্পর্কে শিবনাথ শাস্ত্রী মহাশয় লিখলেন , ” কোনও পাঠ্য বিষয়ের প্রসঙ্গে কোন জ্ঞানের কথা পাইলে তিনি সে সম্বন্ধে বালকদিগের জ্ঞাতব্য যাহা কিছু আছে তাহা সমগ্রভাবে না বলিয়া সন্তুষ্ট হইতে পারিতেন না | পড়াইতে পড়াইতে যদি আরবের নাম কোথাও পাইলেন তাহা হইলে আরবের প্রাকৃতিক অবস্থা , তাহার অধিবাসীদের স্বভাব ও প্রকৃতি , মহম্মদের জন্ম ও ধর্ম্মপ্রচারের বিবরণ প্রভৃতি বালকদিগকে না জানাইয়া সন্তুষ্ট হইতে পারিতেন না | ” ২
এইরূপ পাঠের প্রত্যক্ষ ফলাফল বালকের অন্তরের সুপ্ত জ্ঞানানুরাগ উদ্দীপ্ত হয়ে উঠত | লাহিড়ী মহাশয় তাঁর শিক্ষক ডিরোজিওর মতোই ছুটির পর ছাত্রদের সঙ্গে পড়াশুনার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন | অনেক সময় কলেজের মাঠে তাদের সঙ্গে বন্ধুর মতো খেলাধূলাও করতেন |
কিছুটা এগিয়ে গিয়ে অর্থাৎপরবর্তীর একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করলে উপরের বক্তব্যের সত্যতা নিরূপিত হয় | রসপাগলা হতে তিনি বরিশাল জেলা স্কুলের হেডমাস্টার হয়ে আসেন ১৮৬০ সালের প্রারম্ভে | তিন মাস এখানে ছিলেন | এই অল্প সময়ের মধ্যে তিনি ছাত্রদের অন্তরের অন্তঃস্থলে প্রবেশ করতে পেরেছিলেন | শিবনাথ শাস্ত্রী মহাশয়ের ভাষায় , ” মধুবিন্দুর চারিদিকে যেমন পিপীলিকা শ্রেণী জোটে , তেমনি সন্ধ্যার সময় বালকগণ লাহিড়ী মহাশয়ের চারিদিকে জুটিত | তিনি স্কুলগৃহের নিকটস্থ পুষ্কুরিণীর বাঁধাঘাটে তাহাদের মধ্যে সমাসীন হইয়া বিবিধ বিষয়ের প্রসঙ্গ উত্থাপন করিতেন ; এবং কথোপকথনচ্ছলে নানা তত্ত্ব তাহাদের গোচর করিতেন | ইহার আকর্ষণ এমনি ছিল যে , বালকগণ গুরুজনের নিকট তিরস্কার সহ্য করিয়াও সেখানে আসিতে ছাড়িত না | ” ৩
জাত শিক্ষকের প্রধান লক্ষণ হল – ” যাবৎ বাঁচি , তাবৎ শিখি ” – এই মন্ত্রে সদা জাগ্রত অবস্থিতি | রামতনু লাহিড়ীর ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি | তিনি যখন অশীতিপর স্থবির তখনও কোনো নতুন শব্দ বা বিষয় জানতে পারলেই বলতেন , ” রসো , রসো কথাটা লিখেনি | ” ৪ সঙ্গে সঙ্গে স্মারক -লিপির পুস্তকখানি বের করতেন |
তিনি জাত শিক্ষক ছিলেন তার সবচেয়ে বড়ো প্রমাণ তাঁর কোনো ভুল হয়েছে , কোনো ছাত্র তা তাঁর নজরে এনেছেন , তাতে তিনি না হয়েছেন অপমানিত , না রাগান্বিত , না অসন্তুষ্ট | ছাত্রের কাছ থেকে ব্যাখ্যা শুনে তিনি পরম সন্তোষ অনুভব করেছেন | শেষে ছাত্রকে বাহবা দিয়েছেন | নিজে যা জানেন না তা অপরের কাছ থেকে শিখে নিতে তাঁর কোনো লজ্জাবোধ ছিল না | এই রকম একটি ঘটনার কথা এখানে উল্লেখ করব – ” একবার লাহিড়ী মহাশয় পাঠ্য বিষয়ের কোনও এক অংশের ব্যাখ্যা করিতেছেন , ইতিমধ্যে একটি বালক বলিল , ‘”মহাশয় ওটার মানে ত ওরকম নয় | “তিনি অমনি তন্মনস্ক , “সে কি ? তুমি কি আর কোনও অর্থ জান নাকি ? “তখন বালকটি আর এক প্রকার ব্যাখ্যা দিতে প্রবৃত্ত হইল | ব্যাখ্যা শুনিয়া লাহিড়ী মহাশয় অতিশয় আনন্দিত হইলেন , ” এ মানে তুমি কোথায় পেলে ? ” অনুসন্ধানে জানিলেন , তাঁহার একজন শিক্ষিত আত্মীয় বলিয়া দিয়াছেন | তখন প্রীত হইয়া বলিলেন , ” এমন শিক্ষিত উপযুক্ত লোক যার ঘরে তার ভাবনা কি ? ” ৫
জোড়াতাল বা গোঁজামিল দিয়ে যেন তেন প্রকারে ছাত্রদিকে বুঝিয়ে দেবার প্রয়াস তিনি কোনোদিনই নেননি | বরং বলতেন , ” দেখো এটা আমার ঠিকমতো জানা নেই , আমি জেনে নিয়ে কাল তোমাকে জানাবো | ” ৬ জানতে চেষ্টা করেও যদি কৃতকার্য না হতেন তাহলে ছাত্রদের কাছে তা স্বীকার করতে তাঁর কোনো কুণ্ঠাবোধ ছিল না |