সাপ্তাহিক ধারাবাহিক প্রবন্ধে মানস চক্রবর্তী – ৭

|| ৭ ||

বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রভাবশালী প্রবীণ অধ্যাপক একটি রোল নম্বর পাঠিয়ে বলেছেন , যেন পাশ করিয়ে দেওয়া হয় | বাকিটা বইয়ের ভাষায় :
নারায়ণবাবু ব্যাজার মুখে বললেন ,’ খাতাখানা বার করুন | ‘ বার করলাম |
‘ খাতাটা একবার দেখুন তো | ‘
দেখলাম |
‘ পাশ করানো যায় ? ‘
‘ না | পরীক্ষক এ খাতা খুবই ভালোভাবে দেখেছেন | যথেষ্ট নম্বর দিয়েছেন | আর দেওয়া যায় না | পঁচিশ দেওয়া হয়েছে | ‘
‘ মহা মুস্কিল | কী যে করা যায় ! ‘
নিজেও খাতাটা নেড়েচেড়ে একটু দেখলেন |
খানিক বাদে বললেন ,’ পঁচিশ পর্যন্ত যত খাতা আছে সব বার করুন | ওরাই বা কী দোষ করেছে ! ওদের মুরুব্বি নেই , এই তো ! আমিই ওদের মুরুব্বি | প্ঁচিশ পর্যন্ত সব পাশ করাব | ‘
বলে বালিশে বুক দিয়ে সব পঁচিশকে পাশ করাতে বসে গেলেন | অনেক রাত পর্যন্ত চলল সেই কাজ | বললেন , ‘ পাপ যখন করতেই হবে , অন্তত কিছু প্রায়শ্চিত করি | ‘ ৫
ছাত্রপ্রীতির আর একটি ঘটনার কথা উল্লেখ না করলেই নয় | উনি তখন সিটি কলেজে | সেদিন নাইট শিফট | হঠাৎ কলেজের মেন ইলেকট্রিক সুইচে আগুন লেগে যায় | প্রাণ বাঁচানোর দায়ে সবাই হুড়োহুড়ি করে বেরিয়ে আসছে | এদিকে নারায়ণবাবু স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে আছেন | সহকর্মী অধ্যাপক জাহ্নবীকুমার চক্রবর্তী বললেন , ” আরে শিগরির চলুন নেমে যাই | ” শুনে নারায়ণবাবু শুধু বিরক্ত নন বেশ রেগেও গেলেন | রাগ লুকানোর কোনো চেষ্টা না করে বেশ ধমকের সুরেই বললেন , ” ছেলেগুলোকে ফেলে আমরা নামব আগে | ” পাঞ্জাবির পকেটে হাত দিয়ে সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে রইলেন | সব ছেলে নামল | তারপর তিনি নামলেন |
অনেক মাস্টারমশাই আছেন একটু বেশিই কড়া | একটু চেপেচুপে নম্বর দেন | অনেকক্ষেত্রে নারায়ণবাবুর এটা পছন্দ হতো না | তিনি নির্দিষ্ট পরীক্ষককে ডেকে পাঠিয়ে খাতা সংশোধন করিয়েছেন | পরীক্ষকরা অনেকেই অসন্তুষ্ট হতেন , কেউবা বিরক্ত | তিনি কিন্তু এ সব অগ্রাহ্য করে ছাত্রদের ক্ষতিটা পুষিয়ে দিতেন |
স্ক্রুটিনিয়ারদের উপার্জন যাতে সমান হয় সেই জন্য তিনি কাজ ভাগ করে দিতেন | বিরাগভাজন যে হতেন না তা নয় , তবে সেইসবে খুব একটা আমল দিতেন না | একবার এক স্ক্রুটিনিয়ার অসুস্থ হওয়ার জন্য সকলের সঙ্গে সমান কাজ করতে পারলেন না | কিন্তু বিল করার সময় নারায়ণবাবু সমান বিল বানালেন | বললেন , ” সবার সমান করে দি | ও বেচারার অসুখ হয়েছিল , ওর বড়ই কম কাজ হয়েছে | কিন্তু অসুখে ওর খরচও হয়েছে | ” ৬
খাতা দেখার ধরণ জাত শিক্ষককে চিনিয়ে দেয় | আলোক রায়ের স্মৃতিকথায় তার সাক্ষ্য পাওয়া যায় | লেখক জানিয়েছেন ওনাদের ছাত্রজীবনে প্রত্যেক অধ্যাপক নিয়মিত ভাবেই প্রত্যেক সপ্তাহে টিউটোরিয়াল ক্লাস নিতেন | সেই টিউটোরিয়াল ক্লাসের অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে লেখকের কাছে থেকে যাওয়া নারায়ণবাবুর দেখে দেওয়া কয়েকটি খাতার উদ্ধৃতি এখানে উল্লেখ করব | ” প্রশ্নোত্তরটি দেখার পর শেষে গ্রেড দেওয়া এবং সেই সঙ্গে কিছু মন্তব্য সহ ng স্বাক্ষর – “B’ লেখাটি খুব ভালো | তবে পূর্ববর্তী কবিদের কথা বেশি বলা হয়েছে এবং যতীন্দ্রনাথের আলোচনা সংক্ষিপ্ত হয়েছে | ” ( 20.1.58 ) | ” A লেখাটিতে বেশ মৌলিক চিন্তার পরিচয় আছে | তবে আর একটু গুছিয়ে বলা দরকার | ” ( 7.2.58 ) | ” A লেখার ভঙ্গিটি কিন্তু বড্ড তীব্র হয়েছে – আর একটু শান্তভাবে লিখবে | ” ( 21.2.58 ) | ৭
এখানে লক্ষ্যনীয় বিষয় হলো ক্লাসে পড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে টিউটোরিয়াল ক্লাসের পরিশ্রম | যিনি বা যাঁরা শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত তাঁরা খুব সহজেই অনুধাবন করতে পারবেন এত যত্নের সঙ্গে খাতা দেখা ও ত্রুটিটা উল্লেখ কতটা শ্রমসাধ্য |
একজন শিক্ষক পড়াশোনা করবেন যথেষ্ট এটা স্বাভাবিক , তার সঙ্গে যদি তাঁর স্মৃতি সঙ্গ দেয় তবে তো সোনায় সোহাগা | নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় সেইদিক থেকে ভাগ্যবান | ওনার স্মৃতিশক্তি ঈর্ষা করার মতো |
একবারের ঘটনা | অদ্যকার পাঠ তারাশঙ্করের ‘ অগ্রদানী ‘, কিন্তু মুশকিল হলো ক্লাসে দেড়শো ছেলেমেয়ের মধ্যে কারুর কাছেই বই নেই | কিছুক্ষণ মাথা চুলকে বলতে শুরু করলেন স্মৃতি থেকে | সমস্ত গল্পটাই ড্যাস, কমা, পূর্ণচ্ছেদ, কোলন, সেমিকোলন পর্যন্ত উল্লেখ করে থামলেন ‘ খাও হে চক্রবর্তী’ তে | এই অদ্ভুত স্মৃতি দেখে ছাত্ররা সব থ |

( চলবে )

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।