সাপ্তাহিক ধারাবাহিক প্রবন্ধে মানস চক্রবর্তী – ১০

|| ১০ ||

কত রাত্রে পাঁচ মিনিটেই আহার শেষ করে অনিদ্র রজনী মাঠে মাঠে ঘুরে প্রকৃতিসঙ্গ সুখ অনুভব করত | আত্মভোলা না হলে একি সম্ভব ?

এবারে আসব তাঁর সাহিত্য সাধনার কথায় | ” সাহিত্যের রসসমুদ্রের মধ্যে তিনি অহোরাত্র ডুবিয়া থাকিতেন | সংস্কৃত ইংরেজি বাংলা ফরাসিস্ ও জর্মান কবি ও রসজ্ঞদের রচনার ভাবরস সকাল হইতে দ্বিপ্রহর , দ্বিপ্রহর হইতে সন্ধ্যা ও রাত্রির অনেক প্রহর পর্যন্ত বিনিদ্র থাকিয়া আকণ্ঠ পান করিয়া আনন্দে এমন ভরপুর হইতে কাহাকেও দেখি নাই | যে তাঁহার নিকটে আসিত তাহাকে তিনি সেই নেশা ধরাইয়া দিতেন | ব্রাউনিঙের কবিতা সম্বন্ধে বঙ্গদর্শনে প্রকাশিত তাঁহার আলোচনা পাঠ করিলে সেই আশ্চর্য রসগ্রাহিতার কথঞ্চিৎ পরিচয় পাওয়া যায় | ” ১১
সাহিত্য রচনা সতীশচন্দ্র যে বহুল পরিমাণে করেছেন তা নয় , বরং তা একাসন পাঠেই পড়ে ফেলা সম্ভব | কিন্তু তাতে যথেষ্ট পরিমাণে মস্তিঙ্কের উৎকর্ষতা দেখা গিয়েছিল | সতীশচন্দ্রের রচনাসূচির পরিচয় দেবার মতো স্থানের সঙ্কুলান এখানে হয়তো হবে না , কিন্তু তার বিশেষ কোনো প্রয়োজন এখানে নেই | তবুও একটু দেওয়া যেতেই পারে | সতীশচন্দ্রের মৃত্যুর পর রবীন্দ্রনাথ ও অজিতকুমারের উদ্যোগে আগস্ট ১৯০৪ এ সতীশচন্দ্র লিখিত উতঙ্কের কাহিনী ” গুরুদক্ষিণা ” নামে বোলপুর শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচর্যাশ্রম গ্রন্থাবলীর অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রকাশিত হয় | ১৩১৯ সালে বন্ধু
অজিতকুমারের সংগ্রহ ও সম্পাদনায় ” সতীশচন্দ্র রচনাবলী ” প্রকাশিত হয় | এই রচনাবলীতে কবিতা অংশে চৌত্রিশটি ও গদ্য অংশে আটটি রচনা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং সর্বশেষে একটি ছোট্ট ডায়ারি মুদ্রিত হয়েছে |
তাঁর সাহিত্যলোচনার বিস্তৃত সুযোগ ও সময় কোনোটাই এখানে নেই | তবু দু’একটি আলোচনা বড়োই তাৎপর্যপূর্ণ ও খুবই সঙ্গত | সতীশ প্রথম যৌবনের নবানুরাগে ফ্যাশানে পড়ে সাহিত্য রচনায় প্রবৃত্ত হয়নি | বরং সাহিত্যের প্রতি অকৃত্রিম অনুরাগেই এ কাজে লিপ্ত হয়েছে | স্বয় রবীন্দ্রনাথ বলেছেন , ” ব্রাউনিং পড়িতে যে মনোনিবেশের শক্তি , অনুরাগের বল আবশ্যক হয় , তাহা বালক সতীশের প্রচুর পরিমাণে ছিল | সতীশ সাহিত্যের মধ্যে প্রবেশ ও সঞ্চরণ করিবার স্বাভাবিক অধিকার লইয়া আসিয়াছিলেন | ” ১২
এই প্রসঙ্গে অতি অবশ্যই মনে রাখতে হবে তিনি নামের নামের কাঙাল ছিলেন না | ছিল নিজেকে পাওয়ার সুখান্বেষণ | ডায়ারিতে লিখছেন , ” আচ্ছা আত্মপ্রকাশ করিবার জন্য এত ব্যাকুলতা কেন ? নাম ? কখনো না | নিজেকে পাওয়া | আমার সৌন্দর্যে যে একটা ছিন্নবিছিন্ন আভাস পাইতেছি ঐগুলি এক করিয়া একটি পূর্ণ জীবনের সুর শুনিবার আকাঙক্ষা | গুরুদেব বলিয়াছেন আমরা নিজেদের সৃষ্টি করিবার জন্যই আসিয়াছি | বাস্তবিক ওটা যেন আমাদের একটা original প্রেরণা ! আপনাকে consciously না পাইলে সুখ নাই | ১৩
আপনাকে পাওয়ার সাধনাই সতীশচন্দ্র এই ক্ষুদ্র জীবনে করে গেছেন | ডায়ারির প্রথমেই লিখিত হয়েছে , ” আপনাকে পাইতে হইবে | আপনাকে না পাইলে জীবন মিথ্যা | আমি কুলক্রমগত সংস্কারের , সমাজের দাস হইয়া মূর্খের মত কেন ফিরিব ? আমি পরের উপদিষ্ট এক অগম্য অননুভূত কাল্পনিক ঈশ্বরকে , ‘ ঈশ্বর ঈশ্বর ‘ করিয়া আত্মার ধার কেন কুণ্ঠিত করিব ? আমি আপনাকে জানিব | ” ১৪
এই প্রসঙ্গে প্রমথনাথ বিশী বড়ো সুন্দর বলেছেন ” ইহা লিখিবার সময়ে সতীশচন্দ্রের বয়স কুড়ি বৎসর | এ সময়ে এ জাতীয় উক্তি আমাদের দেশে বিরল নয় – কলেজের ছাত্রদের অনেকের ডায়ারিতেই এই শ্রেণির উক্তি লিপিবদ্ধ হয় | কিন্তু বাস্তবের ঘা খাইতেই তাহাদের মাথা হইতে আপনাকে পাওয়ার ভূত নামিয়া গিয়া চাকুরি পাওয়ার ব্রহ্মদৈত্য চাপিয়া বসে | কিন্তু সতীশচন্দ্রের বেলায় গোড়া হইতেই ব্রহ্মদৈত্য নামিয়া গিয়াছিল | ” ১৫
তাঁর সাহিত্য কীর্তি আলোচনা করতে গেলে আরো একটি বিষয়ের উপর আমাদিগকে আলোকপাত করতেই হবে | সেটি হলো – সতীশচন্দ্র তাঁর ডায়ারির এক জায়গায় রবীন্দ্রনাথ ও কালিদাসের তুলনামূলক আলোচনা করেছেন | এত কম বয়সে এটাকে অনেকে স্পর্ধা বলে মনে করতেই পারেন , কিন্তু এতে তাঁর সাহিত্য মেধার যে পরিচয় পাওয়া যায় তাকে অগ্রাহ্য করার শক্তি বোধহয় কারুরই হবে না |
সাহিত্য সাধনার সঙ্গে সমান্তরালভাবে দেখা গিয়েছিল তাঁর প্রকৃতি প্রেম | সর্বোপরি প্রকৃতির সঙ্গে একীভূত হওয়ার ক্ষমতা | ডায়ারিতে সতীশচন্দ্র লিখছেন , ” ছেলেবেলার ‘ আমাকে ‘ স্পষ্টই ঐ দেখিতে পাইতেছি | প্রকৃতির সঙ্গে আমার কি ভাব ছিল ! বৃষ্টির দিনে কে আমাকে ঘরে রাখিবে ? ঝড়ের দিনে কত ভাল লাগিত ! বর্ষাবিদ্যুতের গর্জ্জনে কি নিবিড় আনন্দে হৃদয় কাঁপিত | বাহিরই আমার প্রিয় ছিল | ভিতরে থাকিতে আমার বিরক্ত লাগিত | ” ১৬
আর এক ঝড়ের বর্ণনায় সতীশচন্দ্র লিখছেন , ” কাল আমরা খসখসের পর্দ্দাঢাকা রথীন্দ্রের কক্ষে শুইয়া , বসিয়া , লুটিয়া , গরমে হেলাহেলি করিয়া দুপুর যাপন করিতেছিলাম | …….হঠাৎ মাঠের উপর ছায়া পড়িতে লাগিল | পশ্চিমউত্তর কোণা হইতে আকাশের উপরে বড় বড় মেঘ জলে ভারি হইয়া কালো হইয়া টলমল করিয়া আসিতে লাগিল | ……হঠাৎ বাহির হইয়া দেখি দূরে হাওয়া উঠিয়াছে | আমরা মাঠে নামিয়া দৌড়াদৌড়ি আরম্ভ করিলাম | আঃ এই বিরাট মাঠের মধ্যে ধূলিরাশির হাহা করিয়া দৌড়াইয়া যাওয়ার দৃশ্যটি কি চমৎকার | ভেরীরবে আহূত যুদ্ধযাত্রী হাজার হাজার অশ্বারোহীর মত হোঃ হোঃ করিয়া ধূলিপটল ছুটিয়াছে | ক্রমে মেঘে ধূলায় মিলিয়া একটা ঘোর অন্ধকার হইয়া গেল | একটু দূরেই আর কিছুই দেখিতে পাই না | যে দিক হইতে পবনদেব আক্রমণ করিতেছিলেন সে দিকে মুখ ফিরাইয়া কাহার সাধ্য অস্ত্রলেখা পৃষ্ঠেই লইতে লইতে হইল | তাও দাঁড়াইয়া থাকা মুস্কিল , এত ছিটা গুলি আসিয়া পিঠের উপরে বর্ষিত হইতে লাগিল | তখন কাজেই হাওয়ার সঙ্গে দৌড়াইতে লাগিলাম | …..ভারি আনন্দের আশায় সকলকে ছাড়িয়া মাঠের মধ্যে দৌড়াইতে লাগিলাম |….. পায়ে কাঁটা ফুটিয়া গেল | তখন বৃষ্টি আরম্ভ হইয়াছে | ভয়ঙ্কর বেগে [ বৃষ্টিকণা ] গুলি পিঠে লাগিতেছে ,দৌড়িয়া একটি বটগাছের কাছে গিয়া দাঁড়াইলাম | আমাকে পাড়িয়া ফেলিবার যোগাড় করিতে লাগিল | আমি বটশিশুর কাণ্ড জড়াইয়া , জোর করিয়া তার উপরে চিৎ হইয়া পড়িয়া কোন রকমে টিকিয়া থাকিলাম | ” ১৭ কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথের তথ্য থেকে আমরা জানতে পারি- সেদিন সতীশচন্দ্রকে অর্ধমৃত অবস্থায় গাছতলা থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল |
এই রূপ সহজাত প্রকৃতি প্রেম তাঁর কবিসত্তাকেই সমর্থন করে |

( চলবে )

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।