” বাংলা সাহিত্যের সরস্বতী যদি আজ বর দিতে উদ্যত হন যে , ইচ্ছা করলে তাঁহাদের যে কোনো একজনকে ফিরিয়া পাওয়া যাইবে , ফিরিয়া আসিয়া তিনি তাঁহার অসমাপ্ত সাহিত্যলীলা পূর্ণ করিয়া রাখিয়া যাইতে পারিবেন , তবে আমি নিঃসংশয়ে সতীশচন্দ্রের প্রত্যাবর্তন কামনা করি | ” ১ উপরের কথাগুলির স্রষ্টা প্রমথনাথ বিশী | কথাগুলি সতীশ মাহাত্ম্যের উজ্জ্বল মাইলফলক নিশ্চয় |
এখন যদি প্রশ্ন ওঠে কে এই সতীশচন্দ্র ? বা কী তাঁর পরিচয় ? সতীশচন্দ্র নিজেই তাঁর ডায়ারির এক স্থলে লিখছেন , ” আমি কোমল , আমি সুন্দর , সৌন্দর্যপ্রিয় , শান্তিনিষ্ঠ , – আমি সৌন্দর্য রচনা করিবার শক্তি রাখি , আমি কবি | ” ২ নিঃসন্দেহে এটিই তাঁর সবচেয়ে বড়ো পরিচয় | কিন্তু এটাই তাঁর সর্বশেষ পরিচয় নয় |
রবীন্দ্রনাথ ব্রহ্মবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পূর্বে একদিন খেদ করে বলেছিলেন , ” এমন অধ্যাপক পাওয়াই কঠিন যাঁহারা অধ্যাপনা কার্যকে যথার্থ ধর্মব্রত স্বরূপে গ্রহণ করিতে পারেন | অথচ বিদ্যাকে পণ্যদ্রব্য করিলেই গুরুশিষ্যের সহজ সম্বন্ধ নষ্ট হইয়া যায় ও তাহাতে এরূপ বিদ্যালয়ের আদর্শ ভিত্তিহীন হইয়া পড়ে | ” ৩ ঘরের এককোণে তখন সতীশচন্দ্র বসে | কথাটি সতীশচন্দ্রের কর্ণগোচর হতেই বিনীতস্বরে কবিগুরুকে জানালেন প্রাণের বাসনা – ” আমি বোলপুর ব্রহ্মবিদ্যালয়ে শিক্ষাদানকে জীবনের ব্রত বলিয়া গ্রহণ করিতে প্রস্তুত আছি , কিন্তু আমি কি এ কাজের যোগ্য ? ” ৪ অনেকের মনে হইতেই পারে প্রথম যৌবনের নবীন কল্পনা | কিন্তু এ সত্য নয় | রবীন্দ্রনাথ প্রথমে তা স্বীকার করতে অসম্মত হলেন | অবশ্য এর যথেষ্ট কারণ ছিল | প্রথমত তাঁর বি.এ .পরীক্ষা আসন্ন | কবির উক্তি : ” পরীক্ষা দিয়ে পরে চিন্তা করো | ” দ্বিতীয়ত তাঁরই মুখপ্রাণে চেয়ে সমস্ত সংসারটা ভারমুক্ত হতে চেয়েছিল | কিন্তু সতীশচন্দ্র আমাদের মতো সাধারণ মনের মানুষ ছিলেন না | তাই অতি সহজেই নিজের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন , সংসারের দাবী অস্বীকার করতে পেরেছিলেন | রবীন্দ্রনাথের ভাষায় : ” দারিদ্র্যের ভার অবহেলায় মাথায় নিয়ে যোগ দিলেন আশ্রমের কাছে | বেতন অস্বীকার করলেন | আমি তাঁর অগোচরে তাঁর পিতার কাছে যথাসাধ্য মাসিক বৃত্তি পাঠিয়ে দিতুম | তাঁর পরনে ছিল না জামা , একটা চাদর ছিল গায়ে , তাঁর পরিধেয়তা জীর্ণ | ” ৫
সতীশচন্দ্র সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের শংসাপত্র বলা যেতেই পারে – ” আশ্রমে যারা শিক্ষক হবে তারা মুখ্যত হবে সাধক , আমার এই পরিকল্পনাটি সম্পূর্ণ সত্য করেছিলেন সতীশ | ” ৬ এত কম বয়সে রবীন্দ্রনাথের এমন অনুরাগ মিশ্রিত শ্রদ্ধা পাওয়া বড়ো কম সৌভাগ্যের কথা নয় |
সতীশচন্দ্র যে সত্যিই সাধক ছিলেন এবং সাহিত্য সাধক তা তাঁর ক্ষুদ্র বাইশ বছরের জীবনের মধ্যে কতখানি সার্থক আমরা তার অন্বেষণে অগ্রসর হবো এবার |
” কল্পনাক্ষেত্র হইতে কর্মক্ষেত্রে নামিয়া আসিলেই অনেকের কাছে সংকল্পের গৌরব চলিয়া যায় | ” – এ স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের অভিমত | এটা যে কতখানি সত্য , এ বাস্তব অভিজ্ঞতা সংসারে কম-বেশি সকলেরই থাকে | কিন্তু সতীশচন্দ্রের সংকল্পের গৌরব চলে যায়নি , বরং তা আরো গৌরবান্বিত হয়েছিল | এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ | ” যাহারা উৎসাহের জন্য বাহিরের দিকে তাকায় , একাজ তাহাদের নহে – কাজও করিতে হইবে নিজের শক্তিতে , তাহার বেতনও জোগাইতে হইবে নিজের মনের ভিতর হইতে – নিজের মধ্যে এরূপ সহজ সম্পদের ভাণ্ডার সকলের নাই | ” ৭
কিন্তু এ সহজ সম্পদের কোনো অভাব ছিল না সতীশের জীবনে | আমৃত্যু ছিলেন ‘ আনন্দের সম্পদ ‘ এর অধিকারী | এমনই একটা ছবি সতীশচন্দ্রের অন্তরঙ্গ বন্ধু অজিতকুমার চক্রবর্ত্তীর স্মৃতিচারণায় ধরা পড়েছে | ” যখন ছাত্র ছিলেন তখন তাঁহার নিঃস্ব অবস্থায় যাহা থাকিত তাহাই দান করিয়া বসিতেন, ছেঁড়া মলিন বস্ত্র পরিয়া ও মাদুরে শয়ন করিয়া কাটাইতে তাঁহার কষ্টবোধ হইত না | কলিকাতায় তাঁহার বাসায় তাঁহার হতশ্রী লক্ষ্মীছাড়া দৈন্যদশা দেখিলে সেখানে বসিতে ইতস্তত করিতে হইত | দারিদ্র্য যে তাঁহাকে ভয়ংকর রূপে ঘিরিয়া আছে তাহা সেই নিয়তরসপিপাসু কবিটি বোধহয় ভালো করিয়া জানিতেনই না ; আনন্দের সম্পদ তাঁহার এতই অধিক ছিল | ” ৮
অজিতকুমার আর বলছেন , ” ত্যাগ যদি ধনের ত্যাগ বা অভ্যাসের ত্যাগ হয় , আরামের বা সুখের ত্যাগ হয় , তবে তাহা সত্য ত্যাগ হয় না , তাহা ত্যাগের বাহিরের রূপ হয় মাত্র ; কারণ সত্য ত্যাগ একমাত্র আত্মত্যাগ , আপনাকে ভোলা | সতীশের সেই আপনভোলা ত্যাগ ছিল | ” ৯
সতীশের আত্মভোলা ভাবের একটি অতি উৎকৃষ্ট চিত্র লাবণ্যরেখা চক্রবর্ত্তীর একটি নিবন্ধে ( দুই বন্ধু ) ধরা আছে | ” সতীশ যে সে ছেলে নয় , সে এ পৃথিবীর স্বার্থকলুষমুক্ত , সম্পূর্ণ অপার্থিব ধাতুতে গড়া | যেমন তাঁর অসামান্য জ্ঞানানুরাগ , তেমনি তাঁর বিনয় ও স্বভাবের মাধুর্য | সমাদরে উৎকৃষ্ট আহার্য দিলে যেমন খুশি , শুধু ডালভাতেও সেই রূপে তুষ্টি , কিছুতেই তাঁর বিরক্তি ছিল না | খাইতে ডাকিতে গিয়া দেখিতাম , অনেক রাত্রি পর্যন্ত দুজনেই পাঠে বা গভীর আলোচনায় নিমগ্ন , খাবার প্রায় ঢাকা পড়িয়া থাকিত | সতীশের মুখে চোখে একটি দিব্যভাব বিরাজ করিত | সে বড়ো আত্মভোলা ছিল , শিশুর প্রতি যেমন দয়া হয় তাঁর প্রতিও তাই হইত | ” ১০