গল্পে মালা চ্যাটার্জ্জী

নবান্ন

‘দাদুভাই ও দাদুভাই, তুমি তো এত গল্প লেখ আমায় একটা গল্প লিখে দাওনা নবান্ন বিষয়ে, স্কুলে প্রতিযোগিতা আছে।’ ‘প্রতিযোগিতার বিষয় যখন তখন তো দাদুভাই তোমার নিজে লেখা ভালো, তাতে বুঝতে পারবে নিজের লেখনীর সম্পর্কে।’ একগাল হেসে অবনীকান্ত বাবু দ্বাদশ শ্রেণীতে পড়া নাতি রাজকে বলেন। ‘না দাদুভাই, আমি তোমার মতো লিখতে পারি!! তাছাড়া, তুমি তো অবিভক্ত বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করেছো তখন নবান্ন উৎসব পল্লীর ঘরে ঘরে ধূমধাম সহকারে হতো। দাওনা দাদুভাই, একটু লিখে।’ সকাতর অনুরোধ রাজের।

‘দাদুভাই বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করলেও সেখানে আমি বেশিদিন থাকিনি। চতুর্থশ্রেণীতে পড়ার সময়েই আমি কলকাতায় চলে এসেছি। বাবা কলকাতায় চাকরি নিয়ে চলে এসেছিলেন।’ হাসতে হাসতে অবনীকান্ত বাবু নাতিকে বলেন।

অগত্যা আদরের নাতির একান্ত অনুরোধ ঠেলতে না পেরে অবনীকান্ত বাবু বসলেন খাতা-কলম নিয়ে। নবান্ন! চোখের সামনে ভেসে উঠলো নিশার কথা যাকে এতদিন মনের মণিকোঠায় ভাসিয়ে দিয়েছিলেন সেই দীর্ঘ, শীর্ণ, অপরিপুষ্ট মেয়েটির কথা। আজ বেলাশেষে সে আবার কেন এসে দেখা দিল! কলকাতার আলোকোজ্জ্বল, জনবহুল রাজপথে এসে তাঁর তো মনে হয়েছিল শীতলপাটী গ্রামের নিশা তাঁর কিছুদিনের দুর্বলতা, অসম্ভব কুয়াশাচ্ছন্ন তবে! প্রোজেক্টারের রিলের মতো নবান্ন লিখতে গিয়ে নিশা কেন সামনে এসে দাঁড়ালো! তবে কি স্মৃতিরা মরে না!!

মনে আছে আজও ছোটবেলার বন্ধু নিশিকান্ত হঠাৎ একদিন এসে বলেছিল, ‘এই অবনী, যাবি আমার দূর সম্পর্কের মাসির বাড়ি শীতলপাটী গ্রামে নবান্ন উৎসবে? খুব সুন্দর গ্রাম জানিস তো! সেখানে অগ্রহায়ণ মাসে মাঠ ভরে যায় পাকা ধানে। যার যে সময়ে ধান পাকে চাষিরা সেইমতো খেত থেকে এই নৈবেদ্য নিয়ে গিয়ে ধানের গোলা ভরিয়ে তোলে। গ্রামবাংলার নবান্ন একটি বিশিষ্ট উৎসব। নবান্ন উৎসবে প্রাক্কালে গ্রামবাংলার চারপাশ জানিস আনন্দে মুখরিত হয়। তাদের কাছে স্বপ্নের মতো আসে নবান্ন উৎসব। চলনা, ক‘দিন কাটিয়ে আসি সেখানে।’

বন্ধু নিশিকান্তর কথায় রাজি হয়ে তাঁর দূর সম্পর্কের মাসির বাড়ি শীতলপাটী গ্রামে গিয়েছিলেন তিনি। যাওয়া কি সেখানে সহজকথা!! অফিসছুটি নিয়ে তবে যাওয়া। শনিবার খুব ভোর-ভোর তারা ট্রেন ধরেছিলেন। তারপর ট্রেন থেকে নেমে আবার গরুর গাড়ি। পথে যেতে যেতে অবশ্য অনেক সুন্দর দৃশ্য দেখেছিলেন। দেখেছিলেন ভোরের প্রদীপ থেকে ধোঁয়া উঠছে আর সবুজ কচিপাতারা প্রথম সূর্যের দিকে মুখ করে চেয়ে আছে। দেখেছিলেন অনেক কাকেদের যারা ঘুর্ণিমেরে এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করছিল হয়তো নবান্নে দেবতার উদ্দশ্যে
দেওয়া নৈবেদ্যর নতুন চাল, কলা, গুড় দিয়ে মাখা খাবার খাওয়ার জন্যে। ভালোই লেগেছিল আলো-ছায়ার উঠোন জুড়ে পল্লীগ্রামের বসতবাড়ি দেখতেও।

চলতে চলতে গোরুর গাড়িটি এক পানা পুকুরের পাশে ছায়ায় ঘেরা একটি কুটিরের সামনে নামিয়ে দিয়েছিল। নিশিকান্তের মেসোমশাই খুব সাদরে তাদের দুজনকে কুটিরের ভিতরে নিয়ে গিয়ে বসায়। সেখানে অভাব ছিল কিন্তু আন্তরিকতার ঘাটতি ছিলনা। তাদের মেয়ে নিশা নজরে আসে একটু পরে নবান্নের নতুন চাল, কলা মাখা খাওয়ার সময়। হলুদ রঙের লালপেড়ে শাড়ি পরেছিল। অনভ্যাসে শাঁড়ির আঁচল খালি উড়ে যাচ্ছিল। তাকে সেদিন ভালোই লেগেছিল অবনীকান্তবাবুর। আরও ভালো লেগেছিল যখন সেদিন রাতে লন্ঠনের আলোয় দুলে দুলে পড়েছিল যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তর ‘নবান্ন’ কবিতা। বিশেষ করে ঐ লাইনটা যখন বলছিল,—

“উঠোনা না বন্ধু, অঘ্রান মাস,—তাহে নবান্ন ভাই,
আজিকার দিনে চাষার ঘরে যে কুটুম ফিরাতে নাই।”

বুকের মধ্যে রক্ত ঝলকে উঠেছিল। তারপর পুরো ‘নবান্ন’ কবিতাটা নিশার সাথে তিনিও পাঠ করেছিলেন। পরের দিন শীতলপাটী গ্রামের বড় পুকুরটার পাশে বসে সাপের সাঁতরানো, ফড়িংদের পাতলা কাঁচের মতো পাখা নাড়িয়ে চলা আর ঘুঘু পাখির উদাস করা ডাক শুনতে শুনতে তিনি যখন নিশাকে দেখেছিলেন তখন মনে হয়েছিল প্রকৃতির বুকে বেড়ে ওঠা নিশার যেন যৌবন স্থগিত হয়ে আছে তবু ভাল লেগেছিল।

ফিরে আসার আগের দিন নিশার পেশায় কৃষক বাবাকে কথাও দিয়েছিলেন তাদের মেয়েকে বিয়ে করবেন আর নিশাকে বলেছিলেন, ‘অপেক্ষা করো আমি আসছি টোপর মাথায় দিয়ে, ছাদনাতলায় দেখা হবে।’ লজ্জায় লাল হয়ে গিয়েছিল সেদিন নিশা কিন্তু ওর মুখে স্পষ্ট অনুরাগের ছোঁয়া তিনি দেখেছিলেন।

কলকাতায় ফিরে এসে বাবা-মাকে নিশার কথা বলে বিয়ের প্রস্তুতি নেবার জন্য মানসিকভাবে তৈরিও হয়েছিলেন কিন্তু একদিন সকালে চা খেতে খেতে মা যখন অতসীর ফটোটা দেখালো তখন তার রূপে আত্মহারা হয়ে যান তিনি, ভুলে যান নিশা, প্রতিশ্রুতির কথা। বাধ্য ছেলের মতো সালংঙ্কারা রূপবতী অতসীকে বিয়ে করেন। সব ঠিকঠাক চলছিল কিন্তু আজ নাতি রাজ এসে ‘নবান্ন’ গল্প লিখতে বলায় অতীত আবার এসে দাঁড়াল।

‘দাদুভাই, ও দাদুভাই, তোমার চোখমুখ এরকম লাল লাগছে কেনো? গল্পটা লিখতে তোমার কি কষ্ট হচ্ছে? কোনোও প্রিয়বন্ধুর কথা মনে পড়ছে?’ চিন্তিতভাবে রাজ প্রশ্ন করে।

‘হ্যাঁ দাদুভাই, অনেকদিনের একজন পুরোনো বন্ধু এসে দরজায় দাঁড়িয়েছে। সে কোথায়, কেমন আছে আমি জানিনা তবু এই গল্পটা আমি লিখবো কিছুটা পাপের প্রায়শ্চিত হবে।’ নাতিকে আশ্বাস দিয়ে খাতা-কলম নিয়ে লিখতে বসলেন অবনীকান্তবাবু। বাইরে তখন গানের কলি ভেসে আসছিল,—

‘সেদিন দুজনে দুলেছিনু বনে, ফুলডোরে বাঁধা ঝুলনা।
সেই স্মৃতিটুকু কভু ক্ষণে ক্ষণে যেন জাগে মনে……’

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।