গদ্যের পোডিয়ামে মধুপর্ণা বসু

পয়লা বৈশাখ হালহকিকত

বাংলার নববর্ষ উৎসব মুখর দিনের আগমন দিনক্ষণ মেলাতে গেলে ফিরে যেতে হবে মুঘল আমলে।ইতিহাস বলে বাংলা বর্ষের সূত্রপাত হয়েছিল ৫ ই নভেম্বর ১৫৫৬ সালে আর এই বর্ষ প্রবর্তন করেছিলেন মুঘল সম্রাট আকবর খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে। সম্রাট আকবরের নির্দেশে তার বিশেষ মন্ত্রক সেই সময়ের ফসল তোলা ও খাজনা আদায়ের সময় বিবেচনায় রেখে ইংরেজি সৌর বৎসর ও হিজরি চন্দ্র বৎসরের উপর ভিত্তি করে এই নতুন বৎসরের নিয়ম প্রবর্তন করেন। প্রথমে এর নাম ছিল ফসলি সন, পরবর্তী কালে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। মুঘল আমলে মানুষদের চৈত্রের শেষ দিনের মধ্যে খাজনা পরিশোধ করতে হত। পরের দিন অর্থাৎ পয়লা বৈশাখ, জমিদাররা নিজেদের অঞ্চলের গ্রামবাসীদের মিষ্টি বিতরণ করতেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো।

পরবর্তী কালে নববর্ষ বাঙালির সামাজিক অনুষ্ঠানের রূপ নেয়। বিদায়ী বছরের সব দুঃখ কষ্ট দূরে সরিয়ে রেখে বাঙালি জাতি উৎযাপন করে তাদের প্রিয় উৎসব নববর্ষ। নববর্ষ বা পয়লা বৈশাখ হল বাঙালিদের একমাত্র ধর্ম নিরপেক্ষ উৎসব – গরীব বড়লোক, উঁচু নীচু ভেদ ভুলে সবাইকে মায়ায় বেঁধে নেওয়ার উপলক্ষ্য।
আধুনিক কালের নববর্ষের চরিত্র বদলাতে শুরু করে উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে। এক্ষেত্রে অবশ্যই ইংরেজদের ইংরেজি নববর্ষের আড়ম্বরের একটি প্রভাব পড়ে বাঙালির চরিত্রে। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায় যে, বিশিষ্ট বাঙালি মনীষী রাজনারায়ণ বসু মেদিনীপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষিকতা করার সময় প্রথম বাংলা নববর্ষ উৎযাপন করে সেই সময়ের নাগরিক জীবনে শিক্ষিত বাঙালিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
উনিশ শতকে শহর কেন্দ্রিক ব্যবসায়ী সমাজের ব্যপক প্রতিপত্তি শুরু হয়। বনিকরা সারা বছরের হোমরাচোমরা ক্রেতাদের মন্ডা- মিঠাই দিয়ে আপ্যায়নের যে সংস্কৃতি প্রচলন করেন আজও তারই জমজমাট ছবি হালের নববর্ষের দোকান বাজারে দেখা যায়। তবে আগে যেমন নববর্ষের সময় পঞ্জিকা প্রকাশ ও সব ঘরে ঘরে নতুন পাঁজি সংগ্রহ করার ব্যস্ততা দেখা যেত আজ সে চল আর বেশি নেই।
খাদ্য প্রিয় বাঙালির জীবনে পয়লা বৈশাখ সত্যিই আনন্দের। সকলের বাড়িতেই সাধ্য অনুসারে চলে ভূড়িভোজ। বাংলাদেশে একসময় পয়লা বৈশাখের সকালে পান্তা ভাত দিয়ে ইলিশ মাছ খাওয়ার প্রচলন ছিল এখন যদিও সেটা অনেকেই উঠে গিয়েছে।
আমাদের ছোটবেলায় একপ্রস্ত নতুন জামা পড়ে হুটোপুটিই ছিল এক অনাবিল আনন্দের। স্কুল কলেজের গণ্ডি পেরোনো নববর্ষ ছিল পাটভাঙা হলুদ তাঁতের শাড়িতে নিজেকে বেশ নায়িকা স্বপ্নে খেয়ালী করে সান্ধ্য জলসায় বাংলা গানে বিভোর, দূরদর্শনের পর্দায় পুরাতনী আড্ডায় বাঙালি নস্টালজিক স্মৃতিতে গর্বিত হয়ে ওঠার একটা ক্ল্যাসিক্যাল যুগ। রামকুমার চাটুয্যের পুরাতনী টপ্পা গান, পঙ্কজ সাহার অতুলনীয় সঞ্চালনায় বাঙালির বর্ষবরণ। ক্রমশ চলে এলো কালীঘাট মন্দিরের আশেপাশে হালখাতা পুজো, রসধারার মিষ্টি দই, পাঁঠার মাংসের নাক ভোজন। যুগের রকেট গতিতে তারপরেই এসেছে ৬, বালিগঞ্জ প্লেস, আহেলি, ভজহরি মান্না, তেরো পার্বনের আদবকেতা, বাঙালী হয়েছে রেস্তোরাঁ মুখী। বাংলাদেশী ঢাকাই জামদানী, গিলে করা পাঞ্জাবী পরিহিত ধোপদুরস্ত বাবু বিবিরা হলেন আধা সাহেবিয়ানায় মুহ্যমান। নববর্ষের সেকাল তার আভিজাত্য নিয়ে যতই সঙ্কটে থাকুক না কেন, ধনী বাঙালীরা বাড়ির হেঁসেলের পাট চুকিয়ে হয়ে পরেছেন রেডিমেড রসনা তৃপ্তির পক্ষপাতি। সেই সাথে দোকান দপ্তরের সাবেকিচলনও এখন আধুনিকতার পোশাকে প্রসাধন বদলে ভীষণ রকম ছাঁটকাট সংক্ষিপ্ত। এখন মা ঠাকুমার হাতের বোঁদে, নিমকি, গজা, বাদ দিয়ে ঢুকে পড়েছে দোকানের সরভাজা, গুঁজিয়া, জলভরা, উজ্জলার চানাচুর। বিকেলে দোকানে দোকানে হালখাতায় কোকালোলা খেয়ে মিষ্টির বাক্স কদাচিৎ আসে। তবুও গ্রীষ্ম বরণের সাজসজ্জায় নববর্ষের দিনটা যতটা অনাবিল আনন্দ আর গৌরবের ছিল, হাল ফ্যাশানের পয়লা বৈশাখ তার কৌলিন্য খুইয়ে ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ হয়ে ওঠার পথে বেশ কিছুটা এগিয়েছে বলতেই পারি।
একবিংশের হাওয়ায় হঠাৎ শণি গ্রহের মতো উপস্থিত “করোনা” রুপী অদৃশ্য শত্রু, যার আক্রমণের জন্য গত নতুন বছরটি আড়ম্বরের আতিশয্যে কিছুটা পিছিয়ে পড়লেও নিশ্চয়ই তার আর্শীবাদ দিতে কার্পণ্য করবে না।
সেকালের বাংলা বর্ষবরণ ছিল এক উৎসব, আনন্দের, কোলাকুলির জিহ্বা তৃপ্তির, একালের নববর্ষ ভারি পকেটে রেস্তোরাঁ মুখী হয়ে উঠলেও মিলনের আশ্বাস আর কুশল বিনিময়ের থাকুক চিরকাল মনের এমনই সাধ রয়ে গেছে আজও।

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!