মার্গে অনন্য সম্মান খুশী সরকার (সর্বোত্তম)

অনন্য সৃষ্টি সাহিত্য পরিবার

পাক্ষিক প্রতিযোগিতা পর্ব – ১৬
বিষয় – অভিনয়
তারিখ – ১৬/১০/২০২০

বিচ্ছেদ

নিতার আজ কোমরের ব্যথাটা বড্ড বেড়েছে।
কিছুতেই বিছানা ছেড়ে উঠতে পারছিল না। না, কষ্টে বলে,আর পারছি না, একবার অভিকে ফোন করে দেখি। মোবাইল বেজে যায় কিন্তু অভি ফোন তো রিসিভ করে না। আবার করে। শেষে ওপার থেকে অভির গলার স্বর ভেসে আসে, হ্যালো, কে ?
— আমি, আমি নীতা, বুঝতে পারছো না ?
— এত সকালে যে ! কি ব্যাপার, শরীর টরীর খারাপ হয়েছে নাকি ?
—- হ্যাঁগো, আজ কোমরের ব্যথাটা বড্ড বেড়েছে, জানো। তুমি একবার এসো না, লক্ষ্মীটি প্লিজ। যেতে তো ইচ্ছা করছে, কিন্তু আমি এখন বড্ড চাপের মধ্যে আছি, সোনা। তুমি আগে যে ওষুধগুলো খেতে, ওগুলো কাউকে দিয়ে কিনিয়ে নাও,ঠিক কমে যাবে। আমি আর কয়েকটা দিন পরেই তোমার কাছে যাচ্ছি, বুঝতে পারছো তো আমার অবস্থাটা।
নিতার ভীষণ রাগ হয়। মনে মনে ভাবে এ বিয়েটা না করলেই বোধহয় ভাল হতো। তখন তো খুব সুন্দর করে বলেছিল, তার কাছে এসে থাকবে। তাকে ছেড়ে থাকতেই পারবে না অথচ দু বছর পার হয়ে গেল এখনো তার এখানে আসার নাম গন্ধ নেই। ওই মাঝে মাঝে দু একদিন না এলে বা কি হয় !
‘ঠিক আছে, তোমার যখন মনে হবে এসো— বলেই নিতা ফোন কেটে দেয়। তারপর মাসিকে ডেকে বলে, মাসি আমাকে ওষুধ গুলো কিনে এনে দেবে ? বড় যন্ত্রণা গো। আজ বোধহয় আর স্কুলে যেতেই পারবো না।
—– তুমিও পারো বাপু, বিয়ে যখন করলে তখন অমন বরকে করলে কেন গো, যে তোমার কাছে থাকেই না ?
—– থাক এখন ওসব কথা। এখন ভালো লাগছে না। তুমি তাড়াতাড়ি ওষুধগুলো এনে দাও আমায়, না খেলে আর আজ উঠতে পারব না।
ওষুধ খেয়ে আস্তে আস্তে ব্যথা সেরে যায় ঠিকই কিন্তু নিতার মনের ব্যথাটা আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে। বিয়ের সময় যত কথা বলেছিল, যত আবেগ, ভালোবাসা, সব‌ই যেন কেমন ফিকে হয়ে যাচ্ছে, অভিকে যেন ভালো করে চিনতেই পারছে না। আগে তবুও ঘনঘন আসতো। এখন যেন দিনের পর দিন তার আসার ব্যবধান ক্রমশ বেড়েই চলেছে। যথারীতি নিতা স্কুলে যায়, নিত্যদিনের কাজ কর্ম যা তা সব করে কিন্তু ভিতরে ভিতরে একটা চিন্তা তাকে পেয়ে বসেছে। নিতা মাঝে মাঝে লক্ষ্য করেছে, যখন ও কলকাতায় যেতে চাইতো না তখন বারবার ওকে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করতো, কিন্তু এখন যখন নিতা নিজেই যেতে চাই তখন যেন অভি খুব একটা খুশি হয় না বরং তার কথায় মনে হয়, নিতা না গেলেই যেন ওর ভালো। ক’দিন ধরে ভাবছে বিষয়টা। সামনেই পুজোর ছুটি।
সে ছুটিতে না গিয়ে যদি হঠাৎ করে অভির কাছে যায় তাহলে কেমন হয় !
সিদ্ধান্ত নেয় আর এভাবেই সে একা একা এখানে পড়ে থাকবে না। হয় অভিকে তার কাছে থাকতে হবে নচেৎ সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসবে। স্বামী থাকতেও যদি তাকে এভাবে অসহায় জীবন যাপন করতে হয়, অসুস্থতায় তাকে কাছেই না পায় তাহলে সেই সম্পর্ক রেখে তার কি লাভ !
হঠাৎ সেদিন মনস্থ করে আজই সাড়ে ছটার ট্রেনে সে কলকাতায় যাবে অভির কাছে। ওর সঙ্গে একটা বোঝাপড়া দরকার।
সাড়ে সাতটায় যখন নিতা অভির বাসার সামনে গিয়ে দাঁড়াল তখনও কিন্তু অভি জানে না নিতা আসছে। মনের ভিতর নিতার যে ঝড় উঠেছে সেই ঝড়ের মোকাবেলা করতেই তার অভির কাছে ছুটে আসা। কিন্তু নিতা ফোন করে যায়, রিসিভ করে না অভি, দরজাও বন্ধ। রাস্তায় লোকের ব্যস্ততা চোখে পড়ে তার অথচ অভি এখনো ঘুমোচ্ছে ?
আবার ফোন করে। তারপর ওপার থেকে কণ্ঠস্বর ভেসে আসে, এত সকালে মনে পড়ল যে।নিতা কেমন আছো ? কোমরের ব্যথাটা কমেছে ?
স্কুলে যাবে নিশ্চয়ই।
—– হ্যাঁ,যাবো তো।তুমি কেমন আছো ?
—- তা বলো, কি বলবে ?
— লক্ষীটি ঘর থেকে বেরিয়ে এসো না, ঘরের সামনে দাঁড়াও।
—- আরে, তুমি কোথায় ? ঘরের বাইরে যাবো মানে ?
— আরে এসোই না।
— অভি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যায়। একদিকে ঘরে শুয়ে আছে বিছানায় মিনা, টুবলু অন্যদিকে বাইরে নিতা। ক্ষনিকেই বুদ্ধি খেলে যায় তার মাথায়। অভি তাকে ফোনে বলে, তুমি একটু দাড়াও লক্ষীটি, আমি ওয়াশরুম থেকে বেরিয়েই আসছি। সঙ্গে সঙ্গে মিনাকে ঘুম থেকে তুলে বলে, শোনো আমি যা বলছি, তাই করবে। এখন আর কোনো প্রশ্ন করো না।পরে আমি তোমাকে সব বুঝিয়ে বলবো। বাইরে একজন মহিলা এসেছে। সে তোমাকে কোনো প্রশ্ন করলে, তাকে তুমি বলবে— তুমি আমার দূর সম্পর্কের জ্যাঠতুতো বোন। শ্বশুরবাড়ির অশান্তির জন্য কয়দিন এখানে বেড়াতে এসেছো। উনি যতক্ষণ থাকবেন ততক্ষণ অভিনয়টা করে যেও কেমন, চিন্তা করো না। আমি সব তোমাকে পরে বলবো।
ঘরের বাইরে এসেই অভির চক্ষু চড়কগাছ। এ আমি কাকে দেখছি ? এসো এসো ঘরে এসো। ফোন না করে এলে যে !
—- তোমাকে চমকে দেবো তাই।
—- ভালোই করেছো। এই দেখো না এত পার্টির কাজের চাপ, তোমার কাছে যাওয়ার জন্য মনটা ছটফট করছে কিন্তু কিছুতেই যেতে পারছি না। তা কদিন থাকবে তো ?
—- আর তো যাবোই না ভাবছি, তোমার কাছে থাকবো।
—– চাকরি ?
—– ছেড়ে দেবো ভাবছি । তুমি তো আছোই চিন্তা কিসের ?
—- ভুলেও ও কাজ করো না নিতা, চাকরি না থাকলে চলে ?
—- কেন তুমি যে বলেছিলে পার্টি থেকে তুমি অনেক টাকা পাও দুজনের দিব্যি হয়ে যাবে। কিন্তু এখনো উল্টো সুরে গান গাইছো কেনো।
— আরে না না উল্টো সুর নয়, বাস্তবটা বোঝার চেষ্টা করো। চাকরিটা একটা পার্মানেন্ট ব্যবস্থা। আর পার্টির টাকা কখন আসে কখন যায় সেটা তো ঠিক করে বলা যায় না।
—– আরে শুধু গল্পই করবে, না একটু চা-টা খাওয়াবে।
—– আরে তোমাকে পেয়ে সব ভুলে গেছি।যাও,যাও ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে আসো । আমি মিনাকে চা করতে বলছি।
—মিনা ! মিনা কে ?
—মিনা আমার দূরসম্পর্কের জ্যেঠতুতো বোন। শ্বশুর বাড়িতে অশান্তির জন্য আমার এখানে কদিন থাকবে বলে এসেছে। ওর একটি আড়াই বছরের ছেলেও আছে। নাম টুবলু। আধো আধো কথা বলে কি সুন্দর ! দেখো খুব ভালো লাগবে তোমার।
ফ্রেশ হয়ে নিতা ঘরে বসে। মিনা চা দিয়ে যায়। অভি ও নিতা চা খায়।
টুবলু ঘুম থেকে উঠেই অভির কাছে দৌড়ে যেতে নিতাকে দেখে থমকে দাঁড়ায়। অভি কাছে টেনে নিয়ে নিতাকে দেখিয়ে বলে, বলো, মাম্মি-ই-ই।
— বাহ, কি সুন্দর ছেলে ! এবার নিতা টুবলুকে টেনে কোলে নিয়ে অভিকে দেখিয়ে দিয়ে বলে, বলতো সোনা, মাম্মা।
অমনি মাথা নাড়িয়ে টুবলু আঙ্গুল দিয়ে অভিকে দেখে বলে, না, বাব্বা। নিতার বিস্মিত চোখ কপালে উঠে, একি বলছে ছেলেটা !
হঠাৎ যেন কথাটা নাড়িয়ে দেয় নিতার মনকে। দ্বিধা কাটানোর জন্য আবার সে টুবলুকে শেখায়,বলো,মাম্মা–আ,
আবার টুবলু জোরছে মাথা ঝাঁকিয়ে চিৎকার করে বলে, না-আ,না-আ,বাব্বা।
এবার আর সন্দেহ থাকে না নিতার। ও জানে শিশু কখনো মিথ্যা বলে না। তাই অভির অভিনয় আজ সব ফাঁস হয়ে যায় নিতার কাছে। বরং উচ্ছল আবেগে শিশুকে কোলে নিয়ে আদর করে বলে, আচ্ছা, আচ্ছা, মাম্মা নয়, বাব্বা।
সব পরিষ্কার হয়ে যায় নিতার কাছে। দুপুরে খাওয়া দাওয়া করে একসঙ্গে এবং খেতে খেতে শান্তস্বরে অভিকে বলে, অভি আমার আগামী কাল স্কুল আছে। আমাকে রাতের ট্রেন ধরতেই হবে।
—-আজকেই যাবে !
— হ্যাঁ,
—স্কুল যখন আছে, আর না করছি না। ঠিক আছে। রাত্রে আমি তোমাকে স্টেশনে গাড়ীতে তুলে দিয়ে আসবো।
নিতা কোনো কথা বলে না ,কেমন যেন বিষন্ন লাগে ওকে।
সাড়ে ছটায় নিতা স্টেশনে অভিমুখে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়।
অভিও তাকে ট্রেনে তুলবার জন্যে প্রস্তুত হয় এবং সঙ্গে যেতে পা বাড়াতেই নিতা দৃঢ় ও কঠিন স্বরে বলে, না। তোমাকে আর যেতে হবে না।
—-আরে যায় না ,রাতের ব্যাপার তো, বলা যায় না।
নিতা তেমনি দৃঢ় কন্ঠে বলে—‘ না’
বাইরে তখন পুজোর কেনাকাটায় মানুষের ব্যস্ততা চরমে।
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!