সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে কুণাল রায় (পর্ব – ২৫)

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা :
দশম অধ্যায় : বিভূতি যোগ :
ভগবান অর্জুনকে বললেন পুনরায় তাঁর অমৃত্সম বাণী শ্রবণ করতে। যেহেতু অর্জুন তাঁর অতীব প্রিয় পাত্র তাই তাঁর পূর্ব উপদেশের অপেক্ষায় বেশ কিছু উৎকৃষ্ট তত্ত্ব বলেছেন।
সকল দেবতা ও মুনি ঋষিরা তাঁর উৎপত্তির রহস্য সম্পর্কে অবগত নন। কারণ তিনি তাঁদের একমাত্র আদিস্রোত। যিনি তাঁদের সকল কিছুর আদি বলে জানেন, তিনিই কেবল তাঁর সকল যন্ত্রণা থেকে মুক্তি লাভ করে মোক্ষের অধিকারী হন।
বুদ্ধি, জ্ঞান, সততা, ক্ষমা, সত্যতা, সুখ, ভয়, অভয়, জন্ম, মৃত্যু, হিংসা, সমতা, সন্তোষ প্রভৃতি ভাব তাঁর থেকেই সৃষ্ট। জগতের স্থাবর -জঙ্গম আদি সমস্ত প্রজা তাঁরই অনুপ্রেরণায় সৃষ্ট। যিনি তাঁর এই বিভূতি যথার্থ রূপে জানেন, তিনি অবিচলিত ভাবে ভক্তিযোগে যুক্ত হন।
তিনি সকল জড় ও চেতন জগতের উৎস। পণ্ডিতগণ সেই সত্য অনুধাবন করে ভক্তি সহকারে তাঁর ভজনা করেন। যাঁদের চিত্ত তাঁকেই সমর্পিত, কেবলমাত্র তাঁরাই তাঁর নিত্য ভজনা করেন। এক অপার্থিব আনন্দ উপভোগ করেন।তিনি তাঁদের বুদ্ধি দান করেন। এই বুদ্ধিকে অবলম্বন করে তাঁরা তাঁর কাছে ফিরে আসতে সক্ষম হন। তিনি তাঁদের হৃদয়ে সদা বিরাজ করেন। দিব্য দ্যুতির দ্বারা অজ্ঞানতার অন্ধকারকে দূর করেন।
অর্জুন ভগবানকে নানা উপাধিতে ভূষিত করলেন। স্বীকার করলেন তিনি সকল কিছু সত্য বলে মনে করেন। কিন্তু দেবলোক ও জীবলোক তাঁর তত্ত্ব যথার্থ ভাবে অবগত নন। পশ্চাতে অর্জুন তাঁর সকল বিভূতি সম্পর্কে জানতে আগ্রহ প্রকাশ করলেন। ভগবান বললেন তাঁর বিভূতি অনন্ত। তিনিই সর্বভূতের আদি, মধ্য ও অন্ত।
তিনি বললেন বেদের মধ্যে সামবেদ, দেবগণের মধ্যে ইন্দ্র ও ইন্দ্রিয়ের মধ্যে মন। তিনি পুরোহিত গণের মধ্যে বৃহস্পতি। সেনাপতিদের মধ্যে কার্ত্তিক। মহর্ষিদের মধ্যে ভৃগু। পর্বতের মধ্যে হিমালয়। বৃক্ষের মধ্যে অশ্বত্থ। দেবর্ষিদের মধ্যে নারদ। সিদ্ধগণের মধ্যে কপিল মুনি। অশ্বের মধ্যে উচ্চশ্রবা। হস্তীর মধ্যে ঐরাবত। মনুষ্যের মধ্যে রাজা।
দৈত্যের মধ্যে প্রহ্লাদ। জলাশয়ের মধ্যে গঙ্গা। বিদ্যার মধ্যে মোক্ষ বিদ্যা । সংহারকের মধ্যে মৃত্যু। মাসের মধ্যে অগ্রহায়ণ। ঋতুর মধ্যে বসন্ত। যদুকুলে কৃষ্ণ, পাণ্ডবকুলে অর্জুন। মুনিদের মধ্যে ব্যাসদেব। বিজয়ীর সুনীতি। জ্ঞানীর জ্ঞান। তিনিই বীজ। তিনিই অঙ্কুর।
এই অনন্ত জগতে তিনিই পরম সত্য। তাঁর বিভূতির অন্ত নেই। নাম মাত্র কীর্তন করলেন অর্জুনের নিকট। জগতের সকল শুভ ও অশুভের অংশী উনি। তাঁর অপার মহিমা। কেবলমাত্র এক অংশ দিয়ে এই ব্রহ্মান্ড ধারণ করে আছেন।