T3 || ঈদ স্পেশালে || লিখেছেন খন্দকার মোত্তালেব

লাল মিয়ার এক রাত

১|
গ্রামের কোল ঘেঁষে তিরতির করে বয়ে যাওয়া সুখাই নদী। আর এই নদী যেখানটায় বিরাট বাঁক নিয়ে পূর্বমুখী থেকে গ্রামের পশ্চিম সীমানা ছেড়ে একেবারে সোজা উত্তরমুখী হয়ে বাজারের মধ্যিখান দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে, ঠিক সেখানটাই এই ভয়ংকর পারবাড়ির জঙ্গলের শুরু। আকাশ ছোঁয়া ঘন সবুজ পাতার বড় বড় আম আর শিমুলের গাছ, আর ঘন বাঁশ ঝাড়ের ছায়ায় দিনের বেলাতেই এই জঙ্গলের ভেতরটা অন্ধকার থাকে। এর মধ্যে আবার সারা জঙ্গলে জায়গায় জায়গায় বেড়ে ওঠা বেতের ঝাড় আর তার তীক্ষ্ণ কাঁটা এই জঙ্গলকে করেছে আরও দূর্ভ্যেদ্য। এই জঙ্গলে শুধু গ্রামের কিছু দস্যি ছেলেমেয়ে বাবা-মায়ের শত বারণ সত্বেও মৌসুমে মাঝে মাঝে শিমুল ফুল আর আম কুড়োতে যায়। আর পাতা ঝরা শীতকালে গ্রামের অতিদুখী ঘরের বৌ-ঝিরা পেটের আগুন নেভানোর জন্য চুলোর আগুন জ্বালাতে দল বেঁধে দিনের আলো থাকতে থাকতেই জঙ্গলের মুখের বাঁশ ঝাড় থেকে বস্তাভরে বাঁশের শুকনো পাতা নিয়ে আসে। এছাড়া এ জঙ্গলের ধারে কাছে ঘেঁষতেও গ্রামের মানুষ তেমনএকটা সাহস পায় না । এমনকি এই জঙ্গলের ভেতরে যে একটা ডোবা আছে সেই ডোবার মাছও কেউ খেতে সাহস পায় না। এই ডোবায় নাকি সারাক্ষণ দিনের বেলাতেই ভুর ভুর করে বুদবুদ ওঠে। ভাদ্রের তালপাকা গরমে পাড়ার কেউ কেউ গাঙের বাতাসে গা জুড়াতে রাতে সড়কে হাঁটাহাঁটি গেলে নাকি দুরের ওই পারবাড়ির জঙ্গলে কিসব আলো দেখতে পায়। জনশ্রুতি আছে এই ডোবার মাছ খেলে মুখে রক্ত ওঠে মরা একবারে নিশ্চিত। ওই যে গেল বছর মগর আলী দাদা মারা গেল, সেতো ওই ডোবার মাছ খেয়েই। আর বেচারারই বা কি দোষ। একবার নাকি ঘন বর্ষার রাতে সেই ডোবা থেকে বৃষ্টির ঢলে উজানে উঠে ছিল সারি সারি কই আর টাকি মাছ। পাড়ার মগর আলী দাদা না জেনে বিলের উজানো মাছ ভেবে সেই মাছ ধরে খেয়েছিল। তারপর থেকেই নাকি তার কাশির সাথে রক্ত উঠা শুরু হল । দশ গ্রামের সবচেয়ে নাম করা কবিরাজ দুষর আলী আকন্দের সাত ধাতুর তাবিজ আর কঠিন পানি পড়াও সেই পারবাড়ি জঙ্গলের ডোবার মাছের সাথে পেরে ওঠেনি। আর তাই দিনে দিনে অমন তাগড়া শরীরের মানুষটা কেমন কাঠের মত শুকিয়ে ধুঁকে ধুঁকে মারা গেল।
পারবাড়ির জঙ্গলের সেই ভয়ংকর ডোবার কাছে বিশাল এক আমের গাছের গোড়ায় বসে আয়েস করে বিড়ি টানছে লাল মিয়া। জীবনের শেষ বিড়ি, তাই খুবই আয়েস করে টেনে নিচ্ছে। এই বিড়িটাও তার কেনার সামর্থ্য নেই । চাচাত বোন জোস্না তার হাড়কিপ্টে বাবার পকেট থেকে চুরি করে এনে দিয়েছে। অন্য সময় হলে বিড়ি খাওয়ার কথা শুনলে বা বিড়ি চাইলে জোস্না খুব রাগ করত আর বকাবকি করত। আর আজ চাইতেই মুচকি হেসে এক দৌড়ে এনে দিল।
জিজ্ঞাসা করল “লালটু ভাই, আমার তো বিয়া ঠিক হইয়া গেচে। তা আজই কি গলায় ফাঁসি খাবেন? লাল মিয়াকে জোস্না ছোটবেলা থেকেই লালটু ভাই ডাকে।
হুম, লাল মিয়া উত্তর দেয়।
দড়ি লাগবে না? আপনার তো দড়ি কেনার টাকাও তো নাই।
দড়ি দিনের বেলাতেই পাকাইয়া নিচি। এক্কেবারে তিতা পাটের দড়ি। খুবই শক্ত। দেকপু?
বাহ্ আপনার জ্ঞানতো অনেক বাইড়া গ্যাচে। একবারে দড়ি পাকায়ে পকেটে লিয়্যা ঘুরিচ্চেন। কই দড়িটা দেকান দেকি?
লালটু পকেট থেকে দড়ি বের করে দেখায়। জোস্না এমনভাবে দড়ি নেড়েচেড়ে দেখে যেন এটা কোন দড়ি নয়, লাল মিয়া তার বিয়ের উপহার হিসেবে এইমাত্র কোন গয়নার দোকান থেকে সিতাহার এনে দেখাচ্ছে।
দড়িটা খুবি চমৎকার হচে, লালটু ভাই। জোস্নার কন্ঠে অকৃত্রিম প্রশংসা। ঝুইলা খুবি আরাম পাবেন মনে হচ্চে। তা কুনটে ঝুলবেন? জায়গা ঠিক করেচেন?
লালি মিয়া ঘাবড়ে যায়। ভেবেছিল কোথায় জোস্না তার গলায় দড়ি দেওয়ার কথা শুনে কান্নাকাটি করবে, উল্টো এখন যেন গলায় দড়ি দিতেই উৎসাহ যোগাচ্ছে। মেয়েটাকে সে কখনই ঠিকমত বুঝে উঠতে পারেনি।
বুকে ভরসা নিয়ে বলে, জোস্না তুই বলিচ্ছিলি না লালটু ভাই তোমার সাথে আমার বিয়া না হলি আমরা একসাথে গলায় ফাঁসি লিব। চল আমরা আজ একসাথে ফাঁসি লিই।
সন্ধার অন্ধকারে জোস্নার চোখ চক্ চক্ করে ওঠে। খুব কঠীন গলায় বলে যা বুলছিনু ভুল্যা যান লালটু ভাই। আপনার সাথে আমি মরতে যাব কোন দু:খে? আপনি জানেন যার সাতে আমার বিয়া লাগচে তার অনেক টাকা। আব্বাকে বাজারে একটা ঘর কইরা দিবে, আর আমাকে বিশ ভরি সোনার বালা, দুল আর মালা দিবে। আপনিতো খালি দেখতেই সোন্দর কিন্তু আপনার তো কিছু নাই। আমাকে বিয়া করলে খাওয়াবেন কি? বাতাস খাইয়া বাঁইচা থাকা যায় না লালটু ভাই। ঘর জামাই থাইকপেন? সে চিন্তাও মনে লিয়েন না। আব্বা তো আপনাকে কুত্তার মতন দ্যাকে। হি হি হি।
জোস্নার যার সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছে পাশের গ্রামের সেই ছেলেকে লাল মিয়া ভালই চিনে। এক সময় সেই ছেলেকে নিয়ে তার চাচাতো ভাবীর সাথে রসালো সম্পর্ক শুধু সেই ছেলের গ্রামেই নয় জোস্নাদের গ্রামেও আড়ালে আবডালে আলোচনা হত।জোস্নার শেষের কথাগুলি লাল মিয়ার বুকে শেলের মত বিঁধে। চোখ ফেটে পানি আসে। অন্ধকারে জোস্না দেখতে পায়না। মুখে কোন কথা না বলে না লাল মিয়া হন্ হন্ করে বাড়ির দিকে চলে যায়।
নিত্যদিনের মত মজিদ মাষ্টার টিমটিমে হারিকেন হাতে পাড়ার মেঠো পথ ভেঙ্গে মসজিদে আসে। মসজিদের কলের পানিতে অজু করে এশার আজান দিয়ে বসে থাকে। একা একাতো আর জামায়াত হয়না। আল্লাহর হুকুমে দুএকজন যদি আসে। আজান শুনে লাল মিয়া অন্ধ দাদিকে কবিরাজের দেওয়া জ্বরের দওয়াই খাওয়ায়। মেঝেতে দাদীর বিছানা ঠিক করে দাদীকে শুতে বলে বাইরে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। জোস্নাদের বাড়িতে তখনও কথাবার্তা হচ্ছে। তার অষ্পষ্ট শব্দ পূবালি বাতাসে লাল মিয়াদের বাড়িতে ভেসে আসে।
ও লাল মিয়া আবার কোনটে গেলু, শুয়ে পড়, রাত তো ভারী হল, বলে দাদী আন্দাজে ঠিকই হাত দিয়ে বাতির সলতে টিপে নিভিয়ে দিয়ে মাটিতে পাতা বিছানায় গা এলিয়ে দেয়।
আবার জোস্নার শেষের কথাগুলো কথা মনে হয়। এবার চিরদিনের ভীতু লাল মিয়া আজ হঠাৎ করে অতি সাহসী হয়ে উঠে। গাঢ় অন্ধকারে দড়ি হাতে গাঙের ধার দিয়ে হেঁটে পারবাড়ির জঙ্গলে ঢুকে পড়ে। জোস্নাহীন এ জীবন রাখার কোন মানে হয় না।
পাড়া থেকে পারবাড়ির জঙ্গলের অন্ধকার যতটা ঘন কালো দেখায় ভেতরে ঢুকার পর ঠিক ততটা কিন্তু নিকষ কালো লাগছে না। কেমন যেন একটু ফিকে ফিকে ভাব। ডোবার পানি থেকে বুদ বুদ ওঠার শব্দ কান ঝালা পালা করা ঝিঁঝিঁ ডাকার মাঝেও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। এমনকি একটু আগে যে শোলজাতীয় মাছ ঘাঁই মেরে কালো পানি খানিকটা সাদা করে অনেকখানি ওপরে লাফ মারল সেটাও লাল মিয়া স্পষ্ট দেখতে পেয়েছে। অনেক দুরে পাড়ার মসজিদে মজিদ মাস্টার একা একাই আকামত দিয়ে সুর করে নামাজের প্রথম রাকাতের সূরা তেলওয়াত করছেন, সে শব্দও এতদুর থেকে অস্পষ্টভাবে কানে আসে।
বিড়িতে শেষ সুখটান মেরে লাল মিয়া উঠে দাড়াল। জীবনে কখনও লাল মিয়া বুদ্ধিমান ছিল না। প্রথম শ্রেনী থেকে পঞ্চম শ্রেনী পর্যন্ত ক্লাশে দুজন ছাত্র আর একজন ছাত্রীর মধ্যে লাল মিয়ার রোল নং ছিল বরাবরই তিন। ষষ্ট শ্রেনীতে নদী পারের হাইস্কুলে লাল মিয়াকে ভর্তি করা হল। ভর্তি রোল নম্বর ছিল ৫৮। ৭০ জন ছাত্রের মধ্যে ষষ্ঠ থেকে সপ্তম শ্রেনীতে উঠার সময় তার রোল নম্বর হল ৬৮। এর মধ্যে হঠাৎ করেই সাপের কামড়ে মা-বাবা দুজনের একসাথে মৃত্যু হলে তার বড় চাচা তার অভিভাবক সেজে বাবার জায়গা-জমি দখল করে তাকে চাকরের মত খাটাতে লাগল। প্রায়ই চাচা তাকে বলত স্কুলে যেয়ে আর কি হবে, তার চেয়ে বাজারে চাচার দোকানে বসলে সে অনেক কিছু শিখতে পারবে। এর মধ্যে চাচা বিলে নতুন শ্যালো মেশিন পুঁতে পানি তুলে ধান চাষ শুরু করল । আর সেই মেশিন ঘরে রাতে থেকে পাহারা আর পানির নালা কেটে কেটে খামারের অন্য কৃষকদের জমিতে পানি দেওয়ার সমস্ত দায়িত্ব পড়ল লালমিয়ার ওপর। সারারাত মেশিন চালিয়ে সকালে স্কুলে গেলে ইংরেজি সারের হাতের কঠীন বেতের বাড়ি ছিল উপরি পাওনা। পড়াশোনা ওখানেই শেষ হল। লাল মিয়া হয়ে গেল আপন চাচার বাড়ির বিনা বেতনে কাজের লোক। চাচার ধান কাটতে পাঁচজন মানুষের দরকার হলে চাচা নিত চারজন, আর একজনের কাজ হয়ে যেত লাল মিয়া কে দিয়ে। বিড়ি টানাটা সেখান থেকেই শেখা। লাল মিয়া বিড়ি খেত না বলে যখন বিড়ি খাওয়ার জন্য দিনমজুররা কাজের মাঝখানে বিরতি নিত, তখন লালমিয়াকে সেই সময়টুকুও একা একা কাজ করতে হত। সে বুঝল বিড়ি টানা ধরলে সে আর সব শ্রমিকদের মতই কাজের মধ্যে বিড়ি টানার বিরতি পাবে, তখন সে বুদ্ধি করে বিড়ি টানা ধরল। সেটা সেই অষ্টম শ্রেনীতে পড়ার সময়ের কথা। জীবনে এই একটা কাজই সে মনে হয় বুদ্ধিমানের মত করেছিল। এরই মধ্যে জঙ্গলের মশা তাকে ছেঁকে ধরেছে। মশাগুলো তার চাচার মতই । সুযোগ পেলেই রক্ত চুষে। সে এবার উঠে দাড়িয়ে বিড়িতে শেষ টান দিয়ে ফেলে দিল।এবার দড়িটা হাতে নিয়ে সে গাছে উঠবে।
গাছে চড়তে গিয়ে দেখল, গাছের যে বেড়, তাতে মই ছাড়া তার পক্ষে গাছে কোনভাবেই ওঠা সম্ভব না। মনে হল সত্যিই তার বুদ্ধি কম। কথাটা আগেই ভাবার দরকার ছিল। এখন চাচার বাড়িতে ফিরে গিয়ে মই চাইলে নিশ্চয়ই জোস্না বেরিয়ে এসে তাকে বোকা বলে আবারও হাঁসাহাঁসি করে কিছু খারাপ কথা শুনিয়ে দিবে। তার চেয়ে চড়া যেতে পারে এমন একটা গাছ খুজে তাতে ঝুলে পড়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে হল। সে রকম গাছের খোঁজে লাল মিয়া এবার পারবাড়ির ভয়ংকর জঙ্গলের আরও ভেতরে ঢুকতে শুরু করল।
কতক্ষণ জঙ্গলে আছে আর রাত কত হবে? আন্দাজ নেই। লাল মিয়া ঘন জঙ্গলে উদভ্রান্তের মত হাঁটছে। একটা চড়ার মত গাছ তাকে খুঁজে বের করতেই হবে। দুই পায়ের তলা স্পন্জের সেন্ডেল ফুঁড়ে বেতের কাঁটার আঘাতে রক্তারক্তি হয়ে গেছে। কিন্তু লাল মিয়ার কোন হুঁশ নেই সে ঘন অন্ধকার পার বাড়ির জঙ্গলে একটা গাছ খুঁজছে যাতে সে চড়ে গলায় ফাঁস দিয়ে মরতে পারে। ইতোমধ্যেই লাল মিয়া ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছে। দরদর করে গা ঘামছে। ক্ষুধা তার কিছুতেই সহ্য হয় না। এখন মনে হচ্ছে আর কিছুক্ষন হাঁটলে সে ক্ষুধা আর তৃষ্ণায় এমনিতেই মারা যাবে। বড় বড় শ্বাস নিতে নিতে সে বড় এক গাছের গোড়ায় একটু জিরোনোর জন্য যেই বসতে যাবে, এমন সময় কান মাথা ধরে যাওয়া অতি সুক্ষ্ম এক শব্দে লাল মিয়ার জ্ঞান হারানোর উপক্রম হল। আর ঠিক জ্ঞান হারানোর আগ-মুহূর্তে সে দেখতে পেল ঠিক মাথার উপরে গাছের পাতা ভেদ করে এক আগুনের চাকতি নেমে আসছে সেই বুদবুদ ওঠা ডোবার ওপরে। এরপর আর কিছু মনে নেই। লাল মিয়া কাটা কলা গাছের মত পারবাড়ির জঙ্গলের জ্ঞান হারিয়ে দড়ি হাতে নি:সাড় পড়ে থাকে।
ক্যাপ্টেন তানে নুট আর আর তার গবেষণা সহকারী আলাফি টায়েথি তাদের স্কাউপ শিপ পারবাড়ির জঙ্গলের ডোবার একটু উপরে নামিয়ে নিয়ে আসে। ক্যাপ্টেন তানে নুট টায়েথি কে একটু ধমকের সুরে বলে “তুমি তো আর একটু হলেই বিপদ ডেকে এনেছিলে, যেখানে আমাদের স্ক্যানার বার বার সাবধান করছে যে এই ডোবার আশে পাশে একজন মানুষ আছে, তারপরও স্কাউট শিপের আল্ট্রা সাউন্ড সিস্টেম অন করে রেখেছিলে কেন? তোমার তো ভূলে যাবার কথা না যে আমাদের অভিযানের কারনে এই পৃথিবীর একজন মানুষ মারা গেলে তোমার সাথে আমারও গবেষণা লাইসেন্স বাতিল হয়ে যেতে পারে?
ক্যাপ্টেন তানে নুটের ধমকে আলাফি টায়েথির চোখে পানি চলে আসে। সে যে তার গবেষণা সুপারভাইজার ক্যাপ্টেন তানে নুটকে অনেক ভালবাসে ইদানিং এটা মনে হয় ক্যাপ্টেন তানে নুট বুঝতে পেরেছে আর তাই আজকাল সামান্য ভূলেও তাকে অনেক কটু কথা শোনায়।
স্কাউট শিপ ডোবার পানির ঠিক এক ফুট উপরে স্থির রেখে ক্যাপ্টেন তানে নুট আর আলাফি টায়েথি অদৃশ্য মই বেয়ে জঙ্গলের মাটিতে নেমে আসে। ক্যাপ্টেন তানে নুটের হাতে ধরা পোর্টেবল ইউনিভার্সাল মাল্টিপারপাস স্ক্যানার এই মুহূর্তে মানুষের উপস্থিতি ধরার জন্য সেট করা। এই স্ক্যানার দিয়ে এই বিশ্ব জগতের যে কোন প্রানী আলাদা করে অথবা এক বিশেষ গ্রুপের প্রানীকে সনাক্ত করা সম্ভব। যেমন এই মুহূর্তে ডোবার ৫০ হাজার বর্গ কিলোমিটারের মধ্যে যত মানুষ আছে তাদের উপস্থিতি নড়া-চড়া, শ্বাস প্রশ্বাস এবং নাড়ির গতি ও রক্তের চাপ এই ছোট স্ক্যানারে ধরা পড়ছে। স্ক্যনার এখন শুধু লাল মিয়ার অবস্থান এবং তার গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক পরিসংখ্যান নির্দেশ করছে। যেমন অনেক ভয়ে লাল মিয়ার রক্তচাপ বেড়ে গিয়েছে এবং এতে করে হৃৎপিন্ড ও নাড়ির গতি স্বাভাবিক একজন মানুষের চেয়ে প্রায় দশগুন বেড়ে গেছে। লাল মিয়ার ব্রেইন তাকে বাাঁচানোর জন্য অটো পাইলটের মত সংয়ক্রিয়ভাবে তাকে অচেতন করে ফেলেছে।
ক্যাপ্টেন তানে নুট আর আলাফি টায়েথি লাল মিয়াকে রোবটিক হাতের সাহায্যে টেনে তুলে।রোবট হাত অর্ধচেতন লাল মিয়ার ঠোঁটে প্রক্সিমা-বি গ্রহের সবচেয়ে উপাদেয় শক্তিবর্ধক পানীয় তুলে ধরে। অর্ধচেতন অবস্থাতেই লাল মিয়া এক চুমুকেই সেই পানীয়ের বোতল খালি করে ফেলে। এবার চোখ মেলে লাল মিয়া নায়ক রাজ রাজ্জাক আর নায়িকা শাবানার মত দুজন অপূর্ব সুন্দর মানব মানবী তার সামনে দেখতে পায়। পেছনে ডোবার ওপরে সেই চাকতির উজ্জল আলো সারা জঙ্গল কে হ্যাজাক লাইটের আলোর মত আলোকিত করে রেখেছে। তার মনে কেন যেন কোন ভয় বা বিস্ময় নেই। কিন্তু তার অবচেতন মন থেকেই কেন যেন ছালাম চলে আসে। মুখে বলে ”স্যার আস সালামু আলাইকুম। আপনাদের কাছে কি একটা মই হবে?”

২|
মহামান্য ক্যাপ্টেন তানে নুট প্রক্সিমা-বি গ্রহের বিজ্ঞান আকাদেমির চার গ্যালাকিটিক বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়স্ক এবং দারুন প্রতিভাবান একজন সদস্য । তিনিই গ্যালাক্সির আলোড়ন সৃষ্টিকারী ইউনিভার্সাল ল্যাঙ্গুয়েজ ট্রান্সলেটর এবং পোর্টেবল ইউনিভার্সাল মাল্টিপারপাস স্ক্যানারের উদ্ভাবক। এই উদ্ভাবনের স্বীকৃতি হিসাবে তিনি এরই মধ্যে দুবার ইন্টার গ্যালাকটিক কম্পিটিশনে সায়েন্টিস্ট অব দ্য গ্যালাক্সি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন । তাঁর উদ্ভাবিত ইউনিভার্সাল ল্যাঙ্গুয়েজ ট্রান্সলেটর এই মহাবিশ্বের যে কোন প্রাণীর ভাষা অন্য ভাষায় রাপান্তর করতে পারে। এই প্রোগ্রাম উন্নয়নের জন্য তিনি সুপার কম্পিউটারের এ্যালগোরিদমে অকল্পনীয় উন্নতিসাধন করেছেন। সুপার কম্পিউটার লার্নিং ল্যাঙ্গুয়েজ কে তিনি এত সহজবোধ্য করেছেন যে, প্রক্সিমা-বি গ্রহের ১০০ বছরের নিচের ছোট ছোট শিশুরাও এখন মেশিন লার্নিং এবং সুপার কম্পিউটার লার্নিং বিষয় নিয়ে তাদের খেলাধুলার জন্য প্রয়োজনীয় প্রজেক্ট তৈরী করতে পারে।

কেন্দ্রীয় তথ্য ভান্ডারের সাথে যুক্ত সুপার কম্পিউটার ক্যাপ্টেন তানে নুটের মাথায় লাগানো হেলমেটের অদৃশ্য পর্দায় পরিস্কার দেখাচ্ছে যে প্রায় ২৩ বছর বয়সের এই অসাধারণ সুন্দর যুবকটি কোন বিশেষ কারনে খুবই মনমরা। এই সুন্দর মানুষটি কেন মনমরা তা ক্যাপ্টেন তানে নুটের মনে আসতেই তার হেলমেট সয়ংক্রিয়ভাবে প্রক্সিমা-বি গ্রহের কেন্দ্রীয় তথ্য ভান্ডরের সাথে যুক্ত হয়ে গেল। এই কেন্দ্রীয় তথ্য ভান্ডারে আমাদের মিল্কিওয়ের প্রায় ৫০০০ গ্রহের যেখানে যেখানে সাধারণ এককোষী প্রানী থেকে পৃথিবীর মানুষের মত জটিল জীবনের উদ্ভব হয়েছে, সেই প্রতিটি প্রানীর উদ্ভব থেকে ধ্বংস পর্যন্ত প্রতিটি মিলি সেকেন্ডের তথ্য আছে। অনেকটা যেমন আমাদের মহাকাশে ঘুর্ণনরত ইউএসএ এবং রাশিয়ার স্পাই স্যাটেলাইটগুলো যেমন প্রতিনিয়ত ভূপৃষ্ঠের প্রতি বর্গ ইঞ্চির প্রতি সেকেন্ডের তথ্য সংগ্রহ করে ব্যপারটা অনেকটাই সেরকম।
প্রক্সিমা-বি গ্রহের এই বিশাল তথ্য ভান্ডারে ঢুকতে মহান বিজ্ঞানী ক্যাপ্টেন তানে নুটের কোন পাসওয়ার্ডের প্রয়োজন হয় না, শুধু তাঁর হেলমেটের স্বয়ংক্রিয় অপশন চালু করলেই তাঁর মনে যে কোনভাবের উদয় হলেই কেন্দ্রীয় তথ্য ভান্ডার স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাঁকে সে বিষয়ে সর্বাত্নক তথ্য যোগান দেয়। এবং চাইলে রেগ্রেসিভ অপশান ব্যবহার করে কোন বিষয়ের অতীত এবং সুপার কম্পিউটার লার্নিং মডেল ব্যবহার করে ভবিষ্যৎ ও বলে দিতে পারে। কেন্দ্রীয় তথ্য ভান্ডারে বিনা পাসওয়ার্ডে প্রবেশাধিকার আছে শুধু আরেকজনের, তিনি হলেন মহা মহান বিজ্ঞানী প্রফেসর তানেহাম গামেও, যিনি প্রক্সিমা-বি গ্রহের সার্বজনীন নেতা ।
কেন্দ্রীয় তথ্য ভান্ডার মহান বিজ্ঞানী ক্যাপ্টেন তানে নুটকে জানাচ্ছে যে সেই যুবকের মনমরা ভাবটি এতই প্রবল যে সে এখন নিজেকে ধ্বংস করতে এই্ জঙ্গলে এসেছে। সেই ধ্বংসের ধরণটাও হবে খুব অদ্ভত। সেন্ট্রাল ডাটা সিস্টেমের সুপার কম্পিউটার লার্নিং পুর্বানুমান করে বলছে যে, এই যুবক ক্যাপ্টেন তানে নুটের নিকট থেকে একটা মই চেয়ে নিয়ে তা দিয়ে গাছে উঠবে, এবং হাতে ধরে থাকা দড়ি গলায় পেঁচিয়ে গাছের একটা ডালে থেকে ঝুলে পড়বে। মানুষের মস্তিষ্ক খুবই জটিল এবং উন্নত, কিন্তু অবাক করার মত নাজুক। গড়ে মাত্র ৪৫ -৬০ সেকেন্ড মানুষের মস্তিষ্ক অক্সিজেন না পেলে মস্তিষ্ক ধ্বংস হতে শুরু করে। আর মানবকুল মস্তিষ্কে অক্সিজেনের যোগান দিতে পারে শুধু মুখ আর নাক দিয়ে বাতাস ফুসফুসে টেনে নিয়ে। যুবকের গলার দড়ি ফুসফুসে বাতাস নেওয়ার একটামাত্র নালীকেই শরীরে সমস্ত ভারের সমপরিমান ওজন দিয়ে চেপে ধরে বাতাস ঢোকার পথ রুদ্ধ করে যুবকের ধ্বংসের পথ ত্বরান্বিত করবে।
ক্যাপ্টেন তানে নুট সেন্ট্রাল ডাটা সিস্টেমের সুপার কম্পিউটার লার্নিং এর পুর্বানুমান করে যুবকের ধ্বংসের ছবিটির অংশবিশেষ আলাফি টায়েথিকে দেখতে দিলেন না। হাজার হোক মেয়ে মানুষ, খুবই আবেগী। মানুষের উপস্থিতি জানা স্বত্বেও আল্ট্রা সাউন্ড সিস্টেম বন্ধ না করে ডোবার ওপর নামার জন্য একটু কড়া করে সতর্ক করাতেই মেয়েটি তিন চোখেই কেঁদে ফেলেছে। এখন এই অসাধারণ সুন্দর যুবকের নিজেকে ধ্বংসের ধরণের পূর্বাভাস দেখলে হয়ত আলাফি টায়েথি কেঁদেকেটে একসারা হয়ে তাদের এই পুরো অভিযানটাকেই হয়ত পন্ড করে দিবে।
সুপার কম্পিউটারের এই অসাধারণ সুন্দর যুবকের নিজেকে ধ্বংসের ধরণের পূর্বাভাস হঠাৎ আলাফি টায়েথির অদৃশ্য স্ক্রিন থেকে চলে যেতেই সে বুঝল মহান প্রফেসর তানে নুট কোন জ্ঞাত কারণেই তাকে এই যুবকের ধ্বংসের ধরনের পূর্বাভাস দেখতে দিতে চান না।
চোখ তুলে হেলমেটের ভেতর দিয়ে মহান প্রফেসর ক্যাপ্টেন তানে নুটের মুখের অভিব্যক্তি দেখার চেষ্টা করতে করতে আলাফি টায়েথি জিজ্ঞাসা করল, ক্যাপ্টেন, আমরা কি এই সুন্দর মানুষটিকে এখন কি করব?
ক্যাপ্টেন তানে নুট নির্বিকার গলায় উত্তর দিলেন, অবশ্যই, আমরা এর জন্য একটি মইয়ের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি, যাতে সে গাছে উঠে সহজে গলায় দড়ি দিয়ে নিজেকে ধ্বংস করতে পারে। এরপর যুবকের গলার দড়ি ফুসফুসে বাতাস নেওয়ার একটামাত্র নালীকেই শরীরে সমস্ত ভারের সমপরিমান ওজন দিয়ে চেপে ধরে বাতাস ঢোকার পথ রুদ্ধ করে কিভাবে যুবকের ধ্বংসের পথ ত্বরান্বিত করবে, তা খুব স্বাভাবিকভাবে তাঁর প্রিয় ছাত্রী এবং গবেষণা সহকারী কে ব্যখ্যা করলেন।
ক্যাপ্টেনের উত্তর ও ব্যাখ্যা শুনে আলাফি টায়েথি নি:শব্দে তিন চোখেই আবার কাঁদা শুরু করল। এমনিতেই তার ভূলেই স্কাউট শিপের আল্ট্রা সাউন্ড এর কারনে এই যুবক একবার জ্ঞান হারিয়েছে, এখন ক্যাপ্টেন তানে নুট চাহিদা অনুযায়ী যুবককে গাছে ওঠার একটা মই দিলেই সর্বনাশের একেবারে ষোলকলাই পূর্ণ হবে।
আলাফি টায়েথি মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। কিন্তু কিছু বলার আগেই মহান তানে নুট আবার সেন্ট্রাল ডাটা সিস্টেমের সুপার কম্পিউটার এর রেগ্রেসিভ অপশান চালু করতে নির্দেশ দিলেন এবং এই সুন্দর পৃথিবীর অসাধারন সুন্দর যুবকের জন্ম থেকে আজ পর্যন্ত জীবনের সমস্ত ঘটনার উল্লেখযোগ্য অংশ কয়েক মিলি সেকেন্ডের মধ্যেই জেনে নিলেন এবং এবার আলাফি টায়েথিকেও তা দেখার এবং জানার সুযোগ দিলেন।
যখন দেখল কাল গোখরার কামড়ে মা-মাবার মৃত্যুর পর দাদীর ভালবাসা এই যুবককে শিশু বয়সে বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করেছে, আর আর চাচা-চাচীর অমানবিক ব্যবহার এবং অত্যাচার এই যুবকের ছোটবেলায় মস্তিষ্কের উন্নয়ন ব্যহত হয়েছে, আর কিশোর বয়সে গণিত আর ইংরেজি শিক্ষকের অমানুষিক শাস্তির ভয়েই এই সুন্দর যুবক লেখাপড়া থেকে বঞ্চিত হয়েছে তখন আলাফি টায়েথির তিন চোখের গাঢ় নীল পানি প্রটেকটিভ স্পেসস্যুটের ভেতরে ভিজিয়ে দিল। আবার যখন দেখল জোস্না নামের এই গ্রহের সবচেয়ে নিঁখুত মানবী, এই অসাধারণ সুন্দর কিন্তু দু:খি যুবককে হৃদয় দিয়ে ভালবাসে তখনও সে কেঁদে গাঢ় নীল পানিতে বুক ভিজালো।
হেলমেটের অদৃশ্য স্ক্রিনে লাল মিয়ার জীবন প্রবাহ বন্ধ হলে আলাফি টায়েথি একটু কেশে গলা পরিস্কার করে মহান তানে নুটকে জিজ্ঞাসা করল আপনি কি এখনও এই সুন্দর মানবের জন্যে একখানা মইয়ের ব্যবস্থা করবেন?
লাল মিয়াকে ইচ্ছে করেই কিছু কটু কথা শুনিয়ে এই মুহূর্তে জোস্না নামের এই পৃথিবী নামক গ্রহের সবচেয়ে নিখুঁত মানবী এখন নিজের ঘরের বিছানায় শুয়ে শুয়ে কাঁদছে। তারই বা কত বয়স। তারপরও সে কত চেষ্টা করেছে তার প্রিয় লালটু ভাইকে একটু সাহসী করে তুলতে, একটু নিরাপত্তা দিতে আর একজন সত্যিকারের মানুষ করে তুলতে। কিন্তু কেমন যেন এই সুন্দর মানুষটির সাহসের বেলুনটির কোথাও ফুটো আছে। কিছুতেই কিছু হয়না। অথচ আজ কি যে হয়ে গেল! যে ভীতু মানুষ এমনকি রাতে তার অন্ধ দাদীকে ডেকে না তুলে টয়লেটে যাওয়ারও সাহস রাখে না আজ সে মানুষই সন্ধার সামান্য কিছু কথাতেই নিজ হাতে পাকানো দড়ি নিয়ে এই অন্ধকারে পারবাড়ির ভয়ংকর জঙ্গলে ঢুকে পড়েছে।
রাত প্রায় ১০ টার মত। মা টানা বারান্দায় শতরন্জি বিছিয়ে দিয়ে সেখানে বাবাকে ভাত দিয়েছে। এখন বাবা ভাতের থালা সামনে নিয়ে বসে আছে। প্রতিদিনের মত আদরের জোস্নাকে সাথে নিয়েই বাবা ভাত খাবে। মা ক্রমাগত ঘরের খিল আঁটা দরজায় ধাক্কা দিয়ে ডেকে চলেছে । জোস্নার কোন উত্তর নেই । এতক্ষণ শুধু গুমরে গুমরে কাঁদছিল আর এখন মায়ের ডাক আবার বাবার উপস্থিতি টের পেয়ে জোরে জোরে কাঁদছে। এবার সে কান্নার শব্দ বাবাও শুনতে পেলেন।
মহান বিজ্ঞানী ক্যাপ্টেন তানে নুট, একটু হেসে আলাফি টায়েথির দিকে তাকিয়ে বললেন আমি বুঝতে পারছি তুমি আল্ট্রা সাউন্ড দিয়ে এই যুবকবে একটু আহত করার পর থেকেই কিছুটা অপরাধবোধে ভুগছ। তা এবার তুমি বল, এই চরম ভীতু যুবককে নিয়ে তুমি কি করতে বল? কিন্তু খবরদার কখনই প্রক্সিমা-বি গ্রহে নেওয়ার কথা মুখেও আনবে না। তোমাকে নিশ্চয়ই সেই ঘটনাটা বর্ননা করা হয়েছে সেই যে Sirius স্টিার সিস্টেম থেকে একবার একটা উড়ুক্ক বাঁদর নিয়ে আসার পর কি হয়েছিল।
আলাফি টায়েথির নৈতিকতা বিষয়ক রোবট শিক্ষক এই গল্প তাদের প্রথম ক্লাশেই বর্ননা করেছিল, সেই বাঁদর থেকে ছড়িয়ে পড়া ঘাতক ভাইরাস কিভাবে প্রক্সিমা-বি গ্রহের গাছপালা শেষ করার উপক্রম করেছিল। এরপর হুঁশিয়ার করে দিয়েছিল এই বলে যে, কোন অবস্থাতেই সুপ্রিম কমান্ডের বিশষ অনুমতি ছাড়া কোন বুদ্ধিমান প্রানী গবেষণার প্রয়োজনেও নিদর্শন হিসেবে প্রক্সিমা-বি গ্রহে আনা যাবে না।
আলাফি টায়েথি মাথা নেড়ে জানাল তার মনে আছে। মহান বিজ্ঞানী ক্যাপ্টেন তানে নুট এবার একটু চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল আমরা যদি কোন সমস্যা বা ঘটনার কার্যকারণ সম্পর্কটা সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারি এবং কারণগুলোকে আলাদা করে ফেলতে পারি তাহলে কিন্তু সেই সমস্যার সমাধানটা সহজেই কিন্তু আমাদের হাতের মুঠোয় ধরা দেয়। এবার আলাফি টায়েথির দিকে তাকিয়ে বলল তুমি বল দেখি আমরা যদি এই যুবক কে সাহায্য করতে চাই, তাহলে কোথায় শুরু করা উচিত?
আলাফি টায়েথি বলল আমরা এই যুবকের কিছু জেনেটিক উন্নয়ন ঘটিয়ে তাকে আবার আমরা তার মার্তৃগর্ভে ফেরত পাঠাতে পারি। মহান তানে নুট বললেন তা পারি কিন্তু চিন্তা করে দেখ, তাতে রিয়াল টাইম এবং স্পেস এর কত ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে। সারা পৃথিবীর ৭.৫৬ বিলিয়িন মানুষের ২৩ বছরের সমস্ত ঘটনা পরিবর্তন করে ফেলতে হবে। সবাইকে ফিরে নিয়ে যেতে ২৪ বছর আগের সেদিনটিতে যেদিন এই যুবক তার মায়ের জঠরে আসে। সেটা যদিও আমাদের পক্ষে খুব কঠীন বিষয় নয়, কিন্তু একটু খরচ এবং পরিশ্রম সাধ্য হয়ে যায়। যদিও আমরা অমরত্ব লাভ করেছি তাই সময় আমাদের কাছে কোন বিষয় নয়, তারপরও আমাদের খরচ এবং সময় effective কাজ করা উচিত। তার চেয়ে, যেদিন সাপের কামড়ে এই সুন্দর যুবকের মা-বাবা দুজনেই ধ্বংস হয়ে যায়, আমরা ঠিক সেই সময় এবং স্থান থেকেও শুরু করতে পারি, তাই না? আচ্ছা তুমিতো সম্পদ বিষয়ক optimization কোর্সটা নিয়েছিলে তাই না?
এবার কিছুক্ষন চিন্তুা মহান তানে নুট যেন নিজে নিজেই বললেন, তার চেয়ে এই কাজটা করলে কেমন হয়? চল আমরা এই যুবকের ভাললাগার মানবীকে দিয়েই কিছু কাজ করে দিয়ে যাই।
এবার মহান তানে নুট এই পৃথিবীর সবচেয়ে নিখুঁত মানবী জোস্নার বর্তমান জীবন প্রবাহকে তাঁর হেলমেটের অদৃশ্য স্ক্রীনে আনলেন।
মা দরজা খোল। কি হয়েছে আমার জোস্না মায়ের? আমাকে খুলে বল মা? অনেক পীড়াপীড়ির পর জোস্না যখন দরজা খুলে দিল তখন রাত বারটার মত।
মা তুমি কি ওই সুন্দর গাধা চাকরটাকে ভালবাস?
জোস্না নিরুত্তর কিন্তু কঠীন চোখে বাবার চোখের দিকে তাকায়।
তারপর বাবার হঠাৎ জানি কি হয়ে যায়। এই মেয়ে যাতে সুখী হয় তাতেই তো তার সুখী হওয়া উচিত। আর মেয়ে যাকে ভালবাসে সে তো তার ভায়েরই ছেলে। ভাবতে ভাবতেই চোখের সামনে ভেসে উঠে তার অসাধারণ চেহারার বড়ভাই আর ভাবীর কথা, তাদের ভালবাসার কথা। আর নিজের সমস্ত অপরাধ এ্ক এক করে চোখের সামনে ভেসে উঠে। হঠাৎ মৃত ভাই-ভাবীর এই একমাত্র উত্তরাধিকারীর জন্য হৃদয়ের সমস্ত তন্ত্রীতে মমতা উথলে উঠে। সেই রাতেই গ্রামের জোয়ান জোয়ান দশ বারোজন ছেলে আর সবার হাতে মশাল আর বল্লম নিয়ে বাবা নিজেপারবাড়ির ভয়াল জঙ্গলে লাল মিয়াকে উদ্ধারে রওয়ানা হয়।
আলাফি টায়েথি যখন পুরো ঘটনাটা তার হেলেমেটের অদৃশ্য স্ক্রিনে দেখল সে আবারও খুশীতে নি:শব্দে কাঁদা শুরু করল। এবার মুখে বলল মহান তানে নুট, আমরা কি এই যুবকের কিছু মানসিক উন্নয়ন ঘটাতে পারি?
তানে নুট ভাবল এই অসাধারণ সুন্দরী মেয়েটা এত দয়ালু কেন? মুখে বলল, মনে রাখবে তুমি যদি কোনভাবে এই যুবককে পরিবর্তন করে আমাদের গ্রহের মহান শিনির মত গনিতজ্ঞ বানিয়ে ফেল, সে কিন্তু এই গ্রাম বা এই গ্রহেই আর বসবাসই করতে পারবে না। এই গ্রামের মানবকুল এখনও মনে করে এই ডোবার মাছ খেলে গলা দিয়ে রক্ত বের হয়। যক্ষা রোগের নামটাও এরা এখনও জানে না। কাজেই এই সুন্দর মানবের পরিবর্তন যেন এই গ্রাম, এই দেশ এবং এই পৃথিবীর সীমা যেন লংঘন না করে । আর হ্যাঁ, জোস্নার বাবা ইতোমধ্যেই অনেক মানব আর মশাল নিয়ে এই যুবককে উদ্ধার করার জন্য এদিকেই আসছে। তাই যা করতে চাও তা তাড়াতাড়ি কর।
আলাফি টায়েথি মহান তানে নুটের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডারের সাথে সংযুক্ত সুপার কম্পিউটারের সাথে যোগাযোগ করল । সুপার কম্পিউটার জানাল যে মানব মস্তিষ্কে amygdala নামক যে গ্রন্থি আছে তা মানব মানবীর সাহস এবং ভয় নিয়ন্ত্রন করে। এই গ্রন্থির হেরফেরেই অনেক সময় দেখা যায় অধিক বুদ্ধিমান মানবও অনেক ভীতু হয়ে থাকে আবার অনেক বোকাও যথেষ্ট সাহসী হয়ে থাকে। আমি আপনাকে কি এখন কয়েকটি উদাহরণ দেখাব যেমন হিটলার আসলে কতটা সাহসী ছিলেন? কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডারের সাথে সংযুক্ত সুপার কম্পিউটার অনেক কথা বলে। আলাফি টায়েথি ধন্যবাদ জানিয়ে বলল তারচেয়ে যদি মহান সুপার কম্পিউটার যদি বলে দিতেন যে কিভাবে এই মাটিতে বসে থাকা যুবকের amygdala নামক গ্রন্থি পরিবর্তন করে তাকে কিছুটা সাহসী ও বুদ্ধিমান করা যায় আর গণিতে একটু উন্নত করা যায় তাহলে অনেক উপকার হয়। সুপার কম্পিউটার তার কাজ শুরু করল।
লাল মিয়া আবারও জ্ঞান হারাল । সমস্ত ঘটনা মুছে গেল তার চেতনা থেকে। শুধু তার মনে হলো তিন চোখের এক অসাধারণ সুন্দরী তাকে কানে কানে বলছে হে পৃথিবীর সুন্দর যুবক, আপনার সাথে জোস্নার বিয়ে হবে, এবং আপনার বংশধররাই একদিন ৪.২ আলোকবর্ষ দুরের প্রক্সিমা-বি গ্রহে অভিযান পরিচালনা করবে। আমি ততদিনে ধ্বংস না হয়ে গেলে আমি নিজে আপনার সেই বংশধরকে প্রক্সিমা-বি গ্রহে স্বাগত জানাব। ভাল থাকুন মর্তের মানুষ। বিদায়!
মাদার শিপের কন্ট্রোল প্যানেলের সারি সারি বোতাম টিপতে টিপতে মহান তানে নুট আলাফি টায়েথিকে জিজ্ঞাসা করল আজকের অভিযান কেমন লাগল আর কি কি শিখলে তার একটা ট্যুর রিপোর্ট তৈরী করে কালকেই বিজ্ঞান আকাদেমিতে পাঠিয়ে দিবে। আচ্ছা তুমি কি ভুতরাজের পাতার স্যাম্পল নিয়েছিলে তো?
আলাফি টায়েথি মুখে উত্তর না দিয়ে একটা বোতাম টিপে স্পেস শিপের কার্গো বেকে মুল পর্দায় প্রতিফলিত করল। সেখানে সারা পৃথিবীর যাবতীয় গাছের স্যাম্পলের সাথে রাজশাহী বাগমারার ভুতরাজের গাছও আছে। এই ভূতরাজের পাতা শুধু নদীতে ষড়গা পেতে মাছ ধরতেই কাজে লাগে না। এটা এখানকার মানবেরা হাত পা কেটে গেলে এর পাতা ডলে কাটা জায়গায় এর রস লাগিয়ে দেয়। এতে করে কাটা চামড়া সহজেই জোড়া লাগে আর সেখানে ব্যাকটেরিয়া আক্রমন করতে পারে না। মহান বিজ্ঞানী তানে নুট সিদ্ধান্ত নিয়েছেনে এই বিশেষ গাছ নিয়ে তিনি পরবর্তি ৫০,০০০ হাজার বছর বিশদ গবেষণা করবেন।
মাদার শিপের ত্বরণ এখন ভীষণভাবে বাড়ছে । আলোর গতিবেগ অর্জন করতে আর মাত্র কয়েক ৫৫ সেকেন্ড বাকি। কাউন্ট ডাউন শুরু হয়ে গেছে। মহান তানে নুট এবার কো-পাইলটের সিটে বসা সুন্দরী আলাফি টায়েথির কানের কাছে মুখ নিয়ে বললেন, তোমার থিসিস তো এই গ্যালাকটিক বর্ষে স্যাটার্নের চাঁদ Enceladus তে অভিযানের আগেই শেষ হবে তাই না? শেষবারের মত সব দেখে নিয়ে অটো পাইলটের হাতে শিপ তুলে দেবার আগে মহান তানে নুট আলাফি টায়েথিকে জিজ্ঞাসা করল ”তুমি কি থিসিসি শেষে আমাকে বিয়ে করবে? ”
আলাফি টায়েথির আর উত্তর দেবার সুযোগ হল না। কারণ আগেই তার তিন চোখই পানিতে ভরে গেছে আর আবেশে গলা বন্ধ হয়ে গেছে, আর এর মধ্যেই মাদার শিপ আলোর গতি অর্জন করে ফেলেছে। এখন মাত্র ২.৫ ঘন্টায় সৌরজগত পেরিয়ে ঠিক ৪.৩ ঘন্টায় হ্যাঙ্গারে প্রবশ করবে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির সর্বাধুনিক স্পেস শিপটি।
কঠীন হৃদয়ের মানুষ জোস্নার বাবা আজ হঠাৎ করেই অনেক আবেগ প্রবণ হয়ে পড়েছেন। লাল মিয়াও কিছুটা নিষেধ করার চেষ্টা করেছিল যে কাল সকালে আয়োজন করলেই তো চলতো। বাবা কিছুই শুনলেন না। আজ রাতেই লাল মিয়ার সাথে জোস্নার বিয়ের আয়োজন চলছে।
ঘর আলো করে বাসর ঘরে বসে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে নিঁখুত মানবী জোস্না। বাইরে পাড়ার মেয়েরা নাচ গান করছে। লাল মিয়া ঘরে ঢুকতেই জোস্না বলল, শোনেন আপনার আমার বংশধরেরা নাকি কোন এক সময় প্রক্সিমা-বি নামক এক গ্রহে পৃথিবীর সকল মানুষের প্রতিনিধি হয়ে যাবে। কিন্তু সেই গ্রহটা কি অনেকদুরে?
সমাপ্ত
পাদটিকা
ক্যাপ্টেন নুটের মা-বাবা দুজনেই নভোচারী ছিলেন এবং অনেকবার এই পৃথিবীতে দুজনে একসাথে অভিযানে এসেছেন। দীর্ঘ সময় এই পৃথিবীতে কাটানোর ফলে দুজনেই এক সময় এই পৃথিবীকে ভালোবেসে ফেলেন নিজেদেরে গ্রহের মতই। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো এই যুগল পৃথিবীর এক মহান ধর্মমতে বিয়েও করেন একজন স্বল্প শিক্ষিত স্থানীয় এক প্রার্থনা গুরুর হাতে। অবশ্য তাঁরা যে পৃথিবীতে এক মহান ধর্মমতে বিয়ে করে পৃথিবীর সভ্যতা এবং বাসিন্দাদের জন্য কোন হুমকি সৃষ্টি করেন নি, তা প্রমান করতে তাদের অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল। শেষবার অভিযানের সময় ১৯৪৭ সালের ১৪ ই জুন আমেরিকার নিউ মেক্সিকোর রসওয়েলে এক দূর্ঘটনায় পতিত হন। সম্ভবত তাঁরা আমেরিকান সরকারের গোপন গবেষণা এলাকা এরিয়া-৫১ তে এখনও বন্দি আছেন।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।