T3 || ঈদ স্পেশালে || লিখেছেন খন্দকার মোত্তালেব

লাল মিয়ার এক রাত
১|
গ্রামের কোল ঘেঁষে তিরতির করে বয়ে যাওয়া সুখাই নদী। আর এই নদী যেখানটায় বিরাট বাঁক নিয়ে পূর্বমুখী থেকে গ্রামের পশ্চিম সীমানা ছেড়ে একেবারে সোজা উত্তরমুখী হয়ে বাজারের মধ্যিখান দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে, ঠিক সেখানটাই এই ভয়ংকর পারবাড়ির জঙ্গলের শুরু। আকাশ ছোঁয়া ঘন সবুজ পাতার বড় বড় আম আর শিমুলের গাছ, আর ঘন বাঁশ ঝাড়ের ছায়ায় দিনের বেলাতেই এই জঙ্গলের ভেতরটা অন্ধকার থাকে। এর মধ্যে আবার সারা জঙ্গলে জায়গায় জায়গায় বেড়ে ওঠা বেতের ঝাড় আর তার তীক্ষ্ণ কাঁটা এই জঙ্গলকে করেছে আরও দূর্ভ্যেদ্য। এই জঙ্গলে শুধু গ্রামের কিছু দস্যি ছেলেমেয়ে বাবা-মায়ের শত বারণ সত্বেও মৌসুমে মাঝে মাঝে শিমুল ফুল আর আম কুড়োতে যায়। আর পাতা ঝরা শীতকালে গ্রামের অতিদুখী ঘরের বৌ-ঝিরা পেটের আগুন নেভানোর জন্য চুলোর আগুন জ্বালাতে দল বেঁধে দিনের আলো থাকতে থাকতেই জঙ্গলের মুখের বাঁশ ঝাড় থেকে বস্তাভরে বাঁশের শুকনো পাতা নিয়ে আসে। এছাড়া এ জঙ্গলের ধারে কাছে ঘেঁষতেও গ্রামের মানুষ তেমনএকটা সাহস পায় না । এমনকি এই জঙ্গলের ভেতরে যে একটা ডোবা আছে সেই ডোবার মাছও কেউ খেতে সাহস পায় না। এই ডোবায় নাকি সারাক্ষণ দিনের বেলাতেই ভুর ভুর করে বুদবুদ ওঠে। ভাদ্রের তালপাকা গরমে পাড়ার কেউ কেউ গাঙের বাতাসে গা জুড়াতে রাতে সড়কে হাঁটাহাঁটি গেলে নাকি দুরের ওই পারবাড়ির জঙ্গলে কিসব আলো দেখতে পায়। জনশ্রুতি আছে এই ডোবার মাছ খেলে মুখে রক্ত ওঠে মরা একবারে নিশ্চিত। ওই যে গেল বছর মগর আলী দাদা মারা গেল, সেতো ওই ডোবার মাছ খেয়েই। আর বেচারারই বা কি দোষ। একবার নাকি ঘন বর্ষার রাতে সেই ডোবা থেকে বৃষ্টির ঢলে উজানে উঠে ছিল সারি সারি কই আর টাকি মাছ। পাড়ার মগর আলী দাদা না জেনে বিলের উজানো মাছ ভেবে সেই মাছ ধরে খেয়েছিল। তারপর থেকেই নাকি তার কাশির সাথে রক্ত উঠা শুরু হল । দশ গ্রামের সবচেয়ে নাম করা কবিরাজ দুষর আলী আকন্দের সাত ধাতুর তাবিজ আর কঠিন পানি পড়াও সেই পারবাড়ি জঙ্গলের ডোবার মাছের সাথে পেরে ওঠেনি। আর তাই দিনে দিনে অমন তাগড়া শরীরের মানুষটা কেমন কাঠের মত শুকিয়ে ধুঁকে ধুঁকে মারা গেল।
পারবাড়ির জঙ্গলের সেই ভয়ংকর ডোবার কাছে বিশাল এক আমের গাছের গোড়ায় বসে আয়েস করে বিড়ি টানছে লাল মিয়া। জীবনের শেষ বিড়ি, তাই খুবই আয়েস করে টেনে নিচ্ছে। এই বিড়িটাও তার কেনার সামর্থ্য নেই । চাচাত বোন জোস্না তার হাড়কিপ্টে বাবার পকেট থেকে চুরি করে এনে দিয়েছে। অন্য সময় হলে বিড়ি খাওয়ার কথা শুনলে বা বিড়ি চাইলে জোস্না খুব রাগ করত আর বকাবকি করত। আর আজ চাইতেই মুচকি হেসে এক দৌড়ে এনে দিল।
জিজ্ঞাসা করল “লালটু ভাই, আমার তো বিয়া ঠিক হইয়া গেচে। তা আজই কি গলায় ফাঁসি খাবেন? লাল মিয়াকে জোস্না ছোটবেলা থেকেই লালটু ভাই ডাকে।
হুম, লাল মিয়া উত্তর দেয়।
দড়ি লাগবে না? আপনার তো দড়ি কেনার টাকাও তো নাই।
দড়ি দিনের বেলাতেই পাকাইয়া নিচি। এক্কেবারে তিতা পাটের দড়ি। খুবই শক্ত। দেকপু?
বাহ্ আপনার জ্ঞানতো অনেক বাইড়া গ্যাচে। একবারে দড়ি পাকায়ে পকেটে লিয়্যা ঘুরিচ্চেন। কই দড়িটা দেকান দেকি?
লালটু পকেট থেকে দড়ি বের করে দেখায়। জোস্না এমনভাবে দড়ি নেড়েচেড়ে দেখে যেন এটা কোন দড়ি নয়, লাল মিয়া তার বিয়ের উপহার হিসেবে এইমাত্র কোন গয়নার দোকান থেকে সিতাহার এনে দেখাচ্ছে।
দড়িটা খুবি চমৎকার হচে, লালটু ভাই। জোস্নার কন্ঠে অকৃত্রিম প্রশংসা। ঝুইলা খুবি আরাম পাবেন মনে হচ্চে। তা কুনটে ঝুলবেন? জায়গা ঠিক করেচেন?
লালি মিয়া ঘাবড়ে যায়। ভেবেছিল কোথায় জোস্না তার গলায় দড়ি দেওয়ার কথা শুনে কান্নাকাটি করবে, উল্টো এখন যেন গলায় দড়ি দিতেই উৎসাহ যোগাচ্ছে। মেয়েটাকে সে কখনই ঠিকমত বুঝে উঠতে পারেনি।
বুকে ভরসা নিয়ে বলে, জোস্না তুই বলিচ্ছিলি না লালটু ভাই তোমার সাথে আমার বিয়া না হলি আমরা একসাথে গলায় ফাঁসি লিব। চল আমরা আজ একসাথে ফাঁসি লিই।
সন্ধার অন্ধকারে জোস্নার চোখ চক্ চক্ করে ওঠে। খুব কঠীন গলায় বলে যা বুলছিনু ভুল্যা যান লালটু ভাই। আপনার সাথে আমি মরতে যাব কোন দু:খে? আপনি জানেন যার সাতে আমার বিয়া লাগচে তার অনেক টাকা। আব্বাকে বাজারে একটা ঘর কইরা দিবে, আর আমাকে বিশ ভরি সোনার বালা, দুল আর মালা দিবে। আপনিতো খালি দেখতেই সোন্দর কিন্তু আপনার তো কিছু নাই। আমাকে বিয়া করলে খাওয়াবেন কি? বাতাস খাইয়া বাঁইচা থাকা যায় না লালটু ভাই। ঘর জামাই থাইকপেন? সে চিন্তাও মনে লিয়েন না। আব্বা তো আপনাকে কুত্তার মতন দ্যাকে। হি হি হি।
জোস্নার যার সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছে পাশের গ্রামের সেই ছেলেকে লাল মিয়া ভালই চিনে। এক সময় সেই ছেলেকে নিয়ে তার চাচাতো ভাবীর সাথে রসালো সম্পর্ক শুধু সেই ছেলের গ্রামেই নয় জোস্নাদের গ্রামেও আড়ালে আবডালে আলোচনা হত।জোস্নার শেষের কথাগুলি লাল মিয়ার বুকে শেলের মত বিঁধে। চোখ ফেটে পানি আসে। অন্ধকারে জোস্না দেখতে পায়না। মুখে কোন কথা না বলে না লাল মিয়া হন্ হন্ করে বাড়ির দিকে চলে যায়।
নিত্যদিনের মত মজিদ মাষ্টার টিমটিমে হারিকেন হাতে পাড়ার মেঠো পথ ভেঙ্গে মসজিদে আসে। মসজিদের কলের পানিতে অজু করে এশার আজান দিয়ে বসে থাকে। একা একাতো আর জামায়াত হয়না। আল্লাহর হুকুমে দুএকজন যদি আসে। আজান শুনে লাল মিয়া অন্ধ দাদিকে কবিরাজের দেওয়া জ্বরের দওয়াই খাওয়ায়। মেঝেতে দাদীর বিছানা ঠিক করে দাদীকে শুতে বলে বাইরে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। জোস্নাদের বাড়িতে তখনও কথাবার্তা হচ্ছে। তার অষ্পষ্ট শব্দ পূবালি বাতাসে লাল মিয়াদের বাড়িতে ভেসে আসে।
ও লাল মিয়া আবার কোনটে গেলু, শুয়ে পড়, রাত তো ভারী হল, বলে দাদী আন্দাজে ঠিকই হাত দিয়ে বাতির সলতে টিপে নিভিয়ে দিয়ে মাটিতে পাতা বিছানায় গা এলিয়ে দেয়।
আবার জোস্নার শেষের কথাগুলো কথা মনে হয়। এবার চিরদিনের ভীতু লাল মিয়া আজ হঠাৎ করে অতি সাহসী হয়ে উঠে। গাঢ় অন্ধকারে দড়ি হাতে গাঙের ধার দিয়ে হেঁটে পারবাড়ির জঙ্গলে ঢুকে পড়ে। জোস্নাহীন এ জীবন রাখার কোন মানে হয় না।
পাড়া থেকে পারবাড়ির জঙ্গলের অন্ধকার যতটা ঘন কালো দেখায় ভেতরে ঢুকার পর ঠিক ততটা কিন্তু নিকষ কালো লাগছে না। কেমন যেন একটু ফিকে ফিকে ভাব। ডোবার পানি থেকে বুদ বুদ ওঠার শব্দ কান ঝালা পালা করা ঝিঁঝিঁ ডাকার মাঝেও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। এমনকি একটু আগে যে শোলজাতীয় মাছ ঘাঁই মেরে কালো পানি খানিকটা সাদা করে অনেকখানি ওপরে লাফ মারল সেটাও লাল মিয়া স্পষ্ট দেখতে পেয়েছে। অনেক দুরে পাড়ার মসজিদে মজিদ মাস্টার একা একাই আকামত দিয়ে সুর করে নামাজের প্রথম রাকাতের সূরা তেলওয়াত করছেন, সে শব্দও এতদুর থেকে অস্পষ্টভাবে কানে আসে।
বিড়িতে শেষ সুখটান মেরে লাল মিয়া উঠে দাড়াল। জীবনে কখনও লাল মিয়া বুদ্ধিমান ছিল না। প্রথম শ্রেনী থেকে পঞ্চম শ্রেনী পর্যন্ত ক্লাশে দুজন ছাত্র আর একজন ছাত্রীর মধ্যে লাল মিয়ার রোল নং ছিল বরাবরই তিন। ষষ্ট শ্রেনীতে নদী পারের হাইস্কুলে লাল মিয়াকে ভর্তি করা হল। ভর্তি রোল নম্বর ছিল ৫৮। ৭০ জন ছাত্রের মধ্যে ষষ্ঠ থেকে সপ্তম শ্রেনীতে উঠার সময় তার রোল নম্বর হল ৬৮। এর মধ্যে হঠাৎ করেই সাপের কামড়ে মা-বাবা দুজনের একসাথে মৃত্যু হলে তার বড় চাচা তার অভিভাবক সেজে বাবার জায়গা-জমি দখল করে তাকে চাকরের মত খাটাতে লাগল। প্রায়ই চাচা তাকে বলত স্কুলে যেয়ে আর কি হবে, তার চেয়ে বাজারে চাচার দোকানে বসলে সে অনেক কিছু শিখতে পারবে। এর মধ্যে চাচা বিলে নতুন শ্যালো মেশিন পুঁতে পানি তুলে ধান চাষ শুরু করল । আর সেই মেশিন ঘরে রাতে থেকে পাহারা আর পানির নালা কেটে কেটে খামারের অন্য কৃষকদের জমিতে পানি দেওয়ার সমস্ত দায়িত্ব পড়ল লালমিয়ার ওপর। সারারাত মেশিন চালিয়ে সকালে স্কুলে গেলে ইংরেজি সারের হাতের কঠীন বেতের বাড়ি ছিল উপরি পাওনা। পড়াশোনা ওখানেই শেষ হল। লাল মিয়া হয়ে গেল আপন চাচার বাড়ির বিনা বেতনে কাজের লোক। চাচার ধান কাটতে পাঁচজন মানুষের দরকার হলে চাচা নিত চারজন, আর একজনের কাজ হয়ে যেত লাল মিয়া কে দিয়ে। বিড়ি টানাটা সেখান থেকেই শেখা। লাল মিয়া বিড়ি খেত না বলে যখন বিড়ি খাওয়ার জন্য দিনমজুররা কাজের মাঝখানে বিরতি নিত, তখন লালমিয়াকে সেই সময়টুকুও একা একা কাজ করতে হত। সে বুঝল বিড়ি টানা ধরলে সে আর সব শ্রমিকদের মতই কাজের মধ্যে বিড়ি টানার বিরতি পাবে, তখন সে বুদ্ধি করে বিড়ি টানা ধরল। সেটা সেই অষ্টম শ্রেনীতে পড়ার সময়ের কথা। জীবনে এই একটা কাজই সে মনে হয় বুদ্ধিমানের মত করেছিল। এরই মধ্যে জঙ্গলের মশা তাকে ছেঁকে ধরেছে। মশাগুলো তার চাচার মতই । সুযোগ পেলেই রক্ত চুষে। সে এবার উঠে দাড়িয়ে বিড়িতে শেষ টান দিয়ে ফেলে দিল।এবার দড়িটা হাতে নিয়ে সে গাছে উঠবে।
গাছে চড়তে গিয়ে দেখল, গাছের যে বেড়, তাতে মই ছাড়া তার পক্ষে গাছে কোনভাবেই ওঠা সম্ভব না। মনে হল সত্যিই তার বুদ্ধি কম। কথাটা আগেই ভাবার দরকার ছিল। এখন চাচার বাড়িতে ফিরে গিয়ে মই চাইলে নিশ্চয়ই জোস্না বেরিয়ে এসে তাকে বোকা বলে আবারও হাঁসাহাঁসি করে কিছু খারাপ কথা শুনিয়ে দিবে। তার চেয়ে চড়া যেতে পারে এমন একটা গাছ খুজে তাতে ঝুলে পড়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে হল। সে রকম গাছের খোঁজে লাল মিয়া এবার পারবাড়ির ভয়ংকর জঙ্গলের আরও ভেতরে ঢুকতে শুরু করল।
কতক্ষণ জঙ্গলে আছে আর রাত কত হবে? আন্দাজ নেই। লাল মিয়া ঘন জঙ্গলে উদভ্রান্তের মত হাঁটছে। একটা চড়ার মত গাছ তাকে খুঁজে বের করতেই হবে। দুই পায়ের তলা স্পন্জের সেন্ডেল ফুঁড়ে বেতের কাঁটার আঘাতে রক্তারক্তি হয়ে গেছে। কিন্তু লাল মিয়ার কোন হুঁশ নেই সে ঘন অন্ধকার পার বাড়ির জঙ্গলে একটা গাছ খুঁজছে যাতে সে চড়ে গলায় ফাঁস দিয়ে মরতে পারে। ইতোমধ্যেই লাল মিয়া ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছে। দরদর করে গা ঘামছে। ক্ষুধা তার কিছুতেই সহ্য হয় না। এখন মনে হচ্ছে আর কিছুক্ষন হাঁটলে সে ক্ষুধা আর তৃষ্ণায় এমনিতেই মারা যাবে। বড় বড় শ্বাস নিতে নিতে সে বড় এক গাছের গোড়ায় একটু জিরোনোর জন্য যেই বসতে যাবে, এমন সময় কান মাথা ধরে যাওয়া অতি সুক্ষ্ম এক শব্দে লাল মিয়ার জ্ঞান হারানোর উপক্রম হল। আর ঠিক জ্ঞান হারানোর আগ-মুহূর্তে সে দেখতে পেল ঠিক মাথার উপরে গাছের পাতা ভেদ করে এক আগুনের চাকতি নেমে আসছে সেই বুদবুদ ওঠা ডোবার ওপরে। এরপর আর কিছু মনে নেই। লাল মিয়া কাটা কলা গাছের মত পারবাড়ির জঙ্গলের জ্ঞান হারিয়ে দড়ি হাতে নি:সাড় পড়ে থাকে।
ক্যাপ্টেন তানে নুট আর আর তার গবেষণা সহকারী আলাফি টায়েথি তাদের স্কাউপ শিপ পারবাড়ির জঙ্গলের ডোবার একটু উপরে নামিয়ে নিয়ে আসে। ক্যাপ্টেন তানে নুট টায়েথি কে একটু ধমকের সুরে বলে “তুমি তো আর একটু হলেই বিপদ ডেকে এনেছিলে, যেখানে আমাদের স্ক্যানার বার বার সাবধান করছে যে এই ডোবার আশে পাশে একজন মানুষ আছে, তারপরও স্কাউট শিপের আল্ট্রা সাউন্ড সিস্টেম অন করে রেখেছিলে কেন? তোমার তো ভূলে যাবার কথা না যে আমাদের অভিযানের কারনে এই পৃথিবীর একজন মানুষ মারা গেলে তোমার সাথে আমারও গবেষণা লাইসেন্স বাতিল হয়ে যেতে পারে?
ক্যাপ্টেন তানে নুটের ধমকে আলাফি টায়েথির চোখে পানি চলে আসে। সে যে তার গবেষণা সুপারভাইজার ক্যাপ্টেন তানে নুটকে অনেক ভালবাসে ইদানিং এটা মনে হয় ক্যাপ্টেন তানে নুট বুঝতে পেরেছে আর তাই আজকাল সামান্য ভূলেও তাকে অনেক কটু কথা শোনায়।
স্কাউট শিপ ডোবার পানির ঠিক এক ফুট উপরে স্থির রেখে ক্যাপ্টেন তানে নুট আর আলাফি টায়েথি অদৃশ্য মই বেয়ে জঙ্গলের মাটিতে নেমে আসে। ক্যাপ্টেন তানে নুটের হাতে ধরা পোর্টেবল ইউনিভার্সাল মাল্টিপারপাস স্ক্যানার এই মুহূর্তে মানুষের উপস্থিতি ধরার জন্য সেট করা। এই স্ক্যানার দিয়ে এই বিশ্ব জগতের যে কোন প্রানী আলাদা করে অথবা এক বিশেষ গ্রুপের প্রানীকে সনাক্ত করা সম্ভব। যেমন এই মুহূর্তে ডোবার ৫০ হাজার বর্গ কিলোমিটারের মধ্যে যত মানুষ আছে তাদের উপস্থিতি নড়া-চড়া, শ্বাস প্রশ্বাস এবং নাড়ির গতি ও রক্তের চাপ এই ছোট স্ক্যানারে ধরা পড়ছে। স্ক্যনার এখন শুধু লাল মিয়ার অবস্থান এবং তার গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক পরিসংখ্যান নির্দেশ করছে। যেমন অনেক ভয়ে লাল মিয়ার রক্তচাপ বেড়ে গিয়েছে এবং এতে করে হৃৎপিন্ড ও নাড়ির গতি স্বাভাবিক একজন মানুষের চেয়ে প্রায় দশগুন বেড়ে গেছে। লাল মিয়ার ব্রেইন তাকে বাাঁচানোর জন্য অটো পাইলটের মত সংয়ক্রিয়ভাবে তাকে অচেতন করে ফেলেছে।
ক্যাপ্টেন তানে নুট আর আলাফি টায়েথি লাল মিয়াকে রোবটিক হাতের সাহায্যে টেনে তুলে।রোবট হাত অর্ধচেতন লাল মিয়ার ঠোঁটে প্রক্সিমা-বি গ্রহের সবচেয়ে উপাদেয় শক্তিবর্ধক পানীয় তুলে ধরে। অর্ধচেতন অবস্থাতেই লাল মিয়া এক চুমুকেই সেই পানীয়ের বোতল খালি করে ফেলে। এবার চোখ মেলে লাল মিয়া নায়ক রাজ রাজ্জাক আর নায়িকা শাবানার মত দুজন অপূর্ব সুন্দর মানব মানবী তার সামনে দেখতে পায়। পেছনে ডোবার ওপরে সেই চাকতির উজ্জল আলো সারা জঙ্গল কে হ্যাজাক লাইটের আলোর মত আলোকিত করে রেখেছে। তার মনে কেন যেন কোন ভয় বা বিস্ময় নেই। কিন্তু তার অবচেতন মন থেকেই কেন যেন ছালাম চলে আসে। মুখে বলে ”স্যার আস সালামু আলাইকুম। আপনাদের কাছে কি একটা মই হবে?”
২|
মহামান্য ক্যাপ্টেন তানে নুট প্রক্সিমা-বি গ্রহের বিজ্ঞান আকাদেমির চার গ্যালাকিটিক বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়স্ক এবং দারুন প্রতিভাবান একজন সদস্য । তিনিই গ্যালাক্সির আলোড়ন সৃষ্টিকারী ইউনিভার্সাল ল্যাঙ্গুয়েজ ট্রান্সলেটর এবং পোর্টেবল ইউনিভার্সাল মাল্টিপারপাস স্ক্যানারের উদ্ভাবক। এই উদ্ভাবনের স্বীকৃতি হিসাবে তিনি এরই মধ্যে দুবার ইন্টার গ্যালাকটিক কম্পিটিশনে সায়েন্টিস্ট অব দ্য গ্যালাক্সি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন । তাঁর উদ্ভাবিত ইউনিভার্সাল ল্যাঙ্গুয়েজ ট্রান্সলেটর এই মহাবিশ্বের যে কোন প্রাণীর ভাষা অন্য ভাষায় রাপান্তর করতে পারে। এই প্রোগ্রাম উন্নয়নের জন্য তিনি সুপার কম্পিউটারের এ্যালগোরিদমে অকল্পনীয় উন্নতিসাধন করেছেন। সুপার কম্পিউটার লার্নিং ল্যাঙ্গুয়েজ কে তিনি এত সহজবোধ্য করেছেন যে, প্রক্সিমা-বি গ্রহের ১০০ বছরের নিচের ছোট ছোট শিশুরাও এখন মেশিন লার্নিং এবং সুপার কম্পিউটার লার্নিং বিষয় নিয়ে তাদের খেলাধুলার জন্য প্রয়োজনীয় প্রজেক্ট তৈরী করতে পারে।