মার্গে অনন্য সম্মান কাকলি ঘোষ (সেরা)

অনন্য সৃষ্টি সাহিত্য পরিবার

সাপ্তাহিক প্রতিযোগিতা পর্ব – ৫৮
বিষয় – বাইশে শ্রাবণ / প্রকৃত স্বাধীনতা / শ্রাবণ ধারা

কিছু কিছু কথা

– ইস্, ভিজে গেছিস তো! ঠান্ডা লাগছে তোর? এই শীতের রাতে বাইরে বেরোনোর কি দরকার ছিল! একে ঠান্ডা, তার ওপর বৃষ্টি।
– একি, তুই! এতো রাতে এই স্টেশনে? তুই একটুও বদলাস নি, সেই একই চেহারা।
– আমি তো স্টেশনের কাছেই থাকি। রাতে খাওয়ার পর ফাঁকা প্ল্যাটফর্মে হাঁটতে আসি।
তুই তো জানিস, রাস্তার জল কাদায়…
– মহারাণী! সেই রকমই রয়ে গেছিস, মাটিতে পা পড়েনা। আপনার জন্য সোনা দিয়ে রাস্তা মুড়িয়ে দিতে হবে!
– তোর শীত করছে, না? এই নে চাদরটা গায়ে দে। এতক্ষন হেঁটে আমার এখন গরম লাগছে।
আয়, চা খাই। দ্যাখ, সেই চায়ের গুমটিটা এখনো আছে ১ নম্বর প্ল্যাটফর্মে। এখন সেই চা কাকুর ছেলে দোকানটা চালায়।
– তোর চাদরে সেই তোর গায়ের পুরনো গন্ধটা পাচ্ছি। রোদ মাখা বুনো ফুলের গন্ধ, মন মাতিয়ে দেয়।
– তোর চেহারাটা খুব খারাপ হয়ে গেছে রে। দেখি! তোর গায়ে তো জ্বর!
– আহ্! তোর ছোঁয়া কতদিন পর! এতো ঠান্ডা কেন তোর হাত! আমার হাতে হাত দে, একটু উষ্ণতা যদি দিতে পারি! আর তো কিছুই পারলাম না দিতে তোকে।
– জানিস, সেদিন যখন এই প্ল্যাটফর্ম থেকে ট্রেনে উঠে শেষ বারের মতো চলে গেলি, ওই সূর্য ডোবা মূহুর্তটা থেমে আছে আজও। আমি অনেক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম এখানে, ভেবেছিলাম একবার পেছন ঘুরে তাকাবি। তারপর ট্রেনটা কখন যেন কুয়াশা হয়ে গেল চোখের সামনে। শূন্য রেল লাইনগুলো শেষ রোদের ওম মেখে শুয়ে ছিল। রেললাইনে পড়ে থাকা চায়ের ভাঙা ভাঁড়গুলো খুব ধারালো, দৃষ্টিতে ফুটে যায়…
– তোর চোখে এখনও সেই শুন্যতা দেখতে পাচ্ছি, এক অদ্ভুত আলোময় অন্ধকার। তোর হাতের ঠান্ডা ছোঁয়া মুছে দিচ্ছে আমার জ্বরের তাপ।
– তোর ভিজে মাথাটা মুছে দিই আমার আঁচল দিয়ে, তুই একদম নিজের খেয়াল রাখিস না মনে হচ্ছে।
– তোর বাড়ি তো কাছেই বললি, নিয়ে যাবি না আমায়?

হঠাৎ প্রচুর জলের ঝাপটায় আমার চোখ খুললো। অনেক অচেনা ঝাপসা কৌতূহলী মুখ ঝুঁকে আছে আমার ওপর। পিঠের নীচে কাঠের শক্ত বেঞ্চটা টানটান মমতাহীন, আমার হাত পা আড়ষ্ট, জিভ শুকিয়ে টেনে আসছে ভেতর দিকে, যেন গলার গহ্বরে গিয়ে দম আটকে ধরবে, চোখের পাতা বরফের মতো ক্ষমাহীন, ভারী, কিছু গুঞ্জন কানে ভেসে আসছে।

কে যেন বলছে ” ওনাকে একটু গরম চা খাইয়ে দিন দাদা, মনে হয় প্রেসার বা সুগার ফল করেছে।”
একটু বল পেয়ে উঠে বসেছি। তখন শিউলী রঙের ভোর শূন্য রেল লাইন ধরে স্টেশনের দিকে এগিয়ে আসছে। বেঞ্চের নীচে দুটো চায়ের খালি ভাঁড় দেখতে পেলাম।
আমার গায়ে ওর গন্ধ মাখা কোনো চাদর তো নেই, তবুও আমার শীত করছে না। জ্বরও নেই।
” বেশী রাতে এই স্টেশনে আর আসবেন না দাদা। এই রেল লাইনে অভিশাপ আছে। এই বয়সে এভাবে শরীর খারাপ নিয়ে আপনার বেরোনো ঠিক হয়নি। রাতের শেষ ট্রেনটা ধরতে পারেননি বুঝি!” গুমটির চা ওয়ালা জিজ্ঞেস করল।
আমি আড়ষ্ট ঠোঁট , জিভ নেড়ে কি জবাব দিলাম নিজেই বুঝলাম না।
সকালের প্রথম হাওড়া গামী ট্রেনে চড়ে বসলাম। ঠান্ডা হাওয়ার স্পর্শ আমার কপাল ছুঁয়ে আদর করে গেল, আমার গালে গড়িয়ে এলো ফোঁটা ফোঁটা বরফ গলা সময়। ওর জড়িয়ে দেওয়া চাদরের থেমে থাকা গন্ধ আচ্ছন্ন করল আমার স্বত্ত্বা। আমার মন জুড়ে বর্ষা আকুল হয়ে বাঁধ ভাঙছে সময় নদীর।
বাইরে তখন অঝোরে ঝরছে শ্রাবণের আকাশ। এ তো শীত কাল নয়! তবে কাল রাতে ও যে বলল…..!
কিছুতেই মনে করতে পারলাম না কেন নেমেছিলাম এই স্টেশনে। আমি তো খড়গপুর থেকে ক্লাস নিয়ে ফিরছিলাম কাল।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।