সাপ্তাহিক গল্প নেই-তে কল্যাণ গঙ্গোপাধ্যায় – ১৪

গল্প নেই – ১৪

ভোট আসে। ভোট যায়।
আমরা যারা সাধারণ মানুষ তারা লাইনে দাঁড়াই। যদি কোনো অঘটন না ঘটে অর্থাৎ পরম আত্মীয় সেজে আমার ভোটটা কেউ না দিয়ে যায় তাহলে আঙুলে কালি লাগিয়ে নিজের ভোট নিজে দেবার সুযোগ পাই। তখন গর্বে বুক ফুলে ওঠে। ফুরফুরে আনন্দে মনে হয় শেষ অবধি ভোট দেওয়া যে আমার গণতান্ত্রিক অধিকার আমি তা রক্ষা করতে পেরেছি।
আমার এই অধিকার প্রয়োগ করে নিজেরই পিঠ চাপড়ে বাহবা দিতে দিতে ভাবি একটা কাজ করেছি বটে।
ফল?
যদি আমার মনোনীত প্রার্থী হেরে যান তাহলে আগামী পাঁচ বছরের মতো তাঁর আর দেখা পাওয়া যাবে না। তাঁকে বলা যাবে না যে আমি আপনাকে ভোট দিয়েছিলাম এইজন্য যে আমার কিছু বলার ছিল। আপনি যদি আমার কথা শোনেন তাহলে আমি ধন্য হই। যা আপনার মাধ্যমে বলতে চেয়েছিলাম। পরাজিত হয়েছেন তো কি হয়েছে? আমার কথা, আমাদের কথা তো আপনি বলতেই পারেন। তা না বলে আবার পাঁচ বছর বাদে আচমকা ভেসে উঠবেন! তখন আবার ভোট চাইবেন?
যদি জিতে যান তাহলেও তাঁকে কোনদিন আমার নিজের কথা বলা হবে না। লক্ষ ভোটারের মধ্যে আমার কথা শুনবার সময় কোথায়! অথচ একটা অটোতে মাইক লটকে যখন চিৎকার করে প্রচার হয়েছে তখন অটোর গতির সঙ্গে শব্দও ছুটে চলেছে। একটা বাক্যও ঠিক মতো শোনা যায়নি। যেন বলতে হয় তাই বলা।
নিজের আগ্রহে শব্দগুলো নিয়ে জোড়াতালি দিয়ে যা বুঝেছি তা হল, প্রার্থী হচ্ছেন কাজের মানুষ ও কাছের মানুষ। তাকে ডাকলেই পাই। এইসব গালভরা বুলি।
আমার পথের মাঝখানে খানাখন্দ। কাজের নামে মাঝে মাঝে পাথরের সঙ্গে পিচের পিন্ড। বাস ভাড়া, অটো ভাড়া বেড়ে গেলে কাউকে পাওয়া যায় না সেই দুঃখের কথা বলার জন্য। বুঝতে পারি অটো বা বাস ও অন্যান্য যানবাহন তারা মুফতে চালায় না। অনেক বড়ো গাছে তাদের নৌকো আটকানো আছে।
বাজারে গেলে আতঙ্ক হয়। আজ তো যেমন তেমন। কাল কি হবে?
যিনি জিতলেন বৈভব যেন তাকে দিনের পর দিন জড়িয়ে ধরেছে। তিনি যা বলেন তাই বেদবাক্য। টিভি খুললে তাঁকে দেখতে পাই। দেখি খবরের কাগজে। হাতের সামনে পাই কোথায় যে দুঃখের কথা বলব।
বেকার ছেলে মেয়েদের সংখ্যা বেড়ে গেছে। প্রচুর। খুব ধোঁকা হচ্ছে তাদের সঙ্গে। পরীক্ষা দিয়েও বুঝতে পারছে না তাদের অবস্থান কোথায়!
শীতের রাতে সবাই রাস্তায় শুয়ে আছে। বিচারের আশায়। চাকরির প্রত্যাশায়। আমি ওদের পাশে গিয়ে দাঁড়ালে সেটা ভালো মনে নিতে পারবে না জানি। ভাববে এটা আবার কে? আমরা তো আছি।
ঠিক আছে আমি না হয় নাই বা পেলাম। আপনি যান। ওদের পাশে দাঁড়ান। একথা বললে শুনতে হবে, বেশি বাতেলা দেবেন না। জানেন আমাদের কত জন সমর্থন। তাদের মধ্যে আমিও যে একজন এটা বোঝাতে গেলে ঘোর সন্দেহর চোখে তাকাবে। তখন হয় ঘাড় ধাক্কা নয়ত একটা কেস খাইয়ে দেবে।
রুগিকে কোন ডাক্তার দেখছে না। সেই রুগি তো মানুষ। খাতিরের কুকুর নয়। কাজেই ডায়ালিসিস হবে না। কোনো চিকিৎসাই হবে না। পাঠিয়ে দিচ্ছে অন্য হাসপাতলে। আবার সেখান থেকে তাড়া খেয়ে অন্যত্র যেতে হচ্ছে। এরকম হচ্ছে কেন?
পরদিন খবরে শুনলাম সেই রুগি মারা গেছে।
চাকরি না পেয়ে, কাজ না পেয়ে বাড়ি,ঘর ছেড়ে যেতে হচ্ছে অচেনা অজানা জায়গায়। করোনার সময় চলে এসেছিল। এখানে কিছু হবার নয় দেখে আবার বাইরে। কেন?
আপনি তো জানেন না যে আমি আপনাকে ভোট দিয়েছি। জানলেও ওসব নিয়ে মাথা আপনার ঘামেই না। সারাদিন তো ঠান্ডার মধ্যেই সময় কেটে যায়। ঘামার সুযোগ কোথায়! যে কদিন না আমার আঙুলের কালি মিলিয়ে গেছে আমি ওই দাগের দিকে তাকিয়ে থেকেছি অনেক প্রত্যাশায়। তাই তো এইসব অনেক কথা আপনাকে জানতে চাই।
জানাতে গেলে হয়ত বলবেন যে, আমি বেশি কথা বলি। এত কথা কেন?
আমার আরও অনেক কথা বলার আছে। আচ্ছা বলুন তো দেখি আপনি ছিলেন তো আঙ্গুল, হঠাৎ এমন কলাগাছ হয়ে উঠলেন কি করে? কোথা থেকে আসে এত গাড়ি, বাড়ি, টাকা? প্রশ্ন করলে হুমকি দেবেন। এই সুজলা সুফলা পশ্চিমবঙ্গে আপনাদের হুমকিগুলি মাঝেমাঝে তালিবানি হুমকির মতো শোনায়।
প্রতিদিন রক্ত ঝরছে। যাদের হাড়ের উপর চামড়া সাটা তাদের পরস্পরকে আপনি কেবলমাত্র ভোটে জিততে চান বলে উস্কানি দিয়ে উত্তেজিত করে লড়িয়ে দিচ্ছেন!
দিকে দিকে মানুষকে হিংস্র করে তুলছেন। একজন অন্যকে মেরে রক্তে মাটি ভিজিয়ে দিচ্ছে।
আপনি ভোট প্রার্থী। আমি ভোটদাতা। একটা গালভরা কথা শুনি ভোট দেওয়া নাকি আমার গণতান্ত্রিক অধিকার। এটা রক্ষা করতে গিয়ে বার বার ভুল করেছি। আমার আঙ্গুল কালিমালিপ্ত করে সাজিয়েছি অন্যের জন্য চিতা অথবা কফিন। আর আপনি নির্বাচিত হয়ে অদৃশ্য হয়ে গেছেন।
আমরা পালন করব গণতন্ত্রের উৎসব। এই উৎসবের আনন্দ নাড়ু আপনার হাতে। রুগ্ন কিছু না পাওয়া ছেলেদের হাতে বোমা ও নানা অস্ত্র।
কোনো সমস্যার সঠিক সমাধান নেই। আমরা কেবল ভিক্ষের এঁটোপাতা চেটে সংগ্রহ করব মনের জোর। আবার আঙুলে অজস্র কালো ইতিহাস থেকে তুলে আনা কালি লাগিয়ে মনের আনন্দে তাথৈ নাচব। আনন্দে বলব, আহা গণতন্ত্র, মুই কি হনু রে!
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!