২০২১এর বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আমার বেশ কিছু বছর আগেকার একটি দিনের কথা মনে হল। সেদিন একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার পক্ষ থেকে পরিবেশদূষণ বিষয়ে আলোচনা সভা ডাকা হয়েছিল সায়েন্সসিটি তে।
এই সংস্থার সঙ্গে আমি যুক্ত ছিলাম। সেদিন পরিবেশদূষণ শুধু নয় নেশা থেকে মুক্তি ছাড়াও নানা ধরনের বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। অনুষ্ঠানের সঞ্চালক হিসেবে দায়িত্বে ছিলাম আমি।
সেদিন অনুষ্ঠানে এসেছিলেন তৎকালীন সরকারের দু’একজন নেতা,মন্ত্রী। উপস্থিত ছিলেন বিরোধী দলের বিশিষ্ট মানুষেরা আরও অনেক সুধীজন।
আলোচনা সভায় উপস্থিত থাকার কথা ছিল আটজন বিশিষ্ট চিকিৎসকের। তাঁদের মূল্যবান কথা মানুষকে শোনাবার জন্য আমাদের সংস্থার পক্ষ থেকে ঢালাও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল পরিচিত বিভিন্ন স্তরের মানুষদের।
সায়েন্সসিটি প্রেক্ষাগৃহ প্রায় ভর্তি। এত মানুষকে যে আমরা আনতে পেরেছি এতে সবাই খশি হয়েছিলাম। আলোচনা সভা হওয়ার কথা দুটি পর্বে। মাঝে একঘন্টার বিরতি। ওই বিরতির সময় যারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছেন তাদের সবার জন্য খাবার আয়োজন ছিল। একথা আমাদের পক্ষ থেকে আগেই ঘোষণা করা হয়েছিল।
সেদিন প্রথম পর্বে আটজন ডাক্তারবাবুর বদলে এসেছিলেন মাত্র চারজন। বাকি চারজনের বিশেষ কাজ থাকায় তাঁরা আসতে পারেননি।
প্রথমপর্বের অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগেই যিনি এই অনুষ্ঠানের মূল উদ্যোক্তা সম্পাদক তিনি আমাকে ডেকে বললেন, ‘আপনি নির্ধারিত সময়ে অনুষ্ঠান শেষ করবেন না।’
‘কেন?’ জিজ্ঞাসা করতে উনি জানালেন, যাদের খাবার পাঠানোর কথা তাদের লোক এসে জানিয়েছে যে সবকিছু ঠিকঠাক করে পাঠাতে যখন পাঠাবে বলেছিল তার থেকে প্রায় এক ঘন্টার মতো দেরি হবে।
সমস্যা হল বিশেষ বিশিষ্ট ডাক্তারবাবুদের আমি বলব কি করে যে, আপনার বক্তব্য দীর্ঘ করুন। এ কথা তাঁদের বলা যায়? না উচিত?
অতএব ঘড়ি ধরে দায়িত্ব আমাকেই নিতে হল।
উদ্বোধন সঙ্গীত একটা হওয়ার পরে গায়িকার গানের প্রশংসা করে আরও দু’টি গানের অনুরোধ করা হল। তিনি খুশি হয়ে গাইলেন।
যিনি সভা উদ্বোধন করবেন তিনি এসেছেন সামান্য দেরিতে। তাঁকে অনুরোধ করা হল সেদিনের বিষয় নিয়ে বিস্তারিত বলতে। এই কথা বলায় মনে হল তিনি খুশিই হলেন। বিশ্ব পরিবেশ দিবসের অনুষ্ঠানে তিনি সেই বিষয়ে বললেন অনেক অজানা কথা। যা সকলের শোনা উচিত। শুনলাম মন দিয়ে। মাঝে মাঝে আমি হাততালি দেওয়ার ভঙ্গি করলাম। সেই ভঙ্গিটি যেন ছড়িয়ে পড়ল গোটা প্রেক্ষাগৃহে। দর্শকরাও হাততালি দিলেন। এই করতালিতে বক্তা উৎসাহিত।
তাতেও যেন সময় কাটে না। মনে হল এইরকম সময় ঘড়ি কেন যে এত আস্তে চলে!
এল ডাক্তারবাবুদের বলার পালা। তাঁদের একজনকে ডাকার আগে সেই বিষয়ে যতটুকু জানি বা বোধগম্য হয়েছে তার চেয়েও বললাম অনেক কথা। বলে ফেললাম নিজের মত করে। তার মধ্যে শব্দদূষণ, দৃশ্যদূষণ এমন অনেক কিছুই বলা হল এমন কি ধূমপান নিয়েও। সিগারেট যে কতটা ক্ষতি করে বা করতে পারে তা নিয়েও কম বলা হল না।
অনুষ্ঠানের মধ্যেই সম্পাদক মহাশয় আবার আমার কাছে এলেন। বললেন, ‘প্রথম সারির একটি আসনে বসিয়ে রেখেছি আমাদের পরিচিত এক সদস্যকে। খাবার এলে তার কাছে খবর আসবে। তিনি সিট ছেড়ে উঠে গেলেই বোঝা যাবে খাবার এসে গেছে।’
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি অনুষ্ঠান শেষ করার নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেছে প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট। এরই মধ্যে আমি সেই সদস্যের দিকে মাঝে মাঝেই তাকাচ্ছি। তাঁর উঠবার নাম নেই। মন দিয়ে ডাক্তারবাবুদের বক্তব্য শুনছেন। সেদিন যে ক’জন ডাক্তারবাবু বক্তব্য রেখেছিলেন মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম তাঁদের কথা। সব কথা মনে না রাখতে না পারলেও অনেক কথাই আজও মনে রেখেছি। সেসব মনে করে আজও মনের ভিতরে নাড়াচাড়া করি।
একেবারে শেষে যে ডাক্তারবাবু বক্তব্য রাখবেন তাঁর নাম ঘোষণা করেই দেখি আমাদের সেই সদস্য সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। আরও পনেরো মিনিট বাদে প্রথম পর্বের অনুষ্ঠান শেষ হল।
বাইরে এসে দাঁড়ালাম। সম্পাদক এসে ধন্যবাদ জানালেন। বললেন, ‘সময় মতো অনুষ্ঠান শেষ করলে খাবারের চাহিদায় পরিবেশ এমন হত যে শত চেষ্টাতেও হামলা দূষণ আটকাতে পারতেন না।’
হেসে বললাম, ‘খাবার বলে কথা। তা না পেলে তো হামলা হবেই।’
ইতিমধ্যে অনেকে ঘিরে ধরেছে আমাকে। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা শুধু নয় মাঝে মাঝে যে কথা বলেছি তাও ভালো লেগেছে অনেকের। সিগারেট নিয়ে যা বলেছি তা তো খুবই ভালো।
একটানা মঞ্চে আটকে থেকে আর কথা বলে মনে হচ্ছিল গলা শুকিয়ে আসছে।পকেট হাতড়ে দেখি সিগারেট নেই।
একজন বুঝতে পেরে আমাকে তাঁর সিগারেট এগিয়ে দিলেন। নিলাম।
আমি যে সিগারেট ব্যবহার করি তা একটু কড়া ধাতের। কমদামের। মূল্যবান সিগারেটে আমার তেমন জুত হল না।
তবু সেই সিগারেটে টান দিতে দিতে সবার মুখে শুনছি দূষণ নিয়ে আর সিগারেট নিয়ে যা বলেছি তার প্রশংসা। হঠাৎ মনে হল এ আমি কি করছি! ততক্ষণে সিগারেট ফুরিয়ে এসেছে। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম, আর নয়। এরপর ঠোঁটে সিগারেটে ছোঁয়ানো আমার পক্ষে অন্যায়।
সেই বছরের ৫জুন অনুষ্ঠান হয়েছিল। ঠিক করলাম ১জুলাই ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়ের জন্মদিনে সিগারেট ছেড়ে দেব। যদি কখনো মঞ্চে বা ক্যামেরার সামনে দরকার হয় তখন ছাড় দিতে হবে। তারপর থেকে মঞ্চে কখোনো দরকার হয়নি। ক্যামেরার সামনে দু’বার। একবার একটি ছোট্টো রম্য অভিনয়ে। আর একবার নব্যেন্দু চট্টোপাধ্যায়ের একটি ছবিতে। সেদিন একটি শটে ন’টি সিগারেট ধরাতে হয়েছিল।
প্রতিজ্ঞার কথা ভেবে অনেকগুলি প্যাকেট কিনলাম। আমি তখন যেখানে যেখানে যেতাম সেখানকার বন্ধুদের একটি সিগারেট দিয়ে নিজেও ধরাতাম। এভাবে আমার সল্টলেকের আবাসনের বন্ধুদের, অফিসে, টলিপাড়ায়, কফিহাউসে এইরকম যেখানেই বন্ধুদের কাছে আমার যাতায়াত ছিল সেখানকার সবাইকে সিগারেট খাইয়ে আমার প্রতিজ্ঞার কথা ঘোষণা করে দিয়েছিলাম। তারপর থেকে আর সিগারেট ছুঁয়েও দেখিনি।
সল্টলেক থেকে ব্যারাকপুরে আড্ডায় আর খুব একটা যাওয়া হত না। ভেবেছিলাম সিগারেট ছেড়ে দিয়ে একদিন বাবলুদাকে (লেখক তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়) জানিয়ে আসব। কেননা বাবলুদা যেদিন শুনেছে আমি সিগারেট ধরেছি, শুনে কিছুক্ষণের জন্য বিষণ্ন হয়ে বসেছিল।
জিজ্ঞাসা করতে বলল, ‘আমার তোকে নিয়ে একটা অহংকার ছিল যে, আমাদের মধ্যে একমাত্র তুই সিগারেট ধরিসনি। আজ আমার সেই অহংকারটুকু তুই নষ্ট করে দিলি।’
শুনে লজ্জা পেলেও তখন সিগারেট ছাড়তে পারিনি।
বাবলুদা বলেছিল, ‘তুই আমার এখানে এলে আমার প্যাকেট সিগারেট নিবি। অন্য সিগারেট এখানে ধরাবি না।’
তখন বাবলুদার কাছে পাঁচশো পঁঞ্চান্নর সিগারেটের প্যাকেট থাকত। সেখান থেকে একটার বেশি নেওয়া যায়।একসময় তাও নেওয়া বন্ধ করলাম।
বাবলুদা নেই।অকালেই চলে গেল। জানত যে আমি একটার বেশি সিগারেট নিতে পারব না। একসময় যখন আর নিতাম না তখন নিজে থেকে কখনো নিতেও বলেনি। হয়তো এভাবেই আমার ধূমপান আটকাতে চেয়েছিল। তখন বুঝতে পারিনি।
শেষ পর্যন্ত ছাড়লাম সিগারেট।
তবে দূষণ তো একরকম নয়। কত রকম দূষণ চারিদিকে। তার ফল ভোগ করছে এখন গোটা পৃথিবীর মানুষ। ঘরের ভিতরে আটকে থেকে সবকিছু বিসর্জন দিয়েও দূষণের অদৃশ্য শত্রুকে দমন করতে পারছি না।
মনে পড়ল সেই বছরের ১জুলাই সিগারেট ছেড়ে দেওয়ার দিনটির কথা। অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে বাসস্টপে দাঁড়িয়ে আছি, কোনোটাতে উঠতে পারছি না। কোনোটা দাঁড়াচ্ছে না। একটা বাস আমার সামনে এসে আচমকা এমনভাবে কালো ধোঁয়া ছাড়ল মনে হল আজ থেকে আমি সিগারেট ছেড়ে দিলে কী হবে! আমি তো এক লহমায় প্রায় একহাজারের উপর সিগারেটের ধোঁয়া ঢুকিয়ে নিলাম আমার ফুসফুসে।