সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে কিশোর ঘোষ (পর্ব – ৩)

মুহূর্তের সেলফি

সেগমেন্ট ৩

—কিশোরদা, তুমি এনআরসি’র বিপক্ষে তো।
—না।
—মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি! সাপোর্ট করছ!
—না।
আমার ‘হ্যাঁ’ ‘না’ গোছের উত্তর শুনে, নির্লিপ্ত ভাবভঙ্গি দেখে উত্তেজিত সুভান। বলল, এখানেও পলিটিকালি কারেক্ট থাকতে চাইছ! ছিঃ!
তরুণ কবি সুভান। তাও আবার কলকাতা থেকে সাড়ে পাঁচশো কিলোমিটার দূরে থাকা বিশুদ্ধ তরুণ রক্ত। অতএব, তার রাগ হওয়ারই কথা। যেহেতু অসমে এনআরসি নামক কাণ্ডে উনিশ লাখ মানুষ নিমেষে দেশ হারিয়েছে। বস্তুত তাঁরা এখন ‘না ঘর কা, না ঘাট কা’। প্রশ্ন হল, এখন এদের কী হবে? রাষ্ট্র এদের সঙ্গে কোন ব্যবহার করবে? যদি কোনও উপায়েই তাঁরা তাঁদের ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণ না করতে পারে? তাহলে? যদি ওঁরা সত্যিই অন্য কোনও দেশ (অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ) থেকে রুটিরুজির খোঁজে এদেশে এসে থাকে? যদি তা প্রমাণিত হয়? তাহলে? তাহলে কি এই বিপন্নদের পূর্বদেশ ফিরিয়ে নেবে স্নেহে?
মনে হয় না। যেহেতু ভারত হোক বা বাংলাদেশ, আমেরিকা বা উগান্ডা, রাষ্ট্র আসলে একটি যন্ত্র। তার সঙ্গে মানবিকতার কোনও সম্পর্ক নেই। ফলে ফের হয়তো সংবিধান, আইন, নিয়মকানুনের প্রশ্ন উঠবে। স্বভাবতই সেই প্রশ্ন হবে অতি নির্মম। সেখানে আবেগ, আবদার, অভিমানের দাম শূন্য। মহাশূন্য। যে মহাশূন্যের স্রোতে ভেসে বাবা-মা-ভাইবোনহীন হয়ে আয়লানের দেহ পড়েছিল এই অ্যানিমাল প্লানেটের এক সিই-বিচে!
রাষ্ট্রের আসলে কিছু করারও নেই। যেহেতু সে ব্যক্তি নয়। ব্যক্তি মানে এক, একজন মানুষ। ব্যক্তির যেমন হিংসা থাকে তেমনি ভালোবাসাও থাকে। কিন্তু একাধিক ব্যক্তি যখন জোট বেঁধে নিয়মনিষ্ঠ হয়ে কোনও কাজে নামে, তখন তা মানবিকতারহিত হতে বাধ্য। কারণ সেই ‘জোট’কে হয়ে আসা নিয়মের দাসত্ব করতে হয়। সেখানে স্থান নেই সংবেদনশীলতার, রুটিন কাঠামো ভেঙে চিন্তার অভিযানে যাওয়ার জো নেই সেখানে। তাই বাচ্চার দুধ কিনে ফেরার পথে পাড়ায় ধরা পড়া রোগা চোরকে চারজন মারছে দেখে সপাটে দুটো ঘুষি, চারটে লাথি মেরে নেন স্নেহশীল শিশুর পিতাও। কারণ চলতি ‘নিয়ম’ অনুযায়ী ‘চুরি’ করা ‘মহাপাপ’। আর সেই ‘মহাপাপি’কে মারা সমাজসম্মত ন্যায়। অর্থাৎ এক্ষেত্রে একাধিক ব্যক্তি জোটবদ্ধ হয়ে… সমাজ নামক একটি গোষ্ঠিযন্ত্র হয়ে উঠল। আর বারো-তেরো বছরের এক বালককে ভয়ঙ্কর গণপিটুনিতে খুন করে বীরবোধে গর্বিত হল।
গণপিটুনিতে অবশ্য লেখাজোখা নিয়ম থাকে না। এ হল প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলা শ্রুতি বা শুনে আসা নিয়ম। কোনও দেশের সংবিধানের ক্ষেত্রে সেকথা খাটে না। সেখানে সব সুলিখিত। কিন্তু সে নিয়মের ফেরেও কতকটা একই ঘটনা ঘটে না-কি মাঝেমধ্যে! তথ্য ও প্রমাণের অভাবে আদালত বেকসুর খালাস করে দেয় চরম অপরাধীকে, জেলে পোরে। ফাঁসি দেয় নিরাপরাধকে। কারণ—তথ্য প্রমাণ তার বিরুদ্ধে। যদিও বিচারক মানুষটি কিন্তু অনেক সময়েই শুনানির প্রথম দিনেই টের পান, কে অপরাধী আর কে নয়। বহু অবসরপ্রাপ্ত বিচারকের এমনই বক্তব্য। তথাপি তাঁকে সংবিধানের নিয়ম মেনে রায় দিতে হয়। নিয়মের দাসত্ব করতে হয়।
আজকের অসম পরিস্থিতিও যেন কতকটা তাই। এই যে রাষ্ট্রযন্ত্র উনিশ লাখ মানুষকে কলমের এক ঝটকায় নো-ম্যানস-ল্যান্ডে পাঠিয়ে দিল। সে রাষ্ট্রযন্ত্রের কর্মীসদস্য যাঁরা, সেই তাঁদের, সেই ব্যক্তি মানুষগুলোকে আলাদা করে প্রশ্ন করুন—যা হল তা ভালো হল? আমার ধারণা, কেউ বলবেন না সুখের কাজ হয়েছে খুব। হয়তো বলবেন, ডিউটি করেছি। হয়তো দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নো কমেন্টস বলে পালিয়ে বাঁচবেন।
কোনও সুস্থ মানুষের পক্ষে এভাবে লহমায় লাখ লাখ মানুষকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়ার নীতিকে মেনে নেওয়া সম্ভব না। এর বাইরে যাঁরা আছেন তাঁরা অসুস্থ, তারা নররাক্ষস, হিটলার, ক্যানিব্যাল। মুষ্টিমেয় তাঁদের নিয়ে ভাবছি না। ভাবছি, এনআরসি’র তালিকা থেকে বাদ পড়া মানুষগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে! সময়ের মার খাওয়া স্রোতে যাঁরা ভেসে এসেছিল কোথাও, কিছুদিন টিকেছিল কোনও এক জনপদে, এবার তাঁরা কোন জীবনের দিকে ভেসে যাবে! সেই জীবন কি মৃত্যুর থেকেও বেশি বিপজ্জনক!
এমন এক নির্মম ইস্যু নিয়ে আমার ‘নির্গুণ ব্রহ্ম’ টাইপ ‘হ্যাঁ’ ‘না’ উত্তর, হাবভাব যে সুভানের পছন্দ হয়নি, এটা স্বাভাবিক। তাছাড়া এই যেখানে বসে কথা চালাচ্ছি আমরা, যেন ‘স্বর্গে’ বসে ‘নরকে’র দিনকাল নিয়ে আলোচনা। অবশ্যই সমাজ, সভ্যতার তথা রাষ্ট্রের নিয়ম মানা পৃথিবী হল ‘নরক’। আর গুলমা হল একশ শতাংশ ‘স্বর্গ’।
শিলিগুড়ি থেকে এক স্কুটার দূরের গুলমা। অঞ্চলব্রিজ ডিঙিয়ে মূল শহরটাকে খানিক পেছনে ফেলে সুভানের স্কুটিতে চেপেছি। পাহাড়-জঙ্গল নদী আর অনেক আকাশ নিয়ে সেজে থাকা গুলমা স্টেশন অবধি পৌঁছতে সময় লেগেছে মিনিট চল্লিশেক।
কিন্তু থমথমে পরিবেশ। এনআরসি নিয়ে আমার জবাবে এই থমথমে আবহাওয়া। অতএব, সুভানের অভিমান ও আমাদের দীর্ঘ নিরবতা ভাঙতে আগবাড়িয়ে বললাম, একটা অন্য কথা ভাবছিলাম সুভান।
সুভান মাথা নিচু করেছিল। ওভাবেই বলল, কী?
—একটা কথা বললে রাষ্ট্র রেগে যাবে, সবার অপছন্দ হবে। তুমিও হয়তো মানতে পারবে না।
—কী কথা?
—সেটা না হলে আজকের এনআরসি’র প্রয়োজন পড়ত না।
—সেটা কী?
—ভারত ও পাকিস্তানের স্বাধীনতা।
সুভান এবার ঘুরে তাকালো। অবাক চোখে বলল, কী বলছ বুঝিয়ে বলো।
—ভেবে দেখো সুভান, যত নষ্টের গোড়া ওই ১৯৪৭, ওই ১৫ ও ১৪ আগস্ট। যে কারণে ভারতবর্ষ হল ভারত ও পাকিস্তান। এবং র‍্যাটক্লিফ লাইন, এবং দেশভাগ, হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ, পূর্ব ও পশ্চিম পাঞ্জাব, পূর্ব ও পশ্চিমে বিভাজিত কোটি কোটি বাঙালি, অসম, ত্রিপুরাতেও। আর ভাঙা চিটাগাঙ, ক্ষতবিক্ষত কুমিল্লা, যশোর, খুলনা, মালদা, মুর্শিদাবাদ।
সুভান কিছু বলতে গেলো কিন্তু আমি থামলাম না। বলো তো, এই যে কাশ্মীর, যে এখন ‘কাশ্মীর সমস্যা’। যার এক হাত ধরে টানছে ভারত, অন্য হাত ধরে পাকিস্তান। আর ছিঁড়ে যাচ্ছে মানুষগুলো, আর অসংখ্য শহীদ জাওয়ান! হায়, জাওয়ান! জওয়ান যেন মানুষ না, তারা যেন আলাদা স্পিসিস। রাষ্ট্রযন্ত্রের মাইনে করা মৃত্যুরোবোট। মৃত্যুর মধ্যে দাঁড়িয়ে বন্দুকের ট্রিগার চেপে মৃত্যু ছুঁড়ছে যাঁদের দিকে, তারা পাল্টা পাথর ছুড়ছে। পাথর না, মগজ ধোলাই হয়ে গেলে গুলিও ছুড়ছে, আত্মঘাতী বোমা হয়ে আবেগে ফেটে পড়ছে। অথচ সেই আবেগ একটা সুস্থ স্বাভাবিক জীবনের জন্য কতখানি জরুরি তা না জেনেই কিন্তু…! জানি জানি, এ হল ইতিহাসের ধারাবাহিক অনটন, সঙ্কীর্ণতার পরিনাম। চালাক মানুষের অন্যায়ের পুজোয় সহজ সরল মানুষকে বলি দিয়ে পূণ্য লাভের কাহিনি। এই তো সভ্যতার প্রকৃত ইতিহাস। বুঝতে পারছ সুভান? এ এক দীর্ঘ মিথ্যের সফর। বলো তো, ১৯৪৭ না হলে ২০১৯-এর অসমের এনআরসি’তে পৌঁছতাম আমরা? পৌঁছতাম না। না না না।
টানা বলায় ক্লান্ত আমি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম। সুভান মাথা নীচু করল। ও কি শুনলো আমার কথা? আমি বোঝাতে পারলাম কষ্ট! পারলাম! আচ্ছা, আদৌ কি সুভানকেই এতকিছু বললাম আমি! সন্দেহ হচ্ছে! গোটাটাই একা একা নয় তো! নিজের ভেতরে দুটো মানুষ বানিয়ে…. আত্মকথন? হ্যাঁ, ও তো এভাবেই নিশ্চুপ হয়ে মাথা নীচু করে বসেছিল এখানে! আমিও গুলমার এক টুকরো স্বর্গে এসে চুপ মেরে গেছিলাম! তাহলে? এই যে এত কথা বললাম, তার একটা রিঅ্যাকশন দেবে না সুভান! এবার হাসি পেল আমার! মনে হল, একা কথা বললেই বা কী! তাই সই। ভারী পাথরের মতো বেদনাটাকে তো খানিক ভাঙতে পেরেছি। কিন্তু না, এবার সত্যি সত্যি কথা বলার জন্য হাত বাড়িয়ে আলতো ঠেলা দিলাম সুভানকে। কবির মগ্নতা ভেঙে জ্ঞানে ফিরল সুভান। বললাম, জানো তো, এতক্ষণ না আমি আর তুমি কথা বলছিলাম। তুমি কিন্তু জানো না!
সুভান রহস্যময় হাসল। বলল, জানি কিশোরদা, পাশপাশি বসা দু’জন চুপ থাকা মানুষের মধ্যেও কথা হয়।
আমি আরও বড় করে হেসে বললাম, নীরাবতার ভাষায়।
—হুম। সুখ দুঃখের কথা। কান্নার, অভিমানের কথাও হতে পারে।
—কথা না বলে এভাবে কথা চালাতে দারুণ লাগে সুভান।
—আমারও।
—একটা গান গাইতে ইচ্ছে করছে সুভান।
শিশুর মতো হাসল সুভান। আমার ভেতরেও একটা গান এসেছে কিশোরদা!
—একই গান!
—হতেও পারে!
আমরা দু’জন দু’জনকে চমকে দিয়ে জোড়া গলায় গেয়ে উঠলাম—
”ইমাজিন দেয়ার ওয়াজ নো কান্ট্রিজ
ইট ইসন্ট হার্ট টু ডু
নাথিং টু কিল অর ডাই ফর
অ্যান্ড নো রিলিজিয়ান, টু……

ক্রমশ…

 

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।