সাপ্তাহিক গল্প নেই-তে কল্যাণ গঙ্গোপাধ্যায়-৩৮


গল্প নেই-৩৮

আমরা আড্ডায় বসে আছি। এক ভদ্রলোক এলেন। আমি লোকটির দিকে তাকালাম না।
     আমাদের এক বন্ধুকে বললেন,‘আপনারা সবাই আমার বাড়িতে একটু আসবেন।’
বন্ধুটি বলল, ‘কেন?’
‘আমার ছেলেটা বাড়িতে খুব ঝামেলা করছে। আমাদের কথা শুনছে না। হাতের কাছে যা পাচ্ছে ভাঙছে।’    
    বন্ধুটি বলল,‘আপনার ছেলে কি করছে তা করতে দিন। আমরা আপনার বাড়িতে গিয়ে কি করব? আমরা গেলে কোন লাভ হবে না।’
আর একজন বলল, ‘ঠিক বলেছিস।’ লোকটিকে বলল, ‘আপনি বাড়ি যান। আমরা আপনার ছেলেকে কিছু বলতে যাব না।’
     মনে পড়ল ১০ বছর দশেক আগেকার একটি ঘটনা। আমরা বসে আড্ডা দিচ্ছি। কালীপুজোর দিন। এই ভদ্রলোক এসেছিলেন তাঁর ১০ বছরের ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে।ছেলেটির হাতে ছিল একটি খেলনা পিস্তল। সেটাতে রোল ক্যাপ ভরা ছিল। পিস্তল সমেত ছেলের হাত আমাদের সামনে তুলে ধরে একজন বন্ধুকে দেখিয়ে ভদ্রলোক ছেলেকে বলেছিলেন, ‘এই আঙ্কেলকে মারো।’
ছেলেটি তার বাবার কথা শুনে সেটাই করল। এইভাবে আমরা সেদিন যে ক’জন বসেছিলাম ছেলেটি তার বাবার নির্দেশ মতো পিস্তল তাক করল। একটা করে ফটাস শব্দ হয় ছেলেটি উল্লাসে হেসে ওঠে। চেলেটির সঙ্গে তার বাবাও ছেলের বাহাদুরিতে হাসতে থাকে।
    আমি সেদিন বলেছিলাম, ‘আপনি এটা কি করছেন? এখানে আমরা যারা আছি সবাই আপনার বয়সি। অনেকে আপনার চাইতে বয়সে বড়ো। আপনি তাদের দিকে বন্দুক তাক করতে বলে এটা কেমন শিক্ষা দিচ্ছেন ছেলেকে?’
    একথা বলাতেও ভদ্রলোকের মনে কোনোরকম ভাবান্তর হল না। তিনি বললেন, ‘কেন আপনাদের কারও কিছু ক্ষতি হয়েছে?’
    ভদ্রলোকের কথাটা শুনে আমাদের বন্ধু রেগে গিয়েছিল। বলেছিল, ‘আপনার সঙ্গে কথা বলে লাভ নেই। আপনি ছেলেকে নিয়ে এখান থেকে যান।’
    ‘পরে আমাদের কাছে ওই ছেলেটিকে নিয়ে আমাদের কাছে অনেক নালিশ এসেছিল। সে তার সমান বয়সি ছেলেদের সঙ্গে মারপিট করত। এর তার সঙ্গে ঝামেলা লেগেই থাকত ছেলেটির। কিছু বলতে গেলে ছেলেটির বাবা ছেলের পক্ষ নিয়ে সবার সঙ্গে ঝগড়া করতেন। ছেলের কোনো দোষ ধরা পড়ত না ভদ্রলোকের চোখে। 
    যাঁরা অযথা ঝামেলায় জড়িয়ে পড়তে চান না তাঁরা এসে আমাদের কাছে নালিশ করতেন। আমরা শুনতাম। কিছু করার ছিল না। ছেলেটিকে কিছু বলার বদলে ওর বাবাকেই শাসন করার দরকার মনে করতাম। আমরা ঠিক করেছিলাম ওই ঝামেলায় কেউ যাব না। সবাইকে বাধ্য হয়ে বলেছিলাম দরকার হলে সবাই মিলে যেন থানায় যান।
     ছেলেটির বয়স তখন ১৬ বছর। ছেলেটির অনেক বন্ধুবান্ধব। এরা বন্ধু না হলেই ভালো হত। এসব কথা ছেলেটিকে ও ওর বাবাকে বলার দরকার ছিল। বলতে গেলা অপমানিত হতে ভেবে আমরা বলতে যাইনি।
     সেদিন ভদ্রলোক কিছুতেই আমাদের কাছ থেকে যেতে চাইছিলেন না। ইনিয়েবিনিয়ে নানান কথা বলে যাচ্ছিলেন। যার কোনো সমাধান করতে যাওয়া আমরা ভাবতে পারিনি। ছেলেটির অনেক চাহিদা। না মিটলে সে বাড়িতে ঝামেলা করে। বাবা মায়ের গায়ে হাত তোলে। বাড়ির এটা ওটা চুরি করে বিক্রি করে দেয়। এমন আরও অনেক কথা।
    যে বিষ একটু একটু করে ভদ্রলোক জমিয়ে তুলেছেন আমরা একদিন গিয়ে তার ক্রিয়া বন্ধ করব কি করে?
    একজন বন্ধু বলল, ‘ আপনি বাড়ি যান। আমরা আপনার ছেলেকে শাসন করতে যাব না। ১০ বছর আগে যখন শাসন করার কথা বলা হয়েছিল তখন আমাদের কথা বুঝতে চান নি। তখন আপনাকেও শাসন করা উচিত ছিল আমাদের।’ 
     ভদ্রলোক চলে গেলেন। তাঁর চলে যাওয়ার অসহায় ভঙ্গি দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেলেও তখন সব হাতের বাইরে।
    একটা সময় ছিল যখন পাড়ার সমস্ত বয়স্ক মানুষেরা ছিলেন আমাদের অভিভাবক। তাঁদের যেমন ভয় পেতাম তেমন ভক্তি শ্রদ্ধাও করতাম। তাঁরা ভালোবাসতেন আমাদের সবাইকে। মনে হত সবাই যেন একই পরিবারের সদস্য।
    এই অবস্থাটা বহুদিন থেকে একটু একট করে বদলে গেছে টেরই পাইনি। আমরা অনেক আধুনিক হয়েছি।     
    যে যার নিজের মতো করে বুঝে নিচ্ছি সব।
    কখনো হিসেব করছি না, যা পেয়েছি তা কতটা!
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!