সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (পর্ব – ১২)

কলকাতার ছড়া 

আজ যে অধ্যায়ের কথা বলব, তা কলকাতার উন্নতিকল্পে এক অবিচ্ছেদ্য পর্ব। ধীরে ধীরে শহরে জাঁকিয়ে বসবার পরে সারা বাংলাতেই বাড়তে থাকল ইংরেজ আধিপত্য। গঙ্গার অববাহিকা দিয়ে জল গড়িয়ে যাবার মতই বহু ইংরেজ কোম্পানির অফিসার, আর্দালি সরকারী নিয়োগপত্র হাতে নিয়ে অথবা ব্যবসায়ীরা স্বইচ্ছায় ব্যবসা করার লক্ষ্যে জাহাজে চড়ে পাড়ি জমাতে থাকলেন শহর কলকাতার বুকে। এভাবেই ১৮০০ সালের একটি সকালে এদেশে ঘড়ির ব্যবসা করার সংকল্প নিয়ে বন্দরে পা রেখেছিলেন ২৫ বছরের এক ইংরেজ তরুণ। বাড়ি স্কটল্যান্ড। নাম ডেভিড হেয়ার। তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত না হয়েও আর কয়েকটি বছর পরেই যে এই অখ্যাত সাহেব কলকাতা তথা বাংলার শিক্ষাজগতে এক জীবন্ত কিংবদন্তীতে পরিণত হবেন তা কি আর জানত কলকাতাবাসী! আজও প্রাতঃস্মরণীয় এই ব্যক্তির তখন ঘড়ির ব্যবসা তো প্রায় লাটে ওঠার জোগাড়। নিজে শুধুমাত্র শিক্ষাব্রতী হিসাবে সময় দিতে পারছিলেন না বলে ব্যবসাখানা বিক্রি করে দেন বন্ধু গ্রে সাহেবকে। তারপর প্রতিদিন নিজের বাড়ি থেকে নিয়ম করে পালকি চড়ে বেরোতেন শহরে ছাত্র ছাত্রীদের দুর্দশা ও অভাব পর্যবেক্ষণ করতে। আর পিছন পিছন ছুটত অভাগা অভাগীর দল। বাংলা রেনেসাঁসের এক পথিকৃৎ স্বয়ং রামতনু লাহিড়ীও নাকি এভাবেই দিনের পর দিন পড়ে থাকতেন হেয়ার সাহেবের ঘরে। শুধুমাত্র বিনামূল্যে শিক্ষাটুকু লাভের আশায়। আর কাউকেই সেইরূপে ফেরাতেন না নরম মনের হেয়ার। তাই রামতনুকেও ভর্তি করে নিয়েছিলেন স্কুল সোসাইটির নব্য প্রতিষ্ঠিত স্কুলে (এখন হেয়ার স্কুল)। হিন্দু কলেজের অত্যন্ত মেধাবী তরুণ রাধানাথ শিকদার বই কিনতে পারতেন না বলে নিয়মিত স্কুলবুক সোসাইটি থেকে বিভিন্ন গণিতের বই তাঁকে যোগান দিতেন তিনি। তখন প্রায় সারাটাদিনই হেয়ার সাহেব পড়ে থাকতেন বিদ্যালয় ও শিক্ষা সংক্রান্ত আলোচনা ও সভায়। হিন্দু কলেজ সংক্রান্ত কমিটিতে যখন সভা আলো করে বসতেন সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতি স্যার হাইড ঈস্ট, রাজা রাধকান্ত দেব বাহাদুর, ডাঃ এইচ এইচ উইলসন, তখন সেই সভায় প্রধান নিয়ামকের ভূমিকা নিতেন তথাকথিত অল্পশিক্ষিত ডেভিড হেয়ার সাহেব। নিজে বিদেশী হয়েও কথা বলতেন ঝরঝরে বাংলায়। কয়েকদিন ঘড়ির ব্যবসা করবার পর বন্ধু রামমোহনের সাথে যৌথভাবে যে পরদেশসেবার ব্রতে অবতীর্ণ হন তিনি, তার ঋণ আজও ভোলেনি বাঙালী, ভুলবেই বা কিকরে। বর্তমানেও হিন্দু স্কুল, প্রেসিডেন্সি কলেজ, হেয়ার স্কুল, সংস্কৃত কলেজ, কলকাতা মেডিকেল কলেজের মত তাঁর মন্ত্রে দীক্ষিত শিক্ষার পীঠস্থানগুলো ক্রমাগত সেবা করে চলেছে বাংলা ও বাঙালীর। কে বলে, ইংরেজ শুধুমাত্র স্বার্থপরদের জাত? উইলিয়ম কেরী, জোসুয়া মার্শম্যান, জন ইলিয়ট ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুন, ডেভিড হেয়াররা তো সেই পথ দেখান নি। নিজের উপার্জনটুকু সম্বল করে তাঁরা নিশ্চিন্তে ফিরে যেতেই পারতেন দেশে। কিন্তু জাননি। নিজের জমির অংশটুকুও হেয়ার সাহেব শেষ পর্যন্ত স্কুলবুক সোসাইটির হাতে তুলে দেন হিন্দু কলেজ ও সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠার স্বার্থে। শোনা যায় নিজের প্রতিষ্ঠিত ফ্রি স্কুলগুলোয় একসময় হাতে কাপড়-গামছা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন তিনি। অপরিচ্ছন্ন ছেলেমেয়েদের গা-হাতপা মুছিয়ে দেবেন বলে। পরে ছেলেদের অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় স্কুলে পাঠালে অবিভাবকদের জরিমানার নিয়মও চালু করেন। প্রাইমারী স্কুলে ছুটির পরে নিজে বল কিনে হাত উঁচু করে দাঁড়াতেন চত্তরে। ছোট ছোট ছেলেরা তাঁকে জড়াতেন, বেয়ে উঠতেন গায়ে, আর তাতেই বুক জুড়িয়ে যেত হেয়ার সাহেবের। এরকমই ছিল তাঁর আত্মোৎসর্গের জীবন। শেষ জীবনে শুধুমাত্র স্কুলগুলো চালানোর জন্য দেনার দায়ে বিকিয়ে যাবার উপক্রম হলে ইংরেজ সরকার বাহাদুর যোগ্য ব্যক্তির স্বীকৃতি হিসাবে তাঁকে কলকাতার শেরিফ পদে অভিষিক্ত করে এবং মাসে ১০০০ টাকা নগদ বেতনের বন্দোবস্ত করে দেয়। শোনা যায়, বর্তমান হেয়ার স্ট্রিটে তাঁর বাসভবনের সামনেই নাকি ছিল একটি মিষ্টির দোকান। সমস্ত ছাত্রদের সেই দোকান থেকে যথেচ্ছ মিষ্টি খাওয়াতেন তিনি। ১৭৪২ সালে হঠাৎ কলেরায় তাঁর মৃত্যু আজও কলকাতাবাসীর কাছে এক অপূরণীয় ক্ষতি। তাঁর মৃত্যুর পরে সারা বাংলা ডুবে গিয়েছিল শোকের অন্ধকারে। শিবনাথ শাস্ত্রী লিখছেন – “তাঁর মরদেহ মিস্টার গ্রে সাহেবের বাড়ি থেকে বাইরে আনতেই কিছু গাড়িতে, অন্যেরা পায়ে হেঁটে, হাজার হাজার জনতা ওই মরদেহ অনুসরণ করেছিল। কলকাতা সেদিন যে দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছিল এরকম আর কখনো হবেনা। ঠিক বো বাজারের ক্রসিং থেকে মাধব দত্তের বাজার পর্যন্ত পুরো জায়গাটা জনজোয়ারে পূর্ণ হয়েছিল।”
তাঁরই প্রাণপ্রিয় জমির ওপর গোলদিঘির (বর্তমানে কলেজ স্কোয়ার সুইমিং পুল) একপাশে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়েছিল। সেখানে তাঁর সমাধির ওপরে একটি আবক্ষমূর্তি আজও দেখা যায়।
সেযুগে এই সূদুর মুলুক কলকাতাতেও তিনি কতটা জনপ্রিয় ছিলেন তা দীনবন্ধু মিত্রের সুরধুনী কাব্যের অন্তর্গত এই জনশ্রুত ছড়া থেকেই বোঝা যাবে –
“দেখ মাতা গোলদীঘি, বড় রক্ত জোর,
বিরাজে দক্ষিণ দিকে হেয়ারের গোর |
দীন দুঃখী শিশুদের পরম আত্মীয়,
বঙ্গের বদান্য বন্ধু প্রাতঃস্মরণীয় |
বাঙ্গালীর উন্নতির নির্ম্মল নিদান,
যার জন্য করেছেন সর্ব্বস্ব প্রদান |”

ক্রমশ

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।