সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (পর্ব – ৪২)

কেল্লা নিজামতের পথে
কলকাতা বিজয়ের পর নবাব কলকাতা দুর্গের দায়িত্ব দিলেন মানিকচাঁদের উপর। এই মানিকচাঁদ নবাব দরবারে প্রবীণ সেনাপতি ও আমির-ওমরাহদের তুলনায় অনেকটাই কম ক্ষমতাসম্পন্ন। যুদ্ধবিদ্যাতেও তেমন পারদর্শী নয়। অথচ নবাব তাকেই সমস্ত দায়িত্ব বুঝিয়ে কলকাতায় রেখে পাড়ি দিলেন মুর্শিদাবাদের পথে। নবাবের সিদ্ধান্তের ভুলগুলি ধীরে ধীরে প্রকট হতে শুরু করলো মুর্শিদাবাদের চোখেও। দরবারে মীরজাফর, জগৎশেঠের মত নামিদামি উচ্চপদস্থ আমলারা রীতিমত বিরক্ত হয়ে উঠলেন সিরাজউদ্দৌলার প্রতি। এই বিরক্তির মনোভাব কোনদিনই তাঁর রাজ্য শাসনের অনুকূলে যায়নি। তিনি শাসন করেছেন তাঁর মত, আর এদিকে তাঁর বিরুদ্ধে তৈরি হয়েছে এক বিরুদ্ধ মনোভাবাপন্ন দল। এই বিরোধিতা যত স্পষ্ট হয়েছে, ততই বিপন্ন হয়েছে সিরাজের রাজকর্তৃত্ব।
কলকাতা বিজয়ের পর সদলবলে মুর্শিদাবাদ ফিরে যাওয়া সিরাজ রীতিমতো নিশ্চিন্ত হয়ে মানিকচাঁদকে রেখে যান কলকাতায়। কিন্তু সে কি কলকাতার মত শহরে এবং দুর্গে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম? এই সিদ্ধান্ত বিবেচনার কোন প্রয়োজনীয়তা সিরাজ অনুভব করেননি। আসলে একটু ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় নবাব সিরাজের একের পর হঠকারী সিদ্ধান্ত তাঁকে তাঁর জীবনের শেষ দিনে উপনীত হতে বাধ্য করিয়েছে। বিশেষ করে প্রবীণ ও যোগ্য ব্যক্তিদের সরিয়ে তুলনায় নবীন ও অযোগ্য ব্যক্তিদের উচ্চপদে বসিয়ে দেওয়া তাঁর রাজত্বের এক চরম ভুল সিদ্ধান্ত। যেমন তিনি মীরজাফর বা দুর্লভরামদের সরিয়ে সেই জায়গায় নিয়ে আসেন মোহনলাল বা মীর মদনের মত অপেক্ষাকৃত নিচুতলার শ্রেণীর সেনাপতিদের। কলকাতাতেও ঠিক তেমনভাবেই বসানো হয় মানিক চাঁদকে।
এদিকে সম্পূর্ণ ইংরেজ কাউন্সিল ফলতার মত এক অস্বাস্থ্যকর জায়গায় গিয়ে পড়লে নড়ে চড়ে বসে সারা ভারতের ইংরেজ সমাজ। খবর যায় মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতেও। সেখান থেকে এক নতুন যুদ্ধ সাজে সজ্জিত হয়ে তারা সিদ্ধান্ত নেয় কলকাতা পুনরুদ্ধারের। কিন্তু অদূরদর্শী নবাব সিরাজউদ্দৌলা একবার কলকাতা জয় করেই ইংরেজদের পরবর্তী মনোভাব বুঝতে বিরাট ভুল করে ফেলেন। তিনি ভাবেন তিনি যা শিক্ষা দিয়েছেন তাতে ইংরেজদের আর নড়েচড়ে বসার ক্ষমতা নেই। কিন্তু তারা জাতে ব্রিটিশ। সেই অদূরদর্শিতার পরিনাম তাকে হাতে হাতে পেতে হয় অল্প কয়েক মাসের মধ্যেই। ১৭৫৬ সালের ১৬ই অক্টোবর কলকাতা পুনরুদ্ধারের জন্য পাঁচটি যুদ্ধ জাহাজ এবং পাঁচটি কোম্পানির সৈন্যবাহক জাহাজ মাদ্রাজ থেকে কলকাতা অভিমুখে যাত্রা করে। ডাক পড়ে দক্ষ যুদ্ধ পরিচালক এবং সাহসী অফিসার রবার্ট ক্লাইভের। জাহাজে প্রায় ১৫০০ সৈন্য সমেত ক্যাপ্টেন ক্লাইভ এবং অ্যাডমিরাল ওয়াটসন সেই জাহাজগুলিকে নেতৃত্ব দেন। এই ছিল বাংলায় কুখ্যাত লর্ড ক্লাইভের কলকাতায় প্রবেশের প্রথম জমি।
ধীরে ধীরে জাহাজ যত কলকাতা অভিমুখ এগিয়ে এলো, খবর পৌঁছলো মানিকচাঁদের কানে। তিনি তখন গুটি কয়েক সৈন্য নিয়ে একা রয়েছেন কলকাতায়। কলকাতা দুর্গকে রক্ষা করবার জন্য তিনিও তার হাতে থাকা ওই কয়েক’শ নবাব সৈনিক নিয়ে এগিয়ে এলেন দক্ষিণের দিকে। এদিকে কলকাতা জয়ের পর প্রায় সম্পূর্ণ সেনাই নবাব প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন মুর্শিদাবাদের পথে। বজবজে থাকা একটি দুর্গ সম্পূর্ণ খালি অবস্থায় পড়েছিল। ক্লাইভ প্রথম নিশানা করলেন সেই দুর্গটিরই। সমুদ্রপথে বাংলার খাঁড়িতে প্রবেশ করে তিনি বজবজের দুর্গের সামনে জাহাজ দাঁড় করালেন। তারপর শুরু হল নাগাড়ে গোলাবর্ষণ। কিন্তু তখন বজবজের দুর্গ প্রায় খালি। এভাবেই শুরু হয়েছিল ইংরেজদের তরফে কলকাতা পুনরুদ্ধারের যাত্রা।
এরপর লড়াই শুরু হল মানিকচাঁদের সাথে। কিন্তু বিপুল ইংরেজ শক্তির সামনে মানিকচাঁদ একা প্রায় অসহায়ের মত দাঁড়িয়ে রইলেন। ইংরেজদের অত্যাধুনিক কামান থেকে গোলাবর্ষণে বেশিক্ষণ দুর্গ রক্ষা করতে না পেরে তিনি মুর্শিদাবাদ অভিমুখে পালিয়ে বাঁচলেন। এদিকে শূন্য হয়ে গেল ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ। আর জাহাজ থেকে দলে দলে ইংরেজ আবার কায়েম করলো কলকাতা শহর এবং তাদের দুর্গের অধিকার। এই ছিল ইংরেজদের কলকাতা, ফলতা ঘুরে আবার কলকাতায় ফিরে আসার ইতিহাস। এই যাত্রাপথটা খুব সহজ ছিল না তাদের জন্য। নিজেদের দেশ ছেড়ে এই সুদূর ভারতবর্ষের মাটিতে জমি দখলের লড়াইটা তাদের কাছে ছিল অনেক বড় লড়াই।
মুর্শিদাবাদের মাটিতে ঘুরতে ঘুরতে বারবার মনে আসছিল সেই দিনটার কথা, যেদিন কলকাতা পুনরুদ্ধারের লড়াই তে ইংরেজরা জিতে যাওয়ার পর মুর্শিদাবাদের কফিনে প্রথম পেরেকটি পোঁতা হয়েছিল নিঃশব্দে। কলকাতা থেকে বহুদূর হলেও আজও মুর্শিদাবাদের মাটি যেন এইসব কিছুরই সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু তখন নবাব সিরাজউদ্দৌলার সেই দূরদর্শিতা ছিল না যেখানে তিনি ইংরেজদের মনোভাব আগে থেকে পড়ে নিয়ে সেই মতো যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গুছিয়ে নিজের নগরীকে রক্ষা করতে পারবেন। কারণ আর যাই হোক সিরাজ তার দাদু আলীবর্দী নন।
ইংরেজরা কলকাতা দখল করার পর ওয়াটসন ও ক্লাইভ এর মধ্যে দুর্গের কর্তৃত্ব নিয়ে শুরু হয় এক মতবিরোধ। যদিও সবকিছুর পর ক্লাইভই হয়ে ওঠেন কলকাতার সর্বেসর্বা। এবং ফের দুর্গের দায়িত্ব পান ড্রেক সাহেব। এভাবেই উত্থান হয় ভারতবর্ষের মাটিতে এক দোর্দণ্ডপ্রতাপ, একগুঁয়ে ও কুচক্রী, আগ্রাসী ইংরেজ শাসকের, যার নাম লর্ড ক্লাইভ।
কিন্তু কলকাতা দখলের পর ইংরেজরা হয়ে ওঠে অনেক ভয়ানক। তখন আর তাদের প্রথম দিকের মত নবাবের দরবারের সেই নরম মনোভাব নেই। যেভাবেই হোক নবাব কে শিক্ষা দেওয়া এবং তার হাত থেকে বাংলার দখল করে কেড়ে নেওয়াই তখন তাদের প্রধান উদ্দেশ্য। আর সেই মতো তৈরি হলো আগামীর ব্লু প্রিন্ট। সেখানে হুগলী দখল থেকে মুর্শিদাবাদ অভিমুখে যাত্রার সমস্ত পরিকল্পনা লিখিত হল অন্দরমহলে। আর সেই মতো শুরু হলো ক্লাইভের নেতৃত্বে নবাবের বিরুদ্ধে ইংরেজদের এক যুদ্ধ। কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গের ভেতর ড্রেক, ওয়াটসন ও ক্লাইভ একত্রে সেদিন মুষ্টিবদ্ধ করে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে।
এরপর থেকে নবাবের জন্য শুরু হলো এক অন্য লড়াই। সেই লড়াইতে তিনি যেন বড়ই একা। মুর্শিদাবাদের অন্দরমহল তখন তাকে পছন্দ করে না। শুধু নিজের কয়েকজন হাতেগোনা বিশ্বস্ত সেনাপতি ছাড়া বাকি সম্পূর্ণ নগরী তখন তাঁর বিরোধিতায় ব্যস্ত৷ আর সেই অবস্থায় তিনি বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত খবর পেলেন ইংরেজদের তরফে ফের কলকাতা দখলের।