T3 || লক্ষ্মী পুজো || সংখ্যায় কৌশিক চক্রবর্ত্তী

আলপনার আলোঘরে
“এসো মা লক্ষ্মী বসো ঘরে
আমার এ ঘর রাখো আলো করে।। ”
বাংলার প্রাচীন প্রবাদ ও লোককথা। লক্ষীপুজো বাংলার সংস্কৃতির তেমনই এক অঙ্গ। আর লক্ষীপুজো বললেই প্রথম বাঙালির মাথায় যেটা আসে, তা হল আলপনা। সংস্কৃতে ‘অলিম্পন্’ শব্দ থেকে আলপনা শব্দের আগম। আবার লোককথা বলে, আলাপন থেকে আলপনা। অর্থাৎ লক্ষ্মী পুজার রাতে ভক্ত আর ভগবানের আলাপনের মঞ্চই হল আলপনা। ঘরে ঘরে আলপনার বাহার দেখবার মতো। ফুল, পাখি, গাছের শাখা-প্রশাখা থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশি বিদেশি আর্ট ফর্মে আলপনার বিষয়বস্তু বৈচিত্র্যময়।
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন–
“এই সব আলপনায় মানুষ নানা অলংকারের কামনা করে পিটুলির সব গহণা এঁকেছে। সেঁজুতি ব্রতের আলপনায় ঘরবাড়ি, চন্দ্রসূর্য, সুপুরিগাছ, গোয়ালঘর সবই মানুষ এঁকেছে, কিন্তু এদের তো শিল্পকার্য বলে ধরা যায় না – এগুলি মন যা চায় তারই মোটামুটি মানচিত্র।”
আবার তারপরেই তিনি বলছেন –
“কিন্তু দেখছি, মানুষ শুধু সেইটুকু করেই ক্ষান্ত হচ্ছে না ; এবং তার মনও তৃপ্তি মানছে না যতক্ষণ-না শিল্পসৌন্দর্যে সেগুলি ভূষিত করতে পারছে। অথচ কামনা-পরিতৃপ্তির পক্ষে আলপনা সুন্দর হল কি না হল তাতে বড়ো আসে যায় না।”
অর্থাৎ বাঙালির কাছে আলপনা মানে শুধু শিল্পকর্মের নৈপুণ্য আর তার প্রকাশই নয়। আলপনা হল মনের ভেতরের একটা ধার্মিক ও সাংস্কৃতিক বোধের তৃপ্তিবিন্দু।
যে পূর্ণিমার রাতে ভক্তরা নৈবেদ্য ও আলপনা সাজিয়ে সারারাত জেগে থাকেন মা লক্ষ্মীর কৃপা লাভের আশায়, আর কৃপাদায়িনী লক্ষ্মী ভক্তদের দোরে গিয়ে জিজ্ঞাসা করেন “কে জেগে রে?” তাই থেকেই কোজাগরী।
আলপনার গল্প বললেই বলতে হয় শান্তিনিকেতনের কথা। ১৯১১ এবং ১৯১৪ এই দুই সাল এক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ। ১৯১১ সালে রবীন্দ্রনাথের পঞ্চাশতম জন্ম বার্ষিকী উদযাপন। আলপনা দিয়ে সাজানো হলো বিশ্বভারতী প্রাঙ্গণ। সেজে উঠল শান্তিনিকেতন। আর ১৯১৪ সালে নন্দলাল বসু কে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেও পাল্লা দিয়ে সেজে উঠল বিশ্বভারতী। প্রধান উপকরণ সেই আলপনা আর ফুল। এই দুই বারেই শিল্প ভাবনা ও পরিকল্পনা ব্রহ্মবিদ্যালয়ের অধ্যাপক অসিতকুমার হালদার ও তার তিন গুণী ছাত্রের। ১৯০১ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বারে বারে আলপনাকে প্রধান উপকরণ করে সেজে উঠেছে রবীন্দ্রনাথের বিশ্বভারতী। পরে তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নন্দলাল বসু ও তার কন্যাদের অসাধারণ আলপনার কারুকার্য। ১৯১৯ সালে শান্তিনিকেতনে শিক্ষক হিসেবে যোগদান নন্দলাল বসুর। এরপর ১৯২০ সালে অধ্যক্ষ পদে বসে আরো জোর দেন আলপনার কাজ ও শিল্পকর্মের উপর। ১৯২৪ সালে শুধুমাত্র আলপনার দায়িত্ব দিয়ে পূর্ববঙ্গ থেকে রবীন্দ্রনাথ নিয়ে আসেন সুকুমারী দেবীকে। তারপর বিশ্বভারতীর ইতিহাসে শুরু হয় আলপনার এক নতুন অধ্যায়। সুকুমারী দেবীর সাথে যুক্ত হয় নন্দলাল বসুর চিন্তাধারা। সুচিন্তিত সেই সব আল্পনায় ধীরে ধীরে উঠে আসে বাংলার বিভিন্ন লোকশিল্প, আঞ্চলিক লোককথা এবং আলপনার চিরাচরিত পুনর্বিন্যাস। নন্দলাল বসুর দুই কন্যা গৌরী ভঞ্জ ও যমুনা সেন এক্ষেত্রে দুই উল্লেখযোগ্য নাম। শান্তিনিকেতনের আলপনা শিল্পে তাঁদের অবদান কখনোই ভোলবার নয়। ১৯০৭ সাল থেকে কয়েক বছর সারা ভারতের প্রায় বিভিন্ন জায়গায় ঘোরা এবং বিভিন্ন শিল্পকর্মের সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে ফেলা নন্দলাল বসুর পরবর্তী শিল্পকর্মে এক বিরাট প্রভাব ফেলেছিল। এক্ষেত্রে শান্তিনিকেতনেও আলপনার মাধ্যমে বারবার উঠে আসে অজন্তা ইলোরার গুহাচিত্রশিল্প, ভুবনেশ্বরের মন্দির, দক্ষিণ ভারতের শিল্পকলা, বিভিন্ন মন্দিরের গায়ে দেহের ভঙ্গিমা, গয়া, বুদ্ধ গয়া, ফতেপুর সিক্রি এবং আগ্রার বিভিন্ন শিল্পকর্ম। সমস্ত শিল্প কাজে আলপনার মধ্যে দিয়ে এক বিশ্বায়ন ঘটিয়ে নন্দলাল বলেছিলেন “গতিই হলো আলপনার প্রাণ”।
লক্ষ্মী পূজার দিন ঘরে ঘরে আলপনা দেবে গৃহস্থ। সেজে উঠবে বাংলার গ্রাম ও শহরের বিভিন্ন তুলসী মণ্ডপ, উঠোন, জানলা দরজা, চৌকাঠ, ও পুজোর বেদী। মা লক্ষ্মীর আরাধনা হবে সেই সাজানো মঞ্চে। কিন্তু খতিয়ে দেখলে গেলে দেখা যাবে আলপনার ইতিহাস বড়ই পুরনো। আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে হরপ্পা মহেঞ্জোদারোর পাত্রের গায়েও দেখা গেছে বিভিন্ন আলপনার কারুকাজ। এ এমনই এক শিল্প যা হাজার বছর ধরে জুড়ে আছে বিভিন্ন অঞ্চলের অঞ্চলভিত্তিক লোককথা ও সংস্কৃতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে। বিভিন্ন অঞ্চলে আলপনার বিভিন্ন রূপ৷ বিহারে অরিপন, উড়িষ্যায় ঝুঁটি, গুজরাটে সাথিয়া, মধ্যভারত ও রাজস্থানে মণ্ডন বা মাণ্ডানা, মহারাষ্ট্রে ও উত্তপ্রদেশে রঙ্গোলী, উত্তরপ্রদেশের পূর্বাঞ্চলে সোনহা, সানঝি বা সাঁঝি, হিমাচল ও হরিয়ানায় লিথুনুয়া, অন্ধপ্রদেশে মুঙ্গলি, তামিলনাড়ু ও কেরালায় কোলাম বা কোলামঝাঁট্টু, কর্ণাটকে চিত্তারা, পশ্চিমবঙ্গে সেই আবার আমাদের প্রাণের আলপনা।
প্রাচীন বৈদিক শাস্ত্রে অথর্ববেদেও আলপনার উল্লেখ পাওয়া যায়। যদিও তার রূপ ছিল ভিন্ন। অথর্ববেদে যে বিভিন্ন নিয়মের কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে একটি হলো যজ্ঞবেদী বা মণ্ডপকে কেন্দ্র করে তার চারপাশে মন্ডল আঁকা। এই মন্ডল বিভিন্ন আকৃতির হতে পারে। গোলাকার বা চতুষ্কোণ আকারের মন্ডল যজ্ঞবেদীকে ঘিরে রাখত। এই ছিল নিয়ম। ভারতের বিভিন্ন পাহাড়ে গড়ে ওঠা প্রাচীন জনপদগুলোতেও গুহার গায়ে গায়ে দেখা যায় বিভিন্ন আলপনার প্রকার। পশু শিকারের ছবি থেকে শুরু করে বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্রের ছবি আলপনার মতো করে গুহা গাত্রে আজও টেনে রাখে পর্যটকদের চোখ। হাজার হাজার বছর ধরে বদলেছে আলপনার আর্ট ফর্ম। বদলেছে তার ধরনও। গ্রাম বাংলার মাটির দেয়াল ও মাটির উঠোন সাজাতে যে আলপনার ব্যবহার করা হতো তার লোকাচার ছিল আলাদা। বরাবরই আলপনায় বিভিন্ন রূপে ব্যবহৃত হয়েছে প্রকৃতি। গাছপালা ফুল পাখি নৌকা এসবই তার উপকরণ। বাংলার আলপনা ব্রতকথার সাথে জড়িত, যা মেয়েলি মন থেকে উঠে আসে। তাদের কামনা, কল্পনা, নানা কৌতূহল বা জিজ্ঞাসার মত আলপনারও নানা বিষয়। তাই অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন— “সমস্ত প্রাচীন জাতির ইতিহাসেই দেখা যায় আদিম মানুষের মধ্যে বায়ু, সূর্য, চন্দ্র এরা উপাসিত হচ্ছেন– ভারতবর্ষে, ইজিপ্টে, মেক্সিকোতে।সুতরাং বাংলার ব্রতের ছড়াগুলি বাঙালীর ঘরের জিনিস বলে ধরা যেতে পারে।”
ছোটবেলায় দেখা দরজার চৌকাঠে বা দেয়ালে যেসব আলপনা আজও মনে পড়ে তার বেশিরভাগটাই পুজো বা উৎসব উপলক্ষে মা ঠাকুমাদের আঁকা। এতে বিভিন্ন সময়ে ফুটে উঠতো বিভিন্ন সাইন বা সিগনেচার। অদক্ষ হাতের দক্ষ ছোঁয়ায় এইসব আলপনাই আজও লেগে রয়েছে আমাদের চোখে। আজও পিটুলি দিয়ে এঁকে দেওয়া আলপনায় চোখ আটকে যায় সেইসব মাটির দেয়াল এবং চৌকাঠে। নগরায়ন হয়েছে সভ্যতার। যুগ দেখেছে টেকনোলজি। ঠিক তেমনভাবেই আলপনারও বিশ্বায়ন ঘটেছে বারে বারে। আজকাল দোকানে দোকানে আলপনার স্টিকার, রেডিমেড আলপনায় ভরে গেছে বাজার। আমরাও বাজার থেকে কিনে আনছি লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ অথবা পূজোর বেদীর আলপনার জন্য বিভিন্ন রেডিমেড স্টিকার৷ কিন্তু সেসবের ভেতরেই কোথায় যেন লুকিয়ে আছে সম্পূর্ণ ইতিহাসটা। সেখানে আজও ফুটে ওঠে গ্রাম বাংলার ঘর বাড়ি ও লক্ষী পূজোর রাত। সেখানে অতি আধুনিকতার মধ্যেও কেউ পাঁচালী হাতে আজও পড়ে –
‘দোল পূর্ণিমার নিশি নির্মল আকাশ
মন্দ-মন্দ বহিতেছে মলয় বাতাস।।
লক্ষ্ণীমা’য়ে লয়ে সাথে নারায়ণ
মলয় পর্ব্বতে বসি করে আলাপন।।’