অনুগল্পে কবিতা চক্রবর্ত্তী

আত্মজ

অফিস থেকে রাতে বাড়ি ফিরেই ‘মা, মা কোথায় গেলে তুমি’– বলে বাড়ি মাথায় করে তুললো আকাশ। রান্নাঘর থেকেই সুজাতা জবাব দিলো, এই তো রান্নাঘরে। রাতের খাবার তৈরি করছি। ছোটো বোনও পড়া ছেড়ে উঠে এসে জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়েছে রে দাদা? কিছু খুশির খবর আছে নাকি?

রান্নাঘরে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে আকাশ বললো, জানো তো মা, আজ আমি মিলির সাথে ওদের বাড়ি গেছিলাম। ওর বাবা মা কি ভালো মানুষ! একদম নিজের মত মনে হচ্ছিল। কত আদর যত্ন করলেন দুজনে আমাকে।
সুজাতা কপট রাগ দেখিয়ে বললো, কতদিন বলেছি একবার মিলিকে আমাদের বাড়িতে আন। দেখি মেয়েটা কে একবার এখনও আনলি না। আনবো আনবো। মিলির বাবা বললেন, খুব শিগগিরই ওনারা আসবেন আমাদের বাড়িতে তোমাদের সাথে দেখা করতে, আর বিয়ের প্রস্তাব দিতে। তখন মিলিকেও আসতে বলবো। তোমরা ওকেও দেখে নিও।

সুতপা হেসে বললেন, ঠিক আছে, আমি তোর বাবাকে সব বলে রাখব। উনি তো আবার ওনার লেখাপড়ার জগৎ ছাড়া সংসারের কিছুই খবর রাখেন না। সব আমাকেই দেখতে হয়।

দুই সন্তান আকাশ আর সোমা কে নিয়ে অধ্যাপক অনিমেষ চ্যাটার্জীর সুখী সংসার। অনিমেষ বাবু একজন অতি সজ্জন ব্যক্তি। ছেলে মেয়েকে উনি নিজের মনের মতো করে মানুষের মতো মানুষ করেছেন। তার মতো আদর্শবান, সৎ চরিত্রের মানুষ আজকালকার দিনে খুব কম পাওয়া যায়। চিরদিনের নির্বিবাদী মানুষটির অবসরের পর বেশিরভাগ সময় কাটে বাড়ির ছোট্ট লাইব্রেরীতে আর গাছেদের সাথে। উপযুক্ত সাথী সুজাতা কে সংসারের সমস্ত দায়িত্ত্ব দিয়ে তিনি পরম নিশ্চিন্তে থাকেন।

নির্দিষ্ট দিনে মিলি, তার বাবা মায়ের সাথে আকাশদের বাড়িতে এলো। আকাশ দরজা খুলে ভিতরে আসতে ও বসতে বললো। বাবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো, ইনি মিস্টার অনিন্দ্য রায়, মিলির বাবা। আর ইনি মিলির মা।
মিস্টার রায় পরিচয় দিলেন, আমি একজন বিজনেস ম্যান, আর ইনি আমার স্ত্রী। আমাদের একমাত্র সন্তান মিলি।

সুজাতা রান্নাঘরে ছিলেন। ট্রে-তে করে সরবত নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। মিলির বাবাকে দেখে চমকে উঠলেন সুজাতা। চোখের সামনে অন্ধকার হয়ে গেলো। আকাশ কোনরকমে মাকে ধরে ফেললো। চোখে মুখে জল দিয়ে দিল। অতি কষ্টে নিজেকে সামলে নিলেন। মিলি প্রনাম করলো। একটু মাথায় হাত দিয়ে বললেন, ভালো থেকো সারাজীবন। আর বসতে পারলেন না। সবার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নিজের শোবার ঘরে চলে গেলেন। অনিমেষবাবু ওদের কাছে ক্ষমা চেয়ে বললেন, ওর তো খুব প্রেসার। হয়তো শরীর খুব খারাপ করছে। কিছু মনে করবেন না, আর একদিন এই বিষয়ে নিশ্চয় আমরা কথা বলবো।

মিস্টার রায় সেই যে মাথা নিচু করে বসেছিলেন, আর একটাও কথা বললেন না। হঠাৎ করে পরিবেশটা কেমন যেনো হয়ে গেলো। ওরা চলে গেলে, অনিমেষ বাবু সুজাতার মাথায় পরম ভালোবাসায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, কি এমন হলো তোমার? খুব কি শরীর খারাপ হয়েছিল তখন? সুজাতা বললেন, দরজাটা বন্ধ করে দাও। তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে।
রাতে খাবার টেবিলে, অনিমেষ ছেলেকে বললেন, এই বিয়ে হবেনা। তোমাদের কোনোদিন কোনো ইচ্ছের বিরুদ্ধে আমরা যাইনি। সব রকম স্বাধীনতা দিয়েছি। কিন্তু আজ এই বিয়েতে আমি বা তোমার মা কেউ রাজি না। এই বিয়ে হতে পারেনা। আর বাবা মার কাছে কৈফিয়ত চাওয়ার শিক্ষা আমি তোমাদের দিইনি। তাই এই ব্যাপারে আর কোনো কথা এই বাড়িতে হবেনা।

গাড়িতে আসতে আসতে মিলির বাবা একটাও কথা বললেন না। বাড়ি ফিরে একটাই কথা বললেন, এই বিয়ে আমি মেনে নেব না। এই বিয়ে হতে পারেনা। আমাকে আর কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করবে না। আর আমাকে কেউ ডাকবেনা। এই কথা বলে ঘরের দরজা আটকে দিলেন ।

কি এমন হলো? মা মেয়ে দুজনেই হতবাক। শরীর খারাপ তো কারুর হতেই পারে। তারজন্য বিয়ে হতে পারেনা? আকাশ পাতাল ভাবতে লাগলো মা মেয়ে।

ঘরের ভিতরে ঢুকে নিজেকে আর সামলাতে পারলেন না অনিন্দ্য । মাথার মধ্যে যেনো হাতুড়ির বাড়ি পড়ছে। বুকে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। নিজের ওপর ঘেন্নায়, মনে হচ্ছে আত্মহত্যা করে ফেলি। আজ যে তিনি একটি মেয়ের পিতা। অনুভবটা আরো বেশি করে করতে পারছেন, আর একটা মেয়ের কষ্ট।
সমস্ত শক্তি দিয়ে খাটের নিচ থেকে অনেক পুরনো একটা ট্রাংক বের করলেন। ওনার কিছু পুরোনো জিনিস থাকে তাতে, ধুলো ঝুল ভর্তি। কেউ কোনোদিন হাত দেয় না। একদম নিচে একটা খাতার মধ্যে থেকে বের করলেন, হলুদ হয়ে যাওয়া একটা চিঠি।
তাতে লেখা…

অনিন্দ্য,
আমি তোমার সন্তানের মা হতে চলেছি। কাপুরুষের মতো সেই সন্তানের দায় অস্বীকার করে আমাকে বিয়ে করতে রাজি হলেনা। চূড়ান্ত অপমান করলে আমাকে। ভেবেছিলাম এই অসম্মানের জীবন রাখবো না। কিন্তু আমাকে সেই অসম্মানের গ্লানি থেকে রক্ষা করতে একজন মানুষরূপী ভগবান আমার জীবনে এসেছেন। যিনি সসন্মানে আমাকে গ্রহণ করেছেন। আর আমার সন্তান তার পরিচয়েই পৃথিবীর আলো দেখবে। তার শিক্ষায় শিক্ষিত হবে।
সুজাতা।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।