T3 || শক্তি চট্টোপাধ্যায় || স্মরণে কৌশিক চক্রবর্ত্তী

‘শক্তি’ জানেননা এমন কোন শক্তি নেই

তখনও ‘এপিটাফ’ দখল নেয় নি পৃথিবীর। অবচেতন মনে আনাচেকানাচে উঁকি দিচ্ছে ‘আমি ধর্মেও আছি, জিরাফেও আছি’। রাত’কে রাতের চোখেই দেখবো বলে যখন প্রথম ভাবনাচিন্তা শুরু, তখন থেকেই ‘শক্তি’র প্রবেশ। ১৯৯৫ সাল (কবির মৃত্যুর বছর) পর্যন্ত আর যাই করি না কেন, কবিতার মতো কবিতা একটাও লিখতে শিখিনি। তাই আমার সাথে পূর্ণাঙ্গ শক্তির ‘হাংরি’ কবিতার পরিচয় তাঁর মৃত্যুর অনেক পরেই। আধুনিক কবিতায় এক আশ্চর্য ‘টুইস্ট’ হল কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়। বাংলা ভাষায় লিরিকধর্মী কাব্যসৃষ্টিতে তাঁর যুগপৎ নিবেদনগুলি সমসময়ই অদ্ভুত ভাবে আমায় টেনে রাখে। মিলে যায় শরীর ঘেঁষা মাটির গন্ধটাও। দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ‘ধপধপি’ গ্রাম থেকে ‘বহড়ু’ গ্রাম বড়জোর ২০ কিমি পথ। প্রথম গ্রামটি আমার পিতৃঘর আর দ্বিতীয়টি কবির। এই সমান্তরাল মিশে যাওয়া রেখাটিকে আজ অনুভব করি কবিতার জন্য, ‘হাংরি কবি’ শক্তির আঙ্গিকে।
শক্তি চট্টোপাধ্যায় একটা আকাশ। খুব সোজাসুজি মুখের ওপর সত্যি কথা বলতে পারা একটা স্বয়ম্ভূ পৃথিবী। প্রথম জীবনে মলয় রায়চৌধুরী, সমীর রায়চৌধুরী ও দেবী রায়ের সাথে ‘হাংরি জেনারেশন মুভমেন্ট’এ অংশগ্রহণ থেকে পরবর্তীতে সুনীলের ‘কৃত্তিবাস’ – কবির হাত ধরে হাঁটতে গেলে ঘুরতে হয় সমাজের প্রত্যেকটি সমান্তরাল সরণিগুলো। রীতিমত ইস্তেহার প্রকাশ করে বাংলা শিল্প ও সাহিত্যের স্থিতাবস্থা কাটানো ছিল হাংরি মুভমেন্টের উদ্দেশ্য। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী পাটনা থেকে প্রকাশ হয় প্রথম ইস্তেহার। কিন্তু পরে ১৯৬৩ সালে মতাদর্শের ভিত্তিতে ‘হাংরি জেনারেশন’ ত্যাগ করে কবি যুক্ত হন সুনীলের কৃত্তিবাস’এ। বাকিটা সর্বজনবিদিত।
একদিন নিকট কবিবন্ধুর কাছে শুনছিলাম সুনীল ও শক্তির কিংবদন্তীতুল্য বন্ধুত্ব সম্পর্কের বাঁকগুলো। কৃত্তিবাসে কবিতাবাছাই থেকে শান্তিনিকেতনে কবিতার জন্য লড়াই – প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁরা সপ্রতিভ। সম্প্রতি ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’র তথ্যসূত্র ধরে জানা গেল সুনীলজায়া স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায়ের কলমে সুনীল-শক্তি বন্ধুত্বের চিরকালীন মোড়গুলোও। তাঁদের জীবনের কাহিনীগুলো ছুঁয়ে যায় ৬০এর দশকের প্রতিটি পর্যায়। শক্তি ছিলেন সেই দশকে দাপিয়ে বেড়ানো কবি। ১৯৪৮ সালে গ্রাম থেকে বাগবাজারে মামাবাড়ি আগমন। তারপর গঙ্গার জল গড়িয়েছে যে গতিতে, শক্তির উত্থানও ঠিক তেমনই। কলেজ জীবনে বাম রাজনীতি থেকে ১৯৮৩’র সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার। গণআন্দোলনের রুক্ষ জমিতে দাঁড়িয়েও তাঁর ভালোবাসবার ‘শার্প কর্নার’ গুলো যত চিনেছি, ততই জমাট বেঁধেছে আধুনিক কবিতার সঙ্গে সম্বন্ধ, ততই যেন কাছ থেকে দেখতে শিখেছি মানুষ ‘শক্তি’কে।
কোন কোন কবি দৃঢ় পাঁচিল ভেদ করতে পারেন খুব অনায়াসে। রোমান্টিকতার লক্ষ্যমাত্রা স্থির করে ছুঁতে পারেন কার্নিশের পিছনে জমে থাকা ফাটল। শক্তি এমনই এক স্বচ্ছতা। কমিউনিস্ট আদর্শে উদ্বুদ্ধ কবি বালোবাসার জন্য বলতে পারেন

“একবার তুমি ভালোবাসতে চেষ্টা করো –
দেখবে নদীর ভিতরে, মাছের বুক থেকে পাথর ঝরে পড়ছে”

আবহমান সময়ের গণ্ডিতে এমন সংযত ভালোবাসবার শব্দ আর কজন উচ্চারণ করতে পারেন? হ্যাঁ শক্তি পারেন। ‘শক্তি’ জানেননা এমন কোন শক্তি নেই। প্রেমের সীমাহীন বিন্যস্তকরণ সেরে কবি আবার দেখাতে পারেন সূর্যাস্তের পরিণতি –

“সকল প্রতাপ হল প্রায় অবসিত…
জ্বালাহীন হৃদয়ের একান্ত নিভৃতে
কিছু মায়া রয়ে গেলো দিনান্তের…”

সদ্য শেষ করলাম কবির আকাদেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত (১৯৮৩) সৃষ্টি ‘যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো’। খুব কাছ থেকে যেন স্পর্শ করলাম কবির একাকীত্বকে। দেখলাম কবি কিভাবে অনায়াসে পৌঁছে গেলেন ‘এপিটাফ’ লেখার বয়সে। সময়ে সময়ে লাগামছাড়াও হয়েছে তাঁর খোলা তরবারি। নিখুঁত অস্ত্রচালনাতেও কবি নিজে রক্তাক্ত হয়েছেন প্রতিনিয়ত –

“আবার সেই
গলা তাক্ করে আঁশবঁটি এগিয়ে আসছে
যুদ্ধ একটা বাঁধবেই”

আবার কত সহজেই শহর কলকাতায় পাতলেন “হাঁড়িয়া মচ্ছব”। শহরের বন্ধকীকরণও তাঁকে ভাবতে শেখালো –

“পাতালরেলের জন্যে কাটা মাটি পাহাড় গড়েছে।
ময়দানের রূপ বদলে হয়ে গেছে সাঁওতাল পরগণা!”
পৃথিবীকে জুগিয়ে যাওয়া তাঁর এই অপার নির্ভরতা পাঠকমনের খোরাক।

নিজে গুটিকয়েক কবিতা লেখার অবস্থান থেকে বলতে পারি মননমানসে নিকষ শূন্যতা জন্ম দেয় একটি কবিতার। আবার কোন কোন কবিতাই কবিকে যোগায় বেপরোয়া নির্ভরতা। কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় তেমনই কবিতাময়। পথে চলা নাগরিক জীবন থেকে প্রেমের অনন্ত পরিণতি – ভাবজীবনের প্রতিটি গভীর তাত্ত্বিকতা যেন থরে থরে সাজানো আছে তাঁর সংকলনগুলিতে। যত এগিয়েছি, ততই অবাক করেছে তাঁর স্বচ্ছ কল্পনাগুলো। সাবলীল রোমান্টিকতায় ঘিরে থাকা কবি কত সহজে বলতে পারেন –

“চারধারে তাঁর উপঢৌকন
কিন্তু আছে স্থির
দুহাত মুষ্ঠিবদ্ধ, কিন্তু ভিতরে অস্থির।”

তাই তাঁর বেশিরভাগ কবিতাই আমার কাছে একএকটি পূর্ণাঙ্গ অস্ত্রভাণ্ডার। কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় শুধু কবি নন। তৎকালীন পরিবর্তিত পরিস্থিতির নিরিখে তিনি একজন দক্ষ ‘liaison’ও বটে। তাঁর মিশে থাকার একাত্মবোধ, স্বাধীনতার আর্তি আজও যে ‘হাংরিইসম’এর জন্ম দেয়, তা যেমন কলম ধরতে শেখায় তরুণ কবিদের, তেমন পাঠকহৃদয়ে গড়ে তোলে একটা দুর্ভেদ্য ‘Self Identity’. অর্থাৎ নিজেকে খুঁজে পাবার ‘শক্তি’।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।