সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (পর্ব – ২১)

কেল্লা নিজামতের পথে

মুর্শিদাবাদের পথ যতটা মসৃণ, ফেলে আসা ইতিহাসটা কখনোই তা নয়। পিছনে ফেলে আসা পথ ধরে যতই এগিয়ে যাচ্ছি কেল্লা নিজামতের পথে, ততই যেন আশপাশ থেকে ঘিরে ধরছে ফেলে আসা মুর্শিদাবাদের মাটি। সেদিনের অনুষ্ঠান শেষ করে যখন ফিরে আসছি গঙ্গা পেরিয়ে আবার হাজারদুয়ারীর দিকে, তখন যেন একটা সময় থেকে ধীরে ধীরে প্রবেশ করছি আর একটা সময়ে। পুণ্যতোয়া ভাগীরথীর একদিকে হীরাঝিল, খোসবাগ, রোশনীবাগ। অন্যদিকে হাজারদুয়ারি, ওয়াসিফ মঞ্জিল, মহিমাপুর, নেমকহারাম দেউড়ি, মিরজাফরের কবর। এই নিয়েই নবাবী মুর্শিদাবাদ। কিন্তু এই যে দুই পাড়ের সমস্ত নবাবী নিশান, তার কিছু আজ যেমন খুঁজে পাওয়াই দায়, তেমনি কিছু এখনও অবিকৃত অবস্থায় বহন করছে নবাব ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জীবন্ত ইতিহাস। একটা অদ্ভুত বিষয় না বলে পারছিনা, আজ মুর্শিদাবাদে তামাম মানুষের ভিড় জমে হাজারদুয়ারীতে। অথচ কটা মানুষ ভাগীরথী পেরিয়ে দেখতে যান ভগ্নদশায় পড়ে থাকা হীরাঝিল? কটা মানুষ কষ্ট করে ছুটে যান হারিয়ে যাওয়ার রোশনীবাগের মাঝখানে শুয়ে থাকা নবাব সুজাউদ্দিনকে দেখতে। অথচ হাজারদুয়ারি তৈরি হয় নবাব সিরাজউদ্দৌলা গত হওয়ার প্রায় ৮০ বছর পরে। তখন মুর্শিদাবাদ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে। নবাব নেহাত কাঠের পুতুল। ইংরেজদের থেকে মাসোহারা পেয়ে দিন চলে তার। এমন অবস্থায় সাহেবদের ইচ্ছেতেই তৈরি হওয়া এক বিশাল ইমারত আজ অদ্ভুতভাবে জায়গা করে নেয় বাঙালি হৃদয়ে। অথচ ভেঙে যাওয়া হীরাঝিল সম্বন্ধে কজনই বা জানেন ঠিকঠাক? সময়ের সাথে সাথে যেন অন্ধ হচ্ছে মুর্শিদাবাদও। বাঙালি হৃদয়ে নবাব সিরাজউদ্দৌলা ‘শেষ স্বাধীন নবাব’ ঢুকে যাওয়ার মত করে বসে গেছে সব স্থাপত্যের চেয়ে বেশি হাজারদুয়ারীর ঐতিহাসিক গুরুত্ব। মুর্শিদাবাদের পর্যটকরা কবে বুঝবেন যে নবাব সিরাজউদ্দৌলা স্বাধীন নবাব ছিলেন না, কারণ এদেশের ইতিহাসে নবাব কোন স্বাধীন পদই নয়। তা দিল্লীর বাদশার নিয়োজিত একটি সুবার অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার মাত্র। ঠিক তেমনভাবেই হাজারদুয়ারী সিরাজউদ্দৌলার সময়ের স্থাপত্য নয়। তার মৃত্যুর অনেক পরে ইংরেজদের পুতুল নবাব ফেরাদুন জা কর্তৃক নির্মিত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক কোর্টচত্বর হলো হাজারদুয়ারী৷ আসলে কেল্লা নিজামতের পথ খুব কঠিন। যে সময়ে চকবাজারে চেহেল সেতুন প্রাসাদে হাজার উৎকণ্ঠা নিয়ে বিচরণ করতেন নবাব মুর্শিদকুলি বা সুজাউদ্দিন, সেই সময়কালটা যেন অচিরেই হারিয়ে গেছে মুর্শিদাবাদের মাটি থেকে। আজকের অক্ষত প্রায় সমস্ত প্রাসাদ গুলোই অনেক পরে নেহাত ইংরেজ স্বার্থে নির্মিত। অন্ধকার বলে আসেনা। আজকের মুর্শিদাবাদেও যেন তেমনই এক নিরবচ্ছিন্ন অন্ধকার। কেল্লা নিজামত খুঁজতে গেলে হারাতে হয় একটা স্বপ্নের মধ্যে। সেই জাঁকজমক, সেই সৈন্য সামন্তের পায়ের শব্দ আজ ভাঙা ইটগুলোর মধ্যে দমবন্ধ হয়ে যেন আটকে পড়েছে বহুকাল৷ গিরিয়া থেকে পলাশী, পলাশী থেকে বক্সার, সবটাই একটা সময়ের ছায়াপথে বন্দী৷ পলাশীর যুদ্ধে হারিয়ে যাওয়া অসংখ্য প্রাণ আজও ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে মুর্শিদাবাদের মাটি জুড়ে। মীরমদন থেকে নবে সিং হাজারী, সকলের কবর আজ অটুট। কিন্তু সেখানেও যেন তীব্র অন্ধকার। ক’জন বীরের খবর আজ ধরে রেখেছে মুর্শিদাবাদ? আর ক’জনের খবরই বা হারিয়ে ফেলেছে নিরবে? পথ চলতে চলতে এই প্রশ্ন বারবার ভিড় করে মাথায়। মাঝে মাঝে কৌতুহল মিটিয়ে মানস দা উত্তর দেয় বিষদে। তিনি বলেন, মুর্শিদাবাদ একটা বিকৃত ইতিহাসের নাম। বারে বারে নিজেদের স্বার্থে পাল্টেছে সেই দিনগুলোর কথা। ঠিক যেমনভাবে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বিপ্লবীদের সামনে দেশমাতৃকার এক বীর সন্তান ও শহীদ হয়ে আত্মপ্রকাশ করেন নবাব সিরাজউদ্দৌলা, তেমন ভাবেই মুছে গেছে নবাব সরফরাজ খাঁয়ের বা সুজাউদ্দিনের সময়কাল। বিপরীতে একটা আচ্ছন্ন সময় আজও ছেয়ে আছে মুর্শিদাবাদের আকাশে। সেখানে সূর্য ওঠে, অস্তও যায়। শুধু নিজের সঠিক অস্তিত্বটুকুর দাবী নিয়ে একা বসে থাকে এককালের সুবিশাল ঝলমলে কেল্লা নিজামত আর হারিয়ে যাওয়া নবাবী মসনদটুকু।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।