T3 || আমার উমা || বিশেষ সংখ্যায় কেয়া চ্যাটার্জি

ইংরাজি ভাষার সৃষ্টি ও উত্থান
ইংরাজি ভাষার জন্ম ও প্রসার সম্পর্কে আলোচনা করার আগে আমাদের আলোচনা করা প্রয়োজন ইংরাজি ভাষার শিকড় সম্পর্কে। প্রতিটি দেশেরই নিজস্ব ভাষা ও নিজস্ব সংস্কৃতি রয়েছে। কিছু দেশের ভাষা সেই দেশের গণ্ডীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ, কিছু ভাষা সীমানা পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক স্তরে। ইংরাজি সেইসব ভাষাদলের অন্যতম ও বলা যায়, প্রধানতম। তবে সব ভাষারই একটি প্রধান মূল থাকে। সেই মূল থেকে নির্গত হয় শাখা মূল, প্রশাখা মূল। অর্থাৎ একটি প্রধান ভাষা থেকে বেরিয়ে আসে আরও অনেক নতুন ভাষা। ঠিক এই কারণেই একেকটি ভাষার মধ্যে উচ্চারণগত, অর্থগত ও ব্যকরনগত মিল থাকে।
এই সাদৃশ্যের ওপর ভিত্তি করে ভাষাবিশারদগণ বহু বছর ধরে গবেষণা চালিয়ে আবিষ্কার করেছেন তিনশত’রও বেশি ভাষা পরিবার। এবার প্রশ্ন উঠতেই পারে, ভাষা পরিবার কী? প্রথমেই বলেছি ভাষার শিকড়ের কথা। ভাষা পরিবার হল সেই শিকড়। অনেকগুলি ভাষার সমষ্টিকে বলা হয় ভাষা পরিবার। একটি ভাষা পরিবার থেকে কালক্রমে স্থান, উচ্চারণ ও সংস্কৃতির তারতম্যের ফলে নতুন নতুন ভাষার সৃষ্টি হয়েছে। তেমনই এক ভাষা পরিবার হল ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবার। এই বিপুল সম্ভারের সবথেকে বেশি চর্চিত ও ব্যবহৃত পরিবার।
১৭৮৬ খ্রিষ্টাব্দে ভাষা বিজ্ঞানী স্যার উইলিয়ম জোন্স ইন্দো ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের উল্লেখ করেন। তাঁর মতে পৃথিবীর অধিকাংশ ভাষাই এই পরিবারের সদস্য। পরবর্তীকালে বিভিন্ন ভাষা বিজ্ঞানীর গবেষণাও সেই কথাই স্বীকার করেছে। মানুষের যাযাবর বৃত্তি যেমন তাঁদের এক স্থান থেকে আরেক স্থানে টেনে নিয়ে গেছে। তেমনই তাঁদের সাথে বাহিত হয়েছে তাঁদের সংস্কৃতি, জীবন যাপন, দর্শন, শিক্ষা, সাহিত্য ও ভাষা। এক জায়গার আঞ্চলিক উচ্চারণের ছোঁয়া পেয়ে সেই ভাষাটি পাল্টে গিয়ে তৈরি হল নতুন একটি ভাষা। আবার মূল ভাষাটির মধ্যে প্রবেশ ঘটল সেই স্থানের কিছু শব্দের যা অঙ্গাঙ্গিভাবে মিশে গেল পুরাতন ভাষাটির সাথে। এইভাবেই ভাষা সৃষ্টি হয়ে এসেছে যুগ যুগ ধরে।
এইবার আরেকটি প্রশ্ন উঠতে পারে, ইংরাজি ভাষা সম্পর্কিত আলোচনায় ভাষা পরিবার নিয়ে কথা ওঠার কারণ কী? অবশ্যই আছে। এবার সেই প্রসঙ্গেই আসব। এই যে, ইন্দো ইউরোপীয় ভাষা পরিবার – এই পরিবার থেকে যেমন জন্ম নিয়েছে জার্মান, স্প্যানিশ, ইংরাজি ভাষা ঠিক সেইভাবেই সংস্কৃত, উর্দু, আরবি, ফারসি ভাষারও জন্ম এই পরিবার থেকে। অর্থাৎ বিদেশী ভাষা ও আমাদের দেশজ ভাষাগুলি একটি সুত্রেই গাঁথা ও একটি পরিবারেরই সদস্য। গবেষকদের মতে ইন্দো ইউরপিয়ান ভাষা পরিবারকে আটটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। সেই ভাগগুলি হল – 1. Indo – Iranian, 2. Balto Slavic, 3. Helenic, 4. Hellic, 5. Celtic, 6. Germanic 7. Albenian ও 8. Armenian. এদের মধ্যে জার্মানিক শাখা থেকে জার্মান, ইংরাজি সহ আরও বেশ কয়েকটি বহুল চর্চিত ও বহুল ব্যবহৃত ভাষার উৎপত্তি হয়েছে। এইবার নিশ্চয় পাঠকের কাছে ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়েছে?
প্রবহমান সভ্যতা, মানুষের বৌদ্ধিক ও জৈবিক চাহিদার জন্য ছড়িয়ে পড়েছে দেশের কাঁটাতার পেরিয়ে বিদেশে। এর ফলে মৌলিক ভাষার অপভ্রংশ ঘটে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন ভাষা। ঠিক এই পদ্ধতিতেই তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক ভাষা ইংরাজি। এই কারণে ইংরাজি সহ আরও বেশ কয়েকটি ভাষা, এমনকি আমাদের মাতৃভাষা বাংলাও মৌলিক ভাষা হিসেবে জায়গা পায় না। বরং এগুলিকে বলা হয় – Synthesis Language।
ইতিহাসের সঙ্গে ভাষার বিবর্তনের একটা নিগূঢ় সম্পর্ক রয়েছে। তাই ইংরেজি ভাষার সম্পর্কে জানার আগে ঘেঁটে দেখতে হবে সেই দেশের ইতিহাস। ইতিহাস অনুযায়ী ব্রিটেন ভূখণ্ডটি প্রথমে ইংরেজদের বসতভূমি ছিলই না। Angles, Jutes, Saxons নামক তিনটি যাযাবর জাতি ব্রিটেন আক্রমণ করে। তারও আগে রোমান জাতি ব্রিটেন দখল করে ও রাজত্ব করে বহু বছর ধরে। আনুমানিক পঞ্চান্ন খ্রিস্ট পূর্বাব্দের ঘটনা। রোমান রাজত্বকালে ল্যাটিন ভাষার প্রভাব দেখা যায় ব্রিটেনের অধিবাসীদের মধ্যে। যাইহোক, রোমানদের চলে যাওয়ার পরে অন্যান্য যাযাবর জাতি অবাধে লুঠপাট চালাতে শুরু করে। যেমন উপরোক্ত তিন জাতি এসেছিল যথাক্রমে ডেনমার্ক, জার্মানি ও নেদারল্যান্ড থেকে। এদের মধ্যে সাক্সন্সরা ব্রিটেনে বসবাস করতে শুরু করে ও ব্রিটেনের আদি অধিবাসীদের নিজের দেশ থেকে বের করে দেয়। তবে উত্তরদিকে অবস্থিত Picts ও Scots অধ্যুষিত ভূখণ্ডটি তারা বা রোমানরাও জয় করতে পারেনি। এই অঞ্চলটিই এখন স্কটল্যান্ড নামে পরিচিত। ৪৫০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে জার্মান জাতি ঢুকে পড়ে ব্রিটেনে। সাক্সন্স ভাষার সাথে জার্মান ভাষার মিশ্রনের ফলে তৈরি হয় একটি নতুন ভাষার যার নাম দেওয়া হয় Anglo Saxon বা Old English। এই রাজত্ব চলে ১১০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। এতদিন পর্যন্ত ব্রিটেনে খ্রিষ্টান ধর্মের কোনও চিহ্ন ছিল না। ষষ্ঠ শতাব্দীতে খ্রিষ্টান ধর্মগুরু সেন্ট অগাস্টিনের হাত ধরে ব্রিটেনে খ্রিস্ট ধর্মের প্রবর্তন ঘটে এবং তার সাথেই ব্রিটেন অধিবাসীর ধর্মীয় গ্রন্থের মাধ্যমে ল্যাটিন, গ্রিক ও হিব্রু ভাষার সাথে পরিচয় ঘটে। অষ্টম শতকে ব্রিটেনে হানা দেয় হিংস্র যাযাবর জাতি ভাইকিং। এদের রাজত্ব ছিল একাদশ শতক পর্যন্ত। এদের হাত ধরে ব্রিটেনের ভাষায় অনুপ্রবেশ ঘটে Scandinavian ভাষার। নরওয়ে, সুইডেন ও ডেনমার্ক এই তিনটি দেশেকে একত্রে বলা হত Scandinavia। সর্বশেষ অনুপ্রবেশ ঘটে ফ্রান্সের। ফ্রান্স-ভাইকিং যুদ্ধে শক্তিশালী দেশ ফ্রান্সের কাছে ভাইকিং জাতি পরাস্ত হয় ও ব্রিটেন ছাড়তে বাধ্য হয়। ১০৬৬ খ্রিষ্টাব্দে ফ্রান্স ব্রিটেনে আধিপত্য বিস্তার করে। এই পর্যায়টি দীর্ঘতম। এই সময় ব্রিটেনের ভাষায় যোগ হয় ফ্রেঞ্চ ও ল্যাটিন ভাষার।
তাহলে দেখা যাচ্ছে, ব্রিটেনের ভাষায় বারবার ঘুরে ফিরে ল্যাটিন ভাষার প্রবেশ ঘটেছে। আবার জার্মান ভাষা যেমন জার্মান জাতির রাজত্বকালে বিস্তার লাভ করেছিল ঠিক একইভাবে ভাকিংদের হাত ধরেও আবার ঢুকে পড়েছিল এই দেশে। কারণ Scandinavian ভাষার একটি বিরাট অংশই জার্মান ভাষার দ্বারা অনুপ্রাণিত। একটি চার্ট বা ছক বানালে স্পষ্টত বোঝা যায় যে, ইংরাজি ভাষার ভিত্তি মূলত ২৯% ল্যাটিন, ২৯% ফ্রেঞ্চ,২৬% জার্মানি, ৬% গ্রিক, ৬% অন্যান্য ভাষা ও ৪% বিশেষ্যপদ বা proper noun। তবে একটা দেশ কি শুধুমাত্র অধিকৃত হওয়ার জন্যই তৈরি হয়েছে? না, তা নয়। এবার সারা বিশ্ব জুড়ে পরিবর্তন ঘটতে লাগল। মানুষ তার চাহিদা বুঝতে শিখল। ঘরের গণ্ডী ছেড়ে তারা পাড়ি দিল বিদেশে। ইংল্যান্ডের অধিবাসীরাও পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকে সমুদ্র যাত্রায় বেরোল। বিজ্ঞান ও সাহিত্যের নতুন দিগন্ত খুলে গেল। বিভিন্ন দেশে ব্যবসা বাণিজ্য বিস্তারের মাধ্যমে তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি ছড়িয়ে গেল পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তে। একইভাবে অন্যান্য দেশের ভাষাও ধীরে ধীরে মিশে গেল তাদের ভাষার সঙ্গে। তবে শুধু ব্যবসা বাণিজ্য করেই তারা সন্তুষ্ট রইল না। তারা শুরু করল উপনিবেশ স্থাপন। এই ঔপনিবেশিকতার মাধ্যমে ইংরাজি ভাষার মধ্যে ঢুকে পড়ল আমেরিকান ভাষা, সাউথ আফ্রিকান ভাষা ও ভারতীয় ভাষা। আবার সেইসব অধীনস্থ দেশেও ছড়িয়ে পড়ল ইংরাজি ভাষা।
একটু বিস্তারিতভাবে আলোচনা করলে দেখা যায় ইংরাজি বেশ কিছু শব্দ যেমন – monk, bishop, priest, mass, church এসেছে ল্যাটিন শব্দ যথাক্রমে monachus, episcopus, presbuter, missa ও cyriacum থেকে। আবার কিছু শব্দ যেমন – telephone, phonograph, appendicitis, character, chorus, cycle, acrobat, atom, harmony, pathos ইত্যাদি গ্রিক সাহিত্যের দ্বারা অনুপ্রাণিত ও ধার করা। ইংরাজি ভাষার একটা বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে ফ্রেঞ্চ ভাষা সেটা আমরা আগেই জেনেছি। এমন অনেক ফরাসি ভাষা ইংরাজি ভাষার সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে গেছে যে তাদের আলাদা করা এখন অসম্ভব। যেমন – prison, castle, chapel, lamp, beast, basin, chef, table, chair, court, lake। তালিকাটি বিশাল বড়। অপরদিকে Scandinavian ভাষা ক্রমে পরিবর্তিত হয়ে এসেছে law, fellow, wrong, outlaw, egg, urge ইত্যাদি শব্দসমূহ। জার্মান ভাষা থেকে ধার করা শব্দগুলি হল – dock, drill, luck, landscape, hustle ইত্যাদি। ইটালিয়ান ভাষার প্রভাব ইংরাজি ভাষার উপর প্রভাব ফেলেছে বহুল পরিমাণে। volcano, stiletto, broccoli, casino, spaghetti, studio, replica ইত্যাদি শব্দ ইটালিয়ান ভাষা থেকে আমদানিকৃত। এইসব দেশ ছাড়াও যে যে দেশের সাথে ব্রিটেনের ব্যবসায়িক, রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক লেন দেন হয়েছে সেই সমস্ত দেশ থেকে শব্দ ভাণ্ডারের লেন দেনও অব্যাহত থেকেছে। যেমন পর্তুগাল থেকে buffalo, mandarin, caste, pagoda, রাশিয়ান ভাষা থেকে mammoth ইত্যাদি। ইউরোপের বাইরের দেশ যেমন আরব থেকে এসেছে zenith, algebra, saffron, cotton; ভারত থেকে যুক্ত হয়েছে yoga, karma, sahib, bungalow, bangle, shampoo; পারসি শব্দগুলি হল azure, jasmin, khaki, shawl। কিছু চৈনিক ও জাপানি ভাষাও নিজের রূপ বদলে ঢুকে পড়েছে ইংরাজি ভাষার মধ্যে। বুমেরাং শব্দটি যে আসলে একটি অস্ট্রেলিয় শব্দ তা আমরা অনেকেই জানতাম না।
ভাষার বিস্তার ব্যাপক ও বিশাল। ভাষা ঠিক নদীর মতো। কখনও থেমে থাকে না। মাঝে মধ্যে অবশ্য থমকে যায় এবং পলি পড়ে বন্ধ হয়ে যায় তার পথ চলা। যেমন বন্ধ হয়ে গেছে ল্যাটিনের মতো একটি শক্তিশালী ও বহুল প্রচলিত ভাষা। তবে ইংরেজি ভাষা যে হারে ও যেভাবে নিজের আধিপত্য কায়েম করেছে বিশ্বময় তাতে সন্দেহ নেই ভবিষ্যতেও এর জয়যাত্রা অক্ষুন্ন থাকবে। বর্তমানে সারা বিশ্বে ৬৭ টি দেশে ইংরাজি ভাষা প্রথম ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তাছাড়াও এমন অনেক দেশ আছে যেখানে ইংরাজি ভাষা দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং কর্মক্ষেত্রেও বহুল জনপ্রিয়। সাম্প্রতিককালের আন্তর্জালের দুনিয়ায় এই বিশাল সংখ্যার ভাষাভাষীদের দ্বারা প্রতিনয়ত তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন শব্দ এবং তা প্রতিদিনই যুক্ত হচ্ছে অভিধানে। ফুলে ফেঁপে উঠছে শব্দ ভাণ্ডার। তাই বলে, মাতৃভাষাকে ভুলে যাওয়া মোটেও কাজের কথা নয়। বিশেষ করে সেই ভাষার জন্য যে ভাষার ভিত থেকে ইমারত পুরোটাই অমৌলিক।
ঋণ স্বীকারঃ
The English Language by C.L. Wrenn
Growth and Structure of the English Language by Otto Jespersen
A Brief History of English Literature by Edward Albert
Critical History of English Literature by David Daiches
English Literature by William J. Long