সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (পর্ব – ২৭)

কেল্লা নিজামতের পথে

হাজারদুয়ারির সামনে দাঁড়িয়ে নবাব সিরাজউদ্দৌলার কথা ভাবছিলাম। গাইডরা কিভাবে বিভিন্ন জায়গায় ভুল ইতিহাস বলে আয়ের রাস্তা পরিষ্কার করে ফেলেছে তা দেখে অবাক হচ্ছিলাম। ছকটা খুব পরিস্কার। মানুষকে বোঝাতে হবে তার মত করেই। ইতিহাসকে পথ দেখায় রাজনীতি। আর রাজনীতিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে ইতিহাস। এভাবেই বারে বারে বিকৃতির শিকার হয়েছে মুর্শিদাবাদও। হাজারদুয়ারি তৈরি করেছে নবাব সিরাজউদ্দৌলা। এমন মিথ থেকে শুরু করে সিরাজউদ্দৌলাকে স্বাধীনতা সংগ্রামের নায়ক হিসাবে মানুষের সামনে তুলে ধরা, সবটাই ইতিহাসের জরাজীর্ণ রূপ। কে লেখে ইতিহাস? কেই বা লেখে ঘটে যাওয়া ঘটনাক্রম? বারে বারে থমকে দাঁড়াতে হয় কোন না কোন জায়গায়। কখনো যেমন বিশ্বাস হয় না কলিজা খাওয়া বেগমের গল্প। আবার তেমনি মন মানতে চায় না খোশবাগের সমাধিক্ষেত্রে ঢাকার কাছে বুড়িগঙ্গার জলে সলিল সমাধি হওয়া আমিনা বেগম ও ঘসেটি বেগমের সমাধি। কিন্তু এসবই রোজ শুনে আসছেন মুর্শিদাবাদে যাওয়া লাখ লাখ পর্যটক ও ঐতিহাস প্রেমী মানুষ।
তখন হাজারদুয়ারীর সামনে দাঁড়িয়ে আছি। এক মা তার শিশু সন্তানকে বলছেন, কলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল যেমন ব্রিটিশ সরকার বানিয়েছে, এই হাজারদুয়ারি তেমন মুর্শিদাবাদ সরকার বানিয়েছে। আমি উপযাচক হয়েই জিজ্ঞাসা করলাম, আচ্ছা ম্যাডাম মুর্শিদাবাদ সরকারটি কে? তিনি তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে তাকালেন আমার দিকে। ভাবখানা এমন যেন তুমি কোথাকার কে হে জিজ্ঞাসা করার? আমার ছেলে, আমি তাকে যা পারবো তাই বোঝাব। কিন্তু আমার তরফে প্রশ্নটার পুনরাবৃত্তি তাকে কিছুটা চমকেই দিল। উত্তরে বললেন, কেন আপনি জানেন না এইসব বাড়িগুলোর নবাব সরকার বানিয়ে গেছে? আবার জিজ্ঞাসা করলাম, আচ্ছা নবাব সরকারটা কে? কোনো গণ্যমান্য ব্যক্তি? এবার মোটামুটি তেড়ে আসার উপক্রম। বিপদে যে কে পড়েছে সেটাই বুঝে উঠতে পারছি না। আমি নাকি জনৈক ভদ্রমহিলা? যাইহোক সেই বিপদের ভ্রূকুটি কেটেও গেল। তিনি বললেন, আরে মশাই নবাব সিরাজউদ্দৌলা বানিয়েছে। আমার কাছেও পরিষ্কার হলো সবটা। সিরাজউদ্দৌলাই মুর্শিদাবাদ সরকার। মুর্শিদাবাদের মানুষ সিরাজউদ্দৌলাকেই চেনে। আর জানে প্রহসনের সেই পলাশীর যুদ্ধ। তাই সবকিছুকেই ওই সিরাজ ব্র্যান্ডিং দিয়েই ভাবতে অভ্যস্ত তারা। সিরাজই বিশ্বায়ন। আর আজকের মুর্শিদাবাদের অর্থনীতিতে সিরাজই নায়ক। তাই ভুল সংশোধনের কোন তাগিদও কোন তরফে নেই। গাইডরাও ভুল বলে, আর মানুষও তার মতো করে বুনে নেয় ইতিহাস। যেমন সিরাজকে নিয়ে ইতিহাস লিখেছিলেন ফোর্ট উইডিয়ামের হলওয়েল সাহেব। বানিয়ে বানিয়ে লিখেছিলেন অন্ধকূপ হত্যার কাহিনী। সে কথা না হয় পরেই বলা যাবে।
কিন্তু সত্যিই কেমন ছিলেন বাংলা বিখ্যাত নবাব মনসুর উল মুলক জং বাহাদুর সিরাজউদ্দৌলা? সেই কথা ভাবতে ভাবতেই পথ হাঁটছিলাম। কিন্তু সামনে পথ অবরোধ। গাড়ি ভরা সব বন্ধ। আজকাল মুর্শিদাবাদের রাস্তায় টাঙ্গার সংখ্যাও খুব কম। যে দুই একটি চলে তাও আর কতদিন চলবে সে বিষয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। তাই এই অবরোধেও যে গাড়িগুলো দাঁড়িয়ে আছে তারমধ্যে আর যাই থাক টাঙ্গা দু একটি। ঘোড়াগুলোও তার তেমনি অবাধ্য। মালিকের ইচ্ছেয় তাদের দৌড় করাতেই নাভিঃশ্বাস ওঠার জোগাড়। ঘোড়া চলে তার মতে আর মালিক চেঁচায় নিজের লয়ে। এ হেন লয় তালহীন অসম বন্ধুত্ব দেখতে দেখতে নিজেই কখন যেন মিশে গেছি মুর্শিদাবাদের সাথে। স্বাধীনতার পর যে অঞ্চল ঢুকে গেছিল পূর্ব পাকিস্তানের ভেতর, আজ সেই ইতিহাসের জীবন্ত জীবাশ্ম শহর মিশেছে ভারতের সাথেই। মুর্শিদাবাদের স্বাধীনতা দিবস ১৭ই আগস্ট। হবে নাই বা কেন? ১৫ ই আগস্ট যে বহরমপুরের মাঠে পাকিস্তানের পতাকা ওড়ে। পরিবর্তে খুলনার মাটিতে ওড়ে ভারতীয় তিরঙ্গা। কিন্তু ১৭ই আগস্ট বদলে যায় ছবি। দেশের অখন্ড অংশ হিসেবে মুর্শিদাবাদ আসে ভারতের সাথে, আর খুলনা পাকিস্তানে। কিছু পাওয়া কিছু হারানোর ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া এসব ইতিহাস আজকের সমাজে কেবলই আলোচ্য।
পথ চলতে চলতে এবং নবাবী আমলে কেল্লা নিজামতের রূপ দেখতে দেখতে কখন যে খিদে তৃষ্ণাও তাদের আসা যাওয়া বন্ধ করে দেয়, তা বোঝার অবকাশই থাকে না। মুর্শিদাবাদকে চিনতে গেলে লাগে প্রবল ইচ্ছা শক্তি। আর লাগে অদম্য জেদ। গাইডদের গল্পের পেছনেও যে কত বড় বড় গল্প অপেক্ষা করছে আপনার জন্য তা একবার ঠাওর করতে পারলে মুর্শিদাবাদ আপনাকে অনেক কিছু দিয়েছে বলেই মনে হবে।
পথ চলতে চলতেই বর্গীদের গল্প বলছিলাম। তাদের আক্রমণে ছত্রভঙ্গ বাংলার কথা বলছিলাম। কিন্তু বলা হয়নি ভাস্কর পন্ডিতের মৃত্যুর কথা। কারণ তাতে বলবার মতো কিছু নেই। আলীবর্দীর এছাড়া উপায়ও ছিল না। তাঁবুতে মিত্রতা ও সন্ধির ছলে ডেকে দুর্ধর্ষ মারাঠা দস্যু নেতা ও তার দলবলের ওপর অস্ত্র সমেত ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের নৃশংসভাবে হত্যা করা ছাড়া বিগত চার বছর ধরে আর কোন পথ দেখেননি আলীবর্দী। তাই গুপ্তহত্যার রাস্তা ধরেছেন। কিন্তু এ আসলে আলীবর্দী চরিত্র নয়। নবাব আলীবর্দীর সাহস ও বীরত্ব সারা দেশে আজও চর্চিত। ঐতিহাসিকরা মনে করেন বর্গী হানার সময় আলীবর্দীর বদলে যদি তার আগের নবাব সরফরাজ সিংহাসনে থাকতেন, তবে বাংলার ভাগ্য যে কোন রসাতলে পরিচালিত হতো তা ভেবেই শিউরে উঠতে হয়। তবু আলীবর্দির মতো বীর এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নবাব বারবার নিজের জান তোয়াক্কা না করে ধাওয়া করেছেন বর্গীদের পেছনে। কখনো গৃহযুদ্ধ, আবার কখনো মারাঠা বর্গী, আবার একাধারে বিহারে আফগান বিদ্রোহ, সব মিলে নবাব আলীবর্দির অন্য কোন দিকে তাকানোর সুযোগও হয়নি কোন মুহূর্তে। কার সঙ্গে সমান তালে পাল্লা দিচ্ছিল আদরের নাতি সিরাজউদ্দৌলার অদ্ভুত সব কার্যাবলী। সে তো আর এক অধ্যায়৷ আজকের দিনে কথা না শোনা অবাধ্য বকে যাওয়া ছেলেদের মত ব্যাপার। যেখানেই যায় সেখান থেকেই রিপোর্ট। তবু সেই দাদুর প্রিয় পাত্র। নিজের অবর্তমানে নবাব হিসেবে একরকম সিরাজের নাম ঘোষণাই করে দিয়েছেন বৃদ্ধ নবাব আলীবর্দী। তাকে আর পায় কে। ভবিষ্যতের এক দীর্ঘ প্রহসানের দিকে তার পা বাড়ানো একদিনে হয়নি৷ এ এক লম্বা প্রক্রিয়া। মুর্শিদাবাদের ইতিহাসকে একদিনে পাল্টে দেওয়ার মতো চরিত্র তার মতো আর কে হতে পেরেছে? কেনই বা সে বিখ্যাত হবে না ইতিহাস বইয়ের পাতা জুড়ে? কেনই বা আজকের মুর্শিদাবাদে তার নামে হবে না বিশ্বায়ন? এক বছরেরও কম সময় নবাব থেকেও আজ ঘরে ঘরে নবাব হিসেবে উচ্চারিত হয় তারই নাম। বিখ্যাত না কুখ্যাত এই তর্ক তুলে রেখে এ কথা মানতে কোথাও কোনো অসুবিধা নেই যে মুর্শিদাবাদ মানেই সিরাজউদ্দৌলা আর সিরাজউদ্দৌলা মানেই মুর্শিদাবাদ। বাকিরা তো সকালের সূর্যের আলোয় হারিয়ে যাওয়া তারাদের মত অস্তমিত প্রায়।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।