সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (পর্ব – ২০)

কেল্লা নিজামতের পথে

একদিন সকাল সকাল গিয়ে দাঁড়ালাম নাগিনাবাদে নবাব সরফরাজ খাঁয়ের জাঁকজমকহীন সমাধিটার পাশে। মুর্শিদাবাদ স্টেশন থেকে খুবই কাছে একটা জনবহুল এলাকায় যুগের পর যুগ শুয়ে আছেন ভাগ্যহীন সরফরাজ। গিরিয়ার যুদ্ধের দু’দিন পরে হাতির পিঠে করে মুর্শিদাবাদে ঢুকেছিলেন আলীবর্দি। একেবারেই বিনা বাধায়। কারণ ততক্ষণে প্রায় পুরো মুর্শিদাবাদ আলীবর্দির কবজায়। সরফরাজের বিস্বস্ত যে’কজন মানুষ মুর্শিদাবাদে টিকে আছেন, তারাও বেগতিক দেখে ঘুরে গেছে আলীবর্দির দিকে। আসলে সেযুগে বদলে যাওয়াটাই যেন ছিল জীবনের অঙ্গাঙ্গী দিক। আর তাই বরাবরই বিশ্বাসঘাতকতা আর ষড়যন্ত্র পিছন ছাড়েনি মুর্শিদাবাদকে। কে যে কার পিছনে সুযোগ বুঝে বিছিয়ে দিয়েছে ষড়যন্ত্রের জাল, তা বুঝে ওঠাই যেন এক মস্ত অধ্যায়। মুর্শিদাবাদ অধিকার করবার পর আলীবর্দি ভুগেছিলেন আত্মদংশনে। প্রভুর পুত্রকে মারতে না চেয়েও যুদ্ধক্ষেত্রে সম্মুখ সমরে তাঁর প্রাণ বাঁচেনি। ফলে মুর্শিদাবাদে এসেও তাঁর আত্মগ্লানি তাঁকে কুরে কুরে খেতে থাকে। ধার্মিক আলীবর্দি মুর্শিদাবাদে এসেই ছুটে যান সরফরাজের পরিবারের কাছে। নিজের সমস্ত পাপের বোঝা বুকে নিয়ে ক্ষমা চান। কিন্তু অন্ধকার পিছু ছাড়েনি মুর্শিদাবাদের। নবাব সরফরাজও এই অন্ধকারের এক আচ্ছন্ন পথিক।
এসব হাজার কথা ভাবতে ভাবতে সন্ধে হয়ে গেছে। কখন যে খিদের জ্বালায় পেট কাঁদে তা যেন ঠাওরই হয় নি। একটার পর একটা সৌধ এবং সমাধি দেখতে দেখতে এগিয়ে যাওয়া। আর তার সঙ্গে ধীরে ধীরে সময়ের হাত ধরে ঘুরে আসা সেই নবাবী মুর্শিদাবাদে। আমার এই অসামান্য অভিজ্ঞতার সঙ্গী বেশ কয়েকজন। আগেই অরুণদা, মানসদার কথা বলেছি। এবার আরেকজন মানুষের কথা বলব। দিনটা ছিল ২৩ শে জুন। অর্থাৎ পলাশী দিবস। আমিও আমন্ত্রিত সমর্পিতাদির সিরাজ উদ্যান উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে। ও সমর্পিতাদির কথা আগে বলা হয়নি না? তিনি এক আশ্চর্য চরিত্র। এই উত্তর আধুনিক যুগে দাঁড়িয়ে তিনি মুর্শিদাবাদের মাটিতে এক জীবন্ত বিস্ময়ই বটে। কলকাতার ঝলমলে অভিনয় জগত ছেড়ে তিনি প্রায় স্বেচ্ছা নির্বাসনের মত বেছে নিয়েছেন এক আশ্চর্য জীবন। এখানে তাঁর সাথে বেঁচে থাকেন শুধু নবাব সিরাজউদ্দৌলা এবং তার আনুষাঙ্গিক সমস্ত পার্থিব উপকরণগুলো। হ্যাঁ দুটো সময় যেন মিলেমিশে যায় তাঁর হাত ধরে। প্রথম যেদিন তাঁর কথা শুনি, সেদিন থেকেই আগ্রহ বাড়ছিল ধীরে ধীরে। তিনি নাকি একালের লুৎফুন্নিসা। অর্থাৎ সিরাজের বেগম। যথারীতিই সাক্ষাৎ করার ইচ্ছে থেকে গেছিল বহুদিন। আর ২৩শে জুনের আমন্ত্রণটা যখন তাঁর থেকেই পেলাম, তখন আর তা রক্ষা না করে পারি? ফলতই মিশন মুর্শিদাবাদ। সমর্পিতাদি অর্থাৎ সমর্পিতা দত্ত সিরাজ নিবেদিতা প্রাণ। শুধু নবাব সিরাজউদ্দৌলার স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য তিনি অনেক লড়াই করছেন মুর্শিদাবাদের মাটিতে। সে হীরাঝিল বাঁচাও আন্দোলনই হোক, অথবা সিরাজ উদ্যান স্থাপন বা মুর্শিদাবাদের মাটিতে নবাব সিরাজউদ্দৌলার মূর্তি স্থাপন। সিরাজউদ্দৌলা ভালো না খারাপ সে তর্ক তো বহু চর্চিত। কিন্তু আজকের মুর্শিদাবাদ যে সিরাজউদ্দৌলাকে জড়িয়েই বেঁচে থাকে, আর অর্থনীতির একটা বড় অংশ ওই নবাব সিরাজউদ্দৌলার নামেই আবর্তিত হয় সে কথা এক বাক্যে স্বীকার করে নেয়া যায়। তাই মুর্শিদাবাদ থাকবে আর সিরাজ থাকবে না তা কোনভাবেই মানা যায় না। আর এই লড়াইটুকুই একা হাতে বহন করে নিয়ে চলেছেন সমর্পিতাদি। আজ আমি যাঁর কথা লিখছি, পরে হয়তো আবার এক নতুন ইতিহাস তাকে মনে রাখবে, আর পরবর্তী মানুষ এই বইয়ের পাতা উল্টে খুঁজে পাবে এক নতুন বেগমকে। এই ২৩ শে জুনের অনুষ্ঠানেই প্রথম দেখা আর এক মানুষের সঙ্গে। সৈয়দ রেজা আলী মির্জা। নবাব মীরজাফরের বর্তমান বেঁচে থাকা বংশধর। মুর্শিদাবাদের মাটিতে তিনি সমান জনপ্রিয়ও বটে। মীরজাফরের বংশ, কিন্তু আজকের মুর্শিদাবাদ তাদের ছোটে নবাবকে অন্য চোখেই দেখে। সেখানে হানাহানি নেই, ঘৃণা নেই, ষড়যন্ত্র নেই। কথাবার্তাতেও যথেষ্ট আন্তরিক মির্জা সাহেব। পলাশী দিবসের অনুষ্ঠানে অতিথি তিনিও। নবাব মীরজাফর ছিলেন অনন্যোপায়। পলাশীর পর মুর্শিদাবাদের পট পরিবর্তনের বিভিন্ন সময়ে ইংরেজদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে কাঠের পুতুলের মত একটি যন্ত্রে পরিণত হন তিনি। রক্তমাংসের মানুষ বটে, কিন্তু আসলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পুতুল হয়েই জীবন কেটে যায় তার। সে কথা না হয় পরেই বলবো। কিন্তু মির্জা সাহেবকে দেখে নবাবী সময়ের অনেকটা যেন চোখের সামনে এসে পড়ে। একটা কুয়াশা ঘিরে ধরে দুচোখের চারপাশ। ধীরে ধীরে অন্ধকার নামে। আর কেউ এসে যেন জোর করে অবরুদ্ধ করে স্বাভাবিক নিঃশ্বাসটুকু। পাশ থেকে যেন কেউ বলে ওঠে আজকের মুর্শিদাবাদ ভালো নেই। পলাশী তৈরি করেছে কলকাতা শহরকে। আর ভেঙে ফেলেছে মুর্শিদাবাদটুকু। আজকের প্রজন্ম তা যেন চোখের সামনে দেখছে এবং বুঝছে একটা যুদ্ধের ফলাফল একটা আঞ্চলিক ইতিহাসকে কিভাবে আপাদমস্তক বদল ঘটিয়ে দিতে পারে। গিরিয়া হয়েছে, বক্সার হয়েছে, উধুয়ানালা হয়েছে, কিন্তু আর একটা পলাশী হয়নি। পলাশীর যুদ্ধ বা সেই প্রহসন যে ইংরেজ স্বায়ত্তশাসনকে কায়েম করেছিল সারা বাংলায়, তারই ফল যেন হাতেনাতে ভোগ করে আসছেন আজও মির্জা সাহেবরা। তিনি আমার সঙ্গে হাত মিলিয়ে ঝরঝরে বাংলায় বললেন, একদিন ঘরে আসুন, আলোচনা হবে। এবার আর মির্জা সাহেবের ঘরে যাওয়া হয়নি। তাই ব্যক্তিগত আলোচনায় অংশগ্রহণ করার সুযোগটুকু তখনো হয়ে ওঠেনি। কিন্তু অনুষ্ঠানের স্মৃতিটুকুই আজ বসে লিখছি নিজের ভালোলাগাটুকু মিশিয়ে। মাঝখানে কেটে গেছে অনেকগুলো বছর। ভাগীরথীর নদী খাতে অনায়াসে বয়ে গেছে অনেক জল। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠার বদলে একেবারে ধূলিস্যাৎ হয়ে গেছে নবাবী মুর্শিদাবাদ। শুধু রয়ে গেছেন মির্জা সাহেব, সমর্পিতাদির মত মানুষেরা। যারা আছেন বলেই বেঁচে আছে মুর্শিদাবাদ। আর আজ প্রায় আড়াইশো বছর পরেও সেই মাটিতেই ধরা আছে বাংলার একটা যুগসন্ধিক্ষণের ইতিহাস।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।