সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (পর্ব – ২৭)

কলকাতার ছড়া 

তখন পলাশির যুদ্ধ দোরগোড়ায়। ক্লাইভের দরবারে ভীষণ খাতির এক আদ্যোপান্ত বাঙালির। হোক না বাঙালি, কিন্তু ফার্সি, উর্দু, আরবি ভাষায় তাঁর অগাধ দখল। কোম্পানির নামে আসা প্রায় সব ফার্সি চিঠিই মুখে মুখে অনুবাদ করে পড়ে দেন তিনি। শুধু তাই নয়, কোম্পানির বিপদ আপদে নবাব বা রাজাদের সামনে অকপটে গিয়ে দাঁড়ানোর জন্যও ডাক পড়ে তাঁর। কিন্তু প্রথমে তাঁর ছিল না এমন খাতির। সবই কপালের গুণ। ছেলেবেলায় বিধবা মাকে নিয়ে ছিল গরিবের সংসার। কিন্তু পরে কলকাতার নামকরা ধনী নকু ধরের হাত ধরে ইংরেজ কোম্পানির সামান্য কেরানি ওয়ারেন হেস্টিংস সাহেবকে ফার্সি পড়ানোর সূত্র ধরেই উত্থানের শুরু নবকৃষ্ণের। বাকিটা তো ইতিহাস। আজকের শোভাবাজার রাজবাড়ীর ইটগুলোও সেই ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে নিয়ে চলেছে। কিশোর নবকৃষ্ণের প্রতিবেশী ছিল চূড়ামণি দত্ত। বনেদি বড়লোক। কিন্তু এক পুরুষে বড়লোক নবকৃষ্ণ চাপিয়ে গেছেন কলকাতার তাবড় ধনীদের। শোভাবাজার রাজবাড়ীর দেউড়ি দিয়ে সেই চূড়ামণি চলেছেন অন্তর্জলি যাত্রায়। বাহকরা সুর করে ছড়া কেটে বলছেন –
“যম জিনিতে যায় রে চুড়ো
যম জিনিতে যায়।
জপতপ কর কিন্তু মরলে জানতে হয়
সবাইকে ফেলে চুড়ো যম জিনিতে যায়
নবা তুই দেখবি যদি যায়।”

নবা অর্থে রাজা নবকৃষ্ণ। চূড়ামনিদের চোখের সামনে বেড়ে ওঠা নবকৃষ্ণই পরে শোভাবাজারের রাজা নবকৃষ্ণ দেববাহাদুর। এই আকস্মিক উত্থানের পেছনে দীর্ঘ ইতিহাস। একসময় এদেশে আসার পর ইংরেজ কোম্পানির পরিত্রাতা স্ময়ং তিনি। সাহেবদের জন্য কী করেননি তিনি। ১৭৫৬ সালে যখন বিদেশী বেনিয়াদের তুমুল স্পর্ধাকে চ্যালেঞ্জ করে মুর্শিদাবাদ থেকে নবাব সিরাজদ্দৌলা এসে একেবারে হালসিবাগানে ছাউনি করলেন, তখনও নবাবকে বোঝানোর জন্য কোম্পানির তরফে ডাক পড়ে তাঁর। উপহার, ভেট হাতে নিয়ে নির্দ্বিধায় তামাম বাংলা বিহার উড়িষ্যার নবাবের সামনে দাঁড়ান তিনি। সওয়াল করেন শান্তিপ্রস্তাবের পক্ষে। কথায় বলে কারও পৌষমাস আর কারও সর্বনাশ। পলাশির আমবাগানে ২৩ বছরের নবাব সিরাজের করুণ পরাজয়ই ছিল কলকাতায় নবকৃষ্ণের সাম্রাজ্যের ভিত নির্মাণ। আজও হয়ত শোভাবাজার রাজবাড়ীর লুকিয়ে থাকা ভাঙা ইট কোম্পানির জয় উদযাপন করে।
তখন প্রায় ১৩ বিঘা ছয় কাঠা পাঁচ ছটাক জমির ওপর তৈরী হয়েছিল তাঁর প্রাসাদ। যদিও পরে বাড়তে বাড়তে তা প্রায় ৩০ বিঘা জায়গায় পরিণত হয়। আজ আলোচনা করা যাক শোভাবাজার রাজবাড়ীর ইটঁকাঠের গভীরে লুকিয়ে থাকা ২২৫ বছরের অজানা ইতিহাস নিয়ে। এই বাড়ির প্রথম মালিকানা ছিল শোভারাম বসাকের হাতে। অনেকে বলেন তাঁর নামে শোভারামবাজারই কালক্রমে শোভাবাজার। অবশ্য মতান্তরও আছে। নবকৃষ্ণের সভা থেকে ‘সভা-বাজার’ সময়ের সাথে সাথে শোভাবাজার – এই মতও শোনা যায়। পলাশীর যুদ্ধে লর্ড ক্লাইভের জয়লাভের পর এই সম্পত্তি আসে নবকৃষ্ণের হাতে। পরে অবশ্য নবকৃষ্ণের ইচ্ছায় আমূল পরিবর্তন হয়ে যায় পুরোনো বাড়িটির কাঠামোয় এবং আয়তনে ও রাজকীয়তায় সেটি হয়ে ওঠে পূর্ণাঙ্গ এক রাজপ্রাসাদ। বাড়ির সাথে পরে নবকৃষ্ণ যোগ করেন নহবতখানা, দেওয়ানখানা, নাচঘর, ডিনার রুম, লাইব্রেরি, তোশাখানা, পর্দানসিন ঘর এবং আরো কত মহল্লা। এমনকি মুঘল আদলে দিল্লী থেকে কারিগর এনে তিনি তৈরী করেন দেওয়ান ই আম, দেওয়ান ই খাস। একেবারে যেন তামাম কলকাতার ঝলমলে বাদশামহল। কাঠের কাজের জন্য জয়পুর থেকে আসে শিল্পী এবং প্লাস্টারের কাজ করেন গৌড়ের বিখ্যাত রাজমিস্ত্রিরা। মহারাজা নবকৃষ্ণের উত্থান বড়োই চমকপ্রদ। প্রথম জীবনে মায়ের সাথে গোবিন্দপুরে কষ্ট করে দিন গুজরানের পর ইংরেজ আনুকূল্যে তৈরী করেন নিজস্ব সাম্রাজ্য। বাবা রামচরণ দেব ছিলেন নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর এজেন্ট বা কালেক্টর। মেদিনীপুরের এক জঙ্গলে তিনি নিহত হন মারাঠা দস্যুদের হাতে। তিন ছেলের মধ্যে নবকৃষ্ণই ছিলেন কনিষ্ঠ। শুধুমাত্র মায়ের চেষ্টায় তিনি ফার্সি ও আরবিতে গভীর জ্ঞানলাভ করেন। নতুনবাজারে সেসময় ধনকুবের ব্যবসায়ী ছিলেন নকু ধর। বুদ্ধিমান নবকৃষ্ণ চাকরির জন্য গেলেন নকু ধরের কাছেই। আর তারপর নকু’র অনুকূল্যেই তিনি ওয়ারেন হেস্টিংসের ফার্সি শিক্ষক নিযুক্ত হন। আস্তে আস্তে হেস্টিংস, ক্লাইভ সকলের সাথে তৈরী হয় নিকট সম্পর্ক। হয়ে ওঠেন কোম্পানির আপনজন। কিন্তু পলাশীর যুদ্ধের পর শুরু হয় তাঁর আসল সুসময়। লর্ড ক্লাইভ দিল্লির সম্রাটের থেকে এনে দেন তাঁর জন্য ‘রাজাবাহাদুর’ খেতাব। এমনকি শোভাবাজার বাড়িতেও দুর্গাপুজো ও অন্যান্য সময় ক্লাইভ বহুবার এসেছিলেন বলে জানা যায়। এই দুর্গাপুজো নিছকই ছিল পলাশির যুদ্ধে জয়লাভের উদযাপন। যুদ্ধের পরে বিজয়ী লর্ড ক্লাইভ সমেত ইংরেজ রাজপুরুষদের খুশি করতেই হবে। সুতরাং বিখ্যাত ‘উইলসন’ রেস্তোরাঁ থেকে আনানো হল ঢালাও খাবার আর পানীয়। সঙ্গে গান, নাচ, বাঈজী, ঠুংরী, টপ্পা – কী নেই সেই আয়োজনে। দেবী দূর্গাও কালে কালে সাক্ষী হলেন এক নতুন বাঙালি মহোৎসবের৷ কলকাতা চিনলো দুর্গোৎসবের চেহারা। পরবর্তীকে কে আসেন নি এই বাড়ির পুজোয়৷ প্রায় সব বড়লাট, ছোটলাট থেকে শুরু করে গান বাজনার আসরে ভোলা ময়রা, নিধুবাবু, রূপচাঁদ পক্ষী বা অ্যান্টনি কবিয়াল, রাম বসুর মতো কিংবদন্তী বাঙালি গায়কেরা। ১৭৭০ সালে নবকৃষ্ণ দত্তক নেন তাঁর বড়দাদার পুত্র গোপীমোহন দেবকে। ১৭৮২ সালে নবকৃষ্ণের সপ্তম স্ত্রীর গর্ভে জন্ম নেন পুত্র রাজকৃষ্ণ। শোভাবাজার রাজবাড়ীর আর একটি প্রসিদ্ধ নাম হলো গোপীমোহন পুত্র রাজা রাধাকান্ত দেববাহাদুর। তিনি অগাধ পান্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন। রাধাকান্তই ছিলেন ভারতের প্রথম ‘নাইট’। তিনি সংস্কৃত এনসাইক্লোপিডিয়া এবং শব্দকল্পদ্রুম প্রণেতা। আজও তাঁর শব্দকল্পদ্রুম সমান জনপ্রিয়। গোপীমোহন ও রাজকৃষ্ণের দুই পরিবার আজও বড় ও ছোট তরফ বলে পরিচিতি পেয়ে আসছে। এমনকি আদিযুগ থেকেই দুই পরিবারে আলাদা দূর্গাপুজোর প্রচলন। রাজা রাধাকান্ত বড়তরফের পুজোয় ছাগবলি বন্ধ করে গেলেও ছোট তরফে তা চলে আসছে পরম্পরা অনুযায়ী। কলকাতার ইতিহাসপ্রেমীরা রাধাকান্ত দেববাহাদুরের নাম কে না জানে। সেকালে গোঁড়া হিন্দু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নেতা রাধাকান্ত প্রত্যক্ষ প্রতিবাদ করেছিলেন রামমোহনের সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের। পরে বিদ্যাসাগর বিধবা বিধবা বিবাহ নিয়ে লড়াই করবার সময়েও সঙ্গে পান নি বিখ্যাত রাজাবাহাদুরকে। বরং বিরুদ্ধে লোকও জুটিয়েছিলেন প্রচুর। সেই তালিকায় ছিলেন বাবু মোতিলাল শীলের মতো মান্যগণ্যরাও। কিন্তু কলকাতার ইতিহাস তাও রাজা রাধাকান্তকে মনে রেখেছে কৃতজ্ঞচিত্তেই। নিজের বাড়িতে বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন থেকে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠায় সরাসরি যোগদান, রাজা বরাবর নেতৃত্ব দিয়েছেন সামনে থেকে। সে এক সময় ছিল বটে। আজকের কলকাতা ফিরে তাকাতে চায় না আর সেই গড়ে ওঠবার সময়টার দিকে। আজ তিলোত্তমা বড়ই ব্যস্ত। এমনকি সেন্ট্রাল এভিনিউতে শোভাবাজারে যে লাল মন্দিরের পাশ দিয়ে রোজ গন্তব্যে বাসে দৌড়নো বাঙালির, তার গায়েও যে লেগে আছে নবকৃষ্ণের নাম, কজনই বা জানেন। রাজবাড়ী থেকে এই মন্দির পর্যন্ত একটি ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গপথ আছে বলেও জনশ্রুতি। যাই হোক, পলাশির যুদ্ধের পরে কলকাতার আধুনিক রূপদানে এই দেববাড়ীর ভূমিকা এতো সহজে শেষ করবার নয়। যদিও বর্তমানে রাজবাড়ীর অবস্থা ভগ্নপ্রায়। দেখে বোঝার উপায় নেই ২০০ বছর পুরোনো জাঁকজমকের দিনগুলো। আর ভেসে আসে না ঠুংরি টপ্পা বা কবিগানের সুর। দেয়ালে এসে পড়ে না ঝাড়বাতির আলো। তবু রাজবাড়ী আছে রাজবাড়ীতেই। কলকাতা কসমোপলিটানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা যেন একখণ্ড পুরনো কলকাতার কড়চা। সিংহদরজা পেরিয়ে প্রাসাদে ঢুকলেই আজও চোখে পড়ে একটি কামান। এই কামানই পলাশীর যুদ্ধে সিরাজের বিরুদ্ধে তোপ দেগেছিলো। আজকের ঐতিহাসিকরা নবকৃষ্ণ ও শোভাবাজার রাজবাড়ীর বিরুদ্ধে ইংরেজ তোষণের সঙ্গত অভিযোগ আনলেও কলকাতার ইতিহাসে এই রাজপরিবারের কথা না বললেই নয়।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।