সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (পর্ব – ৩৭)

কেল্লা নিজামতের পথে
কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম দূর্গ আজও বিদ্যমান৷ কিন্তু আজকের ফোর্ট উইলিয়ামের জায়গায় ছিল না ইংরেজদের তৈরি করা প্রথম ফোর্ট উইলিয়াম দূর্গ। অবস্থানের ফারাক অনেকটা। এটা নিয়ে কলকাতায় খোঁজখবর করেছিলাম কিছুদিন। উত্তরও খুঁজে পেয়েছি সাধ্যমতো। গঙ্গার ধারে আজকের ফেয়ারলি প্লেসে ভারতীয় রেলের কয়লাঘাটা বিল্ডিংয়ের গায়ে চোখে পড়লো একটা ফলক। ইংরাজিটা বেশ ভিন্নধর্মী৷ আজকের লেখা যে নয় তা স্পষ্ট। সেটিই নাকি পুরনো ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গের সীমা। অর্থাৎ সেকালের ফোর্ট উইলিয়ামের অবস্থান বলতে যে জায়গাটি বোঝাচ্ছে তা হল আজকের রিসার্ভ ব্যাঙ্ক, জিপিও, রেল অফিস অঞ্চলটি। ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ পরে জায়গা পরিবর্তন করে। তার কারণ নিয়ে নাহয় পরে আসব।
কিন্তু এই ফোর্ট উইলিয়াম তৈরির সময়টা সাহেবদের কাছে মনে রাখবার মতো। হাজার লড়াই, হাজার বাধা ঠেলে ধীরে ধীরে ইউনিয়ন জ্যাক উড়িয়ে মাথা তুলতে থাকে সাহেবদের প্রথম দুর্গ। তার আগে ছিল অস্থায়ী ভাবে ছুটে বেড়ানো। বাণিজ্যের নাম করে এদেশে আসা লালমুখো সাহেবদের লড়াইটাও নেহাত কম ছিল না। মুর্শিদাবাদকে লুকিয়ে ধীরে ধীরে কলকাতার প্রতিপত্তি বৃদ্ধি ও নিজেদের নিরাপত্তার জন্য ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ, এই ছিল প্রধান উদ্দেশ্য। ইংরেজ সাহেবদের নিজস্ব দুর্গ তৈরি করাটা ভালো চোখে নেয়নি মুর্শিদাবাদ। তামাম বাংলা বিহার উড়িষ্যার অধিপতি হিসাবে সামান্য ভিনদেশী বণিকদের নাকের ডগায় বেশি ঔদ্ধত্যকে নবাব যে সাধারণ ভাবে নেবেন না তা খুব সহজ রাজনৈতিক সমীকরণই বলে দেয়। আর সে নবাব যদি খামখেয়ালি স্বভাবের সিরাজ হন। সিরাজের খেয়ালখুশির ঠিকঠিকানা নেই৷ যখন যা ভাবে তাই করে৷ তার খামখেয়ালিপনার শিকার প্রায় সকলেই। ভরা দরবারে জগৎ শেঠের মতো মানুষকে অপমান করতেও তাকে দুবার ভাবতে হয় না। আর সেখানে বিদেশী বণিক তো তুচ্ছ। কিন্তু তার এই ইংরেজ বিরোধী মনোভাব যে কিভাবে বুমেরাং হয়ে তার দিকেই ফিরে আসতে পারে সে কথা সে কখনো সময় নিয়ে ভাবেনি৷ সাহেবদের আত্মাভিমান অনেক। কিন্তু নবাব তার আঁচ করবেন কিভাবে।
একদিকে দুর্গ আর একদিকে রাজা রাজবল্লভের পুত্র কৃষ্ণবল্লভকে কলকাতায় লুকিয়ে রাখা, নবাবের চোখে সাহেবদের এই জোড়া অপরাধ কোনোভাবে সহ্য হওয়ার নয়৷ সেই থেকেই উভয় পক্ষের শত্রুতা শুরু৷ তার ওপর নাকের ডগায় কাশিমবাজারে কুঠিতে সাহেবদের নিত্য আনাগোনা। সেখানে চলে যন্ত্রণা মন্ত্রণা আর আমোদপ্রমোদ। সেই খবরও গিয়ে পৌঁছলো নবাবের কানে। আর সাথেসাথে নড়েচড়ে উঠে তিনি তৈরি হলেন কাশিমবাজার কুঠি আক্রমণের৷
কথাপ্রসঙ্গে কাশিমবাজারের কথা বলে রাখি। সেইযুগে বাংলায় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কাশিমবাজারের গুরুত্ব অপরিসীম। সেখানে রেশমের ব্যাবসা ছড়িয়ে যায় সারা দেশে। এমনকি বিদেশেও। তাই প্রথম থেকেই বিদেশ থেকে আসা বণিকদের কাছে কাশিমবাজারের গুরুত্ব অনেক। এখানে বারবার ভিড় জমিয়েছে ভিনদেশীরা। ওলন্দাজরা প্রথম এলেও পরে সমস্ত ইউরোপীয় ব্যবসায়ীরা এই জায়গায় কুঠি নির্মাণ করে নিজেদের বাণিজ্যে বসত লক্ষ্মীকে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে সাধ্যমতো। আর ইংরেজদের কাছে এই কাশিমবাজার ছিল একেবারে জোড়া ফলা। একদিকে বাণিজ্যের শ্রীবৃদ্ধি আর একদিকে সেই ছদ্মবেশের পিছনে মুর্শিদাবাদে নবাবের নাকের ডগায় তার ওপর তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ। সব মিলে তাদের রাজনৈতিক মুনাফার দিক থেকে এই জায়গার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। আর সেখানে তাদের জুটেও গেল প্রতিপত্তিশালী ব্যবসায়ী কৃষ্ণকান্ত নন্দীর পৃষ্ঠপোষকতা। সেখানেই তাই তৈরি হয়েছিল বাণিজ্য কুঠি। পক্ষান্তরে মন্ত্রণালয়। সেখানেই ধীরে ধীরে তৈরি হতে লাগলো নবাববিরোধীতার ষড়যন্ত্র। তাই সেদিক থেকে দেখতে গেলে তখন নবাবের প্রধান শত্রু কাশিমবাজার ও কলকাতা। ইংরেজ কোম্পানির শক্ত দুটো ঘাঁটি।
এহেন কাশিমবাজারের কথা নবাবের কানে পৌঁছবে না তা কি হয়? তাই সিংহাসনে চড়বার পরেই তিনি জানতে পারলেন কাশিমবাজারে ইংরেজ চক্রান্তের কথা। আবার ধীরে ধীরে এও জানতে পারলেন যে সেখানে নিত্য যাতায়াত তাঁরই দরবারের কিছু কাছের মানুষজনের। তার মধ্যে জগৎ শেঠ, রাজা রাজবল্লভ অন্যতম৷ ঘষেটি বেগমের ক্ষমতা হ্রাস করার পর থেকেই রাজা রাজবল্লভের ওপর কড়া নজর নবাবের। বিরোধীতার প্রধান ঘাঁটিগুলো তাঁর তখন জানা। কিন্তু সবটা একাহাতে সামলে নেবেন ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে অনুকূলে নিয়ে আসবেন সে ক্ষমতাও তখন তাঁর নেই। তবে সবটা হাতের বাইরে যাবার আগে নিয়ন্ত্রণ যে তিনি করতে চাননি তা নয়৷ কিন্তু তাঁর অপরিণামদর্শীতা ও খামখেয়ালি সিদ্ধান্ত তাঁকে থিতু হতে দেয়নি কোনোদিনই। আর পদে পদে বিরোধিতা সামলাতে তার মাথার ঘাম পায়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
এসবের মধ্যেই ধীরে ধীরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। নবাবের কাছে সেই খবর পৌঁছেও গেছে৷ আর সেই থেকেই ইংরেজবিরোধীতা তাঁর প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে উঠেছে।
এইসব কতকিছু ভাবতে ভাবতে আমি ঘুরে বেড়াচ্ছি হীরাঝিলের ভগ্নাবশেষ বেয়ে বেয়ে। সিরাজের কথা ভাবতে পারতে হীরাঝিলের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতাই আলাদা। দূর দূরান্ত থেকে আমার মত হীরাঝিল দেখতে ছুটে এসেছে বহু মানুষ। কেউ ইতিহাস প্রেমী আবার কেউ নিছক পর্যটকের ভূমিকায়। তার মধ্যেই আমাকে হীরাঝিলের ভাঙা অংশগুলো দেখানোর জন্য পরিশ্রম করে চলেছেন অরুণ দা মানস দারা। কোথাও ভাঙা দালানের অংশ আবার কোথাও ইটের মস্ত ঢিপি। যেন মাটি খুঁড়ে বেরিয়ে আসা এক একটা আশ্চর্য স্তুপ। আর তার ওপরেই দীর্ঘ বাঁশ ও আম বাগান। আমবাগান তখনও ছিল। তার মধ্যেই মাথা তুলেছিল সিরাজের সাধের হীরাঝিল। কিন্তু ধ্বংস হবার পর কেটে গেছে অনেকগুলি বছর। তাই আজ কষ্ট করে চিনে নিতে হয় হীরাঝিলের পুরনো ইট গুলোকে। আমিও বেশ কষ্ট করে চিনে নিতে থাকলাম এই ভগ্নপ্রায় অংশগুলি। তখনই আমার হাত ধরে অরুণদা নিয়ে গেল বাঁশ বনের মধ্যে একটি জায়গায়। বলল চলুন একটা জিনিস দেখাই। কৌতুহলী মনে কি যেন দানা বাঁধলো। আমিও ছুটে গেলাম। বাগানের মধ্যে একটা ইটের স্তুপ দেখিয়ে অরুনদা বললেন, দেখুন দীর্ঘ আড়াইশো বছরেরও বেশি সময় এই স্তূপটি কেউ ভাঙতে পারেনি। একই রয়ে গেছে। যে হাত দিতে গেছে একে ভাঙার জন্য, তার ক্ষেত্রেই নেমে এসেছে বিপদ। কী তার রহস্য কেউ জানে না। আমিও কাছে গিয়ে দেখলাম সেই স্তূপটিকে। নিতান্ত ভাঙাচোরা ইটের একটি নিরীহ ঢিপি। না জানি নবাবের কোন আবেগ আজও মিশে আছে এই ইটের স্তুপ ঘিরে। হীরাঝিল ছিল তরুণ সিরাজের আবেগ। আর সেই প্রাসাদ আজ মিশে গেছে মাটির সাথে। শুধু মাথা তুলে জেগে আছে ওইক’টি ইট। যা আজও ফিসফিস করে কানে কানে শুনিয়ে যায় নবাবের সিংহাসনে বসবার পরে মাত্র কয়েকটি মাসের কথা।