সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (পর্ব – ৩৪)

কলকাতার ছড়া 

হিন্দু স্টুয়ার্ট

গড়ে উঠছে শহর কলকাতা। কতরকম নতুন নতুন তার আদবকায়দা। আদ্যোপান্ত ইউরোপীয় ধাঁচে গড়া একটি ভারতীয় শহর। আর হবে নাই বা কেন। গঙ্গার ধারে পড়ে থাকা অজ পাড়াগাঁটাকে হাতে ধরে একটু একটু করে তৈরি করলো তো সাহেবরাই। কথাতেই মুখে মুখে ফিরত
“ধন্য হে কলিকাতা ধন্য হে তুমি
কতকিছু নূতনের তুমি জন্মভূমি।”
এই নূতনের কলকাতায় মিশে আছে কত আজব ঘটনা, ইংরেজ সাহেবদের সাথে মিশে বাঙালির বারোমাস্যা। ঊনবিংশ শতাব্দীতে কলকাতার গঙ্গার ঘাট। একবার অনুমান করুন তো। প্রতি ভোরে লেগেই আছে শত শত পূণ্যার্থী বাঙালির গঙ্গাস্নান, পালকি, অন্তর্জলি। কিন্তু সেই ভিড়ে যদি দেখেন লাল টুকটুকে গোরা সাহেব ধুতি আর চাদর নিয়ে, কপালে তিলক কেটে, হাতে গোপালমূর্তি স্নান করিয়ে নিজে গঙ্গায় ডুব দিয়ে উঠছেন, কেমন মনে হবে বিষয়টা? সত্যিই এ এক আজব কলকাতার আজব কাহিনী। কিন্তু তা বললে কী হবে। একেবারে ঘোরতর বাস্তব যে। পলাশির যুদ্ধের মাত্র এক বছর পরে তাঁর জন্ম আয়ারল্যান্ডের লিমেরিক শহরে। নবাব সিরাজের মৃত্যুর পর এদেশে তখন ঘটে চলেছে ব্রিটিশ অভ্যুত্থান। সেই সময়ে ১৭৭৭ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে তাঁর ভারতে আগমন। তারপর ভারতীয় কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ধর্মে আশ্চর্য সমর্পণ ও পৃষ্ঠপোষকতা। ঝকঝকে ইংরেজ তরুণটির নাম চার্লস ‘হিন্দু’ স্টুয়ার্ট। কেন এমন অদ্ভুত নাম? বলব। গল্পটা তো শুরু হচ্ছে এভাবেই। সেই সময়টা মিশে রয়েছে কলকাতার গঙ্গার ঘাট, সাহেবের উড স্ট্রিটের বাড়ি এবং সর্বোপরি আজও সাউথ পার্ক স্ট্রিট সিমেট্রির অন্ধকার গোরস্থানে। কথাপ্রসঙ্গে বলি এই সাউথ পার্ক স্ট্রিট গোরস্থানের কথা। আজকের আধুনিক কলকাতায় মিশে থাকা একখণ্ড জলজ্যান্ত ইতিহাস। সে এক ভয়াবহ সময়ের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছিল সদ্য হাতে পাওয়া কলকাতার জমিদার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে ও তার আধিকারিকদের। কোম্পানির জাহাজে বিলেত থেকে চড়ে বসতো শয়ে শয়ে গোরা সাহেব। আট থেকে আশি, কে নেই সেখানে। আর নতুন পরিবেশে মানিয়ে বসবার আগেই প্রতিদিন পঞ্চত্বপ্রাপ্তি হত দলে দলে ইংরেজ সিভিলিয়ানদের। এমনও হয়েছে, কোম্পানির জাহাজে আসা সুস্থ ১৮ বছরের তরুণ সৈন্য একদিন পরেই চোখ বুজেছেন কলেরা বা ম্যালেরিয়ার মতো মারণ রোগে। ফলস্বরূপ ১৭৬৭ সালে কলকাতার কেন্দ্রে জমি নিয়ে তৈরি করা হয় এই সিমেট্রি। সামনে বড়রাস্তার নামকরণ করা হয় বেরিয়াল গ্রাউন্ড রোড। আজকের ঝাঁ চকচকে পার্ক স্ট্রিট। বিশ্বের প্রাচীন নন-চার্চ সিমেট্রি গুলির অন্যতম হল সাউথ পার্ক স্ট্রিট সিমেট্রি। তৈরি হবার পরে পরেই কোম্পানির অফিসার ও কর্মচারীদের মৃতদেহের বিপুল কবরের চাপে জায়গা সংকুলানের অভাবে খুব তাড়াতাড়ি বন্ধও হয়ে যায় এই গোরস্থান। এরপর ইংরেজরা তৈরি করে নর্থ পার্ক স্ট্রিট সিমেট্রি। আজ আর এই গোরস্থানের চিহ্ন নেই। এখানে বর্তমানে অ্যাসেম্বলি অব গড চার্চ স্কুল দাঁড়িয়ে রয়েছে। আজও পার্ক স্ট্রিট তথা কলকাতার ইতিহাস বুকে ধরে কলকাতা শহর তৈরির সময় ব্রিটিশ কোম্পানির লড়াইয়ের দিনগুলোর সাক্ষী দেয় একলা সাউথ পার্ক স্ট্রিট সিমেট্রি।

যাই হোক। ফিরে আসা যাক স্টুয়ার্টের প্রসঙ্গে। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে মাত্র ১৮ বছর বয়সে সাধারণ সেনা হিসাবে যোগদান আর তার সাথে সাথেই ভারতে আগমন। ইংরেজের ইচ্ছেমতো বারেবারে পাল্টেছে কলকাতা। সুন্দরবনের দুর্গম ও ভয়াবহ অংশ থেকে কলকাতা হয়েছে লন্ডনের পরে ব্রিটিশদের সবচেয়ে সুরম্য এবং বড় শহর ও তদুপরি আজকের তিলোত্তমা মহানগরী। কিন্তু আমাদের এই সাধের কলকাতা দুচোখে দেখেছে অনেককিছু। এ শহর দেখেছে সাধারণ একজন সেনাকর্মী থেকে চার্লস স্টুয়ার্টের মেজর জেনারেল হয়ে ওঠা এবং ধীরে ধীরে আপামর হিন্দু বাঙালি ও হিন্দু দেবদেবীকে আপনজন করে তোলা। কলকাতা দেখেছে একজন আইরিশ সেনা অফিসারের প্রবল কৃষ্ণভক্তি। সম্পূর্ণ বিলিতি ভাবধারায় মানুষ একজন মেজর জেনারেল রোজ সকালে যত্ন করে স্নান করান প্রিয় গোপালমূর্তি, সাজান নিজের ইচ্ছেমতো আবার পুজোও করেন একেবারে সনাতন হিন্দু প্রথায়। কত সহজে তিনি বলেন –
“Whereever I look around me, in the vast ocean of Hindu mythology, I discover Piety….Morality…..And as far as I can rely on my judgement, it appears the most complete and ample system of Moral Allegory that the World has ever produced.”
হিন্দু সনাতন ধর্ম থেকে ধর্মান্তরিত হবার ঝোঁক একসময় অনেক দেখেছে এদেশের মানুষ। কোনঠাসা হিন্দু ধর্মের গোঁড়ামি ও ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রতিবাদে দলে দলে হিন্দু ও মুসলিম জনতা মিশনারীদের ছাতার তলায় এককথায় দীক্ষিত হয়েছে খ্রীষ্টের ধর্মে। কিন্তু কোনও ব্রিটিশ সাহেবের এহেন কৃষ্ণপ্রেম সত্যিই খুব কম দেখেছে কলকাতা। তাঁর হিন্দুপ্রীতিই তাঁকে এদেশের মানুষের কাছে শুধু নয়, ইউরোপীয় বন্ধুদের কাছেও পরিচিত করেছিল হিন্দু স্টুয়ার্ট নামেই।
কথায় কথায় আসি স্টুয়ার্টের শিক্ষকতা ও অধ্যাপনা প্রসঙ্গে। ইতিমধ্যে ১৮০০ সালে কলকাতায় ব্রিটিশ কর্মচারীদের দেশীয় ভাষা শিক্ষা ও সংস্কৃতি শিক্ষাদানের জন্য ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন লর্ড ওয়েলেসলী বাহাদুর। বিভিন্ন দিক থেকে বিদ্বান ও গণ্যমান্যরা পড়াচ্ছেন বিভিন্ন বিষয়। রেভারেন্ড ডক্টর উইলিয়াম কেরী সাহেব থেকে শুরু করে মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার, জন গিলক্রিস্ট, তারিনী মোহন, সকলেই অধ্যাপনা করছেন ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে। যোগ দিলেন মেজর জেনারেল চার্লস স্টুয়ার্টও। পড়াতে শুরু করলেন উর্দু ও ফার্সী ভাষা। এই দুই ভাষায় তাঁর অগাধ জ্ঞান৷ নিজের আয় করা প্রায় সমস্ত অর্থই ব্যয় হয়ে যেত হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি ও প্রাচীন ভারতের বিভিন্ন পুরাতাত্ত্বিক স্থাপত্য সংগ্রহ করতে। সাহেবের সে এক অদ্ভুত নেশা। নিজে খ্রীষ্টান হয়েও রীতিমতো ঘুরে ঘুরে জোগাড় করে চলেছেন হিন্দু দেবতাদের মূর্তি, এমনকি প্রায় প্রকাশ্যেই তীব্র সমালোচনা করে চলেছেন খ্রীষ্টান মিশনারীদের। নিজের খরচে একটি পুস্তিকাও লিখে ছাপিয়ে ফেললেন – ‘A Vindication of the Hindoos’.
এই বইতে তিনি ভারতে মিশনারিদের যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন। স্টুয়ার্ট সাহেব লিখছেন – “নৈতিকতার প্রশ্নে মনে হয় না যে হিন্দু ধর্মের প্রতি খ্রিষ্ট ধর্মের কোনো নতুন পথ নির্দেশ দেওয়ার সুযোগ আছে। সভ্য সমাজে জীবনধারণের যে সব নৈতিক আদর্শ ও আচরণ বিধির প্রয়োজন, তার জ্ঞান হিন্দু ধর্ম তার অনুসরণকারীদের খুব ভালো ভাবেই দিতে সক্ষম।” হিন্দু পৌরাণিক আখ্যানগুলি নিয়ে তিনি বলছেন – “হিন্দু ধর্মের আখ্যানগুলির রূপকার্থ না বুঝলে সেগুলির সঠিক অর্থ বোঝা হয় না। পুরানের গল্পগুলি যখন অধ্যয়ন করি তখন আমার মনে হয় যে পৃথিবীর সব থেকে জটিল নৈতিক রূপক ব্যবস্থা বোধহয় হিন্দু মুনি ঋষিরাই তৈরী করে গিয়েছেন।”
হিন্দু সংস্কৃতি, হিন্দু পোশাক তাঁর প্রধান আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। হিন্দু বাঙালি মহিলাদের পোশাক শাড়ি নিয়ে তিনি উল্লাসিত ভাবে লিখছেন – “elegant, simple, sensible and sensual.” এমনকি ইউরোপীয় মেমসাহেবদেরও তিনি গাউন, কর্সেট ছেড়ে শাড়ি পড়তে বলেছেন। এমনই ছিলেন কলকাতার হিন্দু স্টুয়ার্ট। নিজের কর্মক্ষেত্রেও হিন্দু সংস্কৃতির প্রভাব আনতে গিয়ে উর্ধতন অফিসারের কোপে পড়ে সাসপেন্ড পর্যন্ত হতে হয় সাহেবকে। অধস্তন সেনাদের তিলক পরার অধিকার নিয়ে সওয়াল করে বিস্তর ঝামেলা সইতে হয় তাঁকে। কিন্তু থেমে থাকবার পাত্র স্টুয়ার্ট সাহেব নন। মাত্র এক বছরের মাথায় আবার কাজে বহাল করা হয় তাঁকে, প্রোমোশন সমেত।
নিজে ছিলেন সেনা অফিসার। ফলে ঘুরতে হত সারা দেশে। সব জায়গা থেকেই সংগ্রহ করতেন হিন্দু স্থাপত্য। পরবর্তীতে ইংরেজ কিউরেটররা তাঁকে “The Visual Encyclopedia” বলে উল্লেখ করেছেন। ভারতবর্ষের পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন সংগ্রহে তিনি পাইওনিয়ার। পরবর্তীতে প্রায় সকল পুরাতত্ত্ববিদ তাঁর কাজকে মান্যতা দিয়ে আরো এগিয়েছেন। উইলিয়াম ডালরিম্পলের লিখিত “হোয়াইট মোঘল” বইতে স্টুয়ার্ট সাহেবের জীবনী অন্যভাবে উঠে এসেছে। তাঁর মতে সাহেব এদেশীয় এক মহিলাকে সম্ভবত বিয়েও করেছিলেন ও সন্তানও ছিল তাঁদের। যদিও পরবর্তীতে কোনো দলিল বা উইল না পাওয়ায় এই মতের সত্যতা প্রমাণে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। সেইসময় তাঁর উড স্ট্রিটের বাড়িটি পরিণত হয় একরকম পরিপূর্ণ সংগ্রহশালায়। কি ছিল না সেখানে। কেউ দেখতে এলে নিজে আগ্রহ নিয়ে ঘুরিয়ে দেখাতেন স্টুয়ার্ট সাহেব। এমনকি নিজে উপস্থিত না থাকলেও দুজন কর্মচারীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে রেখেছিলেন সবকিছু দেখানোর জন্য। কিন্তু আজ কোথায় সেই সংগ্রহশালা? সাহেব তাঁর প্রিয় কৃষ্ণলোকে যাত্রা করার পর প্রায় ১৪৩ টি বাক্স ভর্তি মূর্তি ও স্থাপত্য কলকাতা থেকে জাহাজে তুলে ব্রিটেনে পাঠানো হয় ইংরেজ কোম্পানির উদ্যোগে। এরপর ১৮৩০ সালে নিলাম হয়ে যায় সমস্ত প্রত্নসামগ্রী। কিনলেন লন্ডনের ধনী গহনা ব্যবসায়ী জন ব্রিজ। কলকাতার নিজস্ব প্রাণের সম্পদ হাতে হাতে ঘুরে চলে গেল ব্রিটিশ মালিকানায়। স্টুয়ার্টের সংগ্রহে দেবদেবীদের মূর্তির সাথে সাথে ছিল অসংখ্য পুঁথি ও অস্ত্র। তাঁর সংগ্রহ একসময় কলকাতায় সবচেয়ে বড় প্রত্ন সংগ্রহে পরিণত হয়। পাল ও সেন যুগের মূল্যবান দেবদেবীদের মূর্তিও যত্ন করে রাখা ছিল বলে জানা যায়।
১৮২৮ সালের ৩১শে মার্চ এই শহরেই ইহলোকের মায়া ত্যাগ করেন হিন্দু স্টুয়ার্ট। সাউথ পার্ক স্ট্রিট সিমেট্রিতে চিরশায়ীত করা হয় তাঁর দেহ। হিন্দু ধর্ম কখনো আনুষ্ঠানিক ভাবে গ্রহণ না করেও হিন্দু দেবদেবীদের সেবা করে ও জপ আহ্নিক করে ধুতি, চাদর গায়ে দিয়ে জীবন কাটিয়েছেন আইরিশ মেজর সাহেব। ভুলতেন না আদ্যোপান্ত বাঙালিদের মতো মুঠে পান দিতেও। এমনই ছিল তাঁর একেবারে ষোলআনা বাঙালি জীবন। তাঁর ইচ্ছেকে মর্যাদা দিয়েই কবরে তাঁর সাথে পুঁতে দেয়া হয় তাঁর প্রাণপ্রিয় গোপাল মূর্তিটিকেও। তাঁর হাত ধরেই খ্রীষ্টান বেরিয়াল গ্রাউন্ডে ঠাঁই হয় হিন্দু দেবতার। আর সমাধি হিসাবে তৈরি করা হয় অসাধারণ একটি মন্দির স্থাপত্য, যা প্রায় পুরোটাই হিন্দু মন্দিরের আদলে জ্বলজ্বল করছে আজও। হরিসাধন মুখোপাধ্যায়ের বইতে আছে – ”এ সমাধিস্তম্ভটি একটি প্রাচীন হিন্দু দেবমন্দিরের ভগ্নাবশেষ। ইহার গাত্রে “ভগীরথ” “পৃথ্বিদেবী” প্রভৃতি খোদিত আকৃতি ও সাধুসন্ন্যাসীর মূর্তি আছে।”
স্বামী বিবেকানন্দ শিকাগোয় ধর্মসভা করে হিন্দু ও বেদান্ত দর্শনের ব্যাখ্যা দেবার প্রায় আশি বছর আগে ইউরোপকে হিন্দু দেবদেবী ও তার দর্শন ভালো করে বুঝিয়ে উঠতে পেরেছিলেন চার্লস স্টুয়ার্ট। সারা বিশ্বে প্রাচীনত্বের ভিত্তিতে ভারতীয় সংস্কৃতির অসীম গুরুত্ব তিনি তুলে ধরেন সাগরপাড়ে। তবু আমরা মনে রাখিনি সাহেবকে। পার্ক স্ট্রিট কবরের এক অন্ধকার দেয়ালের পাশে সাহেব শুয়ে রয়েছেন তাঁর দেবতাকে সঙ্গে নিয়েই। আর তাঁর সমাধি ফলকে আজও লেখা আছে –
“Major General Charles Stuart
(Known as Hindoo Stuart)
1758-1-4-1828
Quarter master of the 1st Bengal European Regiment & later commanded the 10th Andis Regiment.”

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।