সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (পর্ব – ৫)

কেল্লা নিজামতের পথে
লোকে বলত অন্তর্ঘাত। কেউ বলত প্রতিশোধস্পৃহা। আর এই প্রতিশোধস্পৃহাই ছিল তখন দেশজয়ের অন্যতম অস্ত্র। একেবারে মারকাটারি মানসিকতা। গিরিয়ার প্রান্তরে বিহারের শাসনকর্তা আলীবর্দির সাথে বাংলার নবাব সরফরাজ খাঁ হোক বা পলাশির প্রান্তরে ইংরেজ সেনাপতি ক্লাইভ ও ওয়াটসনের সামনে নবাব সিরাজউদ্দৌলাই হোক, ছবিটা পাল্টায়নি। কিন্তু কজন মরে রেখেছে গিরিয়ার যুদ্ধে আলীবর্দির হঠাৎ আক্রমণ আর নবাব সরফরাজ খাঁকে নির্মম ভাবে হত্যা? না। কালের গর্তে হারিয়েই গেল৷ নবাব আলীবর্দি হয়ে উঠলেন বাংলার আকবর। সুশাসক। প্রজাবৎসল। কিন্তু উজ্জ্বল হয়ে উঠলেন এক বছরেরও কম সময় বাংলার মসনদে থাকা সিরাজ। আর ততোধিক উজ্জ্বল হয়ে থাকলো পলাশি আর তার আমবাগান। বাংলায় ইংরেজ শাসনের সূচনালগ্নে এ এক মাহেন্দ্রক্ষণ। ইংরেজরা বাংলা তথা কলকাতা জুড়ে বসেছিল সেই সময় থেকে নয়। তারও অনেক আগে থেকেই৷ কোম্পানির অফিসিয়াল জব চার্নকের কলকাতা শহরে পা দেওয়া থেকে পলাশির যুদ্ধ প্রায় ৬০ বছরের ফারাক। এর মধ্যে ঘটে গেছে বহু উত্থান পতন। অনেক দুর্যোগ মাথায় করে কলকাতার জঙ্গল সাফ করে নগর তৈরি করে ঘরবাড়ি বানিয়েছে সাহেবরা। সে কি আর সহজে ছেড়ে দেবার জন্য? নতুন দেশে নতুন শাসকের সাথে লড়াই করবার সরঞ্জাম ছাড়া তারা এদেশে আসেনি। আর আসবার সাথে সাথে বসিয়েছে নিজেদের জন্য তামাম একটা শহর৷ বাদশার থেকে ফর্মান আদায় করে জমিদারীও পত্তন করে ফেলেছে সেখানে৷ কিন্তু এইসব কিছুকে খুব সাধারণ চোখে নেননি নবাব আলিবর্দী৷ তাই প্রিয় নাতি সিরাজকে বারবার সাবধান করেছিলেন বিদেশী ইংরেজ বনিকদের থেকে। সিরাজের মধ্যেও প্রথম থেকে ঢুকে গেছে সেই তীব্র ইংরেজ বিদ্বেষ। তাঁর হাড়েমজ্জায় সহ্য হয়না এই লালমুখো গোরাদের। অথচ বিদেশী ফরাসি সাহেবদের সাথে তাঁর সুসম্পর্ক। তাঁর দরবারে নিয়মিত আসে ফরাসি সেনাদলের সেনাপতি সিনফ্রে সাহেব। তার সাথে নবাবের বন্ধুত্বকে ভালো চোখে নেয়না কলকাতার ইংরেজরা। এসব মিলিয়ে সবদিক থেকেই একটা মুর্শিদাবাদ-কলকাতা দ্বন্দ্বের পরিবেশ অনেকদিন ধরেই তৈরি হচ্ছিল। তারই শেষ ও চরমতম দিন ছিল ২৩শে জুন ১৭৫৬। অর্থাৎ পলাশির যুদ্ধ।
আমার এই স্বল্পদৈর্ঘ্যের যাত্রাপথে খিদে, তৃষ্ণা, ঘুম সরিয়ে দিতে পারলেই হয়ত ভালো হত৷ কিন্তু সে উপায় কি আছে? প্রকৃতির নিয়মে ফিরতেই হয় ভাঙাচোরা একটা সাদামাটা শহর মুর্শিদাবাদে। যেখানে মাত্র ৭০ টা বছর যেন বাংলার সবচেয়ে উজ্জ্বল একটা অধ্যায়। কিন্তু ধোপে টিকলো কই। অন্তর্ঘাত, চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র, বেইমানি, সব মিলিয়ে অভিশপ্ত মুর্শিদাবাদ৷ আমরাও সেই পথের পথিক। নিজেদের চিনতে হলে শুধু একবার এসে দাঁড়াতে হয় কেল্লা নিজামতের দরজায়। যে জায়গায় এসে সময়ও থমকে দাঁড়ায়। মুর্শিদকুলী গড়েছিলেন। ভেঙেছে ইংরেজ৷ আর মাঝখানে ভাগীরথীর নদীগর্ভে বয়ে গেছে অনেক জল। সেই জলে মিশেছে রক্ত, ভেসেছে শত মৃতদেহ৷
এযাবৎ সবকিছু ঠিক ছিল। যদি হঠাৎ পায়ে এসে না বাঁধত একটা বড় ইট। বিচ্ছিন্নভাবে পড়ে ছিল জঙ্গলে। হ্যাঁ জঙ্গলই। সময়ের সাথে সাথে মাথাচাড়া দেওয়া অজস্র আগাছা। আর তারই নীচে লুকিয়ে থাকা অসংখ্য ভাঙাচোরা ইট৷ নবাবদের সাধের কেল্লা নিজামতের অবশিষ্ট অংশটুকু। আজ লতাপাতার মধ্যে ভগ্নাবশেষে পরিণত। ইটের মাপ সাক্ষী দেয় নবাবী আমলের। পাতলা বাংলা ইট৷ কিন্তু কোনোটাই আস্ত নয়। কোনো না কোনোভাবে ভাঙা। কোন নবাবের শেষদিনগুলোর সাক্ষী বুকে নিয়ে পড়ে আছে তা বলা সত্যিই মুশকিল। কিন্তু এই ইটগুলোই ধরে রেখেছে সময়কালকে। সেযুগের অক্ষত নির্মাণ বলতে আজ আর কটা। মুর্শিদকুলীর কাটরা মসজিদ, সুজাউদ্দিনের ত্রিপলী দরজা, সরফরাজ খাঁয়ের ফৌতি মসজিদ, আর খোশবাগে সিরাজ, আলিবর্দীর কবর ছাড়া আর আছেটাই বা কী? মিরজাফর ও তার পরিবারের কবরও আছে। খুব সুসজ্জিত ভাবেই আছে। কিন্তু তাতে তো লোকে থুথু দেয়, গালিগালাজ করে। এবং তার দাপট এতটাই বেশি যে আজও কখনো কখনো মুর্শিদাবাদে বেশ প্রহসনের মধ্যে পড়তে হয় তার পরিবারকে। তাই পলাশির যুদ্ধের আগের নির্মাণ ও স্মৃতি বলতে ওই কটিই। মুর্শিদাবাদ ঘুরতে যাওয়া মানুষজন সবার প্রথমে হাজারদুয়ারী দেখতে ছুটলেও, এর নির্মাণ পলাশির যুদ্ধের অনেকটা পরে। তখন আর স্বাধীন নেই মুর্শিদাবাদ। ইংরেজ শাসনের তকমা অনেকদিন আগেই লেগে গেছে বাংলার গায়ে। তাই নবাব নাজিম হুমায়ুন জাকে দিয়ে ইংরেজরাই এই বিশাল বাড়িটি নির্মাণ করিয়ে নেন বললে অত্যুক্তি করা হবেনা। এমনকি বাড়িটির আর্কিটেক্টও ছিলেন ইংরেজ সাহেব কর্নেল ডানকান ম্যাকলিওড। নাহলে নবাব বাহাদুরের হাতে বানানো একটা আস্ত বাড়ির দরজার ওপরে কিকরে আজও জ্বলজ্বল করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লোগো? এতো আশ্চর্যের বস্তু বটেই। আসলে পলাশির যুদ্ধের পর থেকেই নবাব পদটি টাকা দিয়ে প্রায় পকেটে পুরে নেয় কোম্পানি। মিরজাফরকে দিয়ে শুরু হয় এই প্রথা৷ নবাবরা ছিলেন ইংরেজ অ্যাপয়েন্টেড একটা পদ মাত্র। রাজ্য ও প্রজাদের থেকে সমস্ত প্রাপ্ত আয় উপায় যেত কোম্পানির হাতে আর নবাবরা পেতেন নির্দিষ্ট করা ভাতা৷ এই ছিল তাঁদের পদের মর্যাদা। এবং প্রতি নবাব পিছু নিয়মিত কমতে থাকে সেই ভাতা। এমনকি পলাশির যুদ্ধের পর পুতুল নবাব মীরজাফরের থেকে সিরাজের কলকাতা আক্রমণের ক্ষতিপূরণ বাবদ প্রায় ১ কোটি ৭৭ লক্ষ টাকা আদায় করে ক্লাইভের দল৷ এছাড়াও মুর্শিদাবাদ থেকে নিজামর আদালতকেও স্থানান্তর করা হয় কলকাতায় ও বিচারক হিসাবে কোন নবাব পরিবারের সদস্যকে ঠাঁইটুকু দেবার সম্মানও দেখায়নি কোম্পানি। উল্টে টাকার হিসাব কম হয়নি পলাশি জয়ের পর। শুধু ইংরেজই বা কেন, সেই পিঠে ভাগে অংশ নেয় দেশীয় রাজা ওমরাওরাও। কেউই বাদ যান নি৷ মুর্শিদাবাদ তথা বাংলার অতুল সম্পদ ভাগ বাটোয়ারা হয়ে গেছে এই বাংলার বুকেই। আর সেইসব সাম্রাজ্যের হারানো ঐতিহ্য বুকে নিয়ে বনেবাদাড়ে পড়ে আছে কেবল ভাঙা ইটগুলোই। এই হয়ত ভবিতব্য। পায়ে এসে না বাঁধলে হয়ত চেনাই হত না বাংলার সাম্রাজ্যের ভান্ডারের বর্তমান রূপ৷ এখনকার নিজামত কেল্লা আধুনিক ইমারতে ভর্তি৷ ইমামবাড়া হোক বা ওয়াসিফ মঞ্জিল, সবই অনেকটাই পরের। পলাশির আগের ইমারত প্রায় অক্ষত একটিও নেই৷