• Uncategorized
  • 0

সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (ইতিহাস কথা পর্ব – ১৬)

শ্রীরামপুরের কথা

অবশেষে ব্যবসায় মুখ থুবড়ে পড়ে আর প্রচুর দেনার ভারে জর্জরিত ড্যানিশ কোম্পানি শ্রীরামপুর শহরকে বাধ্য হয় নিলামে তুলতে। ইংল্যান্ড থেকে মিশনারীরা যখন শ্রীরামপুর নগরীতে পা রাখেন তখনই ডেনমার্ক অধিপতি তাঁদের রক্ষা করবার আর আশ্রয় দেবার যে কথা দিয়েছিলেন তা ড্যানিশরা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে গেছে নিজেদের ধর্ম মনে করে। শ্রীরামপুরে ড্যানিশ রজত্বে তাঁদের ব্যবসায় ভরাডুবি হলেও কেরী সাহেবের নেতৃত্বে মিশনারীদের গায়ে এতটুকু আঁচ পর্যন্ত লাগতে দেন নি তারা। এমনকি সমাধিস্থল থেকে কলেজ প্রাঙ্গন, সমস্ত মিশনারী কর্মকাণ্ডে ড্যানিশ গর্ভমেন্টের সাহায্য ও অবদান মনে রাখবার মতো। একরকম ইংরেজদের চক্রান্তে নিজেদের তুঙ্গে ওঠা বাণিজ্য পুরোদস্তুর বন্ধ হয়ে গেলেও শুধুমাত্র মিশনারীদের কাছে রাজার দেয়া অঙ্গীকার রক্ষা করতে এত বছর শ্রীরামপুর শহরকে নিজেদের আয়ত্তে রেখে দিয়েছিল তারা। কিন্তু দিনে দিনে বাড়তে থাকে দেনার চাপ। কতদিন আর ধারদেনা করে নির্বিঘ্নে পরিচালনা করা যায় আস্ত একটা শহরকে। এদেশে ব্যবসার অভিপ্রায় নিয়ে এলেও ঔপনিবেশিক কোনো ইচ্ছে ড্যানিশদের কোনোকালেই ছিল না। তাই বিশাল মিলিটেন্ট ফোর্সের মালিক শক্তিশালী ব্রিটিশদের পক্ষে এই দুর্বল ড্যানিশদের সম্পত্তি ছিনিয়ে নেওয়া খুব একটা কঠিন কাজ ছিল না।
ব্যারাকপুরে ইংরেজ সেনাছাউনি থেকে সেনা এসে বারবার দখল নিয়েছে শ্রীরামপুরের। পথে বসতে হয়েছে ড্যানিশদের। কিন্তু সবকিছুরই বাঁধ ভাঙে একসময়। ড্যানিশদেরও ভেঙেছিল। তাই ১৮৪৫ সালে শ্রীরামপুর শহরটা মাত্র ১২ লক্ষ টাকায় ব্রিটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দিয়ে ভারতবর্ষের পাট তুলে দেশে ফিরে যায় ড্যানিশরা৷ এদিকে ব্রিটিশ ভারতবর্ষের একটি অংশ হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয় ড্যানিশদের সাধের শ্রীরামপুর। শহরের শাসনও যায় ইংরেজ কোম্পানির হাতে। ফ্রেডরিক্সনগর ফিরে পায় আবার পুরনো নাম। শ্রীরামপুর।
সেযুগের শ্রীরামপুর আদ্যোপান্ত এক ইউরোপীয় শহর। স্রোতস্বিনী গঙ্গার তীরে যেন এক ছোট্ট ইউরোপ। সন্ধে হলেই গঙ্গাতীরে ট্যাভার্নে জ্বলে ওঠে আলো। গীর্জায় বাতি দিয়ে শুরু হয় দৈনিক প্রার্থনা। ১৮০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত সেন্ট ওলাভ চার্চ আজও বাংলার সম্পদ। বাইরে থেকে আসা সমস্ত ইউরোপিয়দের সুবিধার জন্য এই চার্চের ভিত্তিস্থাপন। শহরের বিশপ হেবার সেই সময়ের শ্রীরামপুরকে ইউরোপীয় শহরের সঙ্গে তুলনা করে বলেন- ‘It looked more of a European town than Kolkata.’
শ্রীরামপুর থেকে চলে গেল ড্যানিশরা। কিন্তু রেখে গেল জীবন্ত ইতিহাস। ড্যানিশদের কর্মকাণ্ডের স্থাপত্য আজও ছড়িয়ে ছিটিয়ে বুকে ধরে রেখেছে শ্রীরামপুর। আর রয়ে গেল বাঙালীর নবজাগরণের এক অন্যতম পীঠস্থান শ্রীরামপুর কলেজ ও প্রেস।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।