তোমার সঙ্গে অনেকদিন দেখা হয়নি। ইদানীং বড় বেশী মনে পড়ছে তোমাকে। কেন বলো তো? আমিও এর কোন কারণ জানি না। তবে মনে হয়, তোমাকে আমার কিছু জরুরী কথা বলে ফেলতে হবে। হয়তো তা তোমার কাছে জরুরী নয়। অথবা বলে ফেলার পরে হয়তো আমারও মনে হবে যে, সত্যিই ওটা খুব একটা জরুরী ছিল না। আসলে ‘জরুরী’ কথাটাই তো আপেক্ষিক, তাই না?
তোমার কি মনে আছে, মালীর বাগান নামের একটা বাগানে তোমার গরমের ছুটির দুপুরগুলো কী অসাধারণ রোমহর্ষকভাবে কেটে যেত! ঝোপেঝাড়ে লুকোচুরি খেলতে খেলতে ঝাঁ ঝাঁ রোদে ঘেমে চান করে যেতে। এখন দুপুর কাটে লোহার মালের ইন্সপেকশানে। এখনও পরিশ্রমে ঘাম দেয়। তখনকার ঘামে আর এখনকার ঘামে কত তফাৎ!
(২)
অনিবার্য কারণবশত আজকে একটু ‘ফরাসী ছুটি’ নিয়ে ফেললাম, জানো? রোজ কি ইচ্ছে করে জীবনবিহীন কর্তব্য ঠেলাঠেলি করতে? কতদিন যে লিখিনি! কাল দুই বন্ধুর সঙ্গে তর্কাতর্কি করতে করতে হঠাৎ মনে হল — মরে যাচ্ছি, আমি একেবারে মরে যাচ্ছি। আমার চারপাশে শুকনো কর্তব্য ছাড়া আর কিচ্ছু নেই। এ কী হল আমার? এরই নাম কি জীবন্মৃত্যু? আর সেই মুহূর্ত থেকে সেই বোধ, সেই জীবনানন্দীয় বোধ এই এখনো পর্যন্ত আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। বিশ্বাস করো, সত্যিই ‘সব কাজ তুচ্ছ মনে হয় — পন্ড মনে হয়, / সব চিন্তা — প্রার্থনার সকল সময় / শূন্য মনে হয় / শূন্য মনে হয় ।’ আমারও। আমারও।
(৩)
অফিসে বসে ছিলাম। হঠাৎ পাশের জানলায় একটা কাক। ঠোঁটদুটো ফাঁক করে ঘাড় বেঁকিয়ে আমাকে দেখছে। ফট্ করে মনে পড়ে গেল কাক্কেশ্বর কুচকুচে-বাবুর কথা। ‘হযবরল’-র। একই ভঙ্গী।
সত্যিই তো। এত কাছ থেকে এভাবে কাককে তো কোনদিন ‘Study’ করিনি! ওরও এই মহান বিশ্বযজ্ঞে একটা অংশ আছে। আমার মতই। সেদিক থেকে আমরা দুজনেই সম মানের। অথচ কত আলাদা আমরা। কেউ কারুকে বুঝি না। এখনকার মানুষই মানুষকে বোঝে না; বোঝার সময় নেই। ভীষণ, ভীষণ ব্যস্ত আমরা। তবু গৃহপালিত জীব আর পালক পরস্পরকে খানিকটা বোঝে। কিন্তু কাক তো কেউ পোষে না!
তবু আশ্চর্য দেখ, মানুষের কাছ থেকে তীব্র অবহেলিত একটা পাখিও নিজের জায়গা বজায় রেখে নিজের কাজটুকু করে চলেছে । আর আমি ? তুমি ? তুমি কি কবিতা লিখছো? পুরনো দিনের মতো একটা লাইন নিয়ে ভাবতে ভাবতে সন্ধে থেকে রাত গভীর হচ্ছে? মনোমতো একটা শব্দ খুঁজে পেয়ে লাফিয়ে উঠছো আনন্দে?
আমি জানি। না। বৃত্তটা বড়ো ছোট হয়ে এসেছে।
(৪)
আচ্ছা কৃষ্ণেন্দু, তোমার কি মনে আছে, সুজিতদা একটা কবিতায় একবার এরকম বলেছিলেন — ‘আকাশ ও প্রান্তর কোথাও মেলে না। তবুও দিগন্ত’?
আজ একটা ছবি আঁকতে আঁকতে কথাটা মনে পড়লো। একটা রাতের সমুদ্র আঁকছিলাম। বাতিঘর থেকে আলো পড়েছে সমুদ্রে। আকাশ কালচে নীল। দিশাহীন এক জাহাজ আলোর সন্ধান পেয়ে এগিয়ে আসছে তীরের দিকে। আমাদের অবনত চোখে সব দিগন্তরেখায় মিলেমিশে একাকার।
কবে সেই অন্তর্লীন চোখ পাবো, যা দিগন্তের ওপারে পৌঁছে গিয়ে আকাশের কাঁধে হাত রেখে সমুদ্রের সঙ্গে করমর্দন করবে?
(৫)
“পথিক, তুমি কি পথ হারাইয়াছ ?”
“আমাদের প্রত্যেকের ইঁদুরের মতো মরাই শেষ নয় —
তার পরেও ‘মহত্তম’ ভবিষ্যৎ !”
(৬)
জানো কৃষ্ণেন্দু,
তোমার কবিতা দেখলাম বহুদিন পর। ‘অলিন্দ’ পত্রিকায়। খুব ভালো লাগলো। কবিতাটি তো বটেই, তুমি যে আবার লিখতে পেরেছ এটা ভেবেও। আমাদের কেউ, যারা একটু অন্যরকমভাবে বেঁচে থাকতে চেয়েছিলাম, মাঝে-মাঝে তাদের কেউ যদি মুখ তুলে অস্তিত্ব ঘোষণা করে, তাহলেই মনের ভেতরে ঝর্ণার কলকল। তার বেঁচে থাকাটা তখন আর-সকলের স্বপ্নের প্রতিনিধি হয়ে যায়। হঠাৎ অনেক বড়ো বলে মনে হয় নিজেকে। তুমি জেগে ওঠো, আলোয় স্নান করো। আমরা তো পলিটিক্সে, কর্তব্যপালনে আর ভন্ডামীতে স্রেফ ঘুমিয়ে পড়েছি। অন্তত তুমি যদি একটু আঁকড়ে ধরতে পারো।
(৭)
‘হে প্রিয়তমা, তোমার অনিন্দ্যসুন্দর মুখমন্ডল আমার সম্মুখে উদ্ভাসিত হইয়া উঠুক। তোমার সমগ্র তনুময় কমনীয় লাবণ্য আমার শরীরে শিহরণ বহাইয়া দিক। দুইহাতে তোমার মুখমন্ডল তুলিয়া ধরি; তুমি কপট লজ্জায় চক্ষু আবৃত করিয়া থাকো; তোমার স্থির প্রতীক্ষারত শরীর হইতে উষ্ণ জ্যোতি বাহির হইয়া আসিয়া আমাকে আচ্ছন্ন করিতে থাকুক। এসো, এইবার তোমাকে একটি অমোঘ চুম্বন করি, যেন তুমিই বিশ্বের সকল প্রেমিকা হইয়া বিশ্বময় প্রেমের সেই শরীরী অনুভূতি একাগ্রচিত্তে গ্রহণ করো। এসো, আমাকে মুক্তি দাও।’
লেখাটা কেমন হচ্ছে বলো তো? না না, প্রাচীন সাধুভাষা বলে একে অবজ্ঞা কোরো না, এর ব্যঞ্জনার দিকে দৃষ্টি দাও! মানবিকতার বদলে তুমি নিশ্চয়ই মানুষের পোশাককে বেশি গুরুত্ব দাও না!
তাছাড়া সাধুভাষা তো আর নিষিদ্ধ হয়ে যায় নি? ধরো, এইভাবেই যদি আমি শুরু করি আমার প্রেমপত্র? ধরো, এটাই যদি পৌঁছোয় আমার প্রেমিকার থরোথরো হাতে?
হাসছো? তাহলে বলি, তুমি এখনো জান না, ইদানীং আমাকে প্রেমিক বলা চলে। তোমার অগোচরে, বলা চলে আমারও অগোচরে একটি মেয়ে এসে আমাকে একটি সাউন্ডপ্রুফ কাঁচের ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে গেছে। চারপাশের দৃশ্যাবলী চোখে পড়ছে, কিন্তু বাইরের কোন উত্তেজক শব্দই আর মগজ পর্যন্ত পৌঁছচ্ছে না। কেমন অদ্ভুতভাবে নিজের একটা স্বার্থপর জগৎ গড়ে উঠছে ধীরে ধীরে আমার চারপাশে। অনুভব করতে পেরে আমি কেমন আতঙ্কিত, তুমি ভাবতে পারবে না। তবে দেখে নিও, খুব শিগ্গিরি আমি এই টানাপোড়েন কাটিয়ে উঠবো।
হ্যাঁ, তোমার সঙ্গে ওর আলাপও করিয়ে দেব অবশ্যই। গ্রামাঞ্চলের মাটির মতো শান্ত সোঁদা গন্ধে তুমি সমাহিত হয়ে যাবে। আমি তো তাই হয়ে গেছি। জীবনের অপরিস্ফূট কোন অর্থও যেন ধীরে ধীরে মোড়ক খুলছে।
‘জীবনের সেই সব স্বাদ —
অগাধ — অবাধ —’
(৮)
আজকাল কোন কিছু ভাল লাগে না। যেন হঠাৎ চারপাশের মাটি আলগা হয়ে গেছে। বন্ধুদের আড্ডায় নীরব হয়ে গেছি, নিরর্থক হাসি আর হাসি না, কোনভাবেই নিছক আমোদ আর মন ধুইয়ে দিতে পারে না। মস্তিষ্কের ধূসর পদার্থবিহীন প্রতিবন্ধীর মতো হয়ে যাচ্ছি দিনকে দিন। অদ্ভুত ব্যাপার কি জানো, আমার চারপাশে ছোট-বড়ো যা ঘটনাই ঘটছে, আমি মনের মধ্যে তার কোন প্রতিক্রিয়াই অনুভব করতে পারছি না।
গত পরশু সত্যজিতের ‘নায়ক’ দেখলাম। প্রথমবার। তুমি তো জানো সত্যজিৎ আমার কোন জায়গায়। তার ওপর উত্তমকুমার নামক বিদ্যুৎ-বাতি। সত্যজিতের চলচ্চিত্র হিসেবে অন্য, অনন্য অনুভূতি আর বিশ্লেষণ ছাড়াও, আমি ‘অরিন্দমের’ সঙ্গে কি কাকতালীয়ভাবে আইডেন্টিফায়েড হয়ে গেলাম। ঐ বিচ্ছিন্নতা, ঐ রোম্যান্টিক গ্লানি, দৃঢ় আত্মবিশ্বাসের ঐ ক্রম-ভাঙন যেন আমার মনের ধোঁয়াশা থেকে উঠে এসে হঠাৎ স্পষ্ট রূপ পেল।
ঠিক এইরকম ব্যাপার আগেও একবার ঘটেছিল। ‘জন-অরণ্য’ দেখে বাইরে আসার পর নিমেষের মধ্যে ‘সোমনাথের’ অসহায়তা আমার মধ্যে এসে ব্যর্থ ক্ষোভে ফুঁসে, গর্জে উঠেছিল। সেদিনও কিছু করতে পারিনি, আজও হয়তো পারবো না। পৃথিবী তো দুই বিপরীত ব্যবসায়ী ধ্বনির রূপকার — আছে, নেই। হ্যাঁ, না। আলো, অন্ধকার। শুধু প্রত্যেক পরাজিত দিনযাপনের শেষে রাত্রির গভীর আকাশে দুই হাত তুলে বলি — দাও আলো, দাও শক্তি, দাও অনুভূতি।