ক্যাফে গদ্যে কৃপা বসু

আমার জীবনে বহুবার প্রেম এসেছে, ছেড়েও গেছে, কতবার হাত পা কাটার কথা ভেবেছি, চার তলার ছাদ থেকে লাফানোর কথা ভেবেছি। যতবার পা বাড়িয়েছি নিজেকে শেষ করে দেওয়ার দিকে, ততবারই আবার প্রেম এসেছে যেভাবে আসে পুরসভার জল দিনে তিনবার করে….
যতবারই ভুলভাল সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ততবারই কেউ না কেউ মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করেছে ঠিকই, যেভাবে অসুস্থ রোগীর মাথায় ঠাকুরের ফুল ছোঁয়ায় মায়েদের কোঁচকানো হাত, ঘুম পাড়িয়েছে জাপটে ধরে যত্ন করে।
আলু ভাতে মেখে মুখের সামনে তুলে ধরেছে, ঠোঁটের কোনায় লেগে থাকা এঁটোকাটা রুমাল দিয়ে মুছে দিয়েছে….
প্রতিটা প্রেম, প্রতিটা সম্পর্ক আমায় একটু একটু করে বড় করে দিয়ে গেছে, পরিণত করে দিয়ে গেছে, আমি আমার প্রতিটা জন্মদিনে ঠিক ততটা বড় হইনি যতটা বড় হয়েছি প্রেমিকের কাছে পাওয়া আদরে, অভিমানে, আবদারে, অনুরাগে…
স্কুলে যখন পড়ি এই ইলেভেন কি টুয়েলভ হবে, মনে নেই ঠিক! তখন প্রথমবার প্রেমে পড়ি। রোজ বিকেলে টিউশন পড়তে যাওয়ার সময় একবার দেখা না পেলে কিংবা ফোন বিজি পেলে বাড়ি এসে বই খাতা ছুঁড়ে ফেলে পা ছড়িয়ে কাঁদতাম। দু তিনদিন কথা বলতাম না কারোর সাথে, খাওয়াদাওয়া প্রায় বন্ধ করে দিতাম….
দু তিনদিন বাদে স্কুল যাওয়ার সময় সাইকেল জোর করে থামিয়ে যখন টেনে নিয়ে যেত গলির মধ্যে, জড়িয়ে ধরে নাক ঘষে দিতো কপালে, আইসক্রিম খাওয়াতো, ধীরে ধীরে অভিমান গলে জল হয়ে গড়িয়ে পড়তো গাল বেয়ে। ওর গায়ের চেনা গন্ধটা আমি প্রাণ ভরে মাখতাম সেসব দিন গুলোতে, যে গন্ধ আমি এখনো ভুলিনি…
কলেজে পড়ি, সেকেন্ড ইয়ার, ওড়না কিভাবে নিতে হয়, লিপস্টিক কাজল নেইলপলিশ কিভাবে পরতে হয় সবে সবেই শিখছিলাম, নিজের খেয়ালে ছিলাম। কোত্থেকে এক বেয়াদব ছেলে এসে টানলো আঁচল পেছন থেকে, ছেলেটি থার্ড ইয়ারে পড়তো আমাদের কলেজেই….
চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, গাল ভর্তি দাড়ি গোঁফ, হাতে মোটা বেল্টের ঘড়ি, সে আমায় শিখিয়েছিল একঘর লোকের সামনেও চিৎকার করে ভালোবাসি বলা যায়। সে শিখিয়েছিল কিভাবে ঠোঁটে ঠোঁট ঢুকিয়ে জিভে জিভ ঠেকিয়ে বুকে বুক লাগিয়ে চুমু খেতে হয়…..
সে বলেছিল “তুমি যেদিন এসি রুমের কৃত্তিম বাতাস ছেড়ে আমার টিনে ছাওয়া ঘরে স্টোভে কেরোসিন ঢেলে চা বানাতে পারবে! যেদিন আমি কোনো এক বৃষ্টি বিকেলে চুপচুপে ভিজে গিয়েও সারা কলেজ স্ট্রিট ঘেঁটে তোমার পছন্দের কবিতার বই তোমায় উপহার দিতে পারবো, সেদিন ভেবে নিও আমাদের মধ্যে বন্ধুত্বের থেকে আরো বেশি কিছু আছে, হয়তো ভালোবাসাবাসি বলে সেটাকেই”…
ওর জন্যই সরস্বতী পুজোয় আমার প্রথম শাড়ি পরা, ওর জন্যই আমার চুলের খোঁপা, ওর জন্য দুর্গা পুজোয় ঠাকুর দেখা পায়ে হেঁটে হেঁটে, ওর জন্যই রোদে পুড়ে খাঁক হওয়া আমার শান্ত দুপুরবেলা…
কলেজ পেরিয়ে ঢলে আসা যৌবনে তৃতীয় বার প্রেম এলো আমার বাড়ির রাস্তা চিনে গোপনে গোপনে। আমি ওকে আপনি বলে ডাকি, তিনি আমার চেয়ে বয়সে অনেকখানি বড়, মেয়ে আছে, সংসার আছে, বউ আছে, সব আছে, আমাকে তার প্রয়োজন নেই, তাকেও আমার প্রয়োজন নেই তেমন…
তার কাছে আমার কোনো চাহিদা নেই, দাবি দাওয়া নেই, সব প্রেমে অধিকার বোধ রাখতে নেই, ছাড়তে জানতে হয়। এখন আমি নিজেকে গুটিয়ে ফেলেছি, ভীষণ জটিল করে ফেলেছি।
“আমি আপনাকে ভালোবাসি” এই সহজ কথাটাকে জটিল করে বলার মধ্যেও একটা আনন্দ আছে, বুঝেছি সেটা…..
ঘুরিয়ে ফিরিয়ে চোখের ইশারায় অনেকবার বলতে চেয়েছি তাকে ভালোবাসার কথা, কিন্তু সব অনুভূতির একটা সীমা থাকা দরকার, আমি আমার সীমা লঙ্ঘন করতে পারিনি।
তারপর যোগাযোগ নিভে গেছে ধীরে ধীরে।
এখন আর কারোর সাথে গভীরে জড়াই না, বরং যে কোনো সম্পর্কেরই উপর উপর ভেসে থাকি শুধু।
কাউকে অধিকার দিই না আমায় আঘাত দেওয়ার, লুকিয়ে লুকিয়ে একটা মানুষকে গোটা জীবন ভালোবেসে যাওয়ার মধ্যেও যে তৃপ্তি আছে, অনুভব করেছি তা। যেখানে অধিকার বোধ নেই, সেখানে আবেগ কম থাকে কিংবা থাকলেও তার বহিঃপ্রকাশ কম থাকে….
কে বলেছে, প্রেম মানুষকে ভেঙে গুঁড়ো করে দেয়, একেবারেই না! প্রেম মানুষকে ভেঙে গুঁড়ো করে দেওয়ার পর নিজেকে কিভাবে একটু একটু করে গুছিয়ে আবার শিরদাঁড়া উঁচু করে দাঁড়াতে হয়, সেটা শেখায়…..
জ্বরের ঘোরে তার নাম মনে মনে কিভাবে আওড়াতে হয় সেটা শেখায়, সূর্য ডোবার পরে কিভাবে নিজের ক্লান্ত ছায়ায় মাথা গুঁজে কাঁদতে হয়, সেটা শেখায়। আবার পরেরদিন লাল চোখ মুখ মুছে স্টেশন পেরোনো ট্রেনের ভিড়ে মিশে যেতে হয়, সেটাও শেখায়….
প্রেম একটা ব্যর্থ মানুষকে চরমভাবে জীবনের কোনো একটা মুহূর্তে জিতিয়ে দিয়ে যায়, আমি সেই জিতে যাওয়ার স্বাদ পেয়েছি বহুবার…
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।