গারো পাহাড়ের গদ্যে জিয়াউল হক

বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ইবাদত আলী বিশ্বাস

আমি মোঃ ইবাদত আলী বিশ্বাস, এফ.এফ. এফ.এফ.নম্বর-৯৩৮৪, গেজেট নম্বর – সুজানগর – ২১২১, লাল মুক্তিবার্তা
নম্বর – ০৩১১০৬০০৭৩, এমআইএস নম্বর – ০১৭৬০০০০১৮৬, মোবাইল নম্বর – ০১৭২৫২৪১৫৯১                                                                                  পিতা – জুলমত আলী বিশ্বাস, মাতা – বাসনী বেগম, স্থায়ী ঠিকানা – গ্রাম ও ডাকঘর – খলিলপুর, উপজেলা – সুজানগর, জেলা – পাবনা।                          বর্তমান ঠিকানা – ঐ।

১৯৭১ সালে আমি পাবনা জেলার সুজানগর থানার সাতবাড়িয়া কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতে লেখাপড়া করতাম।  ১৯৭০ সালের পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ নির্বাচনের পর থেকেই দেশের অবস্থা ক্রমান্বয়ে উত্তপ্ত হতে থাকে।  নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করার পরও সামরিক প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান কোন ভাবেই বাঙালিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে রাজি ছিল না। তাইতো শুরু হলো নানা অযুহাত। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান আহুত জাজীয় পরিষদের অধিবেশন বন্ধ ঘোষণা করার সাথে সাথে সারা বাংলাদেশের আপামর মানুষ একযোগে রাস্তায় নেমে এসে আন্দোলন শুরু করে। এহেন উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার নীতিনির্ধারনী ভাষণ দিলেন। ভাষণে তিনি এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম উল্লেখ করায় বাঙালিরা দিকনির্দেশনা পেয়ে গেলেন। তার কথামতো সারা বাংলাদেশে শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি।  আমরা আমাদের গ্রামের খলিলপুর হাই স্কুল মাঠে বাঁশের লাঠি হাতে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সদস্য আলী হোসেনের নেতৃত্বে সামরিক প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু করলাম। ২৪ মার্চ পর্যন্ত এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু থাকলো। ২৫ মার্চ রাতে পাবসেনারা সারা বাংলাদেশে অতর্কিতে আক্রমণ চালিয়ে বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও মানুষ হত্যা শুরু করলো। পাবনার বিপ্লবী জনতা সেই রাতে পাবনায় আগত সকল পাকসেনাকে হত্যা করে শহরকে শত্রুমুক্ত করলেন।  কিন্তু খুব বেশিদিন পাবনাকে শত্রুমুক্ত রাখা গেল না।

১০ এপ্রিল পাকসেনারা ঢাকা থেকে আরিচা হয়ে গানবোট যোগে পাবনার দিকে যাত্রা করে। এই সংবাদ পেয়ে তাদের বাধা দেওয়ার জন্য নগরবাড়ি ঘাটে ইপিআর, পুলিশসহ প্রতিরোধযোদ্ধারা অবস্থান গ্রহণ করে। কিন্তু পাকিস্তান সেনাদের গানবোট থেকে মটারের গোলবর্ষণ ও বিমান থেকে মেসিন গানের গুলি বর্ষণ করার ফলে টিকতে না পেরে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। নগরবাড়ি থেকে ছত্রভঙ্গ হয়ে একদল ইপিআর জওয়ান যখন আমাদের গ্রামের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল, তখন আমরা অনেক অনুনয় বিনয় করে তাদের নিকট থেকে একটা রাইফেল সংগ্রহ করতে সক্ষম হই। তখন গ্রামের সকল যুবক ছেলেরা ছুঠিতে অবস্থানরত গ্রামের একজন পাকিস্তান বিমান বাহিনী সদস্য মোক্তার হোসেন মোল্লার কাছ থেকে রাইফেল চালনা শিক্ষা গ্রহণ করি। ১২ মে পাবসেনারা সুজানগর থানার সাতবাড়িয়া ইউনিয়নের ভাটপাড়া ও গুপিনাখপুর গ্রামে আক্রমণ চালায়। ১৯ মে শত্রুরা আবার সাগরকান্দি ইউনিয়নের খলিলপুর, সাগরকান্দি ও বাদাই গ্রামে আক্রমণ চালিয়ে বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও ৪৬ জন মানুষকে নির্মম ভাবে হত্যা করে।  আমরা তখন বনে জঙ্গলে পালিয়ে থাকতে শুরু করি।  তার কিছু দিনের মধ্যেই ভারত থেকে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের গ্রামে এসে হাজির হয়। আমরা তখন তাদের সাথে কাজ করতে শুরু করি।  কিন্তু অতিরিক্ত অস্ত্র না থাকায় আমরা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারছিলাম না। তাই মুক্তিযোদ্ধাদের পরামর্শে আমরা ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি।

সিদ্ধান্ত মোতাবেক আগষ্ট মাসের প্রথম দিকে আমরা দেশ ছেড়ে ভারতের কেচুয়াডাঙ্গা ইয়ুথ ক্যাম্পে গিয়ে পৌছাই। সেখানে ১০ দিন অবস্থানের পর আমাদের ভারতীয় সেনাবাহিনী পরিচালিত মালদা জেলার গৌড়বাগান প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রেরণ করা হয়। সেখানে মাত্র কয়েকদিন অবস্থানের পর মুক্তিযুদ্ধের উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য আমাদের শিলিগুড়ির পানিঘাটা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রেরণ করা হয়। সেখানে ৩০ দিন প্রশিক্ষণ শেষে ৭ নম্বর সেক্টর হেডকোয়ার্টার তরঙ্গপুর এসে আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে ৪০ জন মুক্তিযোদ্ধার একটা গ্রুপ গঠন করে আমাদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ প্রদান করা হয়।  তারপর আমাদের ৭ নম্বর সেক্টরের মাহাদীপুর সাব-সেক্টরে ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের অধীনে প্রেরণ করা হয়। ৩ ডিসেম্বও নিয়মিত যুদ্ধ শুরু হলে  ভারতীয় বাহিনীর পাশাপাশি আমরা বাংলাদেশের অব্যন্তরে প্রবেশ করি।

শিবগঞ্জ যুদ্ধ ঃ পাকসেনারা সোনা মসজিদ ও কানসাট থেকে পিছু হটে এসে  তৎকালীন রাজশাহী জেলার শিবগঞ্জ থানায় নতুন করে ক্যাম্প স্থাপন করেছে। ৭ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় আমরা শিবগঞ্জ পাকসেনা ক্যাম্প আক্রমণ করি।  সারা রাত ধরে যুদ্ধ চলার পর ভোরের দিকে শত্রুপক্ষের গোলাগুলি থেমে যায়। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি শত্রুরা শিবগঞ্জ ছেড়ে পালিয়েছে। ১৪ ডিসেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর শহীদ হওয়ার পর আমরা চাঁপাই নবাবগঞ্জ শহর দখল করতে সক্ষম হই। তার মাত্র ১ দিন পরেই আমরা স্বাধীনতা লাভ করি।  পূরণ হয় বাঙালি জাতির হাজার বছরের স্বাধীনতার স্বপ্ন।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।