গারো পাহাড়ের গদ্যে জিয়াউল হক

বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ রফিকুল ইসলাম
বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ রফিকুল ইসলাম, এফ.এফ. ভারতীয় তালিকা নম্বর-৪০২৭, গেজেট নম্বর মনোহরদী-২১৬৯, লাল মুক্তিবার্তা নম্বর-০১০৫০৫০৫৩৬, সমন্বিত তালিকা নম্বর-০১৬৮০০০৪০০৪, মোবাইল নম্বর-০১৭১৫০১৮১৩৩, পিতা ঃ মৌলভী আব্দুল হাকিম, মাতা ঃ জোবেদা খাতুন, স্থায়ী ঠিকানা ঃ গ্রাম ঃ চন্দনবাড়ি, ডাকঘর ও উপজেলা ঃ মনোহরদী, জেলা ঃ নরসিংদী। বর্তমান ঠিকানা ঃ ফ্লাট নম্বর-ই-৯, ৩৪৫ দিলু রোড, মগবাজার, ঢাকা-১০০০।
৫ ছেলে ৪ মেয়ের মধ্যে রফিকুল ইসলাম ছিলেন বাবা মায়ের ৫ম সন্তান। ১৯৬৯ সালে এসএসসি পরীক্ষা পাশের পর খুব অল্প বয়সেই তিনি মনোহরদী সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নকল নবীস পদে চাকুরীতে যোগদান করেন। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন এবং তার দল আওয়ামী লীগের একনিষ্ট কমর্ী ছিলেন। চাকরী করার ফাঁকে ফাঁকে তিনি যেমন ১৯৬৯ সালের স্বৈরাচারী আইয়ুব সরকার বিরোধী গণআন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন, তেমনি ১৯৭০ সালের পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ নির্বাচনের সময় তাদের এলাকার আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রাথর্ীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচার কাজে সক্রিয় ভাবে অংশগ্রহণ করেন। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করার পরও পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান কোন মতেই তাদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে রাজি ছিলেন না। তাইতো নানা অযুহাতে তিনি সময়ক্ষেপন করতে থাকেন। বাংলাদেশের সংগ্রামী জনতা প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের এই অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে এসে সরকারের বিরুদ্ধে প্রচন্ড গণআন্দোলন গড়ে তোলেন। সেই আন্দোলন এতোটাই তীব্র আকার ধারণ করেছিল যে সরকারের প্রশাসন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙ্গে পড়ে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নির্দেশেই তখন দেশ পরিচালিত হচ্ছিল। আন্দোলনের পরবতর্ী কর্মসূচি ঘোষণার জন্য ১৯৭১ সালের ৭ মার্চবঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের এক বিশাল জনসভায় ভাষণ প্রদান করেন। তিনি তার ভাষণে যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুকে মোকাবেলার আহবান জানান। বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণে উদ্বুদ্ধ হয়ে রফিকুল ইসলামসহ সারা বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। তার নির্দেশ মোতাবেক সারা দেশে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন।
অবস্থা বেগতিক দেখে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ঢাকায় এসে সমস্যা সমাধানের জন্য বঙ্গবন্ধু শেক মুজিবের সাথে কয়েক দফা আলোচনায় মিলিত হন। কিন্তু আলোচনা ফলপ্রসু না হওয়ায় সেনাবাহিনীকে বাঙালিদের উপর আক্রমণের নির্দেশ প্রদান করে ২৪ মার্চ বিকেলে তিনি ঢাকা ছেড়ে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যান। প্রেসিডেন্টের নির্দেশ মোতাবেক সেই দিন রাত থেকেই পাকিস্তানি সেনারা সারা বাংলাদেশের নিরস্ত্র নিরিহ বাঙালিদের উপর আক্রমণ করে নির্বিচারে মানুষ হত্যা শুরু করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ শুনেই রফিকুল ইসলাম মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন। ১৭ এপ্রিল প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহণ এবং তার অল্প কিছুদিনের মধ্যে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র চালু হওয়ার পর তিনি আর ঘরে বসে থাকতে পারলেন না। নিজের চাকরীর মায়া ত্যাগ করে মে মাসের মাঝের দিকে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের জন্য কয়েক জন বন্ধুকে সাথে নিয়ে তিনি ভারতের পথে যাত্রা করলেন। পথে আখাউড়ার গৈনব বাজারের নিকট শান্তি কমিটির হাতে ধরা পড়লেও ভাগ্যক্রমে ছাড়া পেয়ে সীমান্ত পার হয়ে তারা আগরতলার কংগ্রেস ভবনে গিয়ে পৌছান। সেখান থেকে তাদের নিকটস্থ ইয়ুথ ক্যাম্পে প্রেরণ করা হয়। সেখানে ২০ দিন অবস্থান করার পর মুক্তিযুদ্ধের উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য বাছাই করে রফিকুল ইসলামদের ত্রিপুরা রাজ্যের লোহারবন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রেরণ করা হয়।
সেখানে ৩০ দিন প্রশিক্ষণ শেষে তাদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ প্রদান করা হয়। তারপর তাদের ত্রিপুরা রাজ্যের করিমগঞ্জ অপারেশন ক্যাম্পে প্রেরণ করা হয়। সেখানে রফিকুল ইসলামদের ভারতীয় সেনাবাহিনীর অধীনে ন্যাস্ত করা হয়। সেখানে থাকা অবস্থায় ভারতীয় বাহিনীর সাথে মিলিত ভাবে তারা তৎকালীন সিলেট জেলার ইলেভেন টিলা চা বাগান ও শমশের নগর পাকিস্তানি ক্যাম্পের উপর আক্রমণ পরিচালনা করে তাদের প্রভুত ক্ষতিসাধন করতে সক্ষম হন। এরই মধ্যে বাংলাদেশ সরকার নিজ নিজ এলাকায় যুদ্ধ করতে ইচ্ছুক মুক্তিযোদ্ধাদের স্বস্ব এলাকায় প্রেরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সেই সিদ্ধান্ত মোতাবেক রফিকুল ইসলামসহ তৎকালীন ঢাকা জেলার মনোহরদী ও কাপাশিয়া থানার ৭ জন মুক্তিযোদ্ধাকে করিমগঞ্জ অপারেশন ক্যাম্প থেকে আগরতলায় প্রেরণ করা হয়। সেখান থেকে অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপের সাথে বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করে নিজ এলাকায় এসে দেখতে পান শত্রুসেনারা আগেই তাদের থানা থেকে পালিয়ে গেছে। তখন তারা নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যান। তার মাত্র অল্প কিছু দিন পর ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। রফিকুল ইসলামদের মতো বীর মুক্তিযোদ্ধারা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে আমাদের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ উপহার দিয়েছেন। তাইতো তাদের প্রতি যথাযথ সম্মান ‘দেখানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।