গারো পাহাড়ের গদ্যে জিয়াউল হক

বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ গোলাম রসুল
বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ গোলাম রসুল, এফ.এফ. ভারতীয় তালিকা নম্বর-৬৪৭৩২, গেজেট নম্বর-মনিরামপুর-২৪৩৬, লাল মুক্তিবার্তা নম্বর-০৪০৫০৫০০৩২, সমন্বিত তালিকা নম্বর-০১৪১০০০০৯৩৫, মোবাইল নম্বর-০১৭১২২৫৩৬৮৪, পিতা ঃ হেকিম সরদার, মাতা ঃ ছবেজান, স্থায়ী ঠিকানা ঃ গ্রাম ও ডাকঘর ঃ ডুমুরখালি, উপজেলা ঃ মনিরামপুর, জেলা ঃ যশোর। বর্তমান ঠিকানা ঃ খড়কী, ৫ নম্বর ওয়ার্ড, যশোর পৌরসভা, উপজেলা ও জেলা ঃ যশোর।
৩ ছেলে ৩ মেয়ের মধ্যে গোলাম রাসুল ছিলেন বাবা মায়ের ৪র্থ সন্তান। ১৯৭১ সালে তিনি মনিরামপুর থানার শহিদ স্মরণী ঝাঁপা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষাথী ছিলেন। স্কুল জীবন থেকেই তিনি যেমন ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন, তেমনি নাটক, আবৃত্তিসহ নানা সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সাথেও জড়িত ছিলেন। তিনি ১৯৬৯ সালে স্বৈরাচারী আইয়ুব সরকার বিরোধী গণআন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭০ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করার পরও তাদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান নানা অযুহাতে সময়ক্ষেপনের নীতি গ্রহণ করেন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের এই আচরণে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ উত্তেজিত হয়ে রাস্তায় নেমে এসে প্রচন্ড গণআন্দোলন শুরু করেন। দেশের অবস্থা তখন দিন দিন উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল। এই অস্বাভাবিক অবস্থার মধ্যে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের এক বিশাল জনসভায় তার নীতি নির্ধারণী ভাষণ প্রদান করেন। তিনি তার ভাষণে যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুদের মোকাবেলা করার সাথে এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম বলে ঘোষণা প্রদান করেন। বঙ্গবন্ধুর এই স্বাধীনতার ঘোষণার পর থেকে বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন।
২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনারা সারা বাংলাদেশের উপর আক্রমণ করে মানুষ হত্যাসহ মানুষের বাড়িঘরে আগুন দিয়ে পুড়াতে শুরু করে। ২৯ মার্চ যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্যরা যশোর শহরে এসে আন্দোলনরত সাধারণ জনতার উপর গুলিবর্ষণ করে বেশ কিছু সাধারণ মানুষকে হত্যা করে। তখন মানুষজন শহর থেকে ছত্রভঙ্গ হয়ে গ্রামের দিকে পালিয়ে যান। সেই সময় গোলাম রসুলসহ আরও বেশ কিছু যুবক ছেলে ডুমুরখালি গ্রামের উত্তর পাশের বাওড়ের ধারে ক্যাপ্টেন ফজলুল হকের নেতৃত্বে সামরিক প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন। এপ্রিল মাসের ১৫ তারিখ পর্যন্ত এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকে। আস্তে আস্তে শত্রুসেনাদের তৎপরতা বৃদ্ধি পেলে এপ্রিল মাসের শেষের দিকে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য গোলাম রসুল দেশ ছেড়ে ভারতের পথে যাত্রা করেন। তারপর পায়ে হেঁটে অনেক কষ্ট করে তৎকালীন খুলনা জেলার কলারোয়া থানার সীমান্তের সোনাই নদী পার হয়ে তিনি ভারতের হাকিমপুর ইয়ুথ ক্যাম্পে গিয়ে ভর্তি হন। সেখানে ২ মাস অবস্থান করার পর মুক্তিযুদ্ধের উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য বাছাই করে গোলাম রসুলদের বিহার রাজ্যের চাকুলিয়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রেরণ করা হয়। সেখানে ৩০ দিন প্রশিক্ষণ শেষে তাদের ৮ নম্বর সেক্টর হেডকোয়ার্টার কল্যাণিতে ফিরিয়ে আনা হয়। সেখান থেকে মতিয়ার রহমানের নেতৃত্বে ১১ জন মুক্তিযোদ্ধার একটা গ্রুপ গঠন করে গোলাম রসুলদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ প্রদান করা হয়। তারপর তাদের আবার হাকিমপুর অপারেশন ক্যাম্পে প্রেরণ করা হয়।
হাকিমপুর ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন শফিউল্লাহ। এখান আসার পর তারা ক্যাপ্টেন শফিউল্লাহর নেতৃত্বে বাংলাদেশের ভেতরে বিভিন্ন পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পের উপর আক্রমণ পরিচালনা করতে থাকেন। এই সময়ে তারা কলারোয়া থানার সোনাই নদীর তীরে সোনাবেড়ে, মাদ্রা, কাকডাঙ্গা, ভাদারীসহ বিভিন্ন পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পের উপর আক্রমণ পরিচালনা করেন।
মাদ্রার যুদ্ধ ঃ কলরোয়া থানার মাদ্রাতে পাকিস্তানি সেনাদের একটা ক্যাম্প ছিল। গোলাম রসুলদের ক্যাম্প ছিল ভারতীয় সীমান্তের ভেতরে হাকিমপুরে। অক্টোবর মাসের মাঝের দিকে একদিন রাতে ক্যাপ্টেন শফিউল্লাহর নেতৃত্বে গোলাম রসুলসহ ১৫০ জন মুক্তিযোদ্ধা শত্রুসেনাদের মাদ্রা ক্যাম্প আক্রমণ করেন। এই যুদ্ধে ভারতীয় আটিলারী বাহিনী মর্টারের গোলা বর্ষণ করে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেন। রাত ১২টা থেকে ৩ ঘন্টা যুদ্ধ চলার পর অনেক জানমালের ক্ষতি স্বীকার করে শত্রুসেনারা পিছু হটে যেতে বাধ্য হয়। পরে তাদের ক্যাম্পে ঢুকে ১ জন পাকিস্তানি সেনার মৃতদেহ এবং বেশ কিছু নির্যাতিত মহিলাকে উদ্ধার করা হয়। এই যুদ্ধে বিল্লাল হোসেন নামের একজন মুক্তিযোদ্ধা মাইন বিস্ফোরণে আহত হন। এরপর গোলাম রসুলদের মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপটি ঝিকড়গাছার থানার বাকাড়া, মনিরামপুর থানার রাজগঞ্জ, হানুয়ার, ডুমুরখালী প্রভৃতি স্থানে শত্রুসেনাদের সাথে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার পর ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। ত্রিশ লক্ষ শহিদের বুকের তাজা রক্ত আর গোলাম রসুলদের মতো সাহসী যোদ্ধাদের চরম আত্মত্যাগের বিনিময়েই আমরা পেয়েছি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। তাই আমাদের দেশের সেই সব সূর্য সন্তানদের যথাযথ সম্মান করা উচিৎ।