গারো পাহাড়ের গদ্যে জিয়াউল হক

বীর মুক্তিযোদ্ধা রামলাল রাজভর
আমি রামলাল রাজভর, এফ. এফ. গেজেট নম্বর – রাজনগর – ৭৫২, লাল মুক্তিবার্তা নম্বর – ০৫০৪০৬০০৪৭, এমআইএস নম্বর – ০১৫৮০০০০০২৭, মোবাইল নম্বর-০১৭১২৭০৫০০৬
পিতা: ভগত রাজভর, মাতা: লক্ষ্মীনিয়া রাজভর, স্থায়ী ঠিকানা: পবর্বতপুর চা বাগান, উপজেলা: রাজনগর, জেলা: মৌলভীবাজার। বর্তমান ঠিকানা: মাখিউবা চা বাগান, উপজেলা: রাজনগর, জেলা: মৌলভীবাজার।
১৯৬৮ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষা পাশের পর বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওযামী লীগের(মোজাফ্ফর) সক্রিয় রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়ার ফলে আমার পক্ষে আর লেখাপড়া করা হয়ে ওঠেনি। আমি ১৯৬৯ সালে আইয়ুব সরকার বিরোধী গণআন্দোলনে সক্রিয় ভাবে অংশগ্রহণ করি। ১৯৭০ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে আমি মোজাফ্ফর ন্যাপের কুড়ে ঘরের পক্ষে নির্বাচনী প্রচার কাজে অংশগ্রহণ করি। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করার পরও তাদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় সারা বাংলাদেশে প্রচন্ড গণবিক্ষোভ শুরু হয়। নিজ দলের সিদ্ধান্ত মোতাবেক আমি তখন আওয়ামী লীগের সকল আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে টেংরাবাজার ইউনিয়ন সংগ্রাম পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হই। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের নির্দেশনা মোতাবেক আমরা তখন সরকারের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন শুরু করি। সেই সময়ে চা শ্রমিকদের নেতা হিসাবে আমি রাজনগর পোর্টিয়ার্স হাই স্কুল মাঠে এক শ্রমিক সমাবেশের আয়োজন করি। ২৫ মার্চের পরে পাকসেনারা যখন সিলেট থেকে মৌলভীবাজারের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তখন আমরা হাজার হাজার সাধারণ মানুষ দেশীয় অস্ত্র হাতে শেরপুরে শত্রুসেনাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধযুদ্ধে লিপ্ত হই। শত্রুদের প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হয়ে সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি কতর্ৃক পার্শবতর্ী দেশ ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণপূর্বক মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের নির্দেশ প্রদান করা হয়।
সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক এপ্রিল মাসের শেষের দিকে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের উদ্দেশ্যে আমি বাংলাদেশের চাতলাপুর বর্ডার পার হয়ে ভারতের কৈরাশ্বরে গিয়ে প্রথমে এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করি। সেখানে ২০ দিন থাকার পর মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের উদ্দেশ্যে কৈলাশ্বর ইয়ুথ ক্যাম্পে গিয়ে ভর্তি হই। সেখানে ২০ দিন থাকার পর মুক্তিযুদ্ধের উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য আমাদের ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের লোহারবন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রেরণ করা হয়। সেখানে ৪৫ দিন প্রশিক্ষণ শেষে ভাবতীয় সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন চাঁদকে কমান্ডার করে আমাদের ১২০ জন মুক্তিযোদ্ধার একটা কোম্পানী গঠন করা হয়। এই কোম্পানীর ডেপুটি কমান্ডার ছিলেন মাহবুবুর রব সাদী। তারপর আমাদের অস্ত্রসজ্জিত করে ভারতের কাছাড় জেলার জালালপুর অপারেশন ক্যাম্পে নিয়ে আসা হয়। এখান থেকে আমরা বাংলাদেশের ভেতরে বিভিন্ন শত্রু ক্যাম্প আক্রমণ করে আবার নিজেদের ক্যাম্পে ফিরে আসতাম। এই সময় আমরা তৎকালীন সিলেট জেলার কালিগঞ্জে একটা ব্রিজ ধ্বংস এবং রাজাগঞ্জের এক মুসলিম লীগ নেতার বাড়ি ও দোকানে রেইড করে প্রচুর পরিমান খাদ্য ও বস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে এসে শরনাথর্ী শিবিরে বিতরণ করা হয়। জালালপুর অপারেশন ক্যাম্পে ১ মাস থাকার পর কমান্ডার মাহবুবুর রব সাদীর নেতৃত্বে আমরা বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করে সিলেট জেলার কানাইঘাট থানার রঘুরচক গ্রামে সেল্টার গ্রহণ করি।
লোবাছড়া চা বাগানের যুদ্ধ: কানাইঘাটে পাকসেনাদের শক্ত ঘাঁটি ছিল। শত্রুরা মাঝে মাঝে কানাইঘাট থেকে রোবাছড়া চা বাগানের বাংলোতে অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করে আশেপাশের গ্রামে অপারেশন পরিচালনা করতো। আমাদের ক্যাম্প ছিল লোবাছড়া চা বাগান থেকে ১ মাইল দূরে রঘুরচাক গ্রামে। শত্রুরা পুনরায় লোবাছড়া চা বাগানে আসলে তাদের উপর আক্রমণ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে আমরা খোঁজ রাখা শুরু করলাম। অক্টোবর মাসের শেষের দিকে একদিন খবর পেলাম ২৫ জন পাকসেনা লোবাছড়া চা বাগানে এসেছে। খবর পাওয়ার সাথে সাথে দেরি না করে কমান্ডার মাহবুবুর রব সাদীর নেতৃত্বে আমরা ১২০ জন মুক্তিযোদ্ধা দিনের বেলায় চার দিক থেকে ঘিরে ধরে শত্রুদের উপর আক্রমণ শুরু করলাম। শত্রুরাও পাল্টা আক্রমণ শুরু করলো। কিন্তু ১২০ জন মুক্তিযোদ্ধার আক্রমণের সামনে টিকতে না পেরে অনেক জানমালের ক্ষতিস্বীকার করে শত্রুরা পিছনে পালিয়ে যায়। এই যুদ্ধে ৫ জন পাকসেনা নিহত হয়। আমাদের পক্ষে ১ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়। ডিসেম্বর মাসে নিয়মিত যুদ্ধ শুরু হলে আমরা কানাইঘাট থানাকে শত্রুমুক্ত করে ১৬ ডিসেম্বর সিলেট শহরে গিয়ে হাজির হই। যে দেশপ্রেমের টানে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম, দেশের প্রতি সেই ভালোবাসা আজও অটুট আছে।