গারো পাহাড়ের গদ্যে জিয়াউল হক

বীর মুক্তিযোদ্ধা তমাল কান্তি চৌধুরী

আমি তমাল কান্তি চৌধুরী, এফ.এফ. এফ, এফ,নম্বর – ৪৬৭৩, গেজেট নম্বর – পুঠিয়া – ৮০০, লাল মুক্তিবার্তা নম্বর – ০৩০২০৪০০১৯, এমআইএস নম্বর – ০১৮১০০০০৪৬৩, মোবাইল নম্বর – ০১৬৩১০৩৭২৯৭, ৮পিতা: বিভূতিমোহন চৌধুরী, মাতা: শ্যামসুন্দর                                                                      স্থায়ী ঠিকানরা: গ্রাম: কৃষ্ণপুর, ডাকঘর ও উপজেলা: পুঠিয়া, জেলা: রাজমাহী। বর্তমান ঠিকানা: ঐ।

১৯৭১ সালে আমি রাজশাহী জেলার পুঠিয়া থানার পীরগাছা বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসাবে কর্মরত ছিলাম। ১৯৭০ সালের পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করার পরও তাদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় সারা বাংলাদেশে প্রচন্ড গণআন্দোলন শুরু হয়। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক নীতিনির্ধারণী ভাষণ প্রদান করেন। তিনি তার ভাষণে এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম বলে উল্লেখ করার পর আমরা মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করে দিলাম। পাকসেনারা ১২ এপ্রিল নগরবাড়িঘাট-পাবনা হয়ে রাজশাহীর দিকে যাত্রা করলে সর্বস্তরের ছাত্রজনতা পুঠিয়া থানার বিড়ালদহ ব্রিজের উপর ব্যারিকেড দিয়ে শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করে। কিন্তু শত্রুদের আধুনিক অস্ত্রের মুখে টিকতে না পেরে আমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলে তারা অতি সহজেই রাজশাহী শহরে প্রবেশ করে। বিড়ালদহ ব্রিজের যুদ্ধে পরাজিত হয়ে আমি বাড়ি না ফিরে ঐ দিনই পদ্মানদী পার হয়ে ভারতের জলঙ্গিতে গিয়ে আমার এক আত্মীয়ের বাসায় আশ্রয় গ্রহণ করি।

মে মাসের প্রথম সপ্তাহে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের আশায় বালুরঘাটে নওগার আওয়ামী লীগ নেতা জলিল সাহেবের সাথে দেখা করলে তিনি একটি চিঠি দিয়ে আমাকে বাঙালিপুর ইয়ুথ ক্যাম্পে গিয়ে দেখা করতে বলেন। সেখানে যাওয়ার পর আমাকে ক্যাম্পে ভর্তি করে নেয়া হয়। বাঙালিপুরে ২০ দিন থাকার পর আমাদের পতিরামপুরে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে আরও ২০ দিন থাকার পর জুলাই মাসে উচ্চতর প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য আমাদের শিলিগুড়ির পানিঘাটা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রেরণ করা হয়। সেখানে ২১ দিন প্রশিক্ষণ শেষে আমাদের আবার পতিরামপুর ফিরিয়ে আনা হয়। পতিরামপুর থেকে মকবুল হোসেনকে কমান্ডার করে আমাদের ১২ জন মুক্তিযোদ্ধার একটা দল গঠন করা হয়। তারপর ৭ নম্বর সেক্টর হেডকোয়ার্টার তরঙ্গপুর থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ প্রদান করে আমাদের জলঙ্গির পাশে কাজীপাড়া সাব-সেক্টরে প্রেরণ করা হয়। কাজীপাড়া থেকে আগষ্ট মাসে আমরা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে রাজশাহী জেলার দূর্গাপুর থানায় সেল্টার গ্রহণ করি। সেখানে ২ দিন থাকার পর আমরা স্থানীয় মোহনপুর হাটে গেলে ৪ জন রাজাকারের সাথে সামনাসামনি দেখা হয়। তখন আমরা একজন রাজাকারকে অস্ত্রসহ পাকড়াও করলে বাকি ৩ জন পালিয়ে জীবন রক্ষা করে।

রংশিবাড়ি ভবানীপুরের যুদ্ধ ঃ                                                                                                                                                      ভবানীগঞ্জ বাজরের লাগোয়া নদীর দক্ষিণ পাশে আমাদের ক্যাম্প ছিল্। আমাদের গ্রুপের ১২ জন মুক্তিযোদ্ধার ৮ জন নদীর উত্তর পাড়ে একটা অপারেশনে গিয়েছিল। আমরা ৪ জন মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প পাহারা দিচ্ছিলাম।  ভোর রাতের দিকে লক্ষ্য করি যে পাকসেনারা নদীর উত্তরপাশে মানুষের বাড়িতে আগুন দিয়ে শীত নিবারণ করছে। কিছু সময় পর আমরা আরও লক্ষ্য করলাম ৩টি নৌকা এসে নদীর ওপারে পাকসেনাদের অবস্থানের কাছে ভিড়লো। তার কিছু সময় পর দেখি শত্রুরা সেই ৩টি নৌকাতে চড়ে নদী পার হয়ে আমাদের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। আমরা মাত্র ৪ জন মুক্তিযোদ্ধা। এতো বড় শত্রুসোদের সাথে যুদ্ধ শুরু করার সাহস পাচ্ছিলাম না। তারপর ভাবলাম, মরতেতো হবেই। বরং শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেই মরা ভাল। যে কথা সেই কাজ। আমি, ইসলাম, কার্তিক ও কাশেম চারজন মিলে প্রথমে শত্রুদের ৩টি নৌকা লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছুড়ে মেরেই গুলিবর্ষণ শুরু করলাম। আমাদের গ্রেনেড বিস্ফোরণে শত্রুদের নৌকার ব্যাপক ক্ষতি হলো। তারপর নৌকার উপর গুলিবর্ষণে শত্রুর তখন ত্রাহিমধুসধন অবস্থা। এরই মধ্যে আমাদের দলের বাকি ৮ জন মুক্তিযোদ্ধা নদীর উত্তর পাড়ে শত্রুর পিছন থেকে আক্রমণ শুরু করলো। দুই দিন থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের গোলাগুলির মুখে শত্রুদের নৌকা ডুকে অধিকাংশ পাকসেনার সলিল সমাধি হলো। সেখান থেকে আমরা ৬৭ জন পাকসেনার লাশ উদ্ধার করি। তাছাড়াও  চাইনিজ রাইফেলসহ বিপুল পরিমান অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়।  এই যুদ্ধের পর আমরা গজমতখালি রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণ করে ৪ জন রাজাকারকে হত্যা করলে বাকিরা পালিয়ে যায়। আমাদের এলাকার তাদেরপুর হাটে ছিল সবচেয়ে বড় রাজাকার ক্যাম্প।  রাজাকাররা সারেন্ডার করার প্রস্তাব পাঠালে আমরা গিয়ে হাজির হই। তখন তারা গুলি বর্ষণ শুরু করলে আমরা পাল্টা আক্রমণ শুরু করি। আমাদের আক্রমণের মুখে শত্রুরা অস্ত্র ফেলে পালিয়ে গেলে আমরা সেখান থেকে ১৬০ টি ৩০৩ রাইফেল উদ্ধার করি। তার মাত্র অল্প কিছু দিন পর ১৬ ডিসেম্বর আমরা স্বাধীনতা লাভ করি। শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ের কি যে আনন্দ তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে হয়।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।