জয়ন্ত দত্তের ছোট গল্প

কবি, অনুগল্পাকার, প্রচ্ছদশিল্পী হিসেবে শিল্পাঞ্চলে খ্যাত। দেশ, নন্দন, তথ্য কেন্দ্র ইত্যাদি ছাড়াও অনেক ছোট পত্রিকায় নিয়মিত লেখা প্রকাশিত হয়।

মেঘ বৃষ্টি ও রৌদ্র

মফঃস্বল এলাকার মেয়েটি সদ্য চাকরি পেয়েছে স্কুলে।ট্রেনে করে কটা স্টেশন পেরিয়ে,তারপর আবার বাসে করে স্কুলে পৌঁছতে পাক্কা দুঘন্টা লেগে যায়।কোনদিন ট্রেন মিস করলে বাড়ি পৌঁছতে সেই সন্ধ্যে হয়ে যায়।রাস্তা ঘাটে কারো সাথে কথা বলা পছন্দ করে না,লাজুক মুখচোরা মেয়েটি।
বেশ কিছুদিন ধরে সে একটি ব্যাপার লক্ষ্য করছে।একটি যুবক স্টেশন চত্বরে রোজ ওকে ফলো করে।ড্যাব ড্যাব করে চেয়ে থাকে।মনে হয় যেন কিছু বলবে।ওর খুব একটা ভাল ঠেকে না।এসব গুন্ডা মার্কা ছেলেদের ও ইগনোর করতে জানে।ইউনিভার্সিটি থেকে এসবে সিদ্ধহস্ত।
এর মধ্যে একদিন স্কুলে পরীক্ষা চলাকালীন ফিরতে বেশ দেরী হল।যথারীতি সময়ের ট্রেন মিস হল।পরের ট্রেনে ফিরতে সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত নেমে আসে।বাড়ি থেকে মা ঘন ঘন ফোন করছে।বাবা ও দরকারি কাজে কলকাতায়।স্টেশন চত্বরে একটাও অটো কিংবা রিকশা পাওয়া গেল না।শীতের রাতে এমনিতেই রাস্তায় লোকজন কম।এমন সময় সেই গাল তবড়ানো বিচ্ছিরি দেখতে ছেলেটি কোথা থেকে যেন উদয় হল।ওকে দেখে মাথায় যেন আগুন জ্বলে ওঠে রণিতার। সাইকেল নিয়ে ওর সামনে এসে বলে –চলুন আপনাকে নামিয়ে দিচ্ছি। রণিতাএকরাশ বিরক্তি নিয়ে বলে ওঠে, দরকার নেই  -আপনি আসতে পারেন।
ছেলেটি কিছুক্ষন অবাক বিস্ময়ে চেয়ে থেকে পিছু হটে।
             পাকা রাস্তা ধরে হাটা শুরু করে ও ।ইতিমধ্যে রাস্তায় কতগুলো মাতাল নিজেদের মধ্যে গালাগাল দিয়ে মারপিট শুরু করে দিয়েছে।রণিতা ও দৌড়োতে শুরু করে।আর দেরি করা চলবে না।স্টেশন পেরিয়ে গলি রাস্তায় আলো বেশ কম।ওর বেশ ভয় হতে লাগলো।কিছুক্ষন চলার পর দেখে সেই ছেলেটি সাইকেল নিয়েএগিয়ে আসে।
—পিছনের সিটে বসুন।আমি পৌঁছে দিচ্ছি।না হয় দশ টাকা ভাড়া দিয়ে দেবেন,একনাগাড়ে বলে যায় ছেলেটি।
রণিতা আর দেরি করে না।এমনিতেই রাস্তাঘাট বেশ শুনশান।কয়েকটি কুকুর ঘেউ ঘেউ করে ডেকে ওঠে।আস্তে করে পিছনের সিটে বসে পড়ে।
সাইকেল চলতে লাগল।কয়েকটা পান ঘুমটি এখনো খোলা আছে।ধড়ে প্রাণ এলো বুঝি।
—আপনি তো বিশ্বাস বাড়ির মেয়ে।
ছেলেটি কথা শুরু করে।
এরপর অনেক কথা বলে যায় সে।যেন কত না পরিচিত!রণিতা শুধু হু -হা করে যায়।তার কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে না।বাড়ির কাছে গলির মুখে এসে দাঁড়ায় ছেলেটি।আশ্চর্য হয়ে যায় ও!ছেলেটি ওকে বেশ ভাল করেই চেনে।না না এদের বেশি পাত্তা দিলে চলবে না।
সাইকেল থেকে নেমে পঞ্চাশ টাকার একটি নোট বাড়িয়ে দেয়।ছেলেটি হঠাৎ বলে ওঠে—ওটা রেখে দিন আপনার কাছে।বোনের কাছে দাদা কি কখনো টাকা নিতে পারে!!
এই বলে দ্রুত প্যাডেল চালিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায় সে।
রণিতা অনেক্ষন দাঁড়িয়ে ওর মিলিয়ে যাওয়া দেখতে থাকে…
মনে হলো আকাশ কালো হয়ে এলো ।এই বুঝি বৃষ্টি নামবে!!!
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।