T3 || রবি আলোয় একাই ১০০ || সংখ্যায় জয়া চৌধুরী (নিবন্ধ)

কড়ি ও কোমলে রবীন্দ্রনাথ ও নেরুদা ও পাসের কবিতা
রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী এলেই লেখার অনুরোধ চলে আসে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে কিছু লিখতে গেলেই শুধু উদ্ধৃতি দিয়েই পাতার পর পাতা শেষ হয়ে যায় সেখানে কী যে লিখব ভেবে পাই না। যদি ভারিক্কি প্রবন্ধের কথা ভাবি সেখানেও বৈচিত্র্যের ও বৈদগ্ধ্যের কোন কিনারা পাই না। পশুপালন থেকে বিশ্বকোষ, অঙ্কন থেকে সমাজতন্ত্র সব বিষয়ের সব অনুভূতির অতল প্রসারী কলম যার তাঁকে কলমে লিখব এমন যোগ্যতা তো নেই। তবু ভাবতে গিয়ে মনে পড়ল রবি ঠাকুরের কড়ি ও কোমল বইটির কথা। ১৮৮৬ সালে কাব্য গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে ৮৩ টি কবিতা রয়েছে। অর্থাৎ ২৫ বছর বয়সী যুবকের কলমে এই কবিতাগুলি রচিত। অবশ্য ১৭ বছর বয়সে যিনি বৌ ঠাকরুনের হাট উপন্যাস লিখেছেন তাঁর প্রতিভা নিয়ে নূতন করে বিস্ময় বোধের কিছু নেই, বরং প্রয়োজন তাঁকে পুনর্পাঠ করার। তবু সত্যি কথা বলতে কী বিশ্বভারতী প্রকাশিত ১৫ টি খন্ডে বিধৃত রবীন্দ্র রচনাবলীর অসংখ্য কবিতা আজকের সদ্য তরুণ পাঠক যে প্রায় পড়েন না এ বিষয়ে বিস্মিত না হয়ে স্বীকার করে নেওয়াই শ্রেয়। কারণ বোঝা খুব কঠিন নয়। যুগের পর যুগ ভাষা বদলের সাক্ষী হয়ে থাকে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের কলমে যে বিহারীলাল চক্রবর্তীর কথা জেনেছি, তিনি ম্লান হয়ে যাচ্ছেন তরুণ রবীন্দ্রনাথের উদয়ে। পুরাতন তো সরেই যায়। তবু কেন রবীন্দ্রনাথ এতখানি প্রাসঙ্গিক, এতখানি আধুনিক? সে বিষয়ে পন্ডিতেরা বলবেন। আমার মত অর্বাচীন তাঁর রসাস্বাদনেই ব্যস্ত থাকব। এই কারণেই আজ কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থটি খুলে বসা। স্প্যানিশ ভাষার সাহিত্য চর্চা করতে গিয়ে পাবলো নেরুদার অসংখ্য মহৎ কীর্তির মধ্যে Veinte poemas de amor y una cancion কুড়িটি প্রেমের কবিতা ও একটি গীতি বইটির কবিতাগুলির সংস্পর্শে এসেছিলাম বহু বছর আগে। সারা পৃথিবীতে এই কাব্যগ্রন্থটি আদৃত। নিজে যখন অনুবাদ করতে গিয়েছি তখন কবিতার পর কবিতায় দেখেছি শরীরি ভালবাসার উদযাপন। অবশ্য সে বইটি লেখা হয়েছিল কড়ি ও কোমলের ৩৮ বছর পরে সুদূর চিলেতে বসে, ১৯২৪ সালে যখন নেরুদা মাত্র ১৭ বছর বয়সী এক যুবক ছিলেন। Cuerpo de mujer, blancas colinas, muslos blancos নারী শরীর, শ্বেত পর্বত শীর্ষ, শুভ্র মাংসমজ্জা কিংবা Te recuerdo como eras … তোমাকে মনে পড়ে যেমনটি তুমি ছিলে…
কড়ি ও কোমলের প্রথম কবিতাটি কেই বা না জানে! “মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে…” ৮৩ টি কবিতা বিভিন্ন স্বাদের। কিন্তু বিরহ বা স্তন বা চুম্বন বা বিবসনা প্রতিটি কবিতার ছত্রে ছত্রে এই শরীরী প্রেমের কথা। স্তন কবিতাটির ২ টি পড়া যাক
“পবিত্র সুমেরু বটে এই সে হেথায়,
দেবতাবিহারভূমি কনক-অচল।
উন্নত সতীর স্তন স্বরগপ্রভায়
এর পরের লাইনেই “শিশু- রবি হোথা ওঠে সুপ্রভাতে,” উত্থাপন স্পষ্ট দেখিয়ে দেয় কবি সরে আসছেন ইরোটিক লাইন থেকে। কিংবা ক্ষণিক মিলন কবিতায় “… মেলে দোঁহে তবুও মেলে না, / তিলেক বিরহ রহে মাঝে-/ চেনা বলে মিলিবারে চায়, অচেনা বলিয়া মরে লাজে। মিলনের বাসনার মাঝে আধখানি চাঁদের বিকাশ- দুটি চুম্বনের ছোঁয়াছুঁয়ি , মাঝে শরমের হ্রাস…” কবিতার ইঙ্গিতেই থেমে যাওয়া। অথচ কবি দেহের মিলন কবিতায় স্পষ্ট লিখছেন “ প্রতি অঙ্গ কাঁদে তব প্রতি অঙ্গ-তরে।/ প্রাণের মিলন মাগে দেহের মিলন।/ হৃদয়ে আচ্ছন্ন দেহ হৃদয়ের ভরে/ মুরছি পড়িতে চায় তব দেহ’পরে।/ অধর মরিতে চায় তোমার অধরে।/ তৃষিত পরান আজি কাঁপিছে কাতরে/ তোমারে সর্বাঙ্গ দিয়ে করিতে দর্শন…”।
যদিও নেরুদা প্রসঙ্গে প্রায় সকলেই জানেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা’ কবিতাটির পংক্তি তুলে ব্যবহার করেছেন নিজের কবিতায়। চিলের আরেক প্রবাদ প্রতিম কবি ভিসেন্তে উইদোব্রো এটির বিরুদ্ধে ক্রুদ্ধ হয়ে খবরের কাগজে চিঠি লিখে ছত্রে ছত্রে প্রমান করে দেন রবীন্দ্রনাথের কবিতা থেকে সেগুলি কীভাবে তুলে নেওয়া। অনুপ্রাণিত একে বলতে তিনি নারাজ ছিলেন। পারিপার্শ্বিক সমালোচনার মুখে পড়ে নেরুদাও স্বীকার করেছিলেন এ কথাটি। তবু এ কাজটিকে খুব মন্দ বলতে মন চায় না। কেননা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল প্রাপ্তি স্পেনীয় পৃথিবীর তিনজন নোবেল জয়ী সাহিত্যিককে প্রভূত প্রভাবিত করেছিল বই কী! যদিও সে সময় তাদের কেউই নোবেল পান নি। গাব্রিয়েলা মিস্ত্রাল ১৯৪৫ সালে, খুয়ান রামোন খিম্রেনেস ১৯৫৬ সালে আর তার ঢের পরে ১৯৭১ সালে পাবলো নেরুদা। তাঁর অনেক বছর পরে পেয়েছেন। লেখাটিতে নেরুদার কবিতার ভাষার সঙ্গে মিল খোঁজার চেষ্টা দিয়ে শুরু করলেও বরং ইরোটিক কবিতার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে ঢের মিল খুঁজে পাই ওক্তাভিও পাসের কবিতায়। Cuerpo a la vista কাব্যগ্রন্থে বারবার দেখেছি তার উদাহরন। Dos cuerpos কবিতায় দেখি লিখছেন “মুখোমুখি দুটি শরীর/ কখনও কখনও যেন ঢেউ/ এবং রাত্রিকালে সমুদ্র;/ দুটি শরীর মুখোমুখি / কখনও কখনও দুটি পাথর/ এবং রাত মরুভূমি…’ । এই কবিই আবার লিখছেন “Contra la noche sin cuerpo” শরীরহীন রাতের বিপরীতে কবিতায় লিখছেন- Ojos de sed pechos de sal / entra en mi cama y entra en mi sueño/ amarga pena./ Bebe mi sangre la pena pájaro/ puebla la espera mata la noche/ la pena viva.
চোখের তৃষ্ণা বুকভরা নুন/ আমার বিছানায় আসে এবং স্বপ্নে প্রবেশ করে/ তিক্ত যন্ত্রণা/ আমার রক্ত পান করে পাখি/ ভরিয়ে তোলে কর্কশতায় রাত্রি হত্যা করে/ জীবন্ত যন্ত্রণা…” যদিও রবীন্দ্রনাথের শরীরী প্রেমকেও অন্তিমে ঈশ্বর প্রেমে মিলিয়ে যেতে দেখি। কড়ি ও কোমলের আর একটি কবিতার কথা বলি- পূর্ণ মিলন।
এ তরুণ তনুখানি লহ চুরি করে-
আঁখি হতে লও ঘুম, ঘুমের স্বপন।
জাগ্রত বিপুল বিশ্ব লও তুমি হরে,
অনন্ত কালের মোর জীবন মরণ।
বিজন বিশ্বের মাঝে মিলন শ্মশানে
নির্বাপিত সূর্যালোক লুপ্ত চরাচর,
লাজমুক্ত বাসমুক্ত দুটি নগ্ন প্রাণে
তোমাতে আমাতে হই অসীম সুন্দর।
এ কী দুরাশার স্বপ্ন, হায় গো ঈশ্বর,
তোমা ছাড়া এ মিলন আছে কোনখানে!
উপরোক্ত তিনজন কবি রবীন্দ্রনাথের খ্যাতির মধ্য গগনেই বেঁচে ছিলেন। কিন্তু ওক্তাভিও পাসের উপরে রবীন্দ্রনাথের কোন প্রভাব পড়েনি সেকথা জোর দিয়ে বলা যায় না। তিনি মেক্সিকোর রাষ্ট্রদূত হিসাবে ১৯৬২ থেকে বেশ কয়েক বছর ভারতেই ছিলেন একথা তো সর্বজনবিদিত। কড়ি ও কোমল বইটি রবীন্দ্রনাথের অন্যান্য কাব্যগ্রন্থের চেয়ে আলাদা বলেই আবার পড়তে মন চাইল। সব কটি কবিতাই যে ইরোটিক তা নয়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বললেই সাধারণ মানুষের মনে যে অতিমানবীয় চেহারা রূপকল্প ধারণ করে, এই বইটিতে তিনি অনেক বেশি অন্য রকম, ঢের বেশি রক্ত মাংসের। হয়ত সে কারণেই এগুলি পাশ্চাত্যের এই দুই নোবেল জয়ী স্প্যানিশ ভাষী কবির কবিতা মনে পড়ল।
আমরা বাঙালিরা কতই না ভাগ্যবান। বেঁচে থাকার জন্য একজন রবীন্দ্রনাথ আমাদের আছেন।