গল্পেসল্পে জয়িতা ভট্টাচার্য

আরণ্যক

জঙ্গলটা ভীষণ গহীন।বিস্তীর্ণ পল্লবিত জগত।অনেক সবুজ কিন্তু তার মধ্যেও রয়েছে রঙ ও রূপের ভিন্নতা। বৃদ্ধ বয়োজ্যেষ্ঠ গাছেরা জড়়াজড়ি করে সূর্যের আলো প্রতিরোধ করে । আলো নেই একেবারেই এমনও পরিসর আ়ছে যেখানে অন্ধকারই স্বাভাবিক জীবনের কথা বলে।
হ্যাঁ , অন্য জীবনও আছে বৃক্ষ ছাড়াও।
বেশ কিছু নেকড়ে বাস করে নিরেট গুহা কন্দরে।আ়়ছে শেয়াল আর বিষধর সাপ।তারই মধ্যে জবুথবু বাস করে কয়েকটি ছাপোষা খরগোশ, কাঠবেড়ালি আর পিঁপড়ের সারি।
ওরা মধ্যমবর্ণ। এ বনে পাখিরা যাতায়াত করেনা । কারণ এখানে নীরবতা স্বাভাবিক নিয়ম।
এখানে মুখ খোলা বারন। এখানে নেই মুক্ত আকাশ। তবে বাদুরেরা এখানে দিব্যি বেঁচে আছে।
এখানেই খুব সংকোচের সাথে বাস করে বিস্মরণ ও বিভ্রান্তি নামে দুই হরিণ।ওদের বাবা বিবেক প়থ ভুলে একবার এসে পড়ে়ছিলো এই জঙ্গলে।তারপর আর মুক্তির পথ পায়নি।অন্ধকার গাঢ় হলে বেরিয়ে পড়ে নেকড়ের দল। ওদের মুখ থেকে আগুন ঝরে পড়ে।ওদের দলপতি আগ্রাসন ওদের পথ দেখায়।
বিস্মরণ আর বিভ্রান্তি লুকিয়ে থাকে ভয়ে আর কুন্ঠায় । আগুন়খেকো নেকড়ের দল ছুটে বেড়ায় যত্র তত্র। চৈতন নামের খরগোশটি খুব ভাবে এই আগুনের উৎস নিয়ে।
এই অরণ্যে নিম্ন বর্ণের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বাস করে।ওদের পদবি বিশ্বাস। মুখ খুললেই খতম হয়ে যায় ওরা।
নেকড়েদের চারণভূমি এই জঙ্গল।ওদের পরম বন্ধু রাঘব নামের অজগর আর নবী নামের কালো মথের দল।তারাই এখন এই জঙ্গল শাসন করে।
আঁধারে ওদের লোভী চোখ সবুজ হয়ে জ্বলে।
একসময় রাঘব আর নবী মাঝে মাঝে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা করে।
কিন্তু আমি জানি ভীষন অন্তরঙ্গ ওরা। মোহনের বিষ ওদের জিভে লকলক করে। আমি সব দেখি।
আমি নদী।
এমন দিন ছিলো না অনেক বছর আগেও। দু-পেয়ে কিছু প্রাণী বাস করত । ওরা মানুষ ছিলো।অনেক মানুষ।
তখন এখানে বসবাস করত ওরা।ক্ষেত খামার করত। দিনে কাজ করত রাতে সঙ্গম।চাঁদ ময়লা হয়নি তখনো।
তখনও জঙ্গলে শেয়াল আর নেকড়ে ছিল। ওরা চুপিসাড়ে লুকিয়ে থাকতে পাহাড়ে কন্দরে।সেসব অনেক আগের কথা।
এখন রুগ্ন তির তির করে বয়ে যাওয়া একটা নদী আছে।ওর নাম মায়া ।ওদের দিবা-রাত্রের কাব্য দেখে সে।
এমন সেও ছিল না একসময় তারও বুকে ছিলো জোয়ার ভাঁটা।
শ্বাপদ পূর্ণ জঙ্গল নয় , এখানে একসময় যখন বাস করত মানুষ নামে কিছু প্রাণী।তারা এই নদীর জলে অবগাহন করত, গাছের তলায় এসে বসত প্রেমিক প্রেমিকা।
ছিল মাছরাঙা ,ডাকতো কোকিল।
এমন সময় কোথা থেকে এলো আগ্রাসন আর প্রতারক দুই ভাই।তারা জ্বালিয়ে দিল আগুন এর আর তার হৃদয়ে। বোকা মানুষগুলো লড়তে লাগল নিজেদের সাথেই ।লড়তে লড়তে মানুষ থেকে হয়ে গেলো নেকড়ে আর সাপ।
দুর্বলের হাতে ক্ষমতা বড় সর্বনাশের, আর ক্ষমতাসীনের ক্ষমতার অপব্যবহার ডেকে আনল দল দল কালো মহিষাসুর।
বিশ্বাস তখন পদবি নয়। একজন মহিরূহ ছিল বটে তার মধ্যেই।
ঝুরি নামিয়েছিল। আশ্রয় দিয়েছিল,ছায়া দিয়েছিল। মায়া ওকে ভালোবেসেছিল কারন ও স্বপ্ন দেখাতো।
সেসব অনেকদিন আগের কথা।
তার রক্তাক্ত লাশ ভেসে গেছে কবেই এই মায়া নদীতে।

এখন মায়ার সঙ্গী কিছু ক্ষুদ্র কেঁচো আর শামু়খ।
বিশ্বাস নামে যারা ছিলো ওরা এখন লুকিয়ে থাকে চৈতনের কাছাকাছি।
রাঘব নায়ক হয়ে এসে মানুষগুলোকে এমন মন্ত্র দিলো যে মানুষগুলো ধীরে ধীরে আগুন খেকো নেকড়ে হয়ে যেতে লাগল।
আমি একা একাই এসব দেখতে লাগলাম। আঁধার ভুবনে কীটময় জঙ্গল শ্মশানে।আমি ওদের সকলের নাম জানি। এমনকি কালো মথের রাজা শ্রীনবীকেও।
শ্যাওলা চতুর্দিক। এখন আর মানুষ নামের প্রাণীর সন্ধান পাওয়া যায় না।
এখন শুধু আঁধারের খেলা চলে।শেয়ালের দল বদল, নেকড়ের হাসি আর কু আশা অরণ্যের শুকনো পাতায় পচন ধরায়।
এভাবেই আমি মায়া থেকে কায়া হলাম একদিন।
মনে পড়ে,
একদিন, আমিও তো ভালোবেসেছিলাম। স্বপ্ন দেখতাম।ঢেউ উঠত আমার বুকে । প্রণয় ছিল আমার আর তার।
আজ তার অস্থি ভাসে ক্ষীণ এই স্রোতে।
নিশীথ বেলায় আ়জও স্বপ্ন দে়খি ওকে, মনে মনে কামনা করি ওকে আজও।
ওর নাম ছিলো
বিপ্লব ।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।