T3 || সমবেত চিৎকার || বিশেষ সংখ্যায় জয়িতা ভট্টাচার্য

রাক্ষসপুরী থেকে বলছি,

এ এক ঐতিহাসিক লড়াই চলছে। নেই কোনো দলের পতাকা। আবালবৃদ্ধ বনিতা নেমে আসছে পথে। ফুটবল মাঠ থেকে স্কুলের প্রাঙ্গণ প্রতিবাদে সরব। কী হয়েছিল পাঁচ অগস্ট ২০২৪, এমন কী কী জেনে ফেলেছিলেন দেখা ফেলেছিলেন মানুষটি যার জন্য কয়েকজন রাক্ষস একটি সরকারি হাসপাতালের ভেতরে এমন পাশবিক হত্যা ও ধর্ষণ করেছিল যা ছাড়িয়ে গেছে সমস্ত বিভৎসতা!১৯৪৭ এর ১৪ অগস্ট রাতের পরে এমন এই প্রথম ইতিহাস যেদিন কোনো ডিম্ভাত নয়, বিরিয়ানি নয় ***র ভাণ্ডার নয় শুধু ভেতরের আগুনে জ্বলতে জ্বলতে প্রতিটা গলি রাস্তা পাড়া ছেয়ে গেছে মানুষের রোষানলে। কারা নেই, দশ বছরের বাচ্চা মেয়ে থেকে আশী বছরের বৃদ্ধা, রাজ্যের সমস্ত মহিলা উত্তরের দার্জিলিং থেকে দক্ষিণের সুন্দরবন অবধি দখল নিয়েছে রাতের। সারা ভারত ছাড়িয়ে প্রতিবাদ হচ্ছে সারা বিশ্বের দেশে দেশে। লজ্জায় মাথা নত হচ্ছে না তবু নির্বাচিত রাষ্ট্র কাঠামোর যেখানে ঘটা করে দেবী পুজো হয় টাকার শ্রদ্ধার হয় নকল ভক্তির বন্যা বয়ে যায়।সমস্ত দেশ দেখছে।
তাঁরা স্তম্ভিত হয়ে গেছেন এই বর্বর ন্যাক্কারজনক ঘটনায়, সমস্ত পিতারা, মা, স্বামী ও প্রেমিকেরা আশংকিত হয়ে উঠেছে তাদের বুকের ধন, নারীটি কি রাতে কর্মস্থলে নিরাপদ নয়! এমনকি শহরের মধ্যে একটি সরকারী হাসপাতালেও! তবে কোন দ্বায়িত্ব সঁপেছি আমরা এবং কাকে ভোটে জয়ী করে যেখানে সিস্টেমের মধ্যেই বাস দানবের। যেখানে রাষ্ট্র কালিমালিপ্ত হয়ে যায় ভ্রষ্টাচারে? যেন একটি গনতান্ত্রিক রাজ্য নয় বিপজ্জনক নরখাদকের জঙ্গল?
একজন সরকারি ডাক্তারকে সরকারি হাসপাতালের ভেতর যদি এই নারকীয় পরিণতি দেওয়া হয় তবে লজ্জায় সাস্থ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ করা উচিত ছিল। সারা পৃথিবীর লোক দেখছে। দেশের মানুষ বিচার চায়। একজন ডামি পুতুলের ফাঁসী নয়,মানুষ চায় সঠিক দোষীদের চরমতম শাস্তি। আর কিছু নয়।
কিছুদিন আগেও বলা হতো স্বল্প পরিধানের কথা, রাতে পথে না বেরোনোর কথা, আর কতদিন একটা সভ্য দেশে এসব কথা উঠবে। একটি চিকিৎসক যিনি তাঁর ডিউটি করছিলেন এবং যিনি নারী তাঁর সুরক্ষা না থাকলে এই রাজ্যে কার সুরক্ষা আছে? হতে পারে তিনি গোপন চক্রান্ত জেনে ফেলেছিলেন, হতে পারে অনেক কিছুই, মানুষ ক্রুদ্ধ এবং সন্দেহ করছে শাসক শ্রেনীকে এটা বুঝে নেওয়ার সময় এখন। মনে হয়,
আমরা কতটা স্বাধীন হয়েছি?কতটা সভ্য, কতটা নিরাপদ!প্রসঙ্গত,
রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে দেশের সাধারণ মানুষের যাপনের পার্থক্য প্রায় সব দেশেই দেখা যায়। কিন্তু কতটা পেছিয়ে আছি আমরা মননে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর থেকে?সমস্ত উদ্যোগ একটি বৃহৎ শূন্যের দিকে নিয়ে যায় যখন সে দেশে নারী এখনো পরাধীন স্বাভাবিক জীবন যাপনে, নিরাপত্তাহীন, অসম্মানিত পথে ঘাটে সংসারে আজো। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরো NCRB জানাচ্ছে এদেশে ৩১০০০ ধর্ষণ, প্রতিদিন ভারতে ৯০ জন ধর্ষিতা হন। বলা বাহুল্য প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি। পরিসংখ্যান বলছে এর মধ্যে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপরাধী ধর্ষিতার পরিচিত।দ্বিতীয়ত যেখানে নাবালিকার ধর্ষণ হচ্ছে তার পরিজন দ্বারা।
এবং তৃতীয়ত প্রতিশোধমূলক ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড।
সামাজিক লজ্জার কারনে অভিযোগ দায়ের হয়না ৫০শতাংশ ক্ষেত্রেই। প্রতিদিন ধর্ষিত হয়ে চলেছেন বহু নারী।
না, এসব নারী বা শিশু রা কেউ স্বল্পবসনা অতি আধুনিক ছিলেন না।
তিনটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে—-
পণ্যসভ্যতার জন্য ক্রমাগত মূল্য বৃদ্ধি যা মানুষের স্বাভাবিক জীবন যাপন ব্যহত করছে
দ্বিতীয় ত, অতৃপ্ত যৌনতা তৃষ্ণা।
তৃতীয় ত সোশাল মিডিয়ায় নীল ছবির সহজলভ্যতা।
শেষ তম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমাদের ধর্ম আমাদের মূল্যবোধ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে।
টাকার মূল্য হ্রাস ও শিল্পায়নে ব্যর্থতা একদিকে সাধারন মানুষের নীতিবোধকে আর্থিক চাপে দুর্বল করে দিচ্ছে অন্যদিকে রাষ্ট্র ব্যবস্থা পরিকাঠামোর উন্নতি ও ব্যক্তি পিছু আয় বাড়াতে অক্ষম হয়ে জনসাধারণের মনঃসংযোগ অন্য দিকে চালিত করার চেষ্টা করছেন।পুরুষ এবং নারী উভয় অর্থোপার্জনে মরিয়া হয়ে উঠেছে পরিবার পালনের জন্য ।
একটা সময় ছিল যখন বাল্যকালে বা অল্প বয়সে বিবাহ প্রথা চালু ছিলো মেয়েরাও গৃহে থাকতেন।নারী পুরুষের যৌন জীবন ছিলো নিয়মিত ও স্বাভাবিক। এখন একান্নবর্তি পরিবারে ভাঙন,আর্থিক চাপ চতুর্দিকে অরাজকতা পুরুষকে করে তুলেছে উগ্র। দিনভর ঘর ও বাহির দুই সামলে রাতে নারী ক্লান্ত দেহে নিদ্রায় অথবা অকালেই শীতল।বাড়ছে যৌনতৃষা। রাস্তায়, জনপরিবহনে বাড়ছে নারী শরীর স্পর্শের প্রবণতা। সহজলভ্য নীল ছবি ও শিথিল আইন বিপথে যাওয়া ছেলেদের প্রাণিত করছে ধর্ষণে। গরিব নিরন্ন ও বিকৃত ধর্ম একটি পিতাকে খুনী করে তুলছে তার শিশুকন্যার। তবে এটা ঠিকই, বাজার অর্থনীতি ও মূল্য বৃদ্ধি র সঙ্গে ধর্ষণের ও নারী নির্যাতনের সমানুপাতিক সম্পর্ক আছেই।
আছে শিথিল আইন ও মূল ধর্ম থেকে সরে গিয়ে নীতিশিক্ষার অভাব। ঘূণ ধরা প্রশাসন ও ভ্রষ্টাচারের রাজনীতি যা পুলিশ ও আইন ব্যবস্থাকে করে ফেলেছে ঠুঁটো জগন্নাথ।
উল্লেখযোগ্য ভাবে বিশ্বের ছত্রিশটি দেশের মধ্যে ভারত একটি দেশ যেখানে বৈবাহিক ধর্ষণ স্বীকৃত নয়।

মাননীয় রাষ্ট্রনেতৃত্ব কে অনুরোধ পল্লবগ্রাহী আইন নয় সমস্যার শেকড় থেকে সমাধান করুন।প্রকৃত দোষীদের নির্মম সাজা হোক।
আর সামাজিকভাবে এটা জৈবিক সত্য যে যৌনতৃষ্ণা স্বাভাবিক ভাবে চরিতার্থ হলে বোধহয় পৃথিবীর বহু সমস্যার সৃষ্টিই হতো না।
কিন্তু এর পরেও আছে হত্যাকাণ্ড ও ধর্ষণ যেখানে খুনী বিকৃত মনস্ক। এমনকি মৃতদেহ ধর্ষিত হয়।
সাম্প্রতিক ধর্ষণ ও হত্যার ক্ষেত্রে টার্গেটেড শব্দটি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। তবে কি অন্যায় যে করে আর সহে…কথাটি না মানাই ভালো! তবে কি রাক্ষসের ভয়ে সব মেয়ে মোম মূর্তি ধারন করে থাকবে ততদিন যতদিন না ..

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।