জন্মাষ্টমী স্পেশাল এ জয়িতা ভট্টাচার্য

পুরুষোত্তম

শিশুদের মধ্যেই ঈশ্বরের বাস এমন বার্তা দিতে কৃষ্ণ জন্মাষ্টমীর উৎসব,নারীর মাতৃ সাধের পূরণ জন্মাষ্টমী।বাৎসল্যের জয়গান জন্মাষ্টমী।আসক্তির জয়গান জন্মাষ্টমী।কোনো পাথরের মূর্তি সেবা নয়।মানব সম্পদের সুরক্ষা স্নেহ আশ্রয় ও বাৎসল্যের অনুষ্ঠান জন্মাষ্টমী।
কৃষ ধাতু থেকে উদ্ভুত অর্থাত যা আকর্ষণ করে,কৃষ+ন প্রত্যয় যুক্ত শব্দ কৃষ্ণ আবার কৃষ্ণ মানে কালো রং।
ভারতের এক আশ্চর্য চরিত্র কৃষ্ণের জন্ম জয়ন্তী।
সৌর ভাদ্রের অষ্টমী তিথিতে রোহিনী নক্ষত্রের প্রাধান্য তে কৃষ্ণ জন্মাষ্টমী পালিত হয়।গোকুলাষ্টমী,রোহিনী অষ্টমী বা কৃষ্ণাষ্টমীও বলা হয়।
বলা হয়ে থাকে খৃষ্টপূর্ব ৩২২৮ শতকে জন্ম তাঁর।
মোটামুটি ষোড়শ শতাব্দীর থেকে জন্মাষ্টমীর মিছিল তথা উৎসবের নয়া তথ্য পাওয়া যায়।
কৃষ্ণ,যিনি শেখান জীবন চর্চার কৌশল।
শ্রী কৃষ্ণ বহুরৈখিক এক ভারতীয় পুরুষ চরিত্র। …যিনি শ্রেষ্ঠ প্রেমিক,বুদ্ধিজীবী,
রাজনৈতিক ও উদার শিক্ষক।এক নির্ভিক,আপোষহীন নির্লিপ্ত মেধাবী মানুষ কৃষ্ণ। অসাধারণ ইন্টেলেক্চুয়াল মানুষটি শুধুই প্রেমের কাছে পরাজিত হতে পারেন।
কৃষ্ণ প্রেম একটি ভারতীয় মনস্তত্ব যা মনকে শান্ত করে গীতা যা মনকে যুক্তির পথে টেনে আনে কোনো সাইক্রিয়াটিকের কাউন্সেলিং ছাড়াই। তাঁকে জানতে হলে চাই মেধা।অন্ধ ভক্তি নয়।
কৃষ্ণ
যদি কল্পিত চরিত্র হন তবে এই চরিত্র চিত্রণের স্রষ্টাকে ঈশ্বর বলা যায়।
বিশ্বের শ্রেষ্ঠ পুরুষ কৃষ্ণ অলৌকিক নয় লৌকিক জীবন যাপনের সার সত্য ও ফর্মুলা শেখান।যা আজ এই ২০২৩ সালেও সমাজ ও মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে অনুকরণনীয় হতে পারে ব্যক্তি জীবনের নানা সমস্যায়।
ধর্ম আমাদের যাপনের কৌশল। সেই কৌশল আমরা কৃষ্ণের গোটা জীবন থেকে শিক্ষা নিতে পারি।কিভাবে জীবন যাপন করা যায়। কিভাবে প্রতিকুলতাকে জয় করা যায়।যে ব্যক্তির মধ্যে নিহিত বীর রস কংস বধ ও কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ সেই কৃষ্ণ ই অবনত এক প্রেমিক যিনি রাধার মানভঞ্জনে ব্যাকুল।কৃষ্ণের জীবনের প্রতিটি পর্ব প্র্যাক্টিকাল শিক্ষা দেয়।
যদি হতাশ হয়ে অপদস্থ হয়ে শত্রু পরিবৃত এই জীবন দুঃসহ লাগে,একবার ভাবুন কৃষ্ণ হলে কী করতেন।
জন্মের পর থেকে তাঁকে মেরে ফেলার চক্রান্ত হয়েছে।ক্রমাগত।সারাজীবন। শোক,দঃখ,বিচ্ছেদ বিরহের বিষ পান করে নিয়েছেন হাসিমুখে।কৃষ্ণের মুখে হাসি। ভয়হীন উপেক্ষা।
কিছুতেই যাকে ভেঙে ফেলা যায় না সেই “কৃষ্ণ”। শত্রু মিত্র সবার প্রতি এক নির্মোহ ভুবনভোলানো হাসি,কেয়ার করি না মনোভাব। করে দেখুন জিতে যাবেন জীবনে।
গীতা থেকে লোক শিক্ষা পাই আমরা। কুরুক্ষেত্রের ময়দানে বিহ্বল অর্জুনকে কী কী বলছেন কৃষ্ণ। যদি মস্তিষ্ক দিয়ে বোঝার চেষ্টা করা যায় পাওয়া যায় বাঁচার মন্ত্র।
ক্ষমা,তা মহৎ হলেও একটি সীমা পর্যন্ত, তারপর নয় শিশুপাল বধের শিক্ষা। এভাবে জীবনের মেন্টর হয়ে যান কৃষ্ণ যে চাইবে।
সারা বাল্যকাল তথা কৃষ্ণের জীবন জুড়ে রয়েছে এমন হাজার সাংসারিক কথা,উপদেশ রূপকাকারে যা দৈনিক গড়পড়তা জীবনে মেনে চললে এড়ানো যায় সংকট কোনো অলৌকিক ভগবান ছাড়াই।
বিশ্বে একমাত্র গীতা,একমাত্র ধর্ম, কৃষ্ণ যেখানে দেখিয়েছেন জীবনের বাঁচার জন্য তুচ্ছ ছল অন্যায় নয়।অন্যায় রুখতে আপন আত্মীয়ের বিরোধিতা করা যৌক্তিক। এমন অনেক দৃষ্টান্ত যা পৃথিবীর অন্য কোনো ধর্মে এত practical শিক্ষা নেই। অলীক নয় তাই কৃষ্ণ অতিবাস্তব আদর্শ।
কেন সারথি? যদি ভাবি রথের ঘোড়াগুলি মানব রিপু, আর তার কন্ট্রোল বা লাগাম হাতে আছে কৃষ্ণের। তবে ঠাণ্ডা মাথায় জিতে যাওয়া যায় ঘনিষ্ঠ জনের অন্তর্ঘাত।অন্ধ মোহ।সীমাহীন লোভ।লালসা।সারথির হাতে রথের রশি।
এভাবেই কৃষ্ণ হয়ে ওঠেন একটি আদর্শ চরিত্র থেকে একজন ঈশ্বর। ঈশ্বর একটি কনসেপ্ট যা থেকে আমরা পজিটিভ এনার্জি পেতে পারি। যা আমাদের মনে সুপ্ত তাকে জাগ্রত করার দীক্ষা।
গোপাল সেবার মাধ্যমে যেমন নারীর মাতৃরূপ বা বাৎসল্যের মহিমা স্বীকার করা হয়েছে,তেমনি রাধা রূপে নারীর প্রণয় তিয়াসকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
প্রেম তা বিবাহ বহির্ভূত হলেও মহৎ।
এত আধুনিক এই কৃষ্ণ কাহিনী ভাবতে অবাক লাগে এত সুপ্রাচীন কালেও।
আধুনিক সাম্যবাদকে পেছনে ফেলে কৃষ্ণ কাহিনীতে আমরা দেখেছি ব্রাহ্মণ্যবাদকে অস্বীকার করে রাখাল রাজা বা shepherd boy কে ঈশ্বর বলা হলো।
দত্তক সন্তানের স্বীকৃতি সহ, গয়লার পালিত পুত্র মথুরাপতি হয়ে যান।
নারী পুরুষের মুক্ত বন্ধুত্ব দেখা যায় কৃষ্ণ দ্রৌপদী আলাপে। সেখানে আরোপিত ভাই পাতানোর কোনো প্রচেষ্টার কথাই নেই।
বিবাহ নয় প্রণয়কে শ্রেষ্ঠ মানা হয়েছে।একেবারে খোলাখুলি।
গেল গেল রব ওঠেনি। খাপ পঞ্চায়েত বসেনি।
কৃষ্ণ অনেক আধুনিক যত আধুনিক প্রযুক্তির মানুষ হতে পারেনি।তাবড় মুক্ত মনা আজ তত আধুনিক নয়।
কৃষ্ণ কাহিনী তাই আজকের পুনরাধুনিক বা উত্তরাধুনিক সমাজের গালে থাপ্পড়। এত আধুনিক এমন statesman,এমন বিদগ্ধ রাজনৈতিক নেতা ঈশ্বর মর্যাদা পাবেন বৈকি।
তাই কৃষ্ণ জন্মাষ্টমীর গুরুত্ব অনিবার্য মেধাযুক্ত মানুষের কাছে,হৃদয়বান মানুষের কাছে এবং বাৎসল্যের ফল্গুধারা মায়েদের কাছে এবং প্রান্তিক মানুষের কাছেও। কৃষ্ণ ___ যাকে অস্বীকার করা যায় না।
পেছন ফিরলে মৃত্যুশুধু এগিয়ে চলা__ কৃষ্ণ নাম করলে তাই কোনো anti depressant medicine প্রয়োজন নেই, ডেল কার্নেগি পড়ার দরকার নেই ,hoe to make friends, how to stop worrying প্রভৃতির উত্তর….কৃষ্ণ।

চরৈবেতি।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।