সাপ্তাহিক ধারাবাহিক ঐতিহ্যে “কলকাতার চার্চ (কোম্পানীর যুগ)” (পর্ব – ১২) – লিখেছেন অরুণিতা চন্দ্র

বর্তমানে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একটি মহিলা মহাবিদ্যালয়ে ইতিহাসের সহকারী অধ্যাপিকা পদে নিযুক্ত আছেন। ইতিহাসের অধ্যাপনা ও গবেষণা ছাড়াও পুরাণ ও ভারতীয় সংস্কৃতিচর্চায় তিনি প্রবল আগ্রহী। বাঙালির জাতীয়তাবাদী ইতিহাস রচনা তাঁর স্বপ্ন। এছাড়া ভালোবাসেন ঐতিহাসিক স্থান ভ্রমণ করতে এবং লেখালিখির চেষ্টা করতে।
মহানগরীর কোম্পানি আমলে নির্মিত প্রোটেস্টেন্ট চার্চ গুলির আলোচনা শেষে রোমান ক্যাথলিক ও ইস্টার্ন অর্থোডক্স চার্চ গুলির আলোচনা শুরু করার পূর্বে কয়েকটি প্রোটেস্টেন্ট চার্চের কথা আলোচনা আবশ্যক যার হয় বর্তমানে অস্তিত্ব আর নেই অথবা অন্যত্র নির্মিত হয়েছিল অথবা বর্তমানে তাদের রূপ পরিবর্তন হয়েছে।
মহানগরীর প্রথম আংলিক্যান চার্চ হিসাবে St. Anne’s Church এর জন্ম ও মৃত্যু প্রথম পর্বেই আলোচিত হয়েছে। এরপর সেন্ট জন চার্চ গড়ার আগে বর্তমান ফোর্ট উইলিয়ামের অভ্যন্তরে ১৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দে একটি প্রার্থনাকক্ষ নির্মিত হয় যেখানে বর্তমান Command Library টি অবস্থিত বলে এই লাইব্রেরির বাইরে পূর্বের দেওয়ালের কালো পাথরের ফলক টি থেকে জানা যায়। পরে ১৮২২ ও ১৮২৬ খ্রিষ্টাব্দের সমাচার দর্পন থেকে ফোর্ট উইলিয়ামের অভ্যন্তরে একটি চার্চ তৈরির প্রস্তাবনা দেওয়া হয় বলে জানা যায়। ১৮২৬ খ্রিষ্টাব্দে St. Peter’s Anglican Church এর শিল্যান্যাস ঘটে এবং ১৮৩৫ এর মধ্যে তার নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হয়। চার্চটি গথিক স্থাপত্যে নির্মিত ছিল কিন্তু কোন শিখর এতে যুক্ত ছিল না। তবে চার কোণায় চারটি ছোট চূড়া চার্চের আভিজাত্য বাড়িয়েছিল। চার্চের পশ্চিম দেওয়ালের বৃহৎ জানলাটি কাঁচের উপর অঙ্কিত চিত্র দ্বারা সজ্জিত যেখানে বাইবেলের ঘটনার চিত্ররূপ বর্ণিত আছে। চার্চটির দেওয়ালের মর্ম্মর স্মৃতিফলক গুলি থেকে কোম্পানির সেনাবাহিনীর কিছু উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের পরিচয় পাওয়া যায় যাঁদের মধ্যে ১৮৩৯-১৮৪২ খ্রিষ্টাব্দের প্রথম ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধতে পরাজিত কোম্পানি বাহিনীর সদস্যরাও ছিলেন। এরকমই একজন ছিলেন Col. W.H.Dannie যিনি ১৮৪২ খ্রিষ্টাব্দের ৭ ই এপ্রিল জালালাবাদে যুদ্ধে নিহত হন। তিনি এলফিনস্টনের ব্রিটিশ আর্মির পরাজয় সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করার জন্য স্মরণীয় ছিলেন। ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে এই সেন্ট পিটার’স চার্চটি বর্তমানের কম্যান্ড লাইব্রেরীতে পরিণত হয় এবং নিজের অস্তিত্ব হারায়।
বর্তমানের জোড়া গীর্জা বা সেন্ট জেমস চার্চটি প্রথমে আজকের স্থানে অবস্থিত ছিল না। উনিশ শতকের প্রথমেই মধ্য কলকাতায় খ্রিস্টান জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছিল। ইতিপূর্বে মিশন চার্চ এবং সেন্ট জন চার্চ ট্যাংক স্কোয়ার বা ডালহৌসি স্কোয়ার অর্থাৎ বর্তমানের বিবাদী বাগের নিকট নির্মিত হওয়ায় মধ্য কলকাতায় একটি প্রোটেস্টেন্ট চার্চ নির্মিত হবার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়।Robert Lajerus D’Aleveira নামক এক Anglo-Indian যিনি রোমান ক্যাথলিক থেকে প্রোটেস্টেন্ট ধর্মমতে সদ্য দীক্ষিত হয়েছিলেন তিনি এই চার্চ নির্মাণের উদ্দেশ্যে নিজ বাগান বাড়িটি দান করেন। সমাচার দর্পন থেকে জানা যায় বৈঠকখানা এলাকায় হেস্টিংস নির্মিত পুরাতন মাদ্রাসার নিকট এই বাগান বাড়িতে প্রথম St. James Church এর শিল্যান্যাস হয় ১৮২০ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে। চার্চ সংলগ্ন এলাকায় দরিদ্র শিশুদের জন্য একটি স্কুল নির্মাণের ও পরিকল্পনা হয় এবং তার জন্য এক খ্রিষ্টান ভদ্রলোক ৪০০০ টাকা দান করেন।পুকুর বুজিয়ে এই চার্চটি নির্মিত হয়। শুরু থেকেই তাই তার ভিত নড়বড়ে ছিল তাই তার স্থাপত্যে শিখর যুক্ত হয়নি। স্থানীয় মানুষের কাছে এই চার্চটি তাই নেড়া গীর্জা নামে পরিচিত হয়। কিন্তু দ্রুতই চার্চে ঘুণ ধরে যায় এবং ১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট মাসে আচমকাই এটি ধ্বসে পড়ে ও এভাবেই প্রথম সেন্ট জেমস চার্চটির পরিসমাপ্তি ঘটে। পরবর্তী কালে লোয়ার সার্কুলার রোড বা বর্তমান আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু রোডে ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দে চার্চ ও তার সংলগ্ন স্কুল নির্মাণের কাজ শুরু হয় ও ১৮৬৪ তে তা সমাপ্ত হয়।
এই প্রসঙ্গে তৃতীয় চার্চটি হল লর্ড জেসাস চার্চ যার উল্লেখ পূর্বে রেভারেন্ড আলেকজান্ডার ডাফের ফ্রি চার্চ প্রসঙ্গে হয়েছিল। ডাফের সেন্ট এন্ড্রুজ চার্চ ত্যাগের পর ১৮৪৩ খ্রিষ্টাব্দে ফ্রি চার্চ নির্মাণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ওই বছর ডিসেম্বর মাসে ওয়েলেসলি স্কোয়ারের কাছে দুই বিঘা জমি ক্রয় করা হয় ৮৮৫০ টাকা অর্থমূল্যে। ক্যাপ্টেন Goodwyh নামক এক ইঞ্জিনিয়ার চার্চের নকশা প্রস্তুত করেন। ৩০০০০ টাকা চার্চ নির্মাণের অর্থমূল্য ধার্য হয়। কিন্তু ফ্রি চার্চের সদস্যদের প্রত্যাশা পূরণ না করতে পারায় চূড়াটি অক্ষত রেখে চার্চের বিল্ডিং এর নকশা পরিবর্তিত হয় এবং এর জন্য ১ লক্ষ ১৫ হাজার টাকার ফান্ড সংগ্রহ হয়।১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে চার্চের নির্মাণকাজ সমাপ্ত হয়। পরে ওয়েলেসলি স্কোয়ারের নাম বদলে হয় বর্তমানের রফি আহমেদ কিদয়াই রোড। হেদুয়ার ডাফ চার্চের সাথে নির্মাণশৈলীতে এর সাযুজ্য ছিল। ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে ফ্রি চার্চ আবার চার্চ অব স্কটল্যান্ড এর সাথে যুক্ত হয়ে যায়।১৮৪৮-১৯৪২ পর্যন্ত এই চার্চের সমস্ত মিনিস্টারের নামের তালিকা মেলে চার্চের বাদিকে একটি মার্বেল ফলক থেকে। এই চার্চের বৈশিষ্ট্য ছিল এর অভ্যন্তরে চিত্রগুলিতে যিশু, মেরী বা জোসেফের প্রতিকৃতি গুলি প্রাচীন রোমান না বরং ভারতীয় পোশাকে অঙ্কিত। কারণ ফ্রি চার্চ মূলত ধর্মান্তরিত দের জন্য নির্মিত হয়। বিংশ শতকের সত্তরের দশকে এই চার্চটি রোমান ক্যাথলিকদের হাতে হস্তান্তরিত হয় এবং লর্ড জেসাস চার্চ নামে পরিচিত হয়। এভাবে প্রথম ফ্রি চার্চের অস্তিত্ব লুপ্ত হয়।
কোম্পানির আমলে কলকাতায় নির্মিত মূল প্রোটেস্টেন্ট চার্চগুলির আলোচনা এখানে সমাপ্ত হয়। পরবর্তী পর্বগুলিতে কোম্পানি কলকাতার রোমান ক্যাথলিক চার্চগুলি আলোচিত হবে।

চলবে

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!