ক্যাফে গল্পে জনা বন্দ্যোপাধ্যায়

পাথর – প্রতিমা
ফতেমা রাজা আনন্দনাথের প্রাসাদের বাইরে দাঁড়িয়ে আল্লাহ-র নাম করে। তার চোখের জল বাঁধ মানে না! শীর্ণ ক্লান্ত শরীরে কোন শক্তি নেই। মেঘ ভাঙা বৃষ্টির মতো ফতেমার দু:খের দিনলিপি!
ফতেমার স্বামী জাকিব খানের পাঁচ বিঘে জমি ছিল। বেশ ভালো ফলন হত। দুই ছেলে মেয়ে নিয়ে ফতেমার ছিল সুখের সংসার। কিন্তু পরাধীন ভারতে নাটোরের রাণী ভবানীর উত্তরসূরী রাজা আনন্দনাথ নীলকর সাহেবদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে চাষীদের নীল চাষ করতে বাধ্য করেন। জাকিব আপত্তি করেছিলেন। সেই প্রতিবাদ অগ্রাহ্য করে তাঁকে কয়েদ করে রাখা হয়। ফতেমা শুনেছে বন্দীদের ওপর নির্মম অত্যাচারও করা হয়। শোষণের বর্বরতা সীমা ছাড়ায়। এ বছর বর্ষা বেশ ভালো হয়েছে। ভালো ফলন আশা করা যায়। কিন্তু চাষীদের পেটের ভাত মেরে নীল চাষে রাজী করানো বড় অমানবিক!
ফতেমার আব্বার মাটির বাড়ি ছিল নাটোরেই। তার আব্বা একজন ধার্মিক মৌলবী। ফতেমার এক দাদা আছে, বাংলার মুর্শিদাবাদে শাড়ির ছোট খাটো ব্যবসা করে। ফতেমার মা তার দাদার সঙ্গে ওখানে থাকেন। বাবাকে দেখা শোনা করত ফতেমা। বাবা মেয়ের সুন্দর সম্পর্কের বন্ধন ছিল। জাকিব ফতেমার খালাতুতো দাদা। জাকিব ছোট থেকেই পিতৃহীন। জাকিবের বয়স যখন ছয়,তার আব্বা গ্রামের রাস্তায় সাপের কামড়ে মারা যান। জাকিবদের বাড়ি নাটোর থেকে কিছুটা দূরে পদ্মার পাড়ে। পরাধীন ভারতে গ্রামীণ সংস্কৃতি হিন্দু মুসলমানকে পাশাপাশি থাকতে শিখিয়েছে। জাকিবের আব্বার মৃত্যুর পর তার আব্বার বন্ধু সতীশ মিত্র জাকিবকে পড়াশোনা শেখার জন্য পাঠশালায় পাঠান। বন্ধু বৎসল সতীশ মিত্র জাকিবের মা বোনের ভরণ পোষণের দায়িত্ব নেন। জাকিবের ষোলো বছর বয়সে হঠাৎ করেই সতীশ মিত্রর হৃদরোগে মৃত্যু হয়।
এরপর জাকিব তাঁর আব্বার জমিতে চাষ শুরু করেন। রোদে জলে পরিশ্রমে মজবুত পেশীবহুল জাকিবের চেহারা। বোনের বিয়ে দিতে গিয়ে দুই বিঘা জমি বেচতে হয় তাঁকে। বাকি জমিতে ফসল ফলিয়ে সংসারের অভাব মেটান জাকিব।
ফতেমা পাঠশালায় পড়েনি। সে তার আব্বার কাছে সামান্য আরবী শিখেছে। তখন ফতেমা সতেরো বছরের কিশোরী, শাড়ি পরে সর্ষে ক্ষেতে যখন সে ঘুরে বেড়াতো, তার গায়ের রঙ সর্ষে ফুলের রঙের সঙ্গে মিশে যেত। দুটি চোখ ছিল জ্যোৎস্না মাখা। ঠোঁটের পাশে কালো তিলে আরো মিষ্টি লাগতো ফতেমাকে। একদিন হঠাৎ করেই ঘরের ছাগলগুলো তাড়াতে তাড়াতে কিশোরী ফতেমা যুবক আনন্দনাথের ঘোড়ার সামনে এসে দাঁড়ায়। নাটোরের রাজা শিবনাথের ছোট ছেলে সুপুরুষ আনন্দনাথের ঘোড়ায় চড়ে গ্রামের পথে ঘুরে বেড়ানোর শখ। ফতেমাকে দেখে আনন্দনাথ ঘোড়ায় লাগাম টেনে দাঁড়িয়ে পড়েন। তারপর ঘোড়া থেকে নেমে ফতেমার দিকে একভাবে চেয়ে ফতেমার নাম জিজ্ঞাসা করেন। ফতেমা সলজ্জ মুখে নাম বলে।
এরপর আনন্দনাথ প্রায় প্রায়ই ফতেমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে ফতেমার বাড়ির কাছাকাছি বট, অশ্বত্থ আর আমের বনে যেতেন। বটের ঝুরির আড়ালে নিস্তব্ধ প্রহর কাটতো ফতেমা ও আনন্দনাথের। দুজনের চোখেই ছিল মুগ্ধ আবেশ- ঝর্ণা ধারার ভালোবাসা।
একদিন আনন্দনাথ ফতেমার হাতদুটো ধরে বলেন, “তোমার আব্বার কাছে আমাদের বিয়ের প্রস্তাব দেব।”
ফতেমার মুখে আশঙ্কার রেখা লক্ষ্য করেন আনন্দনাথ।
“না, না। আব্বা রাজী হবেননা। বিয়ে আমাদের হবেনা। আপনি ফিরে যান। এখানে কেউ জানতে পারলে আপনার সমস্যা হবে!”
আনন্দনাথ সেদিন ফতেমার দীঘির মতো চোখে কালো মেঘের ছায়া দেখেন।
” বেশ চলে যাচ্ছি। তবে কোনদিন যদি মনে পড়ে বা প্রয়োজন হয়, আমার কাছে আসতে দ্বিধা কোরোনা। ”
আনন্দনাথের কথার সঙ্গে সঙ্গে সেদিন শেষ বিকেলে বড় তাড়াতাড়ি সন্ধ্যের অন্ধকার নেমে আসে। আনন্দনাথের ঘোড়া মিলিয়ে যায় দূরে। ঝাপসা হয়ে আসে ফতেমার দৃষ্টি। কিছু দিনের মধ্যে জাকিবের মা ফতেমার আব্বার কাছে ছেলের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসেন।
মাঝে দশটা বছর কেটে গেছে। ফতেমার সঙ্গে আনন্দনাথের আর দেখা হয়নি। শিবনাথের পর নাটোরের রাজা হন আনন্দনাথ। ততদিনে নাটোরের মাটিতে ব্রিটিশদের আধিপত্য বেড়েছে। বন্ধুত্বের মুখোশ পরে ব্রিটিশরা আনন্দনাথের সঙ্গে চুক্তি করে। নাটোরের প্রাসাদের পাশে স্থাপিত হয় কয়েদখানা। অন্ধকার, আলো বাতাস বিহীন কিছু অস্বাস্থ্যকর কুঠুরী। এছাড়া প্রাসাদের আঙিনায় কুঁয়োর ভেতর প্রস্তুত হয় ফাঁসির মঞ্চ। খাজনা দিতে না পারলে রাজা আনন্দনাথের নির্দেশে পেয়াদা প্রজাদের ধরে এনে কয়েদখানায় বন্দী করে। নীল চাষে অসম্মত হলেও কয়েদখানার শাস্তি জোটে। চাবুকের আঘাত ও আরো অনেক অত্যাচার বন্দীদের নীরবে সহ্য করতে হয়। বন্দীরা খুব বেশী প্রতিবাদী হলে আনন্দনাথ তাদের রাতারাতি ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন।
আজ ছেলে মেয়ে দুটোর মুখ চেয়ে স্বামী জাকিবের মুক্তি প্রার্থনায় ফতেমা আনন্দনাথের প্রাসাদের প্রবেশদ্বারের বাইরে এসে দাঁড়ায়। কিন্তু তার পা যেন সরে না। আনন্দনাথের সামনে গিয়ে স্বামীর মুক্তির জন্য আর্জি জানাতে ফতেমার আত্মসম্মানে বাঁধে। আল্লাহ তাকে এক কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছেন। একদিন যাঁর বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছে, আজ তাঁর কাছে প্রার্থনার ঝুলি নিয়ে দাঁড়াতে ফতেমা প্রবল মানসিক বাধা অনুভব করে।
ফতেমা ভাবে ক্ষমতা মানুষের পরিবর্তন ঘটায়। প্রজাবৎসল রাণী ভবানীর দানশীলতা ভুলে তাঁর উত্তরসূরী আনন্দনাথ নীলকর সাহেবদের উস্কানিতে পাশবিক রূপ ধারণ করেছেন। নাটোরের প্রজারা পাষাণ রাজা আনন্দনাথকে অশ্রদ্ধার চোখে দেখে। আনন্দনাথের অমানবিকতা ফতেমার মনেও তার প্রথম ভালোবাসার প্রতি ঘৃণা বোধ জাগিয়ে তোলে। সন্ধ্যের মুখে নিবিড় অন্ধকারে নাটোরের রাজপ্রাসাদের সামনে স্থির দাঁড়িয়ে থাকে ফতেমা, এক বিষন্ন পাথর – প্রতিমা!